https://www.prothomalony.com/

15578

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৭:৫৯

মেরুনরঙের আবেগ

আ ই না ল হ ক 

 

না থাকা জিনিস সাজিয়ে রাখবার বড্ড শখ আমার

মায়াবী শূন্যতা দু'হাতে জড়িয়ে ধরতে যাই

মরিচীকায় ঢেলে দিই মেরুনরঙের আবেগ

লোকে শুনে কি বলে জানো, ভারি বেকুব;

বলে অস্তিত্বহীনকে বাস্তবতায় পোষা ভীষণ পাগলামি। 

ওদিকে তুমিও বইয়ের পাতার মতো 

কেবলই উল্টেপাল্টে দেখলে, 

অথচ পাঠে মনোনিবেশে যে সম্পদ আবিষ্কার করতে 

সীমাহীন অবহেলার দরুন তা রহস্যই রয়ে গেল। 

আচ্ছা মনা; যে শিখা জ্বালানো হয় নিজেদের অজান্তে 

তা-কি আদৌ আলোকিত করতে পারে গহীন অন্ধকার?

 

 

 

ঘুড়ি আর হেঁটে আসা মানুষ

ইসলাম মুহাম্মদ তৌহিদ

 

হাতে ঘুড়ি নেই তবুও সে আকাশে তাকায়—

মুক্তির মানে খুঁজতে গিয়ে বুঝে ফেলে অস্তিত্বের সংকট! নাটাই নাকি ঘুড়ি, আসলে কে কাকে উড়ায়?

মাকে পুড়তে থাকা হাড়ের গন্ধে ভাত রাঁধতে দেখে সে 

শিখে ফেলে 'ক্ষুধা আর কল্পনার ভেদরেখা'।

স্কুলের খাতা থেকে একটি পাতা উড়ে গিয়ে পড়ে 

কারখানার ছাদে,

যাতে স্পষ্টাক্ষরে লেখা—

'মানুষ জন্ম নেয় একদিন, কিন্তু সে মানুষ হয় প্রতিদিন'।

 

দেয়াঙ

বশির আহমেদ 

 

জীবনের উপক্রমণিকায় আমার একটি ঘর ছিল,

ডমেস্টিক এনিমেলের মতো দিনশেষে তার বুকে খুঁজে 

নিতাম আশ্রয়। এখন সন্ধ্যা হলে একলা হাঁটি, 

আক্ষেপের জোয়ার ভাটায় কাছে টানে দেয়াঙ পাহাড়।

অরণ্যের করতলে জীবনের অর্থ খুঁজি,

বুকের পাঁজর দিয়ে হেঁটে যায় নাশপাতিবাগান। 

চিন্তার নহরে সাঁতার কাটি,

দু'চোখে ফুটে গালিবের ফুল। 

বিরম্বনা পথে পাবালো পিকাসোর রং মেখে পৌঁছে যাই সান্তাক্লজের বাড়ি!

 

উড়চুঙ্গা পোকার স্বপ্ন

মারুফ আহমেদ নয়ন

 

তোমাকে দেখেছি লাল মাছরাঙা, বাদাবনে।

আমার পাখি–তপস্যা পূর্ণ হলো। ছিলাম সিন্ধু–

ঈগল, শালবনে ছিল উড়াউড়ির দিন। দূরবীন

নিয়ে তাকিয়ে থাকো তুমি। আমি শিকার করি

বুনো কাঁকড়ার দল—পতঙ্গ শিকারের উৎসব।

উড়চুঙ্গা পোকার স্বপ্নে ঢুকে পড়ি হরপ্পা নগরী।

হৃদয়ের ভাষান্তর করি। যেন তোমাকে ভালবাসা

অপরাধ হয়ে গেছে। অগ্ন্যুৎপাতে সব ছাই হয়ে

গেছে। সীমান্ত–ক্যাফেতে জ্বলছে মায়াবী লণ্ঠন।

তোমার রূপের মতো সর্বগ্রাসী প্রাণের পদ্মনগর।

ধূসর শিলায় পলির স্তর। তোমার কথার মতো

ছোট শান্ত ঢেউ। দুঃসহ স্মৃতি–কাতরতা। জানি,

আদিতে জগৎ বিভোর ছিল। সেরূপ মগ্নতায়

তোমাকে জগৎ বলে সম্বোধন করি।

 

রুদ্র, তোমারই ছায়ায় কলুষিত হতে চাই

মাজহারুল ইসলাম

 

ভিতরে-বাহিরে নির্বাসিত আমি,

সন্ন্যাস-ব্রতে বড় একেলা।

সুদূর নির্জনে একা-একা হাঁটি,

নিস্তব্ধতার চাদরে নিজেকে জড়িয়ে।

আমার গুমোট পৃথিবীতে সকাল হয় না,

দুপুর হয় না, বিকেলও না।

মাঝরাতে থেকে থেকে কুকুরের আহাজারি,

জরাগ্রস্ত হুতুমপেঁচার আর্তনাদ,

ডানা-ভাঙা বাদুড়ের পাখা-ঝাপটানি...

একদিন অভিমানে, অকারণে,

ওরাও গেল চলে!

জানি, আপাদমস্তক তুমি এক প্রেতাত্মা,

অশরীরী তুমি—অস্তিত্বহীন, এক অন্যরকম অনুভূতি।

তবুও নির্বাসিত আমি,

বারবার আছড়ে পড়ি তোমার বুকে!

কলুষিত হই বারংবার—

আবারও কলুষিত হই স্বেচ্ছায়!

আমি তোমারই ছায়ায়

আর-একবার কলুষিত হতে চাই, রুদ্র।

কলুষিত হতে চাই

অন্তিম বারের মতো—আরও একবার, শেষবার।

 

পরাজয়ের ধূসর গল্প 

মোর্শেদা মৌ 

 

অবশেষে আমি শান্ত পরিশ্রান্ত -

নির্জন সমুদ্র বেষ্টিত অচেনা দ্বীপের মতো, 

যেখানে গুটিকতক স্বপ্ন এখনো বেঁচে আছে 

অবলা নারীর মতো। 

যার অসহায় চিৎকার, মনের রসনার আর্তনাদ 

সুবিশাল জলরাশীর মাঝে প্রতিধ্বনি হয়;

ফিরে আসে নিজের কাছে। 

কারও মৌনতা ভেঙে বিরক্তের কারণ হবার নয়,

প্রচণ্ড হাহাকার, বীভৎস পরাজয়ের ধূসর গল্প এটি,

চিরন্তন পৃথিবী স্বাগত জানায় মৃত্যু, স্থবির সন্ধ্যা 

স্বপ্নের অধ্যায়গুলো এখানে বৈচিত্রহীন, 

বৈরিতার শাসনে অনবদ্য তিক্ততার সৃষ্টি সীমাহীন।

 

আমি বিপদ মহাশয়

মিঠুন দত্ত 

 

আমি বিপদ মহাশয়;

‎তপ্ত চুলোয় পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি লরাটায়

‎সারাক্ষণই জাল হতে থাকে―

‎বিপদের হরেক রকম আনাজ-তরকারি।

‎কখনো বলক উঠছে, কখনো-বা পুড়ছে,

‎কখনো বাগাড়ের তীব্র ঝাঁঝালো ঝাঁজ,

‎কখনো কর্কশ মাজুনির ঘষা-ঘষি,

‎স্বেচ্ছায় আমন্ত্রিত নিমন্ত্রিত।

‎আমি বিপদের নেটওয়ার্কিং টাওয়ার।

‎এখানে আউট অফ সিগন্যাল নেই,

‎সৌর বিদ্যুৎ ও চন্দ্র বিদ্যুতে সগৌরবে চলে।

‎প্রিয়,

‎এত প্রিয় আমি! প্রিয় বলেই থামেনি,

‎এগিয়ে যাওয়াই জীবনের দায়।

‎কেবলই অপেক্ষা...

‎ডাকের প্রতীক্ষায়...

‎স্বেচ্ছায় কি ফিরা যায়?

‎অন্ধকারে তো আছিই;  মহা-অন্ধকার আর চাই না।

...‎আর পারি না

 

ভাঙাচেরা

আতিক আজিজ 

 

আমরা তো জন্ম থেকে পরবাসী, বেদেদের মতো তাই

দূর থেকে দূরান্তরে ভেসে-ভেসে ক্লিন্ন এই জীবন কাটাই। 

আমরা তো পরগাছা, অন্ধকারে বেড়ে উঠি খুব -একা 

অপমানে দগ্ধ হই, পাথরের মতো তবু আমাদের জীবন

সরে না-জীবন মানেই তবে এইভাবে লুকোচুরি খেলা 

সবকিছু বুঝেও বুঝি না আমি, হয়ে যাই শুধু ভাঙাচোরা। 

এখনো অনেক দূরে যেতে হবে, পাহাড়ের সংকীর্ণ রথে

উঁচু-নিচু, চড়াই-উতরাই- সেইখানে-সরু গিরিপথে

সহিংস প্রাণিদের আনাগোনা; তবুও উপায় নেই। 

মৃত্যু যার উপত্যকা, সহিংস প্রাণিদের ভয় পাওয়া 

তার জন্যে খুবই বেমানান, আমি তাই ছুটে যাই 

গিরিখাত পার হয়ে যূথবদ্ধ পাখিদের দেশে, 

যেখানে হাওয়ারা এসে উড়ে যায় গন্ধর্বের বেশে...! 

 

হাবু ও পাঁঠার গল্প

কনক কুমার প্রামানিক 

 

ষাটোর্ধ জগদীশ সরকার শুধু গায়ে গতরেই বড় হয়েছে। বুদ্ধি বলতে কোন কিছু তার মধ্যে নাই। এজন্য সারাদিন মানুষের গালমন্দ শুনতে হয় তাকে। বাড়িতে গেলেও তার শান্তি নাই ঝগড়াটে বউটা সারাদিন বক বক করতে থাকে। সবাই তাকে সারাদিন অপমান করে। এমনকি সদ্য কথা বলতে শিখেছে এরকম ছোট বাচ্চারাও তার সামনে নাচতে নাচতে এসে বলে, হাবু-গু খাবু? কিংবা, জগদীশ কাঁচা কলা ভাতে দিস, তুই না পারলে তোর বউকে দিস। ওমনি ওর রাগী বউটা ঝাঁটা হাতে তেড়ে আসে। সবাই তখন দৌঁড়ে পালায়। নিবুর্দ্ধিতার কারণে জগদীশ সরকারের নাম জগদীশ সরকার থেকে হাবু হয়ে গেছে। অত্র দু'চার অঞ্চলের লোকজন তাকে বোকার হদ্দ হিসেবে চিনে। 

ওর বৌয়ের হয়েছে যত জ্বালা। জমিদার বাড়িতে ঝিঁয়ের কাজ করে কোন রকমে সংসার চালায়। বোকা হাবু কাজকর্ম কিছুই করেনা। জমিদার বাড়ির সামনে বড় বটগাছটার সামনে ছেলে ছোকরাদের সঙ্গে কখনো ডাংগুলি কখনোবা মার্বেল খেলে। মাঝে মাঝে জমিদার বাড়ির কর্তামশায় বা গিন্নি মার ছোটখাটো ফরমায়েশ খাটে। বিনিময়ে এক-আধ বেলা আহার কিংবা দু'চার পয়সা গাঁটে জোটে। তা দিয়ে হাবু তামাক কিনে। অবসরে শান বাঁধানো গাছের নিচে বসে তুমুল ধোঁয়া উড়িয়ে হুস হুস করে তামাকে টান দেয়। 

হরিষপুর গ্রামের জমিদার বাড়ির পাশে জগদীশ সরকারের চৌদ্দ পুরুষের বাস। তার বাবা জমিদার বাড়ির জমিজমা চাষ আর ফরমায়েশ খাটতো। জগদীশ ওরফে হাবু বাবা মার একমাত্র সন্তান। সন্তান হয়না বলে কত দেবতার মানসা, কবিরাজি,তাবিজ, কবজ, শিকড় বাকড়, ওষুধ, ঝাড়ফুঁক, ওঝা, বদ্যি কোন কিছুতেই কিছু হয়না। একপর্যায়ে সন্তান হওয়ার আশাই ছেড়ে দেয় ওরা। অবশেষে শেষ বয়সে এক ফকির বাবার জল পড়ার কেরামতিতে বাবা মায়ের কোল আলোকিত করে আসে এ জগদীশ। শেষ বয়সের সন্তান বলে কথা। আদরের শেষ থাকেনা তার। মাথায় তুলে রাখবে নাকি কোলে তুলে রাখবে ভেবে পায়না তারা। এরকম ভাবে ছোটবেলা থেকে বাবা মার খুব আদর যত্নে বড় হয় জগদীশ। জগদীশের বাবা মা তাকে কোন রকম কাজকর্ম করতে দিতেন না। যদি কাজ করতে গিয়ে আঘাত পায় এই ভয়ে। এ নিয়ে পাড়া প্রতিবেশীরা জগদীশের বাবা মাকে প্রায় বলতো-

জগাকে এতো আদর তোরা দিসনে। পরে কিন্তু সামলাতে পারবি না। 

পরে পাড়া প্রতিবেশীদের কথাই অক্ষরে অক্ষরে ঠিক হয়। জগদীশের বাবা মা যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন তার ততটা সমস্যা হয়নি। বাবা মা মারা যাওয়ার পর বিপদে পড়ে যায় সে। জমিদার মশায় তার বাড়ির এক ঝিঁয়ের সঙ্গে বিয়ে দেন তাকে। 

জমিদার বাবু তাকে একদিন বললেন, "হাবু সামনে তো জমিদার বাড়ির কালীপূজোর সময় চলে আসলো। আর মাত্র কটা দিন বাকি। যোগার যন্ত করতে হবে তো। বলি দেওয়ার জন্য পাঁঠা কিনতে হবে। সামনের বিষ্যুদবার দিন পাঁঠা কিনতে হাটে যাবো, তুই আমার সঙ্গে হাটে যাবি। তুই শুধু পাঁঠাটা টেনে নিয়ে আসবি।

সম্মতিতে মনের আনন্দে সহাস্যে মাথা দোলায় হাবু। দেখতে দেখতে চলে আসে হাটবার। জমিদার মশায় ঘোড়ার গাড়িতে চেপে হাটে যায় আর হাবু নির্ধারিত দিনে অনেক আগে হাটে পৌঁছে যায়। জমিদার মশায় বড়সড় আর নাদুস নুদুস দেখে একটা পাঁঠা কিনে হাবুর হাতে দিয়ে বলেন, "তুই গাঁয়ের মধ্যেকার সোজা রাস্তা দিয়ে হেঁটে আয়। আমরা গাড়িতে আসছি।"

জমিদার মশায় হাবুকে সবকিছু সুন্দর করে বুঝে দিয়ে চলে এলেন। হাবুও কথামতো গ্রামের মেঠোপথ ধরে পাঁঠার দড়ি টেনে নিয়ে আসতে লাগলো। 

পথে সন্ধ্যে হয়ে এলো। তখনার দিন একটু সন্ধ্যা নামলেই যেন ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যেত। গা ছমছম করতো। মনে বিশাল সাহস সঞ্চার করে হাঁটতে হাঁটতে পাঁঠার দড়ি ধরে জমিদার বাড়ির সামনে উপস্থিত হলো হাবু। হাবুকে দেখে জমিদার মশায় বললেন, "কিরে হাবু পাঁঠা কোথায়?" 

হাবু তখন পেছনে তাকিয়ে দেখে পাঁঠা নাই। শুধু দড়িটা ধরে আছে সে। অন্ধকারে গলার দড়ি ঢিলে হয়ে ছুটে গেছে পাঁঠা তা ঠাঁওরই করতে পারেনি হাবু। এতো দুর রাস্তা সে  শুধু দড়ি টনে নিয়ে এসেছে। 

জমিদার মশায় হাবুর এমন কান্ড দেখে খুব রুষ্ট হলেন। আর তখন থেকে জগদীশ হয়ে গেল পার্মানেন্ট হাবু।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন