https://www.prothomalony.com/
15497
literature
অমসৃণ সর্পিল স্বপ্নীল পথ
মুহাম্মদ রফিক ইসলাম
যার আগুন সে তাপাব নে
চোখে শীতঘুম যদিও
ধোঁয়ার ভেতর কম্বল পোড়ানো টেকাও আগে
কুয়াশায় মোড়ানো কাঁচা হলুদ ঘ্রাণ
কথার উষ্ণতায় ভেজানো ঠোঁটে
শুকাতে দিয়েছি বিকেলের রোদ্দুর
জলের ছায়ায় বেলফল খুঁটে খাওয়া পাখির মতো
জাগ্রত ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করাও বোকামি
দণ্ড গুনতে গিয়ে সময়ের চোখে
ভুলতে বসেছি, একলা একা চলতে হয়
অমসৃণ সর্পিল জেনে স্বপ্নীল পথে
কি লিখি তোমায়
রকিবুল ইসলাম
প্রিয়তমেষু! কি লিখি তোমায়!
শব্দ'রা আজ হয় না চয়ন আমার কলম দিয়ে,
একলা আমার অসহায়ত্বের
নেয় না খোঁজ কেহ একলা আমায় ভেবে।
তবে, কি লিখি তোমায়!
ফুরিয়েছি কলম কত, লিখতে তোমায় শত,
জানতে পারিনি কভু, সে সব লেখা পেয়েছ কি না!
পড়েছ কি কভু? তবে, কেন লিখি তবু?
কি লিখি তোমায়!
অপেক্ষারা আজ মানে না বাঁধ,
আক্ষেপ'রা ও তাই যোগ দিল তত্রসাথ!
কি লিখি তোমায়!
কবুতর'টা আজ হয়ে গেছে বয়ঃবৃদ্ধ
মেলতে পারে না ডানা,
কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি ভাবি এখন কিভাবে পাঠাব
তোমায় লেখা নীল খামে ভরা মোর চিঠিখানা।
তবে, কেন লিখি তোমায়? কি-ই-বা লিখি তোমায়!
স্বপ্নরা আজ হয় না বিবৃত কালি নেই আজ দোয়াতে,
হৃদয় ক্ষরিত রক্ত দিয়ে লিখি আজ তাই
তোমায় মনে হলে।
পরম স্বামী
হাসান মাহমুদ
তোমারে খুঁজে মসজিদ–মন্দিরে,
গির্জার পথে, দূর প্যাগোডায়;
ধর্মশালার বন্ধ তালায়—
কোন জন রাখিল বন্দি তোমায়?
কেউ খোঁজে শ্লোকে অবেলাতে,
কেউ খোঁজে প্রেমের জপমালাতে;
কেউ খোঁজে আজানের সুরে—
হৃদয়-গহীনে খুঁজিতে ভুলে।
মোনাজাতে কিংবা ঘণ্টাধ্বনির মাঝে—
মানুষ খোঁজে তোমার ঠিকানা আজও;
হৃদয়-মাঝে করিছো বাস,
তবু খোঁজে বাহিরে-কত বিভ্রান্ত বিলাস!
মানুষে মানুষে এত ভেদাভেদ—
কেহ কি শুনিল তোমার বেদ?
কোথায়, হে ভাগ্য-বিধাতা?
পরম স্বামী, তুমিই পরিত্রাতা।
জগৎ-স্বামী, পথ দেখাও—
ধর্মের দেয়ালে তুমি নও বন্দি।
হে চিরন্তন, হে চির সত্য
তুমি অনাদি–অনন্ত, তুমি সদা মুক্ত।
নিরপরাধ প্রেম
দীপান্বিতা পালিত
তোমার শরীরে শীতভোরের শিশিরের গন্ধ...
যেন এক গ্রামের কিশোর এসেছে নতুন দেশে
বিহ্বল হয়ে দেখছে তোমার
স্থাপত্য, ভাস্কর্য, সম্পদ...
আর কখন ভুল করে সে ছুঁয়ে ফেলেছে
অমূল্য তোমার হৃদয়...
অমনি তার বাঁশিতে বেজে উঠেছে
অনন্তকালের এক গভীর বিষাদের সুর...
তোমার শরীরে নতুন শিশিরের গন্ধ
দুপায়ে পদ্মপরাগের গভীর নিনাদ...
আকাশছোঁয়া গল্প
জহিরুল হক বিদ্যুৎ
জীবনটা কখনো সমুদ্রের ঢেউ,
কখনো মরুভূমির নীরবতা।
কখনো ভিজে ওঠে অনাবিল শিশিরে,
কখনো শুকিয়ে যায় নিজের অগোচরে।
তবু আমরা হাঁটি--
পদচিহ্নের ওপরে নতুন পদচিহ্ন রেখে
প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে পুনরায় জন্ম দেই।
নীরবতা অনেক কিছু শেখায়, শোনা যায় না,
কিন্তু ভেতরে অদৃশ্য আলো জ্বেলে দেয়।
সুখের দরজায় দাঁড়িয়ে যে দুঃখ কড়া নাড়ে,
তাকেও একদিন নিজের ঘরের অতিথি মনে হয়।
জীবনটা যেন এক আকাশ--
যেখানে থাকে রোদ, মেঘ, ঝড়, নীরবতা
কিছুদিন আকাশ পরিষ্কার, কিছুদিন কালো।
আমরাও নিজস্ব রঙে ধীরেধীরে হয়ে উঠি
এক চলমান আকাশছোঁয়া গল্প।
পিরিতের গীত
মিলন ইমদাদুল
কানাইয়ের বংশী ঠোঁটে মেলে যে যুবক ছেলেটি—
ছুঁটে চলেছে এমন রাত দুপুরে যমুনার ঘাটে,
ঠোঁটের জাদুতে তার অনাদিকালের মন্ত্র বেঁধেছে পুরাণে
বাঁশরি সুরে উতলা হয়ে একদিন ঘর ছেড়েছিল
যে সুন্দরী কামিনী; সময়ে অসময়ে—
তার বুকেও জ্বলে ওঠে বিষম পিরিতের গীত।
প্রেমে যারে টানে রূপসাগরে—মনের অজান্তে
সে চোখে আচমকা পিরিতের ফুল তো ফুটবেই...
প্রিয় হেমন্তে নারীগণ
সৈয়দ নূরুল আলম
হেমন্ত আসবে, নারীগণ চুল শুকায় ছাদে।
পাশে ঝাউ বাগান থেকে পাতার মৃদু শব্দ ওড়তে
বেরোয় হেমন্তে আর মিশতে থাকে ভিজা চুলে।
বিকেলের তাড়া খাওয়া হলুদ রোদ টুপ করে ডুব দেয়
নদীর অগভীর জলে,
কবিতার মতো সন্ধ্যা নামে ছাদে লাগানো বাতাবি
লেবুর ডালে, নারীগণ হেমন্ত বাতাসের স্পর্শ পেয়ে,
একে ওপরের গায়ে পড়ে শীষ দেয় ঠোঁটে।
এমন তো হয় ফি বছর হেমন্তে,
আফসোস! হঠাৎ হেমন্তের বিকেল শেষ হয়ে যায়,
নারীগণ নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে ছাদের ওপরে।
গল্প নয় সত্য ঘটনা
ইশতিয়াক রুপু
১৯৮৮ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে যোগ দিলেন এক অধ্যাপক রংপুর থেকে। ছয় ফুটের বেশি উচ্চতার ভদ্রলোক ছিলেন খুব মিশুক। হাসিখুশী মানুষ। কথা বলতেন হেসে হেসে।
এদিকে আমার আব্বা আম্মা দুজন তখন আমেরিকা প্রবাসী। আমার বাস বাড়ির পুরাতন অংশে। উত্তর দিকের দালান কোঠা ভাড়া দেয়া। পিছনের অংশে পূরালী ব্যাঙ্কের ব্যবস্থাপক পরিবার সহ। সামানের তিন কোঠায় ঔষধ কোম্পানির বিক্রয় কর্মীরা-যাদের সবাই ব্যাচেলর। ওদের এক পরিচিত জনের সঙ্গে পূর্ব সুত্রে সম্পর্কিত ছিলেন অধ্যাপক সাহেব। আর সেই সূত্রে তিনি উঠলেন আমাদের বাসায়। বিকালে বাজারে গিয়ে পরিচয়।পাশের দোকানের মালিক স্বাধীন ভাইর সঙ্গে তিনি বসা।
প্রতিদিন কলেজ থেকে এসে সময় কাঁটাতে বাজারে যান। বসেন প্রয়াত স্বাধীন ভাইয়ের দোকানে।সেখানে ধীরে ধীরে নিজেকে পরিচিত করে নিলেন হস্তরেখা বিশারদ রুপে।সবাই জেনে গেলো অধ্যাপক সাহেব যে কারো হাত দেখে বর্তমান ভবিষ্যত সব সঠিক বলে দিতে পারেন।
ব্যাস জমে গেল বাজার। একেবারে রমরমা অবস্থা। লোক জন এসে ঘন্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে বসে থাকে হাত দেখানোর জন্য। ক্রমে সেই সুনাম চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে গেলো। সন্ধা থেকে হাত দেখা শুরু-চলে রাত দশটা এগারো পর্যন্ত। পরদিন সকালে ছুটেন কলেজে। হাসিখুশী মানুষ। অল্প দিনে শহরের অনেকের সঙ্গে বেশ জানাশুনা হয়ে গেলো।শহরে কেউ ঠিকানা জিজ্ঞেস করলে সোজা বলে দেন আমাদের বাসার কথা।
কোন এক গ্রীস্মের সকাল। বারান্দায় বসে সবজি নিচ্ছি সুরমা নদীব উত্তর পাড় থেকে আসা একজন কমবয়সী ফেরিওয়ালার নিকট থেকে। নানা জাতের শাক সবজি নিয়ে সে আসতো বিক্রি করবার জন্য। হঠাৎ কখনো পুঁজি ধার নিতো। সময় মত ফেরৎ দিতে কখনো দেরি করেনি। ধীরে ধীরে বাসার একজন পারিবারিক সদস্য হয়ে যায়।ইচ্ছে হলে নিজে রান্নাঘরে ঢুকে নিজ হাতে চা বানিয়ে নিতো। ওর এমন আচরণে কেউ যেমন নজর দিতাম না, তেমনি রাগ করাও হতো না।
একদিন সকাল বেলা সবজিওয়ালার নিকট থেকে করল্লা সবজি ক্রয় করছি। উত্তরের ঘরের বারান্দায় প্রফেসর সাহের পত্রিকা নিয়ে ব্যস্ত। হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেজি কতো করে নিলো করল্লার? উত্তরে বললাম,বেশি না! ১৫/১৬ টাকা কেজি দরে।সব শুনে তড়াক করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ১৫/ ১৬ টাকা কেজি? বলেন কি? উত্তরে বললাম, জি সত্যি! তবে আপনার এই অবাক হয়ে যাওয়া এই প্রশ্ন কেনো? বিস্ময় ভর্তি দৃষ্টিতে বলে উঠলেন, বাহে হামাক অংপুরে করল্লার প্রতি মন( ৪০ কেজি)বিক্রি হচ্ছে ১০/১২ টাকা দরে।আর আপনি কেজি নিলেন ১৫/১৬ টাকা করে?
হাসতে হাসতে জানতে চাইলাম, বাহে, আপনার রংপুরে কজন লোকে হাত দেখায়ে পয়সা দেয়? কোন সময় না নিয়ে একদম সহজ ভাষায় জানালেন, হামারা হাত দুখান লিয়ে জমিনে ক্ষেতি করতে যায়,কোন জোতিষ্যির কাছে যায় না।
শুরু হলো বিশ্বকাপ ফুটবল। চারদিকে তমুল উত্তেজনা।ঘরে ঘরে ব্রাজিল এবং আর্জিন্টিনার পতাকা উড়ছে। চায়ের কাপে ঝড়ো তুফান। বাসার সকল ভাড়াটিয়ারা চাঁদা তুলেলেন খেলা দেখার সময় বিরিয়ানি খাবেন বলে, যা তৈরি হলো আমাদের বাসায়।
গুরুত্বপূর্ণ সেই খেলার দিন হঠাৎ করে এলেন প্রফেসার সাহেব।খেলা দেখতে দেখতে গল্প ছলে তিনি বলে দিলেন হাত গণনার কিছু ট্রিক্স।
জানতে চাইলাম, আপনি নিজে কি বিশ্বাস করেন ? হাসতে হাসতে উত্তর দিলেন, রুপু ভাই হাতের লেখায় যদি সব জানা যেতো। তাহলে আল্লাহর উপর একিনের কি দরকার আছে? বুঝেন না শুধু বাড়তি কয়টা টাকা আসে প্রতি মাসে এইজন্য এটা চালিয়ে যাচ্ছি। পরে উনার এক কলিগের নিকট থেকে জানলাম, অধ্যাপক সাহেব ১৯৯৫ সালে গলায় ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে ইন্তেকাল করেন। কষ্টের এই খবর শুনে মনে হলো, সবার ভবিষৎ তিনি বলে পারতেন শুধু নিজের এই মরণব্যাধির খবর রয়ে গেলে নিজেরই নিকট অজানা।
হঠাৎ আমার সখ পেয়ে গেলো হাত দেখবো। প্রফেসার সাবের পরামর্শে কিনে নিলাম কিরোর লেখা একখানা জ্যোতিষবিদ্যা শেখার বই। বাসায় ছিলো আরো একটি বই। নামটি ভুলে গেছি।মনে রেখেছি প্রফেসার স্যারের বাস্তব কিছু পরামর্শ। প্রথমে শুরু নিজেদের বন্ধুদের হাত পরীক্ষা করে।কার্যত কোন লাভ হলো না। উল্টো ধমক খেলাম নিকটতম বন্ধুদের থেকে।একদম কড়া ধমক। কড়া ভাষায়-যা বেটা! আর কোন কাজ পেলি না, শুরু করলি বুঝি হাত গণনা। জানালাম, টাকা পয়সা দিতে হবে না।দুটো হাত দেখে ভাগ্যে কি ভালো মন্দ আছে বলে দেবো।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শহরে চাকুরি করেন এমন একজন সরকারী কর্মচারী পর্যন্ত জেনে গেলেন আমার ভাগ্য গণনা করার খবর। উনার আবার স্ত্রী পুত্র কণ্যা নিয়ে সুন্দর সংসার, রোজগারে ভালো। পরিবারের চাল চলনে টের পাওয়া যায়।
তিনি জানলেন, আমি হাত দেখে সব ভালো মন্দ বলে দিতে পারি। শক্ত হয়ে আমার পিছু নিলেন সেই কথিত ভাই।দেখা হলেই অনুরোধ, ভাই একটু আসেন কোথাও বসি।হাতটি দেখবেন। যন্ত্রণা সইতে না পেরে একদিন আমন্ত্রণ নিয়ে চলে গেলাম উনার বাসায়। বাসায় যেতেই আমাকে টেনে বাইরে এনে বললেন, ভাই বাসায় বসবো না।অন্যত্র কোথাও বসবো।
উনার অনুরোধ রক্ষা করে গেলাম অফিসে। তাও অফিস টাইমের পর। রুমে প্রবেশ করে দেখি এলাহি কাণ্ড। ।ফল ফলাদি মিষ্টি আর দামী বিস্কুটে টেবিল ভর্তি। চেহেরায় দারুণ উৎকন্ঠা নিয়ে তিনি বসে আছেন নিজ আসনে।চা নাস্তা শেষ করে পাশে বসে ডান হাতটি নিজ কোলে টেনে নিলাম। মিনিট দুয়েক জ্যোতিষিও ভাব নিয়ে ডান হাত কয়েক বার উল্টে পাল্টে দেখছি।আর মনে মনে ঠিক করেছি কি পরিমান সিরিয়াসনেস প্রকাশ করে কি কি বলবো। উনার দিকে তাকিয়ে দেখি উনার পুরো চেহারায় অনেক জানার আকাঙ্ক্ষা।পরক্ষণে সবজান্তার ভাব নিয়ে শুধু বললাম, ভাই, আপনি এতো সহজ সরল কেনো? মানুষকে অতিরিক্ত বিশ্বাস করেন। আর এই বিশ্বাসের চরমমূল্য আপনি দিয়ে যাচ্ছেন-যা ক্রমে আপনার নাগালের বাহিরে চলে যাচ্ছে।
আমার কথা শেষ না হতেই সরকারী কর্মকর্তা ভাই আমার হাত চেপে ঢুকরে কেঁদে উঠলেন।বলতে লাগলেন, রুপু ভাই, আপনি ঠিক ধরেছেন! আমার সব শেষ। পরিবার সহ নিজের সঞ্চিত টাকা সম্পদ সব আজ চলে গেছে অন্যের দখলে। আমি বিশ্বাস করে আপন চাচাতো ভাইকে শহরের বাসায় এনেছিলাম শিক্ষিত করবো বলে। ভাইয়ের সঙ্গে আমার ১৬ বছরের বিবাহিত স্ত্রী পরকিয়া সম্পর্ক।
তিনি নিজের অর্জিত সকল নগদ অর্থ সম্পদ সহ নিজের টাকায় কেনা জমি সবই করেছেন স্ত্রী নামে। কার্যত তিনি এখন সহায়-সম্বলহীন। সহসা হারাতে চলেছেন নিজের পরিবারকে।
আমি হতবাক হয়ে ভাবছি। উনার হাতের কোন রেখায় এমন কোন চিহ্ন বা গুপ্ত ভাষায় লেখা নেই উনার এই সর্বনাশের গল্প। তাহলে দুনিয়ার তাবৎ জ্যোতিষরা কি এভাবেই আনুমানিক কিছু বলে গ্রাহকের মন জয় করে?
এরপর আমি আর কখনো কারো হাত গণনা করতে যাইনি।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন