https://www.prothomalony.com/
15551
literature
প্রতিটি দিন শেষ করতে গিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের হিসাব লিখতে লিখতে ভীষণ ক্লান্তি চলে আসে। আজও একটি কোয়াডকপ্টার ছয় বছরের একটি শিশুর পায়ে দু’বার গুলি করেছে। গাজা শহরের একটু উত্তরে একটি বড় বিস্ফোরণে এক কিশোরের মারাত্মক ও আর কখনো ঠিক না হওয়ার মতো মস্তিষ্কে আঘাত লেগেছে। আজ আরও অনেকে নিহত বা আহত হয়েছে।
বোমা পড়ছে, আর শিশুরা খেলছে, হাসছে। এখানকার বাস্তবতা এভাবেই স্বাভাবিক করে নেওয়া হয়েছে।
দুয়া—আমার সবচেয়ে প্রিয় রোগী। চৌদ্দ বছর বয়সী এই মেয়েটি ভয়াবহ বিস্ফোরণজনিত আঘাত নিয়ে আইসিইউতে ছিল। সে ধীরে ধীরে ভালো হচ্ছে। আজ সে একটু চকলেট দুধ খেতে পারবে—এই জন্য সে গত কয়েক দিন ধরেই আমাকে অনুরোধ করছিল। তাই আমি রাস্তার ওপারে দৌড়ে গিয়ে একটি কিনে আনলাম। সে আমাকে আমার নাম ধরে ডাকে। আইসিইউতে অনেকেই এতে অস্বস্তি বোধ করে—কারণ সে ‘ডাক্তার’ উপাধি ব্যবহার করে না। আমার তাতে কিছু যায় আসে না, বরং তাদেরই বেশি সমস্যা হয়।
দুয়া দিনে বহুবার আমাকে ডেকে পাঠায়, কারণ সে জানে আমার কাছে গুগল ট্রান্সলেট আছে—যা ভাষার ফাঁকটা কিছুটা হলেও পূরণ করে। আজ সে জানতে পারল যে সে আইসিইউ থেকে বের হবে—আরও এক ধাপ বাড়ির দিকে। যদিও সেই ‘বাড়ি’ এখন একটি তাঁবু, তবু পরিবারের সঙ্গে থাকার অনুভূতিটাই তাকে বাড়ির স্বস্তি দেয়। তার আসল বাড়িটি বহু আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে। কতবার সে বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তা সে নিজেই মনে করতে পারে না। সে আমাকে প্রতিশ্রুতি করায়, আমি যেন আগামীকাল সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে তাকে দেখতে যাই। আমি সেই প্রতিশ্রুতি ভাঙব না। তাকে চকলেট দুধ উপভোগ করতে দেখা আজ আমার জন্য সবচেয়ে বড় উপহার ছিল। তার কান্না আমাকে তাড়া করে বেড়ায়—কারণ তা গাজার প্রতিটি হারানো শিশুর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
আল্ট্রাসাউন্ড প্রশিক্ষণের আগে আমি একটু আগে ইমার্জেন্সি রুমে পৌঁছাই। সেখানে একটি কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট চলছে। আমি পাশে গিয়ে দাঁড়াই। যে রেসিডেন্ট কোড ব্লু পরিচালনা করছিল, সে কদিন আগেই আমাদের শেখানো অ্যাডভান্সড কার্ডিয়াক লাইফ সাপোর্ট প্রশিক্ষণে ছিল। বোঝা যাচ্ছে, কিছু বিষয় সে শিখেছে। মানুষটি বেঁচে যায়, কিন্তু তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে এবং সে ভেন্টিলেটরে আছে। আমরা কেবল শিরায় রক্ত পাতলা করার ওষুধ দিতে পারছি। পুরো গাজা শহরে কার্ডিয়াক অ্যাঞ্জিওগ্রাম করার মতো একমাত্র জায়গাটি অনেক দূরে। সে ভেন্টিলেটর থেকে না নামা পর্যন্ত সেখানে নেওয়া সম্ভব নয়। আমি শুধু আশা করছি—অপর্যাপ্ত চিকিৎসা নিয়েই সে সেই পর্যায় পর্যন্ত বেঁচে থাকবে। সরঞ্জামের অভাবে প্রতিদিনই কম কার্যকর চিকিৎসা বেছে নিতে বাধ্য হওয়ার যে নৈতিক ক্ষত, তা ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। যুদ্ধের আগে গাজায় প্রতিদিন পাঁচ শতাধিক ট্রাক ঢুকত। এই ধ্বংসের পর প্রয়োজন অন্তত তার দশগুণ। অথচ যুদ্ধবিরতির পরও প্রতিদিন দুই শতটির কম ট্রাক ঢুকছে, যার মাত্র তিন শতাংশে স্বাস্থ্যসামগ্রী রয়েছে।
আল্ট্রাসাউন্ড রাউন্ড স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। হঠাৎ একজন রোগীর হৃদয় পরীক্ষা করতে ডাক আসে। তার রক্তচাপ ‘পড়া যাচ্ছে না’, অথচ সে স্পষ্টভাবে কথা বলছে। আমি নার্সকে কাফ বদলাতে বলি। তাতেও রক্তচাপ ধরা পড়ে না। নিজের হাতে লাগিয়ে দেখি—আমারটাও পড়ছে না। দু’টি ভাঙা যন্ত্র বদলানোর পর অবশেষে কাজের মতো একটি পাওয়া গেল। রক্তচাপ তখন বেশ কম। কার্যকর যন্ত্র খুঁজতে এই বিলম্ব মারাত্মক হতে পারত। নিজেকে দোষ দিই—আরও কাফ না আনায়। তারপর মনে পড়ে যায়—সীমান্তে চিকিৎসা সামগ্রীর উপর যে নিষেধাজ্ঞা, তাতে সেগুলো ঢুকতেই দিত না। আবারও রাগ দমন করতে হয়।
রাউন্ডের মাঝেই ইমার্জেন্সি বিভাগের সিনিয়র ডাক্তার ডা. মুনীর আমাকে টেনে নিয়ে তার কক্ষে নিয়ে যান, এক কাপ কফি খাওয়াতে। তিনি বলেন, “আমাদের ফিলিস্তিনি আতিথেয়তাই আমাদের ট্র্যাজেডি।” কথাটা গভীরভাবে আঘাত করে—এই ভূমির ইতিহাস আর দখলের দিকে ইঙ্গিত করে।
আমি রেসিডেন্ট হানিনকে বলি, ডা. মুনীর আমাকে পরিবারের মানুষের মতো মনে করেন। সে বলে, “আমরা সবাই এখন একে অপরের পরিবার। আমরা অনেকেই প্রিয়জন হারিয়েছি। আমি আমার বাবাসহ দশজন আত্মীয়কে হারিয়েছি।” সবসময় হাসিখুশি হানিন হঠাৎ নীরব হয়ে যায়। এমন মুহূর্ত এখানে খুব সাধারণ—যখন মানুষ হঠাৎ ভয়াবহ কোনো স্মৃতিতে ফিরে যায়। একটু পর সে নিজেকে সামলে বলে, “চলো, আল্ট্রাসাউন্ডে রোগী দেখা যাক।”
রাতে ডরমিটরিতে ফেরার পথে আবার ডা. তামিরের সঙ্গে দেখা হয়। কবরস্থানের পাশে দাঁড়িয়েই কথা হয়—প্রতিদিনই এ পথ দিয়ে যাই বলে এটা অস্বাভাবিক নয়। হঠাৎ একটা তীব্র গন্ধ আসে। তিনি আমাদের সরে যেতে বলেন—“এখন দেহাবশেষ তোলা হচ্ছে, অন্য কবরস্থানে সরানোর জন্য—তাই এই গন্ধ।”
মৃত্যু, ক্ষতি আর নিজের মৃত্যুর আশঙ্কা যখন চারদিকে ঘিরে থাকে—তখন মানুষ কীভাবে পূর্ণভাবে বাঁচে? যখন বাতাস, পানি আর মাটিতে জমা বিষে শরীর ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়—তখন কীভাবে বাঁচে? তাঁবুর ভেতরের দমবন্ধ করা পরিবেশ, খারাপ বাতাস, কিংবা উত্তর বিশ্বের চাপা বুট যখন গলায় চেপে বসে—তখন কীভাবে?
টানা চার-পাঁচ রাত দুই ঘণ্টার বেশি ঘুম হয়নি। ড্রোনের শব্দ, বিস্ফোরণের আওয়াজ, গুলির শব্দে সবাই যেন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছি। তবু আগের সফরগুলোর তুলনায় এখানে নাকি ‘মিথ্যা নিরাপত্তার অনুভূতি’ আছে—এ কথাটি হাস্যকর। কারণ ফিলিস্তিনি মানুষের জন্য নিরাপত্তা বলে আসলে কিছু নেই।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন