https://www.prothomalony.com/

15240

bangladesh

বাংলাদেশ

বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ—সমস্যা ও সম্ভাবনা

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৫ ০৫:২৭

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ। নদীমাতৃক ভূখণ্ড, পাহাড়-পর্বত, সমুদ্রসৈকত, সবুজ বনানী, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে এটি একটি পর্যটন সম্ভাবনাময় দেশ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এই সম্ভাবনা আজও যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা কিংবা নেপালে ছুটে যায়; অথচ বাংলাদেশের কক্সবাজার, সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন, সিলেট বা পাহাড়ি অঞ্চলগুলো পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক মনোযোগ পায় না। প্রশ্ন হচ্ছে—কেন আমরা পারছি না পর্যটনকে অর্থনীতির শক্তিশালী খাতে পরিণত করতে?

প্রথমত, আমাদের অবকাঠামোগত দুর্বলতা একটি বড় বাধা। পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য সড়ক যোগাযোগ, নিরাপদ পরিবহন, মানসম্মত হোটেল, তথ্যকেন্দ্র, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা অপরিহার্য। কিন্তু দেশের অধিকাংশ পর্যটন এলাকায় যাওয়ার রাস্তা এখনো সংকীর্ণ, অনিরাপদ এবং অপরিকল্পিত। কক্সবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রেও যানজট, পানি সংকট, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দখলদারিত্ব বড় সমস্যা। সিলেট বা বান্দরবানের মতো পাহাড়ি অঞ্চলেও পর্যাপ্ত হোটেল বা রিসোর্ট নেই, যেগুলো আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে। ফলে স্থানীয় পর্যটক ছাড়া বিদেশিরা তেমন ভরসা পান না।

দ্বিতীয়ত, পর্যটন বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা এখনো পেশাদার নয়। সরকার ও বেসরকারি খাতে অনেক প্রকল্প নেয়া হয়, কিন্তু সেগুলোর বাস্তবায়ন পর্যায়েই গলদ দেখা যায়। অনেক জায়গায় ‘ইকো ট্যুরিজম’ বা ‘কালচারাল ট্যুরিজম’ ধারণা তুলে ধরা হলেও পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতির সুরক্ষা নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না। আমাদের পর্যটন খাত এখনো ‘সিজনাল বিজনেস’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ, যেখানে স্থায়ী কর্মসংস্থান বা দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব আয়ের দিকটি অবহেলিত।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা পর্যটন শিল্পের বড় প্রতিবন্ধকতা। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারী বা পর্যটক—কেউই আগ্রহী হয় না। নির্বাচনকালীন সহিংসতা, অবরোধ, হরতাল, কিংবা হঠাৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি দেশের ইমেজকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিদেশি মিডিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতার খবর প্রকাশ হলে পর্যটকরা স্বাভাবিকভাবেই নিরাপদ বিকল্প খুঁজে নেয়। অথচ পর্যটন এমন একটি খাত, যা স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ছাড়া কখনো টেকসইভাবে বেড়ে উঠতে পারে না।

চতুর্থত, নিরাপত্তা ও আচরণগত সমস্যা পর্যটন বিকাশে বড় প্রতিবন্ধকতা। বিদেশি পর্যটকরা অনেক সময় হয়রানির শিকার হন, উপযুক্ত তথ্য না পাওয়ায় বিভ্রান্ত হন। পর্যটন এলাকাগুলোতে প্রশিক্ষিত গাইড, ইংরেজি ভাষাজ্ঞানসম্পন্ন কর্মী বা তথ্যকেন্দ্রের অভাব স্পষ্ট। তাছাড়া, অনেক সময় স্থানীয়দের আচরণ বা আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা পর্যটকদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করে। একটি দেশের ইমেজ গঠনে পর্যটকদের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

পঞ্চমত, আমরা এখনো পর্যটন প্রচারণায় পিছিয়ে আছি। বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারে উপস্থাপন করার মতো কার্যকর ব্র্যান্ডিং নেই। বিমানবন্দর, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা বিদেশি সংবাদমাধ্যমে আমাদের পর্যটন নিয়ে কোনো ধারাবাহিক প্রচার দেখা যায় না। নেপাল ‘বিউটিফুল নেপাল’, মালয়েশিয়া ‘ট্রুলি এশিয়া’, শ্রীলঙ্কা ‘ওয়ান্ডার অব এশিয়া’—এই স্লোগানগুলো বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো কোনো একক, প্রভাবশালী পর্যটন ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারেনি।

তবে সবকিছুই নেতিবাচক নয়। বাংলাদেশে পর্যটনের সম্ভাবনা অপরিসীম। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পাহাড়বেষ্টিত পার্বত্য চট্টগ্রাম, চা-বাগানের নগরী সিলেট, প্রাচীন নগরগুচ্ছ মহাস্থানগড়, ময়নামতি কিংবা গৌড়—এসব স্থান বিশ্বমানের পর্যটন আকর্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে ইকো ট্যুরিজম, কালচারাল ট্যুরিজম, রিলিজিয়াস ট্যুরিজম ও মেডিকেল ট্যুরিজমে বাংলাদেশ নিজের জায়গা তৈরি করতে পারে। সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বা কাপ্তাই হ্রদকে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনায় উন্নয়ন করলে আন্তর্জাতিক ক্রুজ পর্যটনও সম্ভব।

সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটন খাতে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় নতুন নীতিমালা গ্রহণ করেছে, ‘ডেল্টা প্ল্যান’ ও ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ উদ্যোগেও পর্যটনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যেমন নতুন হোটেল নির্মাণ, ওয়েবসাইট উন্নয়ন, পর্যটন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট চালু ইত্যাদি। তবে এসব উদ্যোগ এখনো সীমিত পরিসরে আছে; সার্বিক রূপ দিতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত ও আন্তঃমন্ত্রণালয় পরিকল্পনা।

এখন সময় এসেছে পর্যটনকে শুধুমাত্র অবসর বা আনন্দের খাত হিসেবে না দেখে একটি অর্থনৈতিক শিল্প হিসেবে দেখার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো তাদের জিডিপির বড় অংশ পর্যটন থেকে অর্জন করছে। বাংলাদেশেও যদি বছরে কেবল ১০ লাখ বিদেশি পর্যটককে আকর্ষণ করা যায়, তবে তা থেকে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব অর্জন সম্ভব। এর সঙ্গে যুক্ত হবে স্থানীয় পণ্যের বিক্রি, কারুশিল্পের প্রসার, কৃষিপণ্য সরবরাহ, রেস্তোরাঁ ব্যবসা, পরিবহন, এমনকি তথ্যপ্রযুক্তি খাতও। অর্থাৎ পর্যটন হতে পারে সার্বিক অর্থনৈতিক চক্রের চালিকা শক্তি।

একইসঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো জায়গার উন্নয়ন যেন তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে পরিকল্পনার শুরু থেকেই। স্থানীয় মানুষকে পর্যটন ব্যবসার অংশীদার করতে হবে, যাতে তারা নিজেদের সংস্কৃতি, খাবার, সংগীত বা হস্তশিল্প দিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারে।

বাংলাদেশের পর্যটন খাত এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে সীমাহীন সম্ভাবনা, অন্যদিকে বাস্তব সমস্যা। আমরা যদি অবকাঠামো উন্নয়ন, সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও প্রচারণা জোরদার করতে পারি, তবে বাংলাদেশও দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে। এই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বিশ্বমানের নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

অতএব, পর্যটন শিল্পের বিকাশ শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; বেসরকারি খাত, উদ্যোক্তা, মিডিয়া এবং নাগরিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। দেশপ্রেমের এক বাস্তব প্রকাশ হতে পারে—নিজ দেশকে বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করা, তার সৌন্দর্যকে পরিচিত করানো। বাংলাদেশের নদী, পাহাড়, মানুষ ও সংস্কৃতি—সবই এক অনন্য গল্প। এই গল্পটা আমাদেরই বলতে হবে, বিশ্বাস নিয়ে, পরিকল্পনা নিয়ে, ভবিষ্যতের আশায়।

বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন