https://www.prothomalony.com/
15319
literature
ভূমিকাঃ শিল্পকলাকে আমাদের সৃষ্টিশীলতা ও ভাবনার একটি রঙিন পরিচয় বলা যায়, যা বিভিন্ন চিত্র, মূর্তি, অঙ্কন, গান, নৃত্য, নাট্য, আধুনিক ও প্রাচীন কার্যকলার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।শিল্পকলার মাধ্যমে আমরা সমাজের বিশিষ্ট সংস্কৃতি, চিন্তা, ধারণা, এবং অভিজ্ঞতগুলোকে উপস্থাপন করতে পারি।
মূলত চিত্রশিল্প হলো এক ধরনের দৃশ্যকলা যা আঁকা, রং করা, রেখাচিত্র বা অন্যান্য পদ্ধতির মাধ্যমে বিভিন্ন ধারণা ও অনুভূতিকে দৃশ্যমান রূপ দেয়।একজন শিল্পী বিভিন্ন ধারণা, অনুভূতি এবং দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ছবি আঁকতে পারেন, যার মধ্যে রয়েছে চারপাশের জগতকে নান্দনিক বা সৃজনশীল উপায়ে দেখা, ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি প্রকাশ করা, বা নির্দিষ্ট সামাজিক বা রাজনৈতিক ধারণার প্রতিফলন ঘটানো। একজন শিল্পী তার নিজস্ব শৈলী ও চিন্তাভাবনা অনুযায়ী বিষয়বস্তু নির্বাচন করেন এবং প্রায়শই বিভিন্ন কৌশল ও মাধ্যম ব্যবহার করেন। চিত্রশিল্পীরা কখনো শখের বসে শৈল্পিক কাজটিতে জড়িত হোন। আবার কখনো এটি তাদের পছন্দের কিছু করতে এবং অর্থ উপার্জনের একটি মাধ্যমে হয়ে উঠে।
শিল্পঘর পাতায় আমরা আজ দুইজন গুণী চিত্রশিল্পীদের গল্প জানবো, শিল্পী শারমিন শিরাজী এবং মোহাম্মেদ মাহমুদুল হাসান (রোকন) যাদের শৈল্পিক কাজ ও ভাবনার অনুরণনে আপনারাও মুগ্ধ হবেন। আশাকরি 'শিল্পঘর' এর আজকের মূল্যায়নটি আপনাদের ভালো লাগবে।
ধন্যবাদান্তে-রোকেয়া দীপা।
শিল্পী শারমিন শিরাজী
.jpeg)
বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রশিল্প অঙ্গনে এক উজ্জ্বল নাম শারমিন শিরাজী। তিনি রঙে রঙে আঁকেন জীবনের গান। তাঁর শিল্পকর্মে ফুটে ওঠে প্রকৃতি, নারী ও ফুলের অনন্ত সৌন্দর্য, যা ক্যানভাসে ছুঁয়ে যায় হৃদয়ের গভীরতম কোমল অনুভূতি। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম, ভালোবাসা ও আশাবাদকে তিনি তুলির রঙে পরিণত করেছেন জীবন্ত গল্পে।
ঢাকার মাটিতে শেকড়, আর নিউইয়র্কের আকাশে ডানা মেলে তিনি হয়ে উঠেছেন এক পথপ্রদীপ যিনি শিল্পে খুঁজে পান শান্তি, মানবতা আর সৌন্দর্যের চিরন্তন ছোঁয়া।
শিল্পী শারমিন শিরাজী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৭২ সালের ১লা সেপ্টেম্বর, ঢাকায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছবি আঁকার প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ড্রইং ক্লাসের অপেক্ষায় থাকতেন প্রতিদিন। তাঁর আগ্রহ দেখে বড় ভাই তাঁকে একটি আর্ট স্কুলে ভর্তি করান, যেখানে তিনি শিক্ষক রফিকুল স্যারের কাছে মাত্র ১২ বছর বয়সে অয়েল পেইন্টিং শেখা শুরু করেন।
শারমিন শিরাজী জানান, পরিবারের সবাই তাঁর প্রতিভা দেখে তাঁকে চারুকলায় পড়ার অনুপ্রেরণা দেন।১৯৮৯-৯০ শিক্ষাবর্ষে তিনি ভর্তি হন চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রি-ডিগ্রি কোর্সে, পরবর্তীতে ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগে বিএফএ শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে বিএফএ দ্বিতীয় বর্ষে পড়াকালীন তিনি প্রথমবারের মতো একটি গ্রুপ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন, যার থিম ছিল বাংলাদেশের নৈসর্গিক প্রকৃতি। ১৯৯৭ সালে গুলশানের সাজু আর্ট গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী। ২০০২ সালে তিনি চারুকলা ইনস্টিটিউট (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে এমএফএ ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছর চারুকলার গ্যালারিতে "তিন কন্যা" শিরোনামে সমসাময়িক দুই নারী শিল্পীর সঙ্গে একটি গ্রুপ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন।
তাঁর শিল্পযাত্রার শুরু নিয়ে জানান, শিল্পযাত্রা শুরু হয় তাঁর শিক্ষক ও সহপাঠীদের সহযোগিতায়। তাঁর মতে, পেইন্টিংয়ের সবচেয়ে মজার দিক হলো, ভুল জায়গাতেই নতুন করে সঠিকতা খুঁজে নেওয়া যায়। ব্রাশের ছোট-বড় স্ট্রোক ও রঙের মেলবন্ধনে তিনি ক্যানভাসে সৃষ্টি করেন এক প্রাণবন্ত পরিবেশ, যা তাঁকে আরও কাজের অনুপ্রেরণা দেয়। ঢাকাতেই তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা ও শিক্ষা হলেও, গ্রামীণ বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মানুষের সহজ সরল জীবন তাঁকে সবসময় টেনেছে। তাই তাঁর চিত্রকর্মে প্রায়ই ফুটে ওঠে নদী, নারী ও কন্যার প্রতিচ্ছবি।
এই যাত্রাপথে চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি জানান, শিক্ষাজীবনের মাঝামাঝি সময় শুরু হয় তাঁর সংসার জীবন। সন্তান ও সংসারের দায়িত্ব সামলে শিল্পচর্চা চালিয়ে যাওয়া ছিল তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, তবু তিনি থেমে যাননি। ২০১৩ সালে তিনি পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে। নতুন সমাজ, নতুন পরিবেশ ও বাস্তবতার এই অধ্যায়ও ছিল সংগ্রামময়। কিছুদিনের বিরতির পর তিনি আবার ফিরে পান তাঁর সত্তার আসল পরিচয়, শিল্পীসত্তা।
তিনি যুক্ত হন প্রবাসী বাংলাদেশি শিল্পীদের সংগঠন আর্টিস্ট ফোরাম (নিউইয়র্ক) এর সঙ্গে এবং ঢাকায় তাঁর প্রিয় বান্ধবীদের গঠিত কালার্স গ্রুপের সঙ্গে। এই দুই জগৎ, প্রবাস ও জন্মভূমি, তাঁকে নতুন করে জীবন ও সৃষ্টির উচ্ছ্বাস উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে।
সম্প্রতি তিনি ঢাকায় অনুষ্ঠিত "রিদম অব নেচার" শিরোনামের সমসাময়িক নারী শিল্পীদের গ্রুপ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। এছাড়া নিউইয়র্কে আর্টিস্ট ফোরাম-এর আয়োজিত গ্রুপ প্রদর্শনীতেও তাঁর কাজ প্রদর্শিত হয়েছে।
বর্তমানে তাঁর চিত্রকর্মের প্রধান বিষয়- ফুল। তিনি শাপলা, সূর্যমুখী, জবা, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া, গাঁদা, ডালিয়া এবং আরও অনেক ফুল নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন।
তাঁর মতে, "যখন পৃথিবীতে যুদ্ধ, অশান্তি ও বিভেদের ছায়া ঘনিয়ে আসে, তখন শিল্পে খুঁজে পাওয়া যায় শান্তির আশ্রয়। তাই ফুলকে বেছে নিয়েছি নিজের শিল্পের প্রতীক হিসেবে যা কোমলতা, ভালোবাসা ও সৌন্দর্যের প্রতিরূপ।"
তাঁর তুলির ছোঁয়ায় ফুটে ওঠা ফুলগুলো শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, বরং মানবতার প্রতি তাঁর গভীর বিশ্বাস ও আশার প্রতিচ্ছবি।
শারমিন শিরাজী বলেন, "ফুলের মধ্যেই আছে এক বিকল্প পৃথিবীর ইঙ্গিত, যেখানে রঙে রঙে গড়ে ওঠে সহমর্মিতা, হৃদয়ের সংযোগ এবং এক অনন্ত শান্তির আহ্বান।"
শিল্পী মোহাম্মেদ মাহমুদুল হাসান (রোকন)
(1).jpeg)
মোহাম্মেদ মাহমুদুল হাসান (রোকন) জন্মগ্রহণ করেছিলেন জামালপুরে। ছোটবেলায় থেকেই তাঁর ছবি আঁকার প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল। সেই সময় ছবি আঁকার জন্য যা পাওয়া যেত, তা সীমিত ছিল-একটি সাধারণ পেন্সিল, আর্ট পেপার নামে একটি কাগজ, একটি ছোট্ট ওয়াটার কালার সেট এবং কিছু রঙিন পেন্সিল। তিনি এই সীমিত উপকরণের মধ্যেও তার সৃজনশীলতাকে উজ্জীবিত করেছিলেন।
যতটুকু মনে আছে, একবার তিনি একটি স্কেচ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন, যেখানে তারা তাদের হাতের লেখা চর্চার জন্য খাতায় অঙ্কিত কাজ জমা দিতেন। সেই সময় তিনি অনেক প্রশংসা ও সুনাম অর্জন করেছিলেন।
তিনি এই প্রসঙ্গটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, কারণ শিল্পচর্চা এবং ছবি আঁকার জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ অপরিহার্য বলে মনে করেন মোহাম্মেদ মাহমুদুল হাসান।
তিনি জানান, ১৯৭৬ সালের পরে তাদের চারপাশে এমন পরিবেশ বা উপকরণের প্রচলন ছিল না, আশেপাশের মানুষও খুব বেশি ছবি আঁকার বিষয়ে জানতেন না।যখন কেউ ছবি আঁকত, সবাই হয়তো বলতো, 'ওহ, তুমি তো আর্ট কলেজে ভর্তি হতে পারবে।' এটাই ছিল বিনা মূল্যের উপদেশ। স্কুলগুলোও শিল্পী তৈরি করার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট গাইডলাইন দিতে পারত না। স্কুলে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য ছিল শুধু ভালো ছাত্র হওয়া। ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া ছিল সবার স্বপ্ন।
মোহাম্মেদ মাহমুদুল হাসান বলেন, "সত্যি বলতে, সবাইতো আলাদা কেউ কোনো মেধায় সেরা। আমি কোনো শিক্ষাকে ছোট বা বড় করে দেখিনা; এই পৃথিবীতে সবারই গুরুত্ব আছে।"
তিনি জানান, ছবি আঁকতে তাঁর ভীষণ ভালো লাগত। তিনি অন্য কারো ছবি আঁকা দেখলে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতেন। অনেক সময় হতাশও হতেন। তাদের এলাকার অনেক বড় ভাইদের চিত্রকর্ম দেখে ভাবতেন, 'কেন আমার ছবি ওদের মতো সুন্দর হয় না?'
পরে নিজেই উপলব্ধি করেছিলেন, প্রত্যেকের আলাদা আলাদা স্টাইল আছে। কারো কারো সাথে কারো মিল নেই, প্রতিটি শিল্পীর নিজস্বতা আছে।
মোহাম্মেদ মাহমুদুল হাসান ১৯৯০-৯১ ব্যাচে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে। বাবার স্নেহ-স্মৃতি স্বরণ করে তিনি বলেন, "আব্বা ছিলেন অনেক ভীতু মনের মানুষ। তিনি আমাদের প্রতি ভালোবাসা রাখতেন, আর সেই ভালোবাসার কারণে হয়তো বেশি চিন্তা করতেন, কি খাবো, কিভাবে থাকবো, সন্ধ্যার আগে রুমে ফিরবো কিনা, বেশি আড্ডা দেবো কিনা! "
কিন্তু চারুকলায় এসে তিনি দেখলেন, এখানে বাবা যে নিয়মে তাকে বাঁধতে চেয়েছিলেন, তার উল্টো পরিবেশ। তিনি বাবার ইচ্ছে মাথায় রেখে প্রি-ডিগ্রি শেষ করেন।
অজান্তেই অনেক শিক্ষক তাঁর প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।
একজন বিশেষ প্রিয় শিক্ষককে স্মরণ করে তিনি বলেন, "এই শিক্ষক ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীদের কাজের মূল্যায়ন করতেন। তিনি সুন্দরভাবে সবার কাজের সেরা অংশগুলো তুলে ধরতেন এবং তা ব্যাখ্যা করতেন। এটি ভীষণ ভালো লাগত আমার। এরপর তিনি কাজের দুর্বল দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করতেন, কোথায় আলো ও ছায়া ব্যবহার হয়েছে, ড্রয়িং, পারস্পেকটিভ, রঙের ব্যবহার এবং অন্যান্য নানান দিক।"
মোহাম্মেদ মাহমুদুল হাসান বলেন, "অনেক বন্ধুদের সিনিয়র ও জুনিয়রদের কাজ দেখেও আমি প্রচুর কিছু শিখেছি।"
রাজশাহীতে তারা মাঝেমাঝে আউটডোর ড্রয়িং ও ওয়াটার কালার করার জন্য গ্রামের দিকে যেতেন। গ্রামের মানুষরা তাদের কাজ দেখে বিভিন্ন মন্তব্য করতেন। কেউ বলত, 'ছাপছে মামুর বুটা, এগুলো বিক্রি করবে, টাকা পাবে, আমাদের কি লাভ?' আবার কেউ বলত, 'খাবার পানি দিচ্ছি, তুই কি কষ্টই করছিস।'
গ্রামের মানুষদের মধ্যে অনেকেই কাজের ভিন্নতা নিয়ে হতাশও হতেন। কারণ তাদের সাবজেক্ট সিলেকশন ছিল ভাঙা ও পরিত্যক্ত জায়গা, ঝকঝকে সুন্দর জায়গা নয়। কাজ শেষ করার পর তারা বলত, 'গরিবের ভাঙা বাড়ি ছাপো, এতে কি লাভ?'
১৯৯৩ সালে তিনি ঢাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগে সিরামিকস ডিপার্টমেন্টে বিএফএ ক্লাস শুরু করেন।
মোহাম্মেদ মাহমুদুল হাসান বলেন, "সিরামিকস একটি মজার মাধ্যম হচ্ছে মাটি দিয়ে তৈরি করা, ড্রয়িং ঠিক করা, নিজের মতো করে জিনিস তৈরি করা এবং তা গ্লেজ ব্যবহার করে ফায়ারিং করে আরও সুন্দর রূপে উপস্থাপন করা। প্রথমে মনে হতো সিরামিকস কেবল হাড়ি-পাতিল তৈরির মাধ্যম, কিন্তু পরে বুঝতে পারি, এটি পুরোপুরি এক ধরনের রসায়ন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ফাইনাল প্রোডাক্ট তৈরি করা হয়। যদি কারো ক্লাসের বাইরে ছোটখাটো স্টুডিও থাকে, তবে সিরামিকস দিয়ে তেরাকোটা থেকে মডার্ন ভাস্কর্য পর্যন্ত শিল্পী তার স্বপ্নের রূপ দিতে পারে।"
শিল্পীরা নানান মাধ্যম দিয়ে শিল্পকর্ম করতে পছন্দ করে, তিনিও তাই করেন। তিনি চারুকলা বার্ষিক প্রদর্শনীতে সবসময় অংশগ্রহণ করেছেন। ক্লাসের কাজও বিক্রি হতো প্রদর্শনীতে। বিভিন্ন কাজ দেখার সুযোগ হতো আর প্রতিযোগিতার আগ্রহ বেড়ে যেত। পাশাপাশি সারা বাংলাদেশ থেকে ইয়ং আর্টিস্ট প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণের সুযোগও হতো।
তাঁর কাজ ছিল ভাস্কর্য, মেটাল দিয়ে তৈরি। জাতীয় পর্যায়ের শিল্পীদের প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। সিরামিকস, ভাস্কর্য, ওয়াটার কালার এবং বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন। মাস্টার্স ক্লাস শুরু হলো, চেষ্টা করছিলেন দেশের বাইরে পড়াশোনা করার। ১৯৯৯ সালে নিউ ইয়র্কে ভাস্কর্যে মাস্টার্স করতে পেরেছিলেন। দেশে থাকাকালীন চারুকলার ক্লাসের বাইরে পার্টটাইম কাজ করেছেন।
মোহাম্মেদ মাহমুদুল হাসান বলেন, "উন্নত দেশ মানে মাথায় ছিল অনেক আশা। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই আলাদা। বিদেশি ছাত্র হিসেবে কাজের অনেক সীমাবদ্ধতা ছিল। শুধু ক্যাম্পাসের ভিতর ২০ ঘণ্টা/সপ্তাহ কাজের অনুমতি ছিল। সেমিস্টার খরচ অনেক বেশি, কাজ করে খরচ সামলানো প্রায় অসম্ভব।"
তিনি জানান, নিউ ইয়র্কে থাকাকালীন, দ্য ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার-এ ৯/১১ ঘটনার সময় তিনি ক্লাসে ছিলেন। নিজের চোখে দ্বিতীয় বিমানটি হিট করতে দেখেছিলেন। সমস্ত বিল্ডিং ধসে পড়া দেখে সাত ঘণ্টা হেঁটে ব্রুকলিন ফিরেছিলেন। এরপর থেকে বিদেশি ছাত্রদের অতিরিক্ত নজরদারি শুরু হলো। স্টুডেন্ট স্ট্যাটাস ঠিক রাখা বাধ্যতামূলক হয়ে গেল।
কাগজপত্র ঠিক রাখার জন্য বিভিন্ন কম্পিউটার কোর্স, গ্রাফিক ডিজাইন ও ওয়েব ডিজাইন ডিপ্লোমা সম্পন্ন করতে হয়েছে তাকে। পাশাপাশি নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। ২০০৫ থেকে ২০১০ দ্য আর্ট স্টুডেন্টস লিগ অফ নিউ ইয়র্ক-এ স্টুডেন্ট থেকে মিক্স মিডিয়াতে কাজের অনেক কিছু শিখেছেন।
মোহাম্মেদ মাহমুদুল হাসান বলেন, "এখানেই শিখেছি, যে কোনো জিনিস দিয়ে শিল্পকর্ম তৈরি করা সম্ভব।"
তিনি শিক্ষকের মাধ্যমে শিখতে পেরেছিলেন, শিল্পকর্ম তৈরি হলে মাধ্যম নষ্ট হলেও তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। মূল কথা হলো, কোনো মেটেরিয়ালের সাথে কম্প্রোমাইজ না করা। প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব গ্যালারিতে প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন তিনি। ম্যানহাটানের চেলসি আর্ট মিউজিয়াম-এ একটি গ্রুপ শোতে অংশ নেওয়া হয়েছিল, যেখানে কাজগুলোর নিলাম হয়েছিল। তার কাজ ২০০৯ সালে ১২০০ ডলার-এ নিলামে উঠেছিল। সারাবছর বিভিন্ন শোতে অংশগ্রহণ করেছেন, গ্রুপ শো, দুইজনের শো, তিনজনের শো, নন-প্রফিট অর্গানাইজেশনের প্রদর্শনী, ব্রুকলিন, কুইন্স, ম্যানহাটান, লাইব্রেরি ও গ্যালারিতে। বাংলাদেশী এম্বাসির মাধ্যমে ওয়াশিংটনে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন। নিউ ইয়র্ক কনসুলেট জেনারেল আর্ট ওয়ার্কশপের মাধ্যমে কাজ সংগ্রহে রেখেছে। ইন্ডিয়ান কনসুলেটের আয়োজনে প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেছেন।
বাংলাদেশী-আমেরিকান আর্টিস্ট ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। ফোরামের সিরামিকস ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেছেন।
তাঁর কাজের মাধ্যম- অ্যাক্রেলিক মিক্সমিডিয়া ক্যানভাস। সার্কেল নিয়ে কাজ করেছেন তিনি। তার মতে, মানুষের সাফল্য ও ব্যর্থতা শুরু হয় বিন্দু থেকে। এই বিন্দু ঘুরে সাফল্যের চরম এক জায়গায় আটকে থাকে, আবার ফিরে আসে। তার সার্কেলের রঙ এবং তুলির লাইন সেটির প্রতিফলন। স্বপ্নও ঘুরে থাকে এবং নতুন স্বপ্ন জমে, দ্বিগুণ হয়ে আবার ঘুরতে থাকে।
অনেক সময় গতিও দেখিয়েছেন। রঙের লাইন থেকে ঝরে যাওয়া রঙ আবার অন্য রঙের সাথে মিলিত হয়ে আলাদা ফর্ম তৈরি করে।
তিনি জানান, বিমূর্ত কাজ করতে ভালো লাগে তাঁর। কাজের ভিতরে অনেক গল্প থাকে, আবার কিছু না বলা গল্পও থাকে, যা দর্শক নিজের মতো করে উপলব্ধি করে। ওয়াটার কালারে পেপারে এক্সপেরিমেন্টাল কাজ করেছেন। মাঝে মাঝে ক্যানভাসে রঙ দিয়ে ড্রয়িং করেছেন, উপরে আবার রঙ ব্যবহার করেছেন, ড্রয়িংয়ের নীচের অংশ ঘসে ঘসে তুলে বিমূর্ত কম্পোজিশন তৈরি করেছেন।
এখন সিরামিকসের কাজ আর করেন না মোহাম্মেদ মাহমুদুল হাসান। নিউ ইয়র্কে স্থানের সীমাবদ্ধতা, আর্টিস্ট হিসেবে চ্যালেঞ্জ হলেও, তিনি মনে করেন শিল্পীরা সব পরিবেশের সাথে মিলেমিশে নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো সুন্দর জায়গা তৈরি করতে পারে।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন