https://www.prothomalony.com/
15566
literature
.png)
মাশওয়ারা - ইসলামের অন্যতম আদব
আনোয়ার হোসাইন আশরাফী। উস্তাযুল হাদিস, জামিয়া ইসলামিয়া মেহেরপুর
মানুষ জাতিকে আল্লাহ তাআলা সামাজিক জীব হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। এক সমাজে, এক দেশে ও একই পরিবেশে বসবাস করতে গিয়ে আমরা নানাবিধ প্রয়োজনে একে অপরের কাছে সহযোগিতা চাই। ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে উদ্ভূত বহু পরিস্থিতি ও সমস্যার সমাধানে প্রায়ই আমরা কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হই। সঠিক দিশা খুঁজে পেতে কখনো বিভ্রান্ত হই, আবার কখনো ভুল সিদ্ধান্তে সমস্যাকে আরও জটিল করে ফেলি। তখন মানুষ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দিয়েছেন এক পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, দিয়েছেন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে। কঠিন ও জটিল বিষয়ে সহজ, সুন্দর ও প্রশান্তিময় সমাধানের নির্দেশনা দিয়েছেন। মাশওয়ারা— অর্থাৎ পরামর্শ, পারস্পরিক আলোচনা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ— সেইসব নির্দেশনার অন্যতম। আল্লাহ তাআলা মাশওয়ারাকে কল্যাণ ও সফলতার মাধ্যম করেছেন।
আল্লাহ তাআলা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলেন "সুতরাং তাদেরকে ক্ষমা কর, তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা কর এবং (গুরুত্বপূর্ণ) বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করো। অতঃপর তুমি যখন (কোনো বিষয়ে) সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালোবাসেন।”(সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৫৯)
নবীজি সা. আল্লাহ প্রদত্ত ওহীর দ্বারাই যেকোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম ছিলেন। তাঁর সিদ্ধান্তের বিপরীতে অন্যের মতামতের কোনো স্থান ছিল না। আল্লাহ তাআলা বলেন "আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যখন কোন ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন, তখন কোনো মুমিন পুরুষ বা মুমিন নারীর নিজের ব্যাপারে ভিন্ন মত রাখার অধিকার থাকে না।” (সূরা আহযাব, আয়াত ৩৬)
তবুও আল্লাহ তাআলা নবীজীকে সাহাবাদের সাথে পরামর্শ করার নির্দেশ দিয়েছেন। মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেন, নবীজি তাদের মতামতের মুখাপেক্ষী না হলেও পরামর্শের নির্দেশ দেওয়ার হিকমত হলো: সাহাবায়ে কেরামের অন্তরকে প্রশান্ত করা, তাঁদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা এবং দ্বীনের ব্যাপারে তাদের আরও দৃঢ় করা। যেন তারা মনে করেন, নবীজি (সঃ) মহান ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও আমাদের কথা শুনছেন এবং বিভিন্ন কাজে আমাদের সহযোগিতা গ্রহণ করছেন। তাছাড়া মদীনাবাসীর স্বভাবই ছিল পারস্পরিক পরামর্শে কাজ করা। সেই গুণের প্রশংসা করে আল্লাহ বলেন “এবং যাদের কাজকর্ম পারস্পরিক পরামর্শক্রমে সম্পন্ন হয়।” (সূরা শূরা, আয়াত ৩৮)
হযরত হাসান বসরী রহ. বলেন এই আয়াতে নবীজিকে মাশওয়ারার নির্দেশ দেওয়ার মধ্য দিয়ে মাশওয়ারার গুরুত্ব প্রকাশ করা হয়েছে এবং এটিকে ইসলামের অন্যতম আদব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নবীজি সা. বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞ সাহাবায়ে কেরামের সাথে পরামর্শ করতেন, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন এবং বাস্তবায়ন করতেন। খন্দক যুদ্ধে হযরত সালমান ফারসী রা.-এর পরামর্শে পরিখা খনন তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
মাশওয়ারার মধ্যে আল্লাহ তাআলা রেখেছেন বিশেষ বরকত। ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন “মাশওয়ারা হলো বরকত।” মাশওয়ারার বড় উপকার হলো, পরামর্শের ভিত্তিতে কাজ করলে আফসোস থাকে না; উদ্দেশ্যে সফল না হলেও মনোবল ভেঙে পড়ে না; পাশে সান্ত্বনা ও সহযোগিতার মানুষকে পাওয়া যায়। ইমাম কুরতুবি রহ. হাদিস উল্লেখ করে বলেন, নবীজি সা. বলেছেন, “যে পরামর্শ করে সে কখনো লজ্জিত হয় না, আর যে ইস্তেখারা করে সে কখনো ব্যর্থ হয় না।”
হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজি সা. বলেছেন: “যখন তোমাদের উত্তম লোক তোমাদের শাসক হবে, তোমাদের সম্পদশালীরা দানশীল হবে এবং তোমাদের কাজ পরামর্শ ভিত্তিক হবে তখন ভূমির উপরিভাগ তোমাদের জন্য ভূগর্ভের চেয়ে উত্তম হবে।” (তিরমিযি, হা. ২২৬৬)
হযরত সাহল ইবনে সাদ রাযি. বলেন, নবীজি সা. বলেছেন: কোন মানুষ মাশওয়ারা করার কারণে কখনো হতভাগা হয়নি, আর কেউ নিজের মতের উপর অটল থাকার ফলে কখনো সৌভাগ্যবান হয়নি। (মুসনাদে শিহাব, ২/৬) ।
পরামর্শদাতার গুণাবলী
মাশওয়ারা বা পরামর্শ যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ আদব। তাই যার সাথে পরামর্শ করা হবে তাকে কিছু বিশেষ গুণে গুণান্বিত হতে হবে। কেননা ভুল পরামর্শে সমস্যা সংকটে পরিণত হতে পারে। সঠিক পরামর্শে ব্যক্তির জীবন সুখের হতে পারে। তাই বিশেষভাবে যেগুলো লক্ষ্য রাখতে হবে।
০১. পরামর্শদাতা ঈমানদার ও খোদা ভীরু হওয়া
একজন মুমিনই হতে পারে প্রকৃত অর্থে পরামর্শদাতা। যার অন্তরের আল্লাহর ভয় নেই, তার দেওয়া পরামর্শে বরকত ও সফলতা লাভের আশা করা যায় না। কেননা মাশওয়ারা একটি আমানত। যার ঈমান নেই তার ভিতরে আমানতদারি নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মুসলিমগণ! তোমাদের বন্ধু তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনগণ…।” (সূরা মায়েদা, আয়াত: ৫৫)
০২. পরামর্শদাতা আমানতদার হওয়া
একজন মানুষ অন্যের প্রতি মুখাপেক্ষী হয়, নিজের সমস্যা সমাধানে উপযোগী কোন পরামর্শ লাভের আশায়। পরামর্শদাতা আমানতদার না হলে সঠিক পরামর্শ লাভের পরিবর্তে, ব্যক্তি আরো নতুন সমস্যার সম্মুখীন হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা দেখা দেয়। তাইতো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “পরামর্শদাতা একজন আমানতদার।” ( সুনানে আবু দাউদ, হা. ৫১২৮)
০৩. পরামর্শদাতা অভিজ্ঞ হওয়া
মাশওয়ারা হয়ে থাকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একটি সুন্দর সমাধান পাওয়ার জন্য। প্রকৃত উদ্দেশ্য তখনই অর্জিত হয়, যখন উক্ত বিষয়ে অভিজ্ঞ ব্যক্তির কাছে বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়। ইবনে খুওয়াইয মিনদাদ বলেন, শাসক ও নেতাদের জন্য মাশওয়ারা করা আবশ্যক। দ্বীন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলেমদের সাথে পরামর্শ করবে। যুদ্ধের বিষয়ে সেনাপ্রধান, সমাজের বিষয়ে দলপ্রধান, দেশের বিষয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সাথে পরামর্শ করবে।
০৪. পরামর্শদাতা বিজ্ঞ আলেম হওয়া
ইমাম কুরতুবি রহ. উল্লেখ করেন, পরামর্শকৃত বিষয়টি যদি দ্বীন সংশ্লিষ্ট ও শরীয়তের বিধান সম্পর্কে হয়, তাহলে পরামর্শদাতা একজন বিজ্ঞ ও বিদ্বান আলেম হওয়ার পাশাপাশি বুঝমান ও চিন্তাশীল হওয়া। অন্যথায় মাশওয়ার পরিপূর্ণ ফায়দা লাভ হবে না। (তাফসিরে কুরতুবি)
আল্লাহ তাআলা বলেন, যদি তোমাদের জানা না থাকে, তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস করো। (সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ৭)
০৫. পরামর্শদাতা সত্যবাদী, নিরপেক্ষ ও গোপনীয়তা রক্ষাকারী হওয়া
সত্য ও সঠিক পরামর্শের জায়গায় কারো দুর্বলতার সুযোগে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে ভুল পরামর্শ দেওয়া থেকে বিরত থাকা। নিরপেক্ষ ও নিষ্ঠার সাথে চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত জানানো। পরামর্শকারী থেকে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত এবং তার ব্যক্তিগত অবস্থাসহ যাবতীয় বিষয় গোপন রাখবে। অন্যের সামনে তার অবস্থা প্রকাশ না করা। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার উপর যুলম করবে না এবং তাকে জালিমের হাতে সোপর্দ করবে না। যে কেউ তার ভাইয়ের অভাব পূরণ করবে, আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন।” (সহিহ বুখারী, হাদিস ২৪৪২)
পরামর্শকারীর গুণাবলী:
০১. পরামর্শক্রমে প্রাপ্ত সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকা। আল্লাহ তাআলা বলেন, “অতঃপর তুমি যখন (কোন বিষয়ে) মনস্থির করবে, তখন আল্লাহর উপর নির্ভর করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদেরকে ভালোবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
০২. পরামর্শদাতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও আনুগত্যে অনুরাগী হওয়া।
০৩. পরামর্শক্রমে কাজ করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেলে হায় হুতাশ না করা। নিরাশ না হওয়া। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “… আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” (সূরা যুমার, আয়াত: ৫৩)
মাশওয়ার ফায়দা
০১. মাশওয়ারা আল্লাহ তাআলার পছন্দনীয় একটি ইবাদত।
০২. মাশওয়ার মাধ্যমে দলবদ্ধ কাজে পারস্পরিক সম্পর্ক ও বোঝাপড়া সুন্দর হয়।
০৩. সামাজিক কাজে নিজেদের মধ্যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার মনোভাব তৈরি হয়।
০৪. পরামর্শ করলে আশপাশ ও সংশ্লিষ্টদের মনের ভিতরে কোন ধরনের প্রশ্ন থাকে না।
০৫. মাশওয়ার মাধ্যমে চিন্তা-ভাবনার জগত প্রশস্ত ও বিস্তৃত হয়। মেধার বিকাশ ঘটে।
০৬- পরামর্শ ভিত্তিক কাজ সাধারণ ভুল থেকে মুক্ত হয়। (তাফসিরে কুরতুবি, তাফসীর ইবনে আশূর)
মানবজীবনের বিভিন্ন কার্যক্রমে মাশওয়ারার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। এটি ইসলামের অন্যতম একটি আদব। আল্লাহ তাআলার কাছে পছন্দনীয় একটি পন্থা। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের সাথে পরামর্শ করেছেন। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. তাঁর ওফাতের সময় পরবর্তীদের মধ্য হতে ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটি পরামর্শ পরিষদ গঠন করেছিলেন। আমাদের প্রতিটি কাজ হোক মাশওয়ারার মাধ্যমে সুন্দর ও সুসংগঠিত এবং আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও নির্ভরতার গুণে পরিপূর্ণ। আমীন।
(2).png)
দোয়া মুসলমানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র
লেখক: আবদুল্লাহ শুয়াইব ছাত্র, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম।
মানবজীবন এক অবিরাম যাত্রা, যা সুখ ও দুঃখ, আশা ও হতাশা, সাফল্য ও ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে এগোয়। আমরা চেষ্টা করি, সংগ্রাম করি, পরিকল্পনা করি, জ্ঞান অর্জন করি, ধন-সম্পদ সংগ্রহ করি এবং মানুষের সহায়তা আশা করি। তবু একটি গভীর সত্য আমরা অনুধাবন করি, মানুষের শক্তি সীমিত, তার সক্ষমতার সীমানা আছে। কতই না জ্ঞান, ধন বা সহায়তা থাকুক, কিছু কিছু মুহূর্তে নিজের সীমাবদ্ধতা মানুষকে বোঝায়। সেই সময়ই প্রকৃত শক্তি অনুধাবন হয়, একটি অদৃশ্য অথচ পরম শক্তির ওপর নির্ভরতা ছাড়া শান্তি ও স্থিরতা অর্জন করা সম্ভব নয়। ইসলাম সেই নির্ভরতার নাম দিয়েছে দোয়া।
দোয়া শুধু চাওয়ার প্রক্রিয়া নয়; এটি বান্দা ও আল্লাহর মধ্যকার অন্তরঙ্গ সম্পর্কের এক অটুট সেতু। এটি আত্মার গভীর আবেগ, হৃদয়ের নীরব আর্তি এবং বিশ্বাসের সর্বোচ্চ প্রকাশ। যখন একজন মানুষ অবলম্বনের শেষ সীমায় পৌঁছায়, যখন প্রচেষ্টা, জ্ঞান, সম্পদ বা মানুষের সহায়তা যথেষ্ট মনে হয় না, তখন দোয়া অন্তরকে আলোকিত করে, আশা জাগায় এবং সাহস যোগায়।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের স্পষ্টভাবে বলেন: তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। (সূরা গাফির, আয়াত ৬০) । রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেন: দোয়া ইবাদতের মূল। (তিরমিযী, হাদিস ৩৫৪৯) ।
এই আয়াত ও হাদিস আমাদের শেখায় যে দোয়া কেবল প্রয়োজন প্রকাশ নয়; এটি ঈমানের প্রকাশ, ভরসার চূড়ান্ত রূপ, আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। যে বান্দা বেশি দোয়া করে, সে আল্লাহর নৈকট্যকে অধিকতর অনুভব করে এবং প্রিয় হয়ে ওঠে।
ইতিহাস আমাদের দেখায়, নবীগণের জীবনে দোয়ার শক্তি কতটা কার্যকর। নবী ইউনুস (আ.) যখন সমুদ্রের গভীরে মাছের পেটে বন্দী ছিলেন, তিনি দোয়ার মাধ্যমে মুক্তি পেয়েছিলেন (সূরা সাহাফ, ৮৭)। নবী ইব্রাহিম (আ.) যখন জ্বলন্ত আগুনে ফেলে দেওয়া হয়েছিলেন, দোয়া ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের কারণে আগুন তার জন্য শান্তি ও নিরাপত্তার মাধ্যম হয়ে উঠেছিল (সাহিহ বুখারি ৩৮২৪, সহিহ মুসলিম ২৩৭৯)। নবী মুসা (আ.) যখন ফেরাউনের শক্তিশালী বাহিনীর মুখোমুখি ছিলেন, দোয়ার মাধ্যমে তিনি সাহস পেয়ে বিপদকে জয় করেছিলেন। এই ঘটনাগুলো আমাদের শেখায়, যে দোয়া কেবল মনোবল জাগায় না, বরং আল্লাহর অনুগ্রহে বাস্তব জীবনেও পরিবর্তন আনে।
দোয়া মানুষকে তিন ধরনের কল্যাণ দেয়। প্রথমত, আল্লাহ দোয়া কবুল করেন, যা আমরা চাই তার মতো। দ্বিতীয়ত, দোয়ার বিনিময়ে কোনো বড় বিপদ দূর করা হয়। তৃতীয়ত, দোয়া কিয়ামতের দিনে অগণিত নেকি হিসেবে জমা হয়। অতএব, একজন মুমিন কখনো দোয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।
দোয়ার সর্বোচ্চ প্রভাব পেতে কিছু আদব পালন করা জরুরি। দোয়া শুরু করা উচিত আল্লাহর প্রশংসা এবং রাসূল (সঃ)-এর ওপর দরুদ পাঠের মাধ্যমে (সাহিহ মুসলিম, হাদিস ৪০৫)। এরপর দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে প্রার্থনা করতে হবে যে আল্লাহ তা অবশ্যই শুনবেন। দোয়া শুধু বিপদে নয়, সুখের মুহূর্তেও করতে হবে। হালাল রিজিক সচেতনভাবে গ্রহণ করা উচিত। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ফলাফল না পেলেও ধৈর্য্য হারানো যাবে না। কারণ আল্লাহর রহমত শুধুমাত্র তাদের মধ্যে নেমে আসে যারা পরীক্ষার মুহূর্তেও স্থির থাকে (সূরা বাকারাহ, আয়াত ২৮৬)।
দোয়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হওয়া উচিত। নামাজের পরে, তাহাজ্জুদের সময়, আনন্দের মুহূর্তে বা দুঃখের সময়ে দোয়া করা উচিত। কারণ মানুষ ক্লান্ত হলে মানুষ তাকে ছেড়ে দিতে পারে, কিন্তু মুমিন ক্লান্ত হলে আল্লাহ তাকে নিজের দিকে টেনে নেন। দোয়া হলো এমন এক অস্ত্র, যা কারও ক্ষতি করে না; বরং যে এটি ব্যবহার করে তাকেই শক্তি দেয়, রক্ষা করে এবং আশার আলো দেখায়। দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সাফল্যের দরজা খুলে দেয় দোয়া।
যার পাশে দোয়ার শক্তি আছে, তাকে কোনো পরাজয় জয় করতে পারে না। কারণ দোয়ার সঙ্গে থাকা মানেআল্লাহর সান্নিধ্য সঙ্গে থাকা। দোয়া মানে এক অন্তরঙ্গ আলাপ, যেখানে অন্তরের আর্তি আল্লাহর কাছে পৌঁছে, চোখের জল ও নীরব ব্যথা শোনার মতো কেউ নেই। দোয়া হলো মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি, সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়, এবং জীবনের প্রতিটি পরীক্ষায় সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযাত্রী।
(1).png)
সালাম দিয়ে শুরু হোক হারানো সম্পর্ক
লেখক: মিনহাজ উদ্দীন নাফিজ। কো-অর্ডিনেটর, আফটার স্কুল লার্নিং কুরআন ও ইসলামিক স্টাডিজ, আল-মাগরিব ইন্টারন্যাশনাল স্কুল।
একসময় আমাদের সমাজে প্রতিবেশী মানে ছিল কেবল পাশের বাড়ির মানুষ নয়; তারা ছিল পরিবারেরই বিস্তৃত রূপ। দূরের আত্মীয়ের চেয়ে পাশে থাকা মানুষটাই প্রায়শই বেশি আপন মনে হতো। সংকটের সময় তারা প্রথম এগিয়ে আসত, আনন্দের সময়ে তাদের উপস্থিতি স্বাভাবিক এবং ঘনিষ্ঠ ছিল। যে ঘরের দরজা বন্ধ থাকলেও হৃদয়ের দরজা খোলা থাকত। প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখ, খোঁজ-খবর, হাসি-আনন্দ, সবকিছুই একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি হতো। এক কাপ চায়ের জন্য, একসাথে খেলাধুলার জন্য, ঈদ বা জন্মদিনের আয়োজনের জন্য সবাই একে অপরের পাশে দাঁড়াত। ছোট ছোট মুহূর্তগুলো সমাজে উষ্ণতা এবং ঘনিষ্ঠতার বীজ বপন করত।
কিন্তু আজ আমাদের চারপাশের দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। বাড়ি আছে, মানুষ আছে, প্রযুক্তি আছে, নিরাপত্তার সব ব্যবস্থা আছে, কিন্তু সম্পর্ক নেই। আমরা জানি না পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে, কার ছেলে বা মেয়ে কোন স্কুলে পড়ে, কার ঘরে অসুস্থ কেউ আছে কি না। এমনকি পরিচিত মানুষকেও শুভেচ্ছা জানাতেও সময় বের করা হয় না। আজকের ব্যস্ত জীবন, প্রযুক্তির ঘূর্ণায়মান জগৎ, নিরাপত্তাহীনতার মানসিক চাপ—এসবই আমাদের হৃদয়ের দেয়াল উঁচু করছে। একসময় যেখানে হাসি, আলাপ-আড্ডা, ছোটখাটো সাহায্য এবং একে অপরের প্রতি দয়া ছিল, আজ সেখানে শুধু নিঃশব্দ, একাকীত্ব এবং দূরত্ব দেখা যায়।
সমস্যার মূল কারণগুলোও সহজ। মানুষের ব্যস্ততা,অফিস, পড়াশোনা, প্রযুক্তি সবকিছুই সময় চুষে নিচ্ছে। মানুষ সময় দিতে পারছে না, সম্পর্ক গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময়। সময় না দিলে সম্পর্কের উষ্ণতা শুকিয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তির প্রভাব। সোশ্যাল মিডিয়া মানুষকে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত রাখলেও বাস্তব জীবনের সংযোগ কমিয়ে দেয়। আমরা অনলাইনে শত বন্ধু পাই, কিন্তু পাশের দরজায় থাকা অসুস্থ বৃদ্ধের খবর রাখার সময় নেই। তৃতীয়ত, নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি। অপরিচিত মানুষের সঙ্গে মিশলে ঝামেলা হতে পারে, এমন মনোভাব মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়। চতুর্থত, শিশুদের সামাজিক মেলামেশার অভাব। একসময় খোলা মাঠে ছেলে-মেয়েরা একসাথে খেলত, পরিবারগুলো পরিচিত হতো। আজ মাঠ কম, বিল্ডিং বেড়েছে, শিশু স্ক্রিনের সামনে বেশি সময় কাটাচ্ছে, ফলে সম্পর্ক গড়ে ওঠার পথও সংকুচিত। পঞ্চমত, সামাজিক প্রতিযোগিতা ও তুলনা। কার গাড়ি, বেতন, সন্তান এসব নিয়ে অহেতুক প্রতিদ্বন্দ্বিতা মানুষকে একে অপরের থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, সহমর্মিতার জায়গা খালি করে দেয়।
ইসলাম আমাদের শেখায়, প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হওয়া ঈমানের অঙ্গ। নবী (সঃ) বলেছেন: “জিবরাইল আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে এতবার উপদেশ দিলেন যে আমি ভাবলাম তিনি তাকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবেন।” (সহিহ বুখারি: ৬০১৪, সহিহ মুসলিম: ২৬২৫) । এছাড়া তিনি বলেছেন: “সে মুমিন নয়, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।” (সহিহ বুখারি: ৬০১৬)
অর্থাৎ, প্রতিবেশীর প্রতি সদয় আচরণ কেবল সৌজন্য নয়; এটি ঈমানের প্রকাশ। কোরআনেও বলা হয়েছে:“আল্লাহকে সহ, পিতামাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, দরিদ্র, প্রতিবেশী- প্রতিবেশী যার কাছাকাছি রয়েছে এবং যাত্রী এদের প্রতি সদয় হও।” (সূরা নিসা, আয়াত: ৩৬)
হারানো সম্পর্ক ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন শুধু ছোট ছোট পদক্ষেপ। একটি সালাম দিয়ে শুরু করা যায় এই ছোট অভিবাদনই বরফ গলানোর প্রথম চাবি। অসুস্থতা বা বিপদে খোঁজ নেওয়া, রান্না ভাগ করে দেওয়া, ছোট উপহার দেওয়া, শিশুদের একসাথে খেলতে উৎসাহ দেওয়া, এসব ছোট ছোট কাজই সমাজকে আবার পরিবারের মতো করে তুলতে পারে। মহল্লায় ঈদ উপলক্ষে কুশল বিনিময়, সামান্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ, কমিউনিটি মিটিং বা কুরআন পাঠ, এসব সামাজিক উদ্যোগও হারানো উষ্ণতা ফিরিয়ে আনে।
নবী (সঃ) বলেছেন:“যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীর প্রতি সদয়, আল্লাহ তার প্রতি সদয় হবেন।” (সুনান আবু দাউদ, ৫১২৪)
আজকের শহুরে জীবন আমাদের শেখাচ্ছে যে দেওয়াল নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন, কিন্তু সম্পর্ক ও উষ্ণতা মানবতার জন্য অপরিহার্য। পাশের ঘরের মানুষ কেবল পাশের মানুষ নয়; তিনি আমাদের শান্তি, নিরাপত্তা, সহমর্মিতা এবং মানবিকতার অংশ। আমরা যদি প্রথম সালামটি দিই, দরজা খুলে একটু সময় দিই, মন খুলে খোঁজ নিই, ইনশাআল্লাহ হারানো উষ্ণতা ফিরে আসবে।
ছোট ছোট প্রচেষ্টা একটি হাসি, একটি সালাম, একটি খোঁজ সমাজকে আবার মানবিক ও উষ্ণ করে তুলতে পারে। ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী অন্যের প্রতি সদয় হলে আল্লাহও আমাদের প্রতি দয়া করবেন।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন