https://www.prothomalony.com/
15563
literature
সঙ্গীত হলো ধ্বনির এক সুশৃঙ্খল ও শৈল্পিক রূপ, যা মানব জীবনে আনন্দ, গভীর অনুভূতি ও মানসিক প্রশান্তি এনে দেয়। প্রেম, দুঃখ, কিংবা অনুপ্রেরণার মতো সূক্ষ্ম আবেগ প্রকাশের পাশাপাশি সঙ্গীত আমাদের মন ভালো রাখতে ও মানসিক চাপ কমাতেও বিশেষ ভূমিকা রাখে। সঙ্গীতের এই বিশাল জগতে, কীবোর্ড এমন এক যন্ত্র, যা তার বহুমাত্রিক সুর ও শব্দ-বৈচিত্র্যে যেকোনো সঙ্গীতায়োজনকে প্রাণবন্ত ও সমৃদ্ধ করে তোলে।
কীবোর্ড বাদক বা কীবোর্ডিস্ট হলেন সেই শিল্পী, যিনি এই যন্ত্রের মাধ্যমে সুরের এক অনন্য জগৎ তৈরি করেন। একসময় কেবল পিয়ানোবাদক বা অর্গানবাদক হিসেবে পরিচিত হলেও, ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে সিন্থেসাইজার ও ডিজিটাল যন্ত্রপাতির বিপ্লবে "কীবোর্ডিস্ট" শব্দটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।বর্তমানে একজন পেশাদার কীবোর্ডিস্ট সাধারণত পিয়ানো, টোনহুইল অর্গান, সিন্থেসাইজার, ক্ল্যাভিনেট-এমন বহু ধরনের যন্ত্র বাজাতে পারদর্শী হন।
আমরা জানি, ব্যান্ড শোতে কীবোর্ডিস্টের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমুখী। তাঁরা বিভিন্ন ধরনের সাউন্ড, কর্ড ও টেক্সচার যোগ করে গানকে এক নতুন গভীরতা দেন। কখনো একক সুর বাজিয়ে, কখনো সাউন্ড এফেক্ট, আবার কখনো ব্যাকগ্রাউন্ড হারমোনি তৈরি করে তাঁরা ব্যান্ডের সামগ্রিক সুরকে সমৃদ্ধ করেন। অনেক কীবোর্ডিস্ট আবার গান তৈরি এবং লাইভ শোতে পুরো সঙ্গীতায়োজনকে প্রাণবন্ত করে তোলার পেছনেও মূল কারিগর হিসেবে কাজ করেন।
আজ শিল্পঘর পাতায় আমরা পরিচিত হব বাংলাদেশের দুইজন গুণী কীবোর্ডিস্ট-রাজীব হাসান ও রনি চৌধুরী-এর সৃষ্টির জগৎ এবং তাঁদের সঙ্গীত-যাত্রার গল্পের সঙ্গে। কীবোর্ডের পর্দায় তাঁদের আঙুলের জাদু কীভাবে বাংলা গানকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, সেই কথাই বলবে 'শিল্পঘর'-এর আজকের বিশেষ উপস্থাপনা।
ধন্যবাদান্তে,
রোকেয়া দীপা
গান এবং সুর টাইম মেশিনের মত কাজ করে-কীবোর্ডিস্ট রাজিব হাসান
পরিবারের সঙ্গীতপ্রেম, অনুকূল পরিবেশ এবং সাংস্কৃতিক প্রেরণা একজন ব্যক্তির মধ্যে সঙ্গীতচর্চার ভিত্তি তৈরি করে। রাজিব হাসানের মিউজিকের প্রতি প্রাথমিক আগ্রহটা শুরু পরিবার থেকেই। তার মা গান করতেন আধুনিক সংগীত এবং ক্লাসিক্যাল। বাবা হাওয়াইয়ান গিটার বাজাতেন। তার আগে রাজিবের নানা গজল গাইতেন। পারিবারিকভাবে সংগীতের প্রতি ভালবাসাটা সবসময়ই ছিল, সেই পরিবেশ থেকেই তার সংগীতের প্রতি ভালোবাসার জন্ম নেয়।
স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রাজিব হাসান গানে অংশগ্রহণ করেছেন সেগুলো মূলত দলীয় সংগীত এর পর্যায়ে পড়ে।এরপর হাই স্কুলের পর্ব শুরু হতে বাংলাদেশের জোয়ার আসে ব্যান্ড সংগীতের সেই ৯০ এর দশকে।
রাজিব জানান, ব্যান্ড মিউজিক তাকে সবসময় কাছে টানতো এবং সেই ধারার সংগীতকে ভালোবেসেই মিউজিক শুরু করা। স্কুলের বন্ধু জাহিনের কাছে প্রথম ড্রামস শেখা দিয়ে শুরু। তারপরে সুইট ড্রিমস নামে একটা লোকাল ব্যান্ড জয়েন করেন তিনি এবং রাজশাহী শহরের লোকাল শো' থেকে শুরু। পরবর্তীতে নিজের গান গাওয়ার আগ্রহ থেকে গিটার শেখা মূলত নিজের চেষ্টায়। তিনি বিশিষ্ট মিউজিশিয়ান মাকসুমুল হুদা বাড্ডু ভাইয়ের কাছ থেকেও অনেক কিছু শিখেছেন।
রাজিব বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার সময় নিজের ব্যান্ড onyx গঠন করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে পারফর্ম করতে শুরু করেন। তিনি বলেন, "এ ব্যাপারে আমাকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করেন আমার মেজো ভাই রনি-যিনি নিজেও গান করতেন এবং হারমোনিকা বা মাউথ অর্গান বাজাতেন।"
আমেরিকা আসার পর থেকে শুরু হয় রাজিবের কীবোর্ড বাজানোর চেষ্টা। বাংলাদেশি এবং ভারতীয় কমিউনিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কিবোর্ড বাজানোর সুযোগ হয় তার, এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানে পারফরমেন্স করেছেন সলিল চৌধুরীর সুযোগ্য কন্যা অন্তরা চৌধুরীর সাথে। তারপরে বলিউডের প্রখ্যাত গায়িকা কবিতা কৃষ্ণমূর্তির সাথে সঙ্গত করেছেন। বাংলাদেশ ও ভারতের অন্যান্য অনেক শিল্পীর সাথে কিবোর্ড বাজানো ছাড়াও সাউন্ডের কাজ করেছেন তিনি।
পারিবারিক প্যাশন ছাড়াও তার নিজের একটা প্রোফেশন আছে। রাজিব জানান, তিনি নিউ ইয়র্ক সিটির ইউটিলিটি কোম্পানি, কন-এডিশনে এ প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত আছেন। তবে, প্রফেশনের বাইরে পুরোটা সময়েই তিনি মিউজিকের পিছনে ব্যয় করেন।
তিনি বলেন, "নিজের গানের জন্য না, বরং ভালো শিল্পীর গান প্রমোট করাই আমার উদ্দেশ্য।"
সংগীতের ব্যাপারে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব ছিল বলে তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত থেকে অনেকটা দূরেই ছিলেন। শুরুটা হয়েছিল ব্যান্ড সঙ্গীত দিয়ে। রাজিব বলেন, "আমেরিকা আসার পর অনেক শিল্পীর সাথে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়। ওয়েস্টার্ন এবং ইস্টার্ন মিউজিক নিয়ে একসাথে ফিউশন করার ভাবনা তখন থেকেই। ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গীতের সাথে ওয়েস্টার্ন বাদ্যযন্ত্রের মিশ্রণের এই ধারা অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে হয়ে আসছে। আমি নিজের মতো করে চেষ্টা করে "আর্টল্যাবে'র মতো প্ল্যাটফর্ম শুরু করি। শ্রদ্ধেয় লাকি ভাই অসুস্থতার সময়ে চিকিৎসার জন্যে একটা ফান্ড রেইজার প্রোগ্রাম করেন। নিউজার্সির অনেক শিল্পীই এগিয়ে আসেন। পরে দেখলাম, 'আর্টল্যাব' গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। তখন ভিন্ন আঙ্গিকে ফোক গানগুলো ওয়েস্টার্ন মিউজিক দিকে করার কথা ভাবা হয়।"
রাজিব জানান, আর্টল্যাব এপার বাংলা এবং ওপার বাংলার বিশিষ্ট শিল্পীদেরকে ফিচার করা ছাড়াও শিশু শিল্পীদেরকে নিয়ে অনুষ্ঠান করে থাকে। রাজিব এবং শোভনের নেতৃত্বে আর্টল্যাব গতবছর ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। প্রতিবছর আর্টল্যাব এর কনসার্টে শিশু শিল্পীদের অংশগ্রহণ থাকে। সে অনুষ্ঠানগুলোতে তরুণ শিল্পীদের অনেক আগে থেকে গ্রুমিং করা হয়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিশু শিল্পীদের পারফর্ম করা গানগুলোর মধ্যে ইমাজিন, দ্য ওয়াল, উইন্ড অফ চেঞ্জ, উল্লেখযোগ্য।
রাজিব হাসান দেশ–বিদেশের নানা গুণীশিল্পীর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকেই মিউজিসিয়ান ফ্রেন্ড শোভনের সাথে গড়ে তুলেছেন নিজেদের ব্যান্ড 'S&R and Friends'। এপার বাংলা-ওপার বাংলার শিল্পী এবং মিউজিশিয়ানদের নিয়ে একসাথে কাজ করার সুবাদে মিউজিকের সাথে জড়িত সবাই তাদের বন্ধু। ফ্রেন্ডস নামটা সেখান থেকেই আসা। বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তান সব দেশেরই প্রেজেন্টেশন আছে ওনাদের ব্যান্ডে। বাপ্পা মজুমদার, তনিমা হাদি, চন্দন ভাই, ইন্ডিয়ান সাইড থেকে রূপঙ্কর, শুভমিতা, লোপা, অন্তরা এদের সবার সাথে কাজ করে অভিজ্ঞতা হয়েছে তার।
কবিতা কৃষ্ণমূর্তির সাথে গান করার সময় এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা হয়েছে-বলে জানান রাজিব। তিনি বলেন, "আমাদের সাথে 'আর্টল্যাব'-এ যারা গান করেন তাদের অনেকেই শান্তি নিকেতন এবং কোলকাতার ভালো প্রতিষ্ঠান থেকে গান শিখে এসেছেন।"
'আর্টল্যাব' প্ল্যাটফর্মটির কার্যক্রমে থাকে-বিভিন্ন সমাজসেবামূলক উদ্যোগ, ফান্ড রেইজিং, বিভিন্ন শিল্পীদের প্রতিভা খুঁজে বের করা এবং নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
রাজিব বলেন, "আর্টল্যাব-এ গানের ক্রিয়েটিভিটি ছাড়াও অনেকগুলো এভিনিউ আছে। প্যান্ডামিকের বিষণ্ণ সময়ে আর্টল্যাবের একটা গ্রুপ পুরো উত্তর আমেরিকা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা শিল্পীদের নিয়ে একটা ফিচার করে। গান ছাড়াও আড্ডা হতো, কিছু সেলিব্রিটি শিল্পীদেরও যোগ করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকেও অনেক শিল্পী জড়িত হয়েছিলেন। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট যখন বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলতে যায় তখন আমরা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে উদ্বুদ্ধ করার জন্যে একটা গান তৈরি করি। টিভি চ্যানেলের অনুরোধে বৈশাখী গানও করেছিলাম। পরবর্তীতে আমরা বাংলাদেশের বন্যার্তদের সাহায্যের জন্য গান করে ফান্ড রেইজ করেছি।"
রাজিবের পছন্দের ইন্সট্রুমেন্ট গুলোর মধ্যে আছে korg a arranger কিবোর্ড, PA700, PA5x-ইত্যাদি। এছাড়া Yamaha Motif ও Roland XP80 ও বাজাতে ভালোবাসেন তিনি।
রাজিব জানান, তিনি তার ব্যান্ড মেম্বারদের নিয়ে নিয়মিত অনুশীলন করেন। এই মুহূর্তে ব্যান্ডের লাইনআপে রাজীব, শোভন , সাকিব, ড্যানি, নাঈম , পিয়াল, এরা সবাই কাজ করছেন একসাথে। 'এস এন আর ব্যান্ড' এর মধ্যে বেশ কিছু পারফরমেন্স শেষ করেছেন, তার মধ্যে নিউ জার্সিতে তাহসানের জন্য ওপেন করা এবং ফিলাডেলফিয়াতে নগর বাউল জেমস এর জন্য ওপেন করা অনুষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্য।
রাজিব বলেন, "আর্টলাভ' স্টুডিওতে এসএনআর-এর নতুন কিছু গানের কাজ চলছে খুব শিগগিরই সেগুলো সোশ্যাল মিডিয়াতে আসবে।"
রাজিব হাসানকে নিজস্ব বা একক গানের ব্যাপারে নর্থ আমেরিকার যিনি সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট করেছেন তিনি হচ্ছেন স্টুডিও গান-বাজনার হেলাল। হেলালের সঙ্গীত আয়োজনে এ যাবত বেশ কয়েকটি গান উপহার দিয়েছেন। সম্প্রতি হেলালের স্টুডিওতে 'মাঝি' নামে একটি গানের কাজ চলছে, খুব শীঘ্রই মিউজিক ভিডিও রিলিজ করা হবে।
রাজিব জানান, তার গাওয়া বেশিরভাগ মৌলিক গানগুলোই তার নিজের লেখা। এছাড়া অন্য গীতিকারের লেখা গান তিনি গেয়েছেন। মিউজিক ভিডিও প্রডিউস করেন তিনি। তার ডিরেকশনে প্রডিউস করা মিউজিক ভিডিও এর আগে গান বাংলা চ্যানেলসহ অন্যান্য টিভি চ্যানেল থেকেও সম্প্রচারিত হয়েছে বলে জানান তিনি।
রাজিব হাসান বলেন, "আমি বিশ্বাস করি, এক একটি গান এবং সুর মানুষের জীবনে টাইম মেশিনের মত কাজ করে। এইগুলো আপনাকে কোন বিশেষ মুহূর্তে পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে, যেমন-অতীতে ফেলে আসা কোন স্মৃতি বা কোন শিক্ষা বা কারো উপস্থিতি অথবা অনুপস্থিতি গানে গানে ফিরিয়ে নিয়ে আসে-অনেকটা টাইম ট্রাভেল করার মতো। মিউজিকালি গানের মাধ্যমে আমরা অনেক কষ্টের অনুভূতি থেকে পরিত্রাণ পেতে পারি এক ধরনের হিলিং এবং নিজস্ব একটা জগৎ তৈরি করতে পারি যেখানে অবসাদগ্রস্ত হলে আমরা তার শরণাপন্ন হতে পারি।"
এ ব্যাপারে তার পছন্দের উক্তিটি হচ্ছে, বব মার্লির "when music hits you feel no pain!"
তিনি বলেন, "সঙ্গীতের মাধ্যমেই সবার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা এবং সবাইকে ছুঁয়ে যাওয়া সহজ হয়, সংগীতের কোন বর্ডার নেই আলাদাভাবে কোন ভাষা নেই। সংগীতই একটি মনকে আরেকটি মনের সাথে সংযুক্ত করার ভাষা। সেই সংগীতের মাঝে সব সময় সম্পৃক্ত থেকে গান করে যেতে চাই এবং ভালো শিল্পীদেরকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। সুস্থ সঙ্গীতের চর্চা করতে চাই, ভালো গানের সাথে থাকতে চাই।"
কীবোর্ডিস্ট রনি চৌধুরীর গল্প
রনি চৌধুরীর শৈশব থেকেই সঙ্গীত তার জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে। কাওসার আহমেদ চৌধুরী, সামিনা চৌধুরী, ফাহমিদা নবী, পঞ্চম এবং প্রয়াত সাবা তানির মতো শিল্পীদের আত্মীয় হতে পারা তার কাছে বিশাল এক আশীর্বাদ ছিল মনে করেন তিনি। এতগুলো প্রতিভার কাছাকাছি বেড়ে ওঠা আর ছোটবেলা থেকেই রমেল আলী ও রাসেল আলী ওয়ারফেইজ এর মতো সংগীতশিল্পীদের প্র্যাকটিস দেখার সুযোগ-এগুলো তার নিজের সঙ্গীতযাত্রার জন্য এক অসাধারণ ভিত্তি তৈরি করেছিল বলে জানান রনি চৌধুরী।
রনি চৌধুরী বলেন, "ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডের সঙ্গীতচর্চার পরিবেশ, আর সেই সময়কার রেইনবো মিউজিক স্টোর আমার সঙ্গীত আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। ওয়ারফেইজের প্র্যাকটিস শুনতে যাওয়া থেকে শুরু করে নিজের ব্যান্ড ক্যাডেন্স তৈরি করা এবং কীবোর্ড বাদক হিসেবে পথচলা, এসব অনুপ্রেরণা থেকে কাজে পরিণত হওয়ার এক চমৎকার গল্প হয়ে উঠেছিল।"
বাংলাদেশ জুড়ে ট্যুর করতে করতে শ্রোতাদের সঙ্গে যে সংযোগ তৈরি হয়েছিল, সেটাই তার লাইভ পারফরমেন্সকে আরও শক্ত করেছিল। নিজের ব্যান্ডের গান রেকর্ড করার সিদ্ধান্ত ছিল তাদের সৃষ্টিশীলতাকে স্থায়ীভাবে ধরে রাখার একটি বড় পদক্ষেপ।
রনি চৌধুরী বলেন, "মাকসুদ জামিল মিন্টু ও টুলু ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা ক্যাডেন্সের সাউন্ড ও দিকনির্দেশনা গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিল। আমার প্রথম অ্যালবাম মুশু ভালো সাড়া পেয়েছিল। এরপর আমরা উইনিং, এল আর বি ও নিলয় দাসের মতো কিংবদন্তি ব্যান্ডের সঙ্গে পারফর্ম করার সুযোগ পেয়েছিলাম।"
ঠিক দ্বিতীয় অ্যালবাম রেকর্ডিংয়ের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নেন রনি চৌধুরী-যা তার জীবনের এক কঠিন ও মিশ্র অনুভূতির মুহূর্ত ছিল। সফল ব্যান্ড, চলমান প্রজেক্ট, আর নিজের জগতকে রেখে এক নতুন জীবনের পথে যাত্রা সহজ ছিল না তার জন্য।
যুক্তরাষ্ট্রে এসে অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভারসিটিতে কম্পিউটার সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া আর সঙ্গে সঙ্গীতচর্চা ধরে রাখা ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। সীমিত মিউজিশিয়ান পাওয়ার কারণে সঙ্গীতচর্চা কঠিন হয়ে উঠেছিল। তবুও ১৯৯৮ সালে তিনি রেইন্স নামে অ্যারিজোনার একটি ব্যান্ডে যোগ দেন। ভালো লিড গিটারিস্ট না থাকলেও ড্রাম, বেস, রিদম এবং ভোকাল নিয়ে তারা স্থানীয়ভাবে শো করত, এমনকি অ্যারিজোনার বাইরে গিয়েও পারফর্ম করেছেন। বছরে দুই-তিনটি শো হতো।
২০০০–২০১৭ সালে তিনি সামিনা চৌধুরী, এস আই টুটুলের মতো শিল্পীদের সঙ্গে বাজানোর সুযোগও পান। নিয়মিত প্র্যাকটিসের অভাব অবশ্যই তার দক্ষতায় প্রভাব ফেলেছিল বলে জানান তিনি।
প্রায় সাত বছর আগে তারা সাদার্ন ব্রিজ নামে আরেকটি অ্যারিজোনা ব্যান্ড তৈরি করেন। স্থানীয় বাঙালি ও আমেরিকান মিউজিশিয়ানদের নিয়ে নতুনভাবে সঙ্গীতে ফিরে আসার যাত্রা শুরু হয়।
২০১৯ সালের বড় ইভেন্টটি তার জীবনের বিশেষ স্মৃতি বলে জানান। রনি চৌধুরী বলেন, "সামিনা আপা তখন আমার বাসায় এক সপ্তাহ ছিলেন, তিনি আমাকে প্রতিনিয়ত উৎসাহ দিতেন। বলতেন, 'তোর হাত ভালো, কিন্তু প্র্যাকটিস করিস না।' তিনি সকাল সকাল আমাকে উঠিয়ে নিয়ে নিজের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্র্যাকটিস করাতেন। সেদিনগুলোর পর থেকেই আমি আবার সিরিয়াসলি কীবোর্ড প্র্যাকটিস শুরু করি। কোভিডের সময়ও আমি রমেল আলীর সঙ্গে অনলাইনে নিয়মিত প্র্যাকটিস করেছি।"
এরপর তাদের ব্যান্ড এলিটা করিম, অনুভবের ভাবনা ভাই, এবং স্ট্রিং ব্যান্ডের তুষার ভাইয়ের সঙ্গে পারফর্ম করার সুযোগ পায়। রমেল খান ভাই ফিডব্যাক, এস আই টুটুল ভাই, সামিনা আপা, অনিলা চৌধুরী, ঋতুপর্ণা ব্যানার্জি, চন্দন ভাই উইনিং, এদের সঙ্গেও বাজানোর সুযোগ পান।
রনি চৌধুরী বলেন, "সামিনা আপা, ফাহমিদা আপা, রমেল আলী, তুষার ভাই, টিপু ভাই অবস্কিওর, বিপ্লব ভাই প্রমিথিউস, রমেল ভাই, এই মানুষগুলো আমার সঙ্গীতজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছেন।"
পেশাগতভাবে রনি চৌধুরী একজন কম্পিউটার সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার এবং বর্তমানে সরকারের জন্য কাজ করছেন। সঙ্গীত করেন শুধুমাত্র আনন্দের জন্য। এখন তার নিজের ব্যান্ড ছাড়াও নিয়মিত রমেল ভাইয়ের সঙ্গে বাজান। তার কাছ থেকেই তিনি অনেক কিছু শিখেছেন, বিশেষ করে ফিডব্যাক এবং অন্যান্য ব্যান্ডের কাভার সঠিকভাবে বাজানো। সুযোগ পেলে তিনি এস আই টুটুল ভাই, সামিনা আপা, বিপ্লব ভাইদের সঙ্গেও বাজান। সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার বাংলাদেশি ব্যান্ড ফ্রিডম এজ এর সঙ্গেও বাজানো শুরু করেছেন।
রনি চৌধুরী বলেন, "আমার হয়তো বড় কোনো সঙ্গীত ক্যারিয়ার নেই, তবে যেদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাজাই, সেদিন যে আনন্দ পাই, সেটাই আমার আসল প্রাপ্তি।"
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন