https://www.prothomalony.com/
15386
literature
প্রেম অ-প্রেমের জীবন
কাজী ইসলাম
শেষ পর্যন্ত মুক্তি মিললো। কোর্ট থেকে ডিভোর্স চূড়ান্ত হয়ে যাবার পর ভাবে অণিমা। স্বস্তি বোধ করতেই পারে সে এখন। জেলখানার কয়েদ থেকে মুক্তির মতো আনন্দ সে এখন উদযাপন করতেই পারে।
পাশের ঘরে মেয়ে সুমি তার বান্ধবীদের নিয়ে উদযাপন করছে মায়ের মুক্তি। আসলে ডিভোর্সের সম্পূর্ণ ব্যপারটা তদারকি করেছে আইনের ছাত্রী সুমি। মায়ের দুর্বিষহ জীবনের সাক্ষী সে জন্মের পর থেকেই। তার শৈশবও কেটেছে দুঃস্বপ্নের মতো, সার্বক্ষণিক আতঙ্ক সঙ্গী করে।
তিরিশ বছরের বিবাহিত জীবনের ইতি হলো আজ।
কতোদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে। আজন্ম লালিত সংস্কার, দেশি সংস্কৃতির প্রভাব বিয়ে নামক শৃঙ্খলটা ছিন্ন করতে দেয়নি এতোদিন। বারবার ফিরে এসেছে ভাঙনের কিনারা থেকে।
প্রেমের বিয়ে ছিল। পরিবারের সবার অমতেই বিয়ে করেছিল সহপাঠী সাজুকে! আহ্ তারুণ্যের চশমা, কিছুরই বাস্তব চেহারা দেখতে দেয় না। তারুণ্যের রঙিন চশমায় দুনিয়া দেখায় রঙিন, গল্পের সেই স্বর্গের মতো। অনেকটা
"ফুলের বনে যার কাছে যাই তারেই লাগে ভালো"-এর মতো। মানতেই হবে সাজু গান গাইতো খুব ভালো। গিটার বাজিয়ে যখন গান গাইতো, মগ্ন সাধকের মতো লাগতো! মুগ্ধ হয়ে গান শুনতো অণিমা, শুধু কি শুনতো, দেখতোও। একজন মোহন সাধককে দেখতো। আসলে শুদ্ধ সাধক পৃথিবীতে খুব কমই আছে। বেশিরভাগই খবরের কাগজে প্রকাশিত ভণ্ড সাধকদের মতো।
বিয়ের পরে সচ্ছল পরিবারের অণিমা নিম্নমধ্যবিত্ত সাজুর পরিবারে মানিয়েই নিতে চেয়েছিল। কিন্তু কোন অজ্ঞাত কারণে শাশুড়ি আর ননদ তার প্রতি প্রথম থেকেই বিদ্বিষ্ট ছিল। প্রতিপদে দোষ, প্রতিপদে নিষেধাজ্ঞার কাঁটাতারের বেড়াজাল! প্রথমেই বন্ধ হলো লেখাপড়া। বন্ধ হলো কলেজ যাওয়া। ঘরের বৌ কি জজ-ব্যারিস্টার হবে নাকি! সাজুর দেখা গেলো এ নিয়ে কোন হেলদোল নেই। অণিমা মেধাবী ছিল, সাজু ওর তুলনায় নেহাত সাধারণ বা সাধারণেরও নিচে। সেই সাজু সেজেগুজে কলেজে যায়। আফসোস বাংলাদেশের ব্যাচেলর ডিগ্রি সে জোটাতে পারেনি। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের বেকার স্বামীর ঘর করার আজাব আস্তে আস্তে অনুভব করতে থাকে অণিমা। মুখের দিকে তাকিয়ে মা বুঝে যেতেন সব। গোপনে হাতে টাকা গুঁজে দিতেন। মরমে মরে যেত অণিমা। চলছিল অথবা চলছিলো না এভাবেই।
আচ্ছা বিয়ের পরে কি সাজু কখনো শুধু অণিমাকে গান শুনিয়েছে? মনে পড়ে না। অথচ বিয়ের আগে আবেগে- আশ্লেষে বলেছিল, "সাজু, রোজ আমি তোমার গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে যাবো!"
সাজু ঠাট্টা করে বলতো, "কোন গান? ঘুম পাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি এসো, ওইটাতো?"
অণিমা বলতো, "না ঐটে গাইবে, "A port remains undamaged in the storm!"
এসব কথা কি এই জন্মের? নাকি আগের জন্মের? নাকি স্বপ্নে দেখা দৃশ্য এগুলি!
খেয়ালের বসে অণিমা ডিভিতে আ্যপ্লাই করেছিল। একদম জ্যাকপট কামাল হয়ে গেল, অণিমা ডিভি ভিসা পেয়ে গেল! সঙ্গোপনে ভাবলো হয়তো শাশুড়ি- ননদের সীমার বাইরে দুজনে দুজনকে নতুন করে খুঁজে পাবে, হয়তো সুখ ও স্বস্তির সবুজ তটভূমির দেখা মিলবে! নতুন জীবন হয়তো- -!
মা শুধু মৃদু আপত্তি করেছিলেন, "অতদূরে যাবি, একা?" মৃদু হেসেছিল অণিমা। মনে মনে বলেছিল,"একা কোথায়, সঙ্গে সাজু আছে না।"
তারপরেই শুরু হলো স্বপ্নের আমেরিকায় দুঃস্বপ্নের জীবন।সচ্ছল পরিবারের মেয়ে অণিমা কখনও ভাবেনি জীবনে টিকে থাকা এমন কঠিন হতে পারে। এখানে কেউ নেই, মায়ের ছায়া নেই, ভাইদের আশ্বাস নেই, শৈশবের বান্ধবীরা নেই। আছে শুধু অনিশ্চয়তা, আছে শুধু উদ্বেগ। প্রথম ধাক্কাটা এসেছিল সাজুর কাছে থেকেই। সে নাকি এসব হাবিজাবি কাজ করতে পারবেনা! বাসায় কম্পিউটারের সামনে বসে থাকে শুধু। একার ছোট্ট কাঁধে সংসারের বোঝা টেনে চলে অণিমা। দম আটকে আসে মাঝেমাঝে। এর মধ্যে এলো সুমি। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সব ভুলে যায় অণিমা। নতুন করে বুক বাঁধে। জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এলো তখনই। রাত্তিরে কেঁদে ওঠায় ১৪ দিন বয়সী মেয়ের পিঠে চড় মারে সাজু তার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়। স্তম্ভিত হয়ে যায় অণিমা। একোন দানবের সঙ্গে তার বসবাস! সেই শুরু দানবের রুপ দেখা। ক্ষণেক্ষণে মানুষের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে একটা বীভৎস দানব। নিদারুণ যন্ত্রণার জীবন। যখন তখন গায়ে হাত তোলা শুরু হয়। অশ্লীল গালিগালাজ তো ডালভাত। এই দানব নিয়েই চলছিল সংসার। এই নরকেই মেয়ে বড় হচ্ছিল। পরীর মতো একটা কিশোরী। কিন্তু সেই মেয়েকেও যখন তখন মারধর করতো। মেয়ে রাগে ক্ষোভে ফুঁসতো!
একদিন ব্যপারটা এতোদূর গড়ালো যে পাশের আ্যপার্টমেন্টের কেউ ৯১১ - এ ফোন করে। পুলিশ আসে। ব্যপারটা কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। কোর্ট মেয়ের নিরাপত্তার জন্য ফস্টার প্যারেন্টের হেফাজতে মেয়েকে দেয়। সে আর এক দুর্বিষহ পরিস্থিতি। "আমার মেয়ে অন্যের হেফাজতে!" যখন তখন মেয়ের কাছে যাবার সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য! আহা মেয়েটা মায়ের হাতের রান্না ছাড়া খেতে পারতো না! সেই মেয়েকে খেতে হয় বাজারের কেনা জাঙ্ক খাবার! ফস্টার প্যারেন্টরা ব্যপারটা ব্যবসা হিসেবে চালাতেন, মানবিক, অপত্য স্নেহের কোন ব্যপার ছিলো না। দিনে দিনে শুকিয়ে যায় মেয়েটা! মানসিক দিক দিয়ে বিষণ্ণতায় ভুগতো। দেখা করার সময় মা-মেয়ের কান্নাতেই সময় যেত! রাতের পর রাত জায়নামাজে কাটিয়েছে অণিমা। মেয়েকে ফিরে পাওয়ার প্রার্থনায়! এদিকে গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য কাজও করতে হয়। হাড়ভাঙ্গা খাটুনি। সমাধান মেয়েই করে। আঠারো বছর পূর্ণ হলে মেয়ে কোর্টে আবেদন করে মায়ের সঙ্গে থাকার। মঞ্জুর হয় সে আবেদন। দীর্ঘদিন পর মেয়েকে জড়িয়ে বড় শান্তিতে ঘুমায় সে রাতে অণিমা!
মেয়ে দায়িত্ব নেয় এবার! উকিল- কোর্ট- মামলা। "মেয়েটা আমার কতো বড় হয়ে গেছে,"-ভাবে অণিমা!
দানবটা বহু চেষ্টা করেছে মিটমাট করবার। মেয়ে কোর্ট থেকে আদেশ বের করে সে যেন মা-মেয়ের ত্রিসীমানায় না আসে!
আজ কোর্টের রায় হয়েছে। অণিমার জীবন আজ অভিশাপ মুক্ত!! আজ নিশ্চিন্তে ঘুমাবে অণিমা! বড় শান্তিতে ঘুমাবে।পাশের ঘরে মেয়ে ও তার বান্ধবীদের জলতরঙ্গের মতো উচ্ছল হাসির শব্দ ভেসে আসে।
অথচ ঘুম আসেনা অণিমার। কাটা কাটা আধোঘুম আধো জাগরণে স্বপ্ন দেখে-সেই কলেজ জীবন, সেই রঙিন দিনগুলি। শেষ পর্যন্ত ঘুম আসে ক্লান্ত অণিমার চোখে। গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে সে শোনে, কে যেন গিটার বাজিয়ে গাইছে, "A port remains undamaged in the storm!"
ঘুম ভেঙে ঠিক মনে করতে পারলো না অণিমা, গানটা কে গাইছিল স্বপ্নে! সাজুই কি? মেয়ের জন্য নাস্তা বানাতে বানাতে অণিমা গুনগুন করে গায়, "A port remains undamaged in the storm!"
লাল জামা
কনক কুমার প্রামানিক
আজ মাহফুজের মন খুব খারাপ। স্কুলে টিফিনের সময় ফুটবল খেলতে গিয়ে তার প্রিয় লাল জামাটা ছিঁড়ে গেছে। এই জামাটা তার খুব পছন্দের ছিল। গত বছর রোজার ঈদে বাবার সঙ্গে বাজারে গিয়ে জামাটা কিনেছিল সে। ঈদের আগের দিন সারারাত লাল জামাটা বুকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে ছিল সে। পরদিন সকালে জামাটা পরে ঈদগাহে গিয়েছিল। খুশিতে চিকচিক করছিল তার চোখমুখ। এমন পছন্দের জামা ছিঁড়ে যাওয়া সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। মাঠের কোনায় বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল।
স্কুল ছুটির পর মন খারাপ করে বাড়ি ফেরে সে। সব শুনে মা তাকে আর একটা নতুন লাল জামা কিনে দেওয়ার কথা বলেন। তাতেও আশ্বস্ত হতে পারে না মাহফুজ। রোজিনা ও নয়ন মিয়া দম্পতির একমাত্র ছেলে মাহফুজ। ওর বয়স সাত বছর। ক্লাস টুতে পড়ে। খুব ভাল ছেলে। পড়া লেখায় সে খুব মেধাবী। দরিদ্র বাবা নয়ন মিয়ার নিজস্ব কোন জমি জিরাত নাই। অন্যের জমি সে বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করে। মানুষের জমিতে দিন মজুরের কাজ করে। শত কষ্ট হলেও নয়ন মিয়া ছেলের পড়ালেখা ও অন্যান্য বিষয়ে কখনো কার্পণ্যতা করেন না।
রাতে বাড়ি এসে নয়ন মিয়া ছেলে মাহফুজের মন খারাপের বিষয়টা জানতে পারেন। মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে বলেন, "চিন্তা করিসনা বাবা আর কদিন পর আমন ধান কাটার পর তোকে সুন্দর একটা লাল জামা কিনে দেবো।" বাবার কথা শুনে শান্ত হয় মাহফুজ। গরীব হলেও ওদের পরিবারটা খুব সুখের। বাবা মা আর ছেলেতে মিলে আনন্দেই দিন কেটে যায় ওদের।
এর মধ্যে হঠাৎ একদিন রাতে প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি হয়। পরদিন সকালবেলা নয়ন মিয়া ধানের জমিতে গিয়ে দেখে কলাপাকা ধানগুলো সব মাটির সঙ্গে নেতিয়ে পড়েছে। এরপর এক নাগাড়ে আরো চার পাঁচ দিন ধরে বৃষ্টি হয় সে ধানের উপর। ধানগুলোতে চারা গজায় তারপর সেগুলো মাঠেই পঁচে যায়। কৃষকেরা কেউ ধান ঘরে তুলতে পারে না। এ বছর কৃষকের কষ্টের অন্ত থাকে না।
মাহফুজের আর লাল জামা কেনা হয় না। নয়ন মিয়া ছেলের কষ্ট উপলব্ধি করতে পারেন। অন্যদিকে তার অনেক ধার-দেনাও হয়ে গেছে। নয়ন মিয়া শেষ সম্বল লাল গরুটা বেচে দেন। ধার-দেনা মিটিয়ে ছেলের জন্য সুন্দর লাল টুকটুকে একটি জামা কিনে আনেন তিনি। সেদিন বাড়ি ফিরতে ফিরতে কিছুটা রাত হয়ে গিয়েছে। অভিমান করে ছেলেটা ঘুমিয়ে পড়েছে। নয়ন মিয়া ছেলেকে ডেকে তুলে জামাটা পরিয়ে দিলেন।
তখন মাহফুজের খুশি দেখে কে? বাবাকে জড়িয়ে ধরে লুটিয়ে পড়ে বুকে। মধ্য আকাশের পূর্ণিমার চাঁদটা তখন কিছুটা হলে পড়েছে পশ্চিম আকাশে।
হেমন্তের চিঠি
শাহানাজ শিউলী
মমতাময়ী হেমন্ত,
ভোরের শিউলি-ঝরা সুবাস আর শিশিরে ভেজা সজল চোখে আনন্দাশ্রু নিয়ে তোমায় লিখতে বসলাম। কারণ, তুমি ছিলে আমার এক অনন্ত অপেক্ষা। আজ সেই অপেক্ষার অবসান হলো। তাই মনের বাতায়ন খুলে তোমায় লিখতে খুব ইচ্ছে করছে।
আমি লিখছি এমন এক সময়ে, যখন সময়ের পালাবদলে নীরব, অঘোষিত এক যুদ্ধ চলছে-ক্ষুধার্ত শিশুর উদাস দৃষ্টি, মনুষ্যত্ব ও বিবেকের পচনের দুর্গন্ধে দূষিত বাতাস, আর এক আসন্ন ঘোর তমসায় কাতর পৃথিবী। এই দুঃসময়ের মাঝেও তুমি হৃদয়ে উঁকি দিয়ে এলে। তাই তোমাকে স্বচক্ষে গভীরভাবে দেখার লোভটা আর সামলাতে পারলাম না। চলে এলাম মমতামাখা মাটির স্পর্শে-আমার সবুজ-শ্যামল গাঁয়ে।
প্রাতঃভ্রমণে যখন তুমি আমার কুয়াশার চাদরে জড়িয়ে নিলে, আর আমার আলতা-পরা দুটি পা শিশিরে ভিজিয়ে দিলে, তখন এক অন্যরকম শিহরণে কেঁপে উঠেছিল মন।
সত্যি, তোমার কাশফুল আর কচি ধানের সবুজ পাতায় দোলানো হালকা বাতাসের মোলায়েম মমতার স্পর্শ আমাকে এক মুহূর্তে নিয়ে গিয়েছিল সবুজ দিগন্তে। তারার মতো ফুটে থাকা শাপলারা তখন খিলখিল করে হেসেছিল।
তুমি এত মমতাময়ী, এত স্নিগ্ধ, এত আত্মদানকারী-ভাবতেই মনটা উদার হয়ে যায়।
চাষির চোখে-মুখে তৃপ্তির হাসি দেখে আমি মুগ্ধ হই। ধানের শীষে নুয়ে থাকা সোনালি আশার দোলায় আমি আপ্লুত হয়ে পড়ি।
সত্যি বলতে কি, তুমি আমার হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক অন্যরকম অনুভূতি যা ভাষায় সম্পূর্ণ প্রকাশ করা অসম্ভব।
তুমি বুকের পাঁজরে শিউলির গালিচা বিছিয়ে দিয়ে সরিষার হলুদ পাপড়িতে বরণ করলে আমায়। তাই তোমার মায়াবী রূপের প্রেমে পড়েছিলাম। হৃদয়ের গভীর মমতা দিয়ে আপ্যায়ন করেছিলে।
খেজুরের মিষ্টি রস আর নলেন গুড়ের পায়েসের তৃপ্ত স্বাদ এখনও মুখে লেগে আছে।
হালকা ঠান্ডা নরম বাতাসের সঙ্গে মিষ্টি রোদ-এক অমৃত স্বাদ, যা সারা জীবন মনে থাকবে।
তুমি জেনে অবাক হবে, তোমার এই স্পর্শটুকু পাওয়ার জন্য আমি কত রাত-দিন অপেক্ষা করেছি, কত দিন গুনেছি।
তুমি আমার কাছে কুয়াশার আলতো ঘোমটায় ঢাকা এক মায়াবী সকাল। আমার প্রতিটি সুখকর মুহূর্ত তোমাকে নিয়েই রচিত। তোমার মায়াবী চাহনি গভীর, তোমার উষ্ণ ছোঁয়া হাসির মতো লেগে থাকে আমার হৃদয়ে।
দূরের মাঠে যখন বাতাস দোলে, মনে হয়-তোমার কণ্ঠে কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে-মৃদু, কোমল, অথচ অদ্ভুত মায়ায় ভরা।
প্রিয়, সারাদিন তোমার মিষ্টি রোদের আবেশ আমার সারা শরীরে যেমন জড়িয়ে থাকে, তেমনি বিকেলগুলো তোমাকে ছাড়া ভাবতে পারি না।
ধানের সোনালি সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আমি তোমার হাত ধরে পৃথিবীর সব রোদ, সব বাতাস, সব ভালোবাসা ছুঁয়েছি।
সন্ধ্যার কুয়াশা যখন নামে, গোধূলি লগ্নে আমি চোখ বুজে তোমার মুখখানা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রাখি-শান্ত, মায়াময়, তোমার আলোয় গলে যাওয়া এক রূপকথার মতো।
তুমি-নীরব, মুগ্ধ, অথচ হৃদয়ভরা উষ্ণতা নিয়ে আসা এক মায়াবিনী।
আমি তোমাকে ভালোবাসি ঠিক সেই আলোর মতো; যা নরম, অন্তহীন, চিরন্তন।
দূরের বন্ধুকে
সেলিনা আক্তার
প্রিয় বন্ধু,
অনেক দিন হলো তোমার সঙ্গে মন খুলে কথা বলা হয়নি। দূরত্ব আমাদের মাঝখানে এক ধরনের নীরবতা তৈরি করেছে যা কখনো কখনো খুব ভারী লাগে। তাই ভাবলাম, তোমাকে চিঠি লিখি। চিঠি যেমন দ্রুত নয়, তেমনই অস্থিরতাও নেই; বরং এতে থাকে একটু থেমে ভাবার জায়গা, যা কথোপকথনের তুলনায় অনেক বেশি গভীর ও আন্তরিক।
এখানে হেমন্ত নেমেছে। সকালগুলো ঝলমলে; রোদের মোলায়েম উষ্ণতা জীবনের ব্যস্ততায় একটা ছোট বিরতি এনে দেয়। মাঝে মাঝে হালকা শীত এসে গাল ছুঁয়ে যায়, আর সেই মুহূর্তে তোমার কথা খুব মনে পড়ে। মনে হয়, তুমি পাশে থাকলে আমরা আবার সেই অযথা হাসির, গল্পে ডুবে থাকা দুপুরগুলো ফিরিয়ে আনতে পারতাম।
তুমি নিশ্চয়ই তোমার নিজের জীবনে ব্যস্ত। তোমার শহরের সংস্কৃতি, মানুষের আচরণ, রাস্তাঘাটের ছন্দ-সবই নিশ্চয়ই তোমাকে মুগ্ধ করছে। কখনো ভাবি, তুমি কি আগের মতো সকালে কফি হাতে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যের আলো দেখো? বিকেলের আকাশ কি তোমার শহরেও একইভাবে রঙ ছড়ায়? রাত নামলে সেখানে বাতাস কি আমাদের বাড়ির মতোই গল্প বলে?
জানো, মনে হয় বন্ধুত্বের আসল জোরই হলো এই অদৃশ্য সংযোগ-যা দূরে থেকেও কমে না, বরং কখনো কখনো আরও গভীর হয়। আমরা কথা না বললেও, অনেকদিন দেখা না হলেও, মনে হয় আমাদের মধ্যে এক ধরনের মমতার সেতুবন্ধ সবসময় ঠিকই রয়ে গেছে।
তবু তোমাকে মনে পড়ে ভীষণ। ইচ্ছে করে তুমি যদি মাঝে মাঝে লিখতে-কি করছো, কেমন আছো, কি ভাবছো। তোমার ছোট্ট কোনো খবরও আমার মনে অনেক আনন্দ নিয়ে আসে, যেন দূরের আকাশ থেকে ভেসে আসা উষ্ণ চিঠি।
জানি, তোমার চলমান লড়াই বিচ্ছিন্ন করে রাখে তোমাকে অনেক কিছু থেকে। এ সত্য মেনে নিয়েই তোমাকে স্মরণ করি ক্ষণেক্ষণে।
ভালো থেকো বন্ধু। নিজের যত্ন নিও। সময় পেলে কোনো এক শান্ত হেমন্ত-সন্ধ্যায় আমাকে ফিরতি চিঠি লিখো।
অন্তর থেকে,
তোমার দূরের বন্ধু
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন