https://www.prothomalony.com/

15008

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৫ ০৮:৩১

সময়ের কথা

রেজাউল করিম

 

আমি সেই কথা বলব,
যা সময়ের গভীরে খোদাই হয়ে আছে।
আমি সেই ধ্বনি শুনতে চাই,
যা শতাব্দীর পর শতাব্দী মাটির বুক থেকে উঠে আসে।

নদীর স্রোতে ভেসে আসে যে গান,
তার প্রতিটি সুরে লুকিয়ে আছে অদৃশ্য ইতিহাস।
ঝড়ো হাওয়ায় ভাঙা বৃক্ষও,
ফিসফিস করে বলে এক অদম্য কাহিনি।

রাতের আঁধারে যে স্বপ্ন ভেঙে যায়,
তারও আছে অমলিন স্মৃতি।
রক্তাক্ত ভোরে যে সূর্য ওঠে,
তাতেও জ্বলে অটল প্রতিজ্ঞার দীপ্তি।

মানুষ আসে, মানুষ যায়-
কিন্তু অদেখা এক স্রোত বয়ে চলে চিরন্তন।
সে স্রোতে মিশে থাকে অশ্রু ও হাসি,
হারানোর বেদনা আর জয়ের উল্লাস।

আমি সেই কথা বলব,
যা ভাঙা প্রার্থনাগৃহের ইটের মাঝে বাজে,
যা জীর্ণ পাণ্ডুলিপির অক্ষরে ঝরে পড়ে,
যা নতুন প্রজন্মের চোখে আবার দীপ্ত হয়।

 

 

নিঃশব্দ স্রোতের শয্যা

শেখর ভট্টাচার্য

 

মৌনতার অসাধারণ রঙে ভরা এক ত্রিসন্ধ্যায়,

বিস্ময় জাগিয়ে, জোনাকির পিঠে ভর করে তুমি এলে।

কী জানি এক ঘোরের ভেতর ডুবিয়ে দিলে, ভ্রম কিংবা স্বপ্ন,

কাসার থালায় প্রতিফলিত সূর্যের চোখ যেনো ভয় দেখালো

মোমের ডানায় ভর করে, লু হাওয়ায় যাচ্ছি গলে

পাগল পারা নিঃশব্দ দ্যোতনায়।

 

ভ্রম কিংবা স্বপ্ন যদি জীবন হতো, মেঘ কালো চুলের গন্ধ

শুকে শুকে, মেঘালয়ের মেঘ কুঠুরিতে দূর পাহাড়ের গান শুনে, ধ্বনি, আর প্রতিধ্বনির আকুল সুরে, কাটিয়ে দিতাম,

আমি কাটিয়ে দিতাম স্বপ্নের কোলাহলে

অনন্ত রঙিন, এক ভ্রমের জীবন। 

 

কী অদম্য বাতাসের অর্কেস্ট্রা,

ঝি ঝি ডাকা শুন্য দুপুর, হাওয়ার সুরে লেখা কবিতার

মায়াময় রঙধণু রাত,

অনন্ত, অদ্ভুত স্বপ্ন রঙের জীবন, পৃথিবীর কোলের ওপর

ভ্রম কিংবা স্বপ্নে যাপন করেছে জীবন অ্যাডাম আর ইভ?

নদীর মতো উড়ে যাওয়া আঁচলের বাঁকে বাঁকে

ডিঙি নাও হয়ে মিশে যেতে চাই গলুইয়ের আষ্টেপৃষ্ঠে,

ভ্রম চাই, স্বপ্ন চাই, তোমাকেও চাই, শেকল পরানো দরোজার ভেতরে, যেখানে ভালোবাসা খেলা করে 

নিঃশব্দ স্রোতের শয্যায়।

 

 

 

আমাদের ভালোবাসার দৌড়

খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন

 

দুরারোগ্য এক বৈরিতা

শনাক্ত হল শেষে 

আমাদের সম্পর্কে!

আদি নারীপুরুষ সম্পর্ক নিয়ে

ছিলাম তো এ যাবত জম্পেশ!

প্রযুক্তির কল্যাণে আধুনিক হয়েছি,

তাই এখন আমরা অবস্থান করছি

সামাজিক ইন্দ্রজালে!

 

বিপত্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে শেষে,

আমরা আক্রান্ত হয়েছি

অন্য এক আধিভৌতিক ভাইরাসে!

তো কী ছিল ভুল আমাদের?

ভুল আবার কী? সবই ঠিক আছে।

এখন সময় কাটানো শুধু। এই তো।

দেখা যাক, এই প্রেমের দৌড় কতদূর!

 

জৈবনিক সমীকরণে আমরা একে অপরকে

পিছনে ফেলে, দম নিয়ে ভার্চুয়ালি

সামনে এসে বলি, দেখ, আমি প্রথম!

আর পিছন থেকে অন্যজন বলে উঠি,

ভালো! তুমি জয়ী তো, আমিও জয়ী!

 

 

অস্থায়ী জীবন স্থায়ী বাসনা

আ ই না ল  হ ক  
 

যার ঘর নেই তার সত্যিই কি থাকার খুব অভাব?
এই যেমন ধরুন পাখি; বাসস্থানের অনিশ্চয়তা তাকে
কতখানি নির্ঘুম রাখে? কিংবা যদি প্রজাপতির কথা বলি
নির্ভাবনায় এবং বোধ করি মহানন্দে পার করে বসন্ত
আত্মতৃপ্তির প্রশ্নে বাঁধভাঙা দিনযাপন বড্ড প্রয়োজন 
কেবলমাত্র আশরাফুল মাখলুকাত স্থায়ী বাসস্থানের 
তীব্র আকাঙ্ক্ষায় জীবনকে দূর্বিষহ করে তুলে
অস্থায়ী জীবনে স্থায়ী হবার বাসনা শাস্ত্র বিরুদ্ধ নয় কি? 

 

 

ইচ্ছার-ইচ্ছে

হাফিজুর রহমান

 

ভদ্র পরিবেশের যেখানে দাঁড়ালাম

এখানে ঠিক অভদ্রতা মানায় না।

কথাবার্তায় সর্বোচ্চ শালীনতা রাখা,

মার্জিত আচরণের আছে আবেদন

যেখানে চোখে-চোখ রাখাও ঠিক নয়;

সেখানেই আমার ভীষণ ইচ্ছে করে

একটুখানি তোমাকে ছুয়ে দেখতে, 

উপেক্ষা করে ভদ্রতার সকল বলয়!

 

উদ্বেলিত হয়ে সাড়া দেবে?

নাকি অকালেই ঝরে যাবে ইচ্ছে, 

নিয়ে যাবে অপ্রাপ্তির উন্মুক্ত দীর্ঘশ্বাস? 

ইচ্ছার ইচ্ছে নেই, অ-পরিপূর্ণ থাকার।

 

 

 

পৃথিবী হাঁটে চোখের উপর

পঙ্কজ শীল 

 

পৃথিবী হাঁটে চোখের উপর

অলস সূর্য মুছতে থাকে অন্ধকার,

চোখের ভেতর বৃষ্টির শব্দ,

হৃদয়ের ভাঙ্গা টুকরো আস্তে আস্তে গড়ে উঠে।

 

দূর থেকে কোনো অচেনা জাহাজের পাল

হাওয়ার সুরে ভেসে আসে,

যেন ইতিহাসের নীরব এক পৃষ্ঠা

ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যায় সময়ের পাতায়।

 

চোখের কোণে জমে থাকা মেঘের স্রোত

দুঃখের নদীতে হারিয়ে যায়,

অতীতের স্মৃতি কোথায় হারিয়ে গেল?

অথবা এই মুহূর্তটিই কি কিছু ছিল?

 

পৃথিবী হাঁটে চোখের উপর,

কিছু না বলেই সব বুঝে যায়,

প্রকৃতির রঙে রাঙা এক অন্ধকার,

যেখানে আলো শুধুই একটি ভুলের খোঁজ।

 

আকাশে কিছুর ছবি আঁকতে চায়,

তবে ক্যানভাসে অমলিন থাকে চোখের আলো,

গন্তব্যহীন সেই পথের শেষে

পৃথিবী হাঁটে, শুধু হাঁটে, শুধু হাঁটে...

 

 

 

 

সাকিনা বেওয়া

দেবব্রত সিংহ

 

দুই

সকালটা ভালোই কাটে সাকিনা বেওয়ার। ইস্টিশানের লাইনপারের বাজারে রাস্তার ধারে শাকপাত বেচে দিনের শুরুটা বাস্তবিক ভালোই কাটে তার। তাকে সবাই ভালোও বাসে। আসলে তার বয়সি আর কাউকে এমন করে রাস্তার ধারে বসে সবজি বেচতে দেখা যায় না। এখনও এই বয়সে যা খাটাখাটুনি করে সাকিনা তা দেখে সবারই খুব অবাক লাগে। শুধু সবজিওয়ালারা নয়, বাবুরাও তাকে ভালোবাসে। সবাই জানে সাকিনা বেওয়ার কাছে গেলে কম দরে যে জিনিসটা পাওয়া যায় সেটা আর কারো কাছে মিলবে না। দাম দর সে খুব অল্পই রাখে। কী হবে বেশিদাম নিয়ে। তার একার পেট কোনো মতনে চলে গেলেই হল। এসব কারণে বাবুরা এত ভিড় করে তার কাছে। কেউ কেউ আবার ভালোবেসে জানতেও চায়---'কেমন আছো' 'ভালো আছো তো' ইত্যাদি। কেউ আবার দু-দণ্ড গপ্পোও করে যায়।

 

এই সেদিন যেমন একটা ছেলে নিজের মতন করে কত কী জানতে চাইলে। ভারি ভালো ছেলে। পাইকারি বাজার থেকে শাকপাতের বোঝা মাথায় নিয়ে রাস্তার ধারে চট বিছিয়ে সবে বসেছে সাকিনা।

 

ছেলেটা শুধালে, ও মাসি, এই বয়সে তুমি এখনও এত বড়ো বোঝা মাথায় নিয়ে শাকপাত বেচতে আসো রোজ।

সাকিনা বললে, কী করব বাবা। আমরা খেটে খাওয়া মানুষ, আমাদেরঘরে বসে থাকলি চলে।

 

 -কেন তোমার ছেলে-টেলে কেউ নেই।

-ছেলে সওদাগর মিস্ত্রির সঙ্গে জোগাড়ের কাজ করতে গেছে বাইরে।

-বাইরে মানে কোথায়।

-সে আমি জানি না বাবা। আমাকে বলেছে হাওড়া ইস্টিশানে ট্রেন ধরলে এক দিন এক রাতের পথ।

-ওকে লেখাপড়া শেখাওনি।

-সে ক-দিন গেছিল ইসকুলে। দু-তিন কেলাস পড়েও ছিল। তারপরে ওর বাপ মারা গেল হঠাৎ। তখন থেকে আর যায়নি।

-কী করত। ঘরে বসে থাকত।

-ঘরে বসে থাকার ছেলে সে নয় বাবা। ইস্টিশান মোড়ে আমিনুল্লার মোটর বাইকের গ্যারাজে ক'দিন কাজ করতে গেছিল সে ভালো লাগেনি ওর। মস্ত বদমেজাজি মানুষ আমিনুল্লা। তারপরে ওই হটুগঞ্জের সওদাগর মিস্ত্রি যোগাড়ের কাজে ছেলে খুঁজতে এসে আরো সবার সঙ্গে ওকেও নিয়ে গেছে।

-তোমার তাহলে চলে কী করে। ছেলে টাকাপয়সা পাঠায়।

 -এই আজ মাস তিনেক হল গেছে। আমার একলা পেট, ও আল্লার দয়ায় শাকপাত বেচে ঠিক চলে যায়।

-তোমার বাড়িটা কোথায়। কোথা থেকে আসো তুমি।

-ও তুমি চিনতে পারবেনি। এখান থেকে পোলেরহাট, তারপরে পোলেরহাট থেকে বিজয়গঞ্জ, বিজয়গঞ্জ থেকে দেউলপোতার মোল্লাপাড়ার পুরোনো মসজিদ ছাড়িয়ে একেবারে শেষ মাথায় খালপাড়ের ধারে আমার ঘর।

-তুমি ভাতা-টাতা কিছু পাওনি।

-না বাবা, ওসব আমি পাইনি।

-কেন পাওনি কেন? তুমি বয়স্ক মানুষ বিধবা মানুষ, তোমার তো বার্ধক্যভাতা, বিধবাভাতা সবই পাওয়ার কথা।

-ওসব আমি চাইতে যাইনি কারো কাছে।

 -খালপাড়ে তো নদীর ভাঙনে ভেসে গেছিল সব, তখন কোথায় ছিলে?

 -কোথায় আর থাকব বাবা পাড়ার আরও সবার সঙ্গে ইসকুল ঘরে ছিলাম। তারপরে জল নেমে যাতি পঞ্চায়েত থেকে যে তিরপল দিয়েছিল সেই তিরপল টাঙিয়ে খালপাড়ের জায়গায় উঠে গেছিলাম। তার ক-দিন পরে আমাদের মেম্বার রাকিবুল পঞ্চায়েতের লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে সবকিছু দেখেশুনে প্রধানকে বলে একখানা পাকা ঘর পাইয়ে দিয়েছিল।

-বাঃ বাঃ, সে তো খুব ভালো খবর। এখন তাহলে পাকা ঘরে থাকতে পারছ। তোমাদের তো ঘরের জন্যে কাউকে ধরাধরিও করতে হয়নি, এতো কম ব্যাপার না। সত্যি মাসি তোমার ভাগ্যটা ভালো।

-ভাগ্যির কথা আর বল না বাবা। ভাগ্যি ভালো থাকলে কি অমন করে সুকুরের বাপ আমাকে পথে বসিয়ে আধবেলাতে চলে যায়। আর পাকা ঘরে থাকার কথা বলছ! সে ভাগ্যি কি আছে আমার?

-কেন কী হয়েছে? তোমার নামে তো করে দিয়েছে ঘর।

-সে করে দিয়েছে ঠিকই, ভিত কেটে গাঁথনিও তুলে দিয়েছে খানিকটা, তারপরে আর হয়নি। আজ তিন বছর ধরে অমনিই পড়ে আছে।

-সে কী, তুমি ওদের কিছু বলনি এ নিয়ে?

-আর বলে কী হবে বাবা। সব তেলা মাথায় তেল দিচ্ছে।

-তার মানে?

-সে আর কী বলব আমি। সে-সব তো সবাই জানে। যাদের পাকা ঘর আছে তারাই ঘর পাচ্ছে।

-এ তো ভারি অদ্ভুত ব্যাপার। পঞ্চায়েত থেকে যে ঘর দিয়েছে তোমাকে সে ঘর তুমি পাবে না?

-পাব কী করে বাবা! সে ঘরের টাকা তো ভাগ করে খেয়ে ফেলেছে বাবুরা।

-বাবুরা মানে?

-বাবুরা মানে বুঝতে পারছনি! পার্টির বাবুরা।

 

 

তিন

ভোরবেলা ঘুমটা একটু ধরে গেছিল সাকিনা বেওয়ার। গরমটাও পড়েছিল খুব। ভাঙা টিনের দোর লাগিয়ে তালপাতার হাতপাখা নিয়ে খানিক এপাশ ওপাশ করেও অনেক রাত অবধি এল না ঘুম। ইচ্ছে করছিল টিনের দরজাটা খুলে শোবে। সাহস হয় না। খালপাড়ের ঘর।সাপখোপের উৎপাতও আছে। তাই গরমের দিনে বদ্ধ ঘরে এক-একদিন হয় এরকম। এর মাঝে হাতপাখা নিয়ে বাতাস করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে টের পায়নি।

 

ঘুমের ঘোরটা তখনও কাটেনি। হঠাৎ টিনের দরজাটায় কারা যেন দড়ামদড়াম করে ধাক্কা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন অনেকগুলো লোক মিলে লাথি মারছে দরজাটার গায়ে। কী সব চিৎকার চেঁচামেচি করছে। ভাঙা টিনের জোড়াতাপ্পি দেওয়া দরজা। মুহূর্তের মধ্যে গেল ভেঙে। তখন একদল ছেলে হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে বিছানা থেকে সাকিনা বেওয়াকে হিঁচড়ে তুলে হাতে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল উঠানে। পরনের শাড়িটা খুলে যাচ্ছিল সেটা পর্যন্ত ঠিক করতে দিলে না। টানতে টানতে রাকিবুলের সামনে হাজির করলে তাকে।

 

রাকিবুল। গ্রামের পঞ্চায়েতের মেম্বার রাকিবুল। বয়স বেশি না।বড়োজোর ছাব্বিশ-সাতাশ। সম্পর্কে সে সাকিনা বেওয়ার নাতি হয়। ঈদের দিনে কত আবদার করে পায়েস খেয়ে গেছে। আজ তার রুঢ়মূর্তি।

 

রাগে র্গর্গ করতে করতে গলা চড়িয়ে ধমক দিয়ে রাকিবুল বললে, 'তোর এত বড়ো সাহস নানী, তুই মোবাইলে ভিডিও ছেড়ে ভাইরাল করে বদনাম করতে গেছিস আমাদের দলের! দাঁড়া আজ হচ্ছে তোর।'

 

সাকিনা বেওয়ার গা-হাত-পা হিম হয়ে যাওয়ার মতন অবস্থা। কাঁপতে কাঁপতে ভাঙা স্বরে সে বিপুল বিস্ময় প্রকাশ করে বললে, 'ই বাবা, ইসবকী বলছিস রে ভাই! ভাইরা না ভাইরাল কী সব বলছিস ওসব আমি বাপের জম্মেও জানি নাই।'

 

রাকিবুল বাজখাঁই গলায় বললে, 'তুই সব জানিস বুড়ি। তুই যা করেছিস আমাদের শেষ করে দিয়েছিস। আজ তোকে আমরা শেষ করে ছাড়ব।'

 

সাকিনা বেওয়ার বুকের পর্দাটা দ্রুত ওঠানামা করছিল। গলাটা শুকিয়ে আসছিল। তবু সে রাকিবুলের হাতে ধরে বললে, 'আল্লার কসম বলছি ভাই, আমি ওসবের জানি নাই কিছুই।'

রাকিবুল ঝাঁঝিয়ে উঠে বললে, 'জানিস নাই মানে! তুই সব জানিস। তুই যা করেছিস জেনে বুঝেই করেছিস। তোর আজ কোনো কথাই শুনব না আমরা। তুই মিডিয়ার কাছে কত টাকা পেয়েছিস।'

 

বিধ্বস্ত সাকিনা বেওয়ার পায়ের নিচের নরম মাটি সরে যাচ্ছিল, ভারি অসহায় দৃষ্টিতে রাকিবুলের লাল চোখের দিকে চেয়ে সে বললে, 'সাতসকালে তোরা সবাই মিলে আমাকে নিয়ে কেনে এমন করছিস রে ভাই। বিশ্বাস কর আমি কিছু বুঝতেই পারছি নাই।'

 

রাকিবুল বললে, 'তুই সব বুঝে যাবি। প্রধান বাবুকে আসতে দে। তারপরে যা বুঝার তুই বুঝে যাবি।'

 

ভিড়ের মাঝে সাকিনা একবার করুণ দৃষ্টিতে চারপাশের লোকজনের দিকে একপলক দেখলে তাকিয়ে। দেখতে পেলে না কাউকে, পাড়ার কোনও লোককেই পেলে না দেখতে। পাবে কী করে, পাড়ায় এখন লোক বলতে নেই কেউ। সব পেটের দায়ে বউ বাচ্চা ফেলে ঘরদুয়ার ছেড়ে খাটতে চলে গেছে বিদেশ বিভুঁইয়ে। লোক বলতে এখন শুধু মেয়ে-বউরা।এই ঝামেলায় তারা কে-ই বা আসবে।

 

এক একটা মুহূর্তে যেন বদলে যাচ্ছে সকাল। এ কি সকাল! এমন সকাল কখনও দেখেনি সাকিনা। দেউলপোতার খালপাড়ের কেউ দেখেনি। ঘেমেনেয়ে যাচ্ছে সাকিনা। এর মাঝে রাকিবুলের দলের ছেলেরা তাকে ঘিরে ধরে বললে, 'এই বুড়ি তোর মোবাইলটা কোথায়? বের কর মোবাইল।এখনি বের কর।'

 

ওরা মোবাইলের কথা তুলতেই ছেলের মুখটা ভেসে উঠল। মোবাইল বস্তুটিকে কোনোকালেই ভালো লাগত না সাকিনার। ছেলে যতবার তাকে মোবাইল কিনে দিতে চেয়েছে ততবার সে না করে দিয়েছে। ও বড়ো ঝঞ্ঝাটের জিনিস। এবার আর মায়ের কোনও কথা শুনতে চায়নি ছেলে। বাইরে যাবার আগে গঞ্জের বাজারে মোবাইলের দোকান থেকে মায়ের জন্যে একখানা ছোটো মোবাইল কিনে দিয়ে গেছে সে। পাশের বাড়ির আমিনুলের বউ সাজিদা বিবিকে খুব করে বলে গেছে, 'ভাবী তুমি একটু শিখিয়ে পড়িয়ে দিও মা-কে।'

 

(চলবে) 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন