https://www.prothomalony.com/

15269

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৫ ০২:৪২

তোমার এক মুঠো স্বর  

তমিজ উদ্‌দীন লোদী

 

প্রেম তোমাকে সচল করেছিল এক সুবর্ণ  স্বর্ণঘড়ির মতো।

তোমার কৌতূহল ছিল তুঙ্গস্পর্শী, যেন আমি আশ্চর্য পুরুষ 

কখনো তুমি বিষাদে, ভেসে যেতে অরব কান্নায় 

মেঘের আড়াল থেকে চুপিসারে নেমে আসা বৃষ্টির মতো। 

 

আমি তোমার মতো নই—

তা যেমন নয় সেই মেঘ, যে বিন্দু বিন্দু জলে তৈরি করে 

এক দর্পণ

যাতে প্রতিফলিত হয় তার নিজেরই ধীর মিলিয়ে যাওয়া বাতাসের হাতে।

 

তবু সারা রাত তোমার প্রজাপতি-শ্বাস

মিটমিট করে সমতল গোলাপী গোলাপগুলোর মাঝে। 

আমি জেগে উঠে শুনি

এক দূরবর্তী সমুদ্র চলছে আমার কানে।

 

এই অরব কান্না, আমি স্বপ্নের বিছানা থেকে হুমড়ি খাই, 

আমার অজান্তে লাভ-ডব দ্রুততর হয় 

প্রতিরোধের বিপরীতে কী এক সিম্ফনি জেগে ওঠে 

তোমার অবয়ব ভেসে যায় এক বিড়ালের মত নির্মল। 

 

জানালার সাঁটার 

শাদা হয়ে যায় আর গিলে ফেলে তার নিষ্প্রভ তারাগুলো। 

তোমার এক মুঠো স্বর

স্বরবর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ উঠে যায় বেলুনের মতো।

 

আমরা দাঁড়িয়ে থাকি নির্বোধভাবে আকাশের নিচে, প্রাচীরের মতো।

 

 

উত্তরাধুনিক অসুখ- ০১

আশরাফ হাসান 

 

রাত্রিবেশ্যার মতো বেদনান্ত অসুখের কফিস্নানে পুড়ে যায় আঙ্গুল। উতরানো জাহান্নাম উড়ছে ধুম্রজোসনার আকাশে। প্রান্তিক ক্ষেতে আফিম চাষমগ্ন উত্তরাধুনিক ইসাবেলা। 

পৃথিবীর মৃগনাভিতে ঢালে আখেরি সূর্যের সন্তাপ l

 

নীল চাষিদের জবরদখলকৃত জমিন উত্তপ্ত হয় 

'ফ্রিডম অব স্পিচ'র বোমাবর্ষণে। 

সাকরাতের বিছানায় শুয়ে থাকে পঞ্চ-ইন্দ্রিয়l

দেহতত্ত্ব মরুভুমির বালিতে মুখ গুঁজে নিঃশ্বাস নেয়l 

 

দুনিয়া-ধ্যান সারি সারি পুড়ে যাওয়া কাশফুলl

শরতসন্ধ্যা আগুনের চাদর গায়ে ঘুমোতে যায়l

 

 

 

সময়াবর্তের চিঠি  

সুমন শামসুদ্দিন

 

দিগন্তরেখা অপেক্ষমান দিনের শেষার্ধে,

তোমার শব্দেরা কি চিঠির পাখায় ভেসে-

রঙ ছড়াবে না আজ ভীরু বাতাসে?

 

অথবা তোমার কলমের নীব-

ভেঙে কি গেছে? অজানা ভুলের

কোনো সকরুণ আঘাতে?

 

খোলাচোখে আমি অপলক ভেজা দিনে

মেঘ থেকে চেয়ে নিয়েছি বহমান জল!

 

চিঠি লেখার দিনগুলো আজ-

সাদাকালো দিনচিত্রে মানসপটে অঙ্কিত!

স্মৃতিবেদনাতুর সুরে কেঁদে ওঠে

ডাকপিয়নের পুরোনো ঘণ্টাধ্বনি!

 

আমার কলমখানি কি মনে পড়ে কখনও?

তোমার গোলাপি কাগজগুলো আজ

আমার নির্জন নিজস্বকক্ষে সময়াবর্তের ঘোরে

ঘন নীল চাহনির ছায়াছবিতে আবদ্ধ!

 

সারিবদ্ধ শব্দগুচ্ছ নিভৃত কুচকাওয়াজে

অধরা অনাদরে ক্রমাগত আত্মঘাতী!

লাল ডাকবাক্স দৃষ্টিগোচর হয় না এখন,

ডাকটিকেটের ভীড় জমেছে আজ

ব‍্যক্তিগত প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহখাতায়।

 

পত্রপাঠে কি চিরকুটের স্মৃতিভ্রম হলো?

আমি তবুও চিঠি লিখি এখনও-

প্রকৃতির পরিত্যক্ত ধুসর পাতায়!

 

 

 

স্বপ্নহীন মুখ 

রুদ্র সাহাদাৎ 

 

ঘুমের ভিতর ঘুমহীন চোখ 

স্বপ্নের ভিতর স্বপ্নহীন মুখ 

ঘুম নেই স্বপ্ন নেই 

আশাহীন ভালোবাসাহীন বেঁচে থাকা মানুষ 

দেখি রাখাইন পাড়ায় উড়ে রঙিন ফানুষ 

 

দলে দলে হাসে লোক 

নৈঃশব্দ্যে প্রস্থানে সুখ 

কানে বাজে জোয়ার ভাড়ার ঢেউ 

বুঝে না কোনোকালে কেউ 

বোবা হয়ে রই 

 

কখন কী করছি খোদা জানে 

আকস্মিক দৃশ্যপট ভিন্ন থেকে ভিন্নতর

যুগে যুগে এই হরিকেল পথ ধরেই হাঁটছি অনন্তকা

 

 

 

অবচেতন কষ্ট  

জেবুন্নেছা জোৎস্না 

 

মায়াবর্তে— অবচেতনে যখন 

শরীরের সাথে আত্মার সংযোগ ঘটে — 

কদাচিৎ সেখানে আমার সাথে তার হয় দেখা।

পিউপিল অক্ষিগোলকে, গ্রহাণুরা নিজের আর্বতে

আমি হিপনোসের ডানায় গভীর ঘুমে —তবু

ফেরার নিয়মে ফেরারী হয়েছি আপন অন্দরে 

 

তার আয়ত চোখের সিঁড়ি, ঝাঁকুড়া চুল 

আমার খোয়াবনামায় যেন প্রগলভ সরীসৃপ —

ধীরে ধীরে অতি ধীরে ত্বকের গভীরে শোরগোলে—

দেহজ সমুদ্র স্নানে— ঝড় শেষে নৌকো ফেলে 

ফিরে গ‍্যাছে নদী একা

 

ক্ষিপ্রগতির বাদামী ঘোড়ার সহিস জিনে —

সাহস রাখিনি তাকাতে আমার চোখে —

নিঃশ্বাসে মিলাইনি দম, ছুঁড়েছে কেবল শূন্যতায়

পাঁজরের খাঁচায় দূর্ভেদ‍্য কষ্টে

যেন থ‍্যনাটোস ছুটছে—

এক প্রস্থ কাপড়ের ব‍্যবধানে 

শরীরের মাংসপিন্ডের আড়ালে 

নিরাকার আত্মার অস্তিত্বে— মুক্তির আশায়

 

সে আমায় কষ্ট দেয় 

জাগরণে নয়, অবচেতন শরীরে। 

 

 

 

ব্লাকবোর্ডের সাদা অক্ষর  

মাসুম আহমদ

 

তোমার শাসন মানি না বলে 

তুমি বুঝতে চাওনি, 

রাজপথ

মিছিল

বিদ্রোহ 

ভাষণ 

রাজনীতির ছলাকলা 

জয় পরাজয়

অথবা বেদখল হওয়া আমার রাষ্ট্র! 

 

ঈগল পাখির মতো তোমার জন্যে

একশ ফুট উপরে ঘর বাঁধার যে নকশা আঁকতাম 

সে নকশা ডায়েরির শেষ পাতায় গেঁথে

আমি যখন হাওয়ার সাথে মিশে যাচ্ছিলাম 

তখন দেখলাম পর্দায় ভেসে উঠছে 

বিদায়বেলায় কিভাবে চুম্বন অসমাপ্ত থেকে যায়। 

 

আমি জানি লুকিয়ে লুকিয়ে কান্নার শব্দে 

জেগে উঠবে হাজার বছরের ঘুমন্ত সাম্রাজ্য, 

অথচ তুমি আর ফিরবে না 

তোমার শাসন 

তোমার রাজনীতি 

আমার রাষ্ট্র 

ব্লাকবোর্ডর সাদা অক্ষরের মতো করে মুছে যাবে। 

 

 

 

ভুল নামতার ধারাপাত

ফারহানা খান

 

কিছু টুকিটাকি শব্দ আর

এলোমেলো কথার ভিড়ে,  

বিস্মৃতির পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে যায় 

রঙবেরঙের রঙিন কোলাজ।

কিছু বৃষ্টি গ্রহণ করেছিলাম তোমার জন্য-

শ্যাওলাজমা কালো ছাদে

ভিজতে থাকা ঝাপসা বর্ণমালা,

জলতরঙ্গে চেনা বৃষ্টির সুর,

শুদ্ধ, কোমল সুরে বাজতে থাকা  

তোমার-আমার একলা সরগম,  

ঝমঝমিয়ে বাজতে থাকা  

মেঘ-বৃষ্টির ভুল নামতার ধারাপাত; 

রেখেছিলাম- শুধু তোমার জন্য। 

 

 

 

শিরদাঁড়া

আহাম্মদ উল্লাহ  

 

শিরদাঁড়ায় শিশির জমেছে,

গ্রীষ্মে ছিল মোটা আস্তরণে ধুলি।

হাঁটাচলা নাই- ওরোবোরাস। 

 

শিরদাঁড়া,

ভাঁজকরা। 

রেখে দিলো সে আলমারিতে। 

এই তো বেশ-

মস্তিষ্কের ব্যবহার নেই বিশেষ। 

শুয়ে যায় সে ভূমির কোলে

রাজা যায় পুণ্যের পা ফেলে।

 

 

 

নীলকন্ঠ 

শেখ মোমতাজুল করিম শিপলু 

 

নীলকন্ঠ তার বিষণ্ণতা-ভেঙে গেলো জোড়,

আলোর পথ না দেখে ধরা নিশির মতো ভোর।

 

উড়ন্ত মন দুরন্ত ক্ষণ- ক্রন্দনের ই ডাক,

নয়ন ঝরা বিহঙ্গ স্বর শিকলবন্দী পাখ।

 

প্রবল স্রোতের ধার বায় মাল্লা-কিনার নাহি পায়,

করুণ সুরের ধ্বনি বাজে নিকট মৃত্যু ধায়।

 

 বৃত্ত মাঝে আটকে আছে-এক সমুদ্র সুখ, 

শব্দবিহীন লৌহ কপাট পর্বত সম দুখ।

 

নীল রঙে এই ধরণীতল-ছেয়ে গেছে বিষ,

নীলকন্ঠরা নীল পবনে দোলায় ব্যথার শীষ।

 

 

প্রজ্ঞার প্রতিনাম-সংশয়িত আর্তি

এইচ বি রিতা

 

আমার এই অপ্রাকৃত দ্বিধা-ফ্ল্যাশিং নিউট্রিনোর মতন,

ঈশ্বরের অকস্মাৎ সংকেতে স্বীকৃত, কখনো প্রত্যাখ্যাত।

বিশ্বাস নয় কোনো সুসংজ্ঞায়িত উপপাদ্য-যা কেবলই প্রমাণের অপেক্ষা রাখে,

বরং সে এক আদি-অজ্ঞেয়বাদীর লুপ, অস্তিত্বের ডেল্টা-আলোয় ঘূর্ণায়মান।

 

তাঁর অলৌকিক নীরবতা আনে অনাদি গ্রহাণুর ছায়া

প্রতিহত করে ধ্যানলব্ধ চেতনার টেলিস্কোপীয় দর্শন।

খুব জানি, আমি নই সেই অবিচল পিরামিড, যা নিছকই

স্থায়িত্বের ম্যাক্রো-অ্যাক্সিওমে লিখে রাখে-

অবিনশ্বরতার মিথ 

তবু তাঁর অদৃশ্য স্পর্শের কম্পন এক হাইপারস্পেসের জ্যামিতিক রেখা,

জ্বলে ওঠে মনের প্যারাডক্সিক্যাল ডোম-এ। 

 

আমি কোলাহলের আড়ালে শুনি অন্ধকারের সিনথেটিক মন্ত্র-অণুর আবর্তন ভেঙে চলে আমার আস্থার প্রোটোকল।

 

এই ঐশ্বরিক হাহাকারে আমি যুক্তিবাদের ডায়াগ্রাম 

থেকে বিচ্যুত,

আত্মা তখন এনট্রপির ভুল-সমীকরণে দ্রুততর।

অবিশ্বাসের প্রান্তে জেগে ওঠে কী এক গাণিতিক 

ছন্দপতন, তাঁর অবয়ব ভাসে- 

শাশ্বত জিজ্ঞাসা ও অনির্ণেয় ধ্রুবক।

 

বাইরের আকাশ থেকে এখন সময়-বহির্ভূত রেটিনা 

নেমে আসে, যেন মুছে দেয় মহাকর্ষের সূত্র থেকে 

লেখা প্রথম সংশয়ের শেষতম চিহ্ন।

আর তোমার এক গুপ্ত সংহিতা-অর্থ ও তাৎপর্য ছিন্ন 

করে, এক অরূপ প্রতিধ্বনি হয়ে দূরে মেশে।

 

আমরা বিলীন হয়ে যাই, নৈর্ব্যক্তিক শূন্যতার ফোঁটা-

এক আণবিক ধূলিকণা,

অসীমতার সমান্তরালে, এক অসমর্থিত নীরবতারূপে।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন