https://www.prothomalony.com/

15416

bangladesh

বাংলাদেশ

ভূমিকম্পের প্রতিশব্দ এখন বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২৫ ০১:৫৭

গত ২১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে নরসিংদী জেলার ঘোড়াশাল এলাকায় একটি ম্যাগনিচিউড ৫.৫–৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। ভূমিকম্পটির উপকেন্দ্রের গভীরতা ছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার। এই ভূমিকম্পের কারণ এবং তার পরিণতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আমাদের ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি শুধু এক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়—এটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক প্রস্তুতির একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা দাবি করে।

বাংলাদেশ কখনই হালকাভাবে নেওয়ার মতো দেশ নয়। ইউরেশিয়ান প্লেট, ইন্ডিয়ান প্লেট এবং বার্মা মাইক্রোপ্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থান বলে এই অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক চাপ বহুদিন ধরে জমে আছে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পটি ইনট্রাপ্লেট ফল্ট থেকে উৎপন্ন হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন। এ ধরনের ফল্ট জনবহুল এলাকায় বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করে। অতীতের অভিজ্ঞতাও বলে—বাংলাদেশ একটি সক্রিয় ভূমিকম্প-প্রবণ অঞ্চল। দেশের পার্বত্য অঞ্চল এবং সীমান্তঘেঁষা জায়গাগুলোতে যে ভূকম্পন আমরা বারবার টের পাই, তা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।

প্রশ্ন উঠতেই পারে—এমন ভূমিকম্পের মূল কারণ কী? সহজ ব্যাখ্যায় বলা যায়, ভূ-পৃষ্ঠের নিচে টেকটনিক প্লেটগুলোর ধীর সঞ্চালন এবং সংঘর্ষের চাপ একসময় হঠাৎ মুক্ত হয়ে কম্পন সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল—চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ—উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বহু গবেষণায় উল্লেখ আছে। রাজধানী ঢাকাও ঝুঁকির বাইরে নয়। বরং নিয়ন্ত্রণহীন দালান নির্মাণ, ঘনবসতি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন ঢাকাকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে—এটি বিশেষজ্ঞদের স্পষ্ট সতর্কতা।

ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি শুধু প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে না; আমাদের অব্যবস্থাপনা সেটিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। ঢাকার সরু অলিগলি, অননুমোদিত বহুতল ভবন, নির্মাণ কোড না মানা—এসব বাস্তবতা সামনে রেখে বলা যায়, বড় ভূমিকম্প হলে ক্ষতির হিসাব কল্পনারও বাইরে হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই বলছেন—অবকাঠামো দুর্বল থাকলে মানবিক বিপর্যয় রোধ করা কঠিন।

এখানে সরকার ও নাগরিক—দুই পক্ষেরই বড় দায়িত্ব রয়েছে। কারণ—ভূমিকম্পের সঠিক পূর্বাভাস এখনো নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই প্রস্তুতিই একমাত্র পথ। স্কুল-কলেজে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া, দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থার প্রসার, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক দল—এগুলো জরুরি। পাশাপাশি নাগরিক পর্যায়ে ছোট প্রস্তুতিও বড় ভূমিকা রাখে—ভারী জিনিস মাথার ওপরে না রাখা, বের হওয়ার পথ খালি রাখা, জরুরি ব্যাগ প্রস্তুত রাখা, সকলের জরুরি নম্বর জানা—এসব জীবনরক্ষার সহায়ক।

এছাড়া গ্রাম ও শহর সব জায়গায় জরুরি সেবার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। উদ্ধার সরঞ্জাম, ফায়ার সার্ভিসের প্রস্তুতি, আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণে ঘাটতি থাকলে কাগুজে পরিকল্পনা বিপর্যয় ঠেকাতে পারবে না।

প্রকৃতির কাছে মানুষ অসহায়—ভূমিকম্প আমাদের তা শেখায়। কিন্তু জ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রস্তুতিই আমাদের রক্ষাকবচ। আজ সতর্ক না হলে কাল বড় বিপর্যয়ের দায় আমরা কেউই এড়াতে পারব না। প্রতিটি মানুষের জীবন মূল্যবান—অবহেলায় তা নিঃশেষ হওয়ার মতো দুঃখ আর কিছু নেই।

আমাদের শহরের আকাশচুম্বী দালানগুলো যেন মৃত্যু ফাঁদে পরিণত না হয়—এ দায়িত্ব শুধু ভবনমালিকের নয়, রাষ্ট্রেরও। সঠিক প্রকৌশল নীতি, আইন প্রয়োগ এবং দুর্নীতি-রোধ—এই তিনটি ক্ষেত্র জরুরি সুরক্ষার ভিত্তি।

ভূমিকম্প প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু ভূমিকম্পের ক্ষতি কমানো অবশ্যই সম্ভব। আমাদের বিজ্ঞান, প্রস্তুতি এবং নীতি—সবকিছু সমন্বিত হলে জীবন বাঁচানো যায়। ভয় নয়, প্রয়োজনীয় সতর্কতায় এগিয়ে যাওয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। প্রকৃতির শক্তির সামনে নম্র হলেও দায়িত্বহীনতা কখনো ক্ষমাযোগ্য নয়।

বাংলাদেশকে নিরাপদ রাখতে হলে এখনই জাগতে হবে—সরকার, বিশেষজ্ঞ, গণমাধ্যম ও নাগরিক সবাইকে। সতর্ক সংকেত বহুবার এসেছে—এবার কাজের পালা।
 

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন