https://www.prothomalony.com/
14945
literature
স্বপ্নে ঝুলে স্বপ্ন
রুদ্র সাহাদাৎ
স্বপ্নে ঝুলে থাকে স্বপ্ন
ইচ্ছেরা খুন হয় প্রতিদিন
ঈর্ষার রাজ্যে ঘুরেফিরে বেঁচে থাকি
ঘুমে ঝুলে থাকে ঘুম
নির্ঘুম রাত্রির আঁধার, ডানবাম দৌড়ায় চোখ
ফিলিস্তিন গাজা জ্বলে শিশুরা উড়ে যায় -হয়ে যিশু
উড়ে যায় পাগলামন
দিকহারা বিভ্রান্ত পথিক....
শূন্যতার অন্তরালে বাবা
মুহাম্মদ রফিক ইসলাম
কালবৈশাখী ঝড়ের মতো ধেয়ে আসছে
যেন ভাঙনের প্রলয়
মাথার উপর থেকে যেন ভেঙে যাচ্ছে আকাশ
ছায়াটুকু গুড়ো গুড়ো হয়ে লুটিয়ে পড়ছে
নিস্তব্ধ বুকের আনাচে-কানাচে
পায়ের নিচ থেকে যেন সরে যাচ্ছে মাটি
দিব্যি দেখে যাচ্ছি
শূন্য থেকে শূন্যতার দিকে
বাবা, আপনাকে হারানোর মধ্যদিয়েই
বুঝতে শিখি
শূন্যস্থানে শূন্যতা ছাড়া আর কিছু নেই ।
সমুদ্র পেরোতে হয় বোধের সাঁতারে
লুৎফা শাহিন এর কবিতা
ছোটো-বড় অনেক গোপনীয়তা জমে আছে এই
অবমুক্ত জীবনে
প্রতিদিন রাস্তা পেরোতে মর্মাহত হৃদয়ের ভাবনার প্রতিক্ষণে-
একার ভেতর এক নিঃস্বতম মানুষ আর অসংলগ্নতার বিবর্ণ দর্শন
অথচ অজ্ঞতার খামখেয়ালিপনায় আজো সীমাবদ্ধতা ও মাপকাঠির
মৌন সমীকরণ-তবুও বেশুমার বেগতিক বেগবতী কল্পনা আমার!
এ কী জীবনের স্বতন্ত্রবোধ কোথায়-কোন ভালোলাগার আঙিনায়
কল্পনা কতোকিছু আগলে রাখি-যখন যুক্তি তর্কে নিজের কাছে হেরে যাই
খেলামন আমার একবুক বেদান্তের ঈশ্বরবাদী জীবনে ফিরি!
আর রক্তদৃশ্যের সমুদ্রের বোধের রাস্তায় স্বপ্নবিজ্ঞান অধ্যয়ণ করি-
অব্যক্ত শব্দের অনুরণন
শাহজালাল সুজন
আমি দাঁড়িয়ে আছি কংক্রিটের মনুষ্যত্বের শহরে
অব্যক্ত কথনগুলো বলবো বলে,
হাজারো দীর্ঘশ্বাসে বিস্ফোরিত শব্দের জলোচ্ছ্বাসে
চাপা পড়ছে বিচ্ছিন্ন শব্দগুলো।
বাকরুদ্ধ ঝলসানো বিজ্ঞাপনে থীর হয় চক্ষু জোড়া
ভেতরে লুকায়িত অন্ধকার কেউ দেখেনা,
সময়কে হার মানানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে মানুষ
অথচ সূক্ষ্ম সময়ই গিলে খাচ্ছে মনুষ্যত্ব।
কাচের দেয়ালে স্বপ্নগুলো আঁটসাঁট আটকে আছে
তবুও হৃদয় খুঁজে একটি ভোরের আলো,
এভাবেই জীবনের কবিতা গুলো বাঁচে শব্দহীন
দীর্ঘশ্বাসের প্রতিফলিত ধ্বনিতে।
তুমি জল হলে না
শাখাওয়াত তানভীর
জল কোন দল খোঁজে না
ইচ্ছে বা অনিচ্ছায়- কেউ ভাসে, কেউ ডুবে
বিভাহীন বিভুর হয় আশ্রয়, ব্যথার অনুভবে;
তুমি কেন জল হলে না?
প্রণয় ঢলে- ভাসতে না দাও, ডুবিয়ে দিতে
বিষাদের রাতে হতাম না হয় দহনের মিতে;
জল কোন ধর্ম বুঝে না
তুমি কেন জল হলে না?
জল কোন বর্ণ চিনে না
তুমি কেন জল হলে না?
যদিও তোমার জল হওয়া দায়
পেয়ে তোমার- বহুরূপী তাপের আদর
অভিমানী জল আপনারে হারায়
কখনো হয় মেঘ, কখনো বরফ-পাথর!
সমুদ্রে হেঁটে যায় দুঃখ
রিপন বর্মন
সময় সুযোগে সমুদ্রে যাই;
যে পথে যাই— বিপুলা পৃথিবী শুয়ে থাকে
কালো আঁধারের গায়!
সে পথে হাসির রোদ্দুর বিজনে ফুঁফিয়ে কাঁদে,
সে পথে ভালোবাসার শেষ বাড়ি।
বন পাখির আড়ালে বিদীর্ণ নীলিমার ছায়া ধরে,
দীর্ঘতর সৈকতে—
ভিড়ের কোলাহলে নিজেকে হারিয়ে
আবিষ্কারের মন্ত্র খুঁজি।
অনন্ত একা হাঁটি,
নাবিকের চোখে মাটির খিদে মাপি।
এত, এত যে মুখ— তাতে চেনা মুখ তো
একটিও নেই!
সমুদ্রে মিলিয়ে দেখি— কতটা মিটে পানি,
লবণে গেছে হারিয়ে...
দেখি কৃষ্ণ পক্ষের চাঁদ— কতটা দাগ
কেটেছে বালিয়াড়ি ঢেউয়ের নৈবেদ্যে...
সাকিনা বেওয়া
দেবব্রত সিংহ
এক
স্বপ্ন দেখছিল সাকিনা বেওয়া। শেষরাতের দিকে খালপাড়ের ছিটেবেড়ার ঘরে ছেঁড়া মাদুরে শুয়ে দেখছিল স্বপ্ন। সাকিনা বেওয়া দেখলে বছরতিনেক আগে পঞ্চায়েত থেকে যে ঘর পেয়েছিল সে, যে ঘরের ভিতের উপরে গাঁথনিটুকুন তুলে ফেলে রেখে দিয়েছিল বাবুরা, সেই ঘরখানা আবার হচ্ছে। জোর কদমে হচ্ছে। উঠান ভর্তি লোকজন, মেশিনপত্তর, আরও অনেক কিছু।
এসব দেখে হাঁ হয়ে গেছে সাকিনা বেওয়া। তার আন¨ও হচ্ছে খুব। হামিদমিস্ত্রির ব্যস্ততার শেষ নেই। সে একদল জোগাড়েকে কাজে লাগিয়ে ছুটোছুটি করছে। এক ফাঁকে তার কাছে এসে হামিদ মিস্ত্রি বললে, 'দেখচাচি, আজই তোমার ঘরখানা তুলে ঢালাই দিয়ে পেলাস্টার করে দিচ্ছি।ওই ছিটেবেড়ার মাটির ঘরে তুমাকে আর থাকতি হবেনি। আজই তুমি পাকা ঘরে থাকতি পারবে।'
গ্রামের পঞ্চায়েতের মেম্বার রাকিবুল। সে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করছে সবকিছু। হামিদ মিস্ত্রির কথায় সায় দিয়ে ঘাড় নেড়ে রাকিবুল বললে, 'তুমার ঘরটা আজই আমরা কমপিলিট করে দেব। এমএলএ সাহেবের অর্ডার, প্রধান বাবুর হুকুম। যাও যাও তুমাকে ইসব নিয়ে ভাবতি হবে না নানী। তুমি জলদি করে আমাদের জন্যে চা পানি নিয়ে আসো দেখি।'
কাঠকুচো আর ঘুঁটের জ্বাল দিয়ে সেই চা পানি বানাতে গিয়ে ভেঙে গেল ঘুমটা। ছিটেবেড়ার ঘরে জানলা-টানলা নেই কিছুই। জানলার বদলে একখানা মাত্র ঘুলঘুলি। আলো আঁধারি ভোরে সেই ঘুলঘুলি দিয়ে চোখ কচলে উঠানটার দিকে এক পলক তাকালে সাকিনা বেওয়া। পাকা ঘরটা যতটুকুন ছিল ততটুকুনই আছে। উঠানটা শুনশান। কেউ কোথাও নেই। শুধু সাজিদা বিবিদের মোরগগুলো ডাকাডাকি করছে।
এসব দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল সাকিনা বেওয়ার। তখনও আলো ফোটেনি। তখনও ফজরের আজান হয়নি। খালপাড়ের ছিটেবেড়ার ঘরে ভাঙা টিনের জোড়াতাপ্পি দেওয়া দোর লাগিয়ে গরমের দিনে তেমন করে আসতে চায় না ঘুম। বয়সকালে ঘুম-টুম নাকি এমনিতেই পাতলা হয়ে আসে। রাজ্যির চিন্তা এসে জোটে। সেসব উলটো-পালটা চিন্তার মধ্যে দুশ্চিন্তাই বেশি। দুটো কথা বলার মতনও কেউ নেই ঘরে।
ছেলেটা যখন ছিল তখন এত দুশ্চিন্তা হত না। আজ মাস ছয়েক হল সে সওদাগর মিস্ত্রির দলে জোগাড়ের কাজে খাটতে গেছে বাইরে। বিদেশ বিভুঁই জায়গা। কী খাচ্ছে, কি না খাচ্ছে, কীভাবে থাকছে না থাকছে, সে-সবের কিছুই জানে না সাকিনা বেওয়া। ছেলেটা আবার মস্ত মুখচোরা ছেলে। পাড়ার আরও সব ছেলের মতন হৈহৈ করে থাকার ছেলে নয়।থাকা খাওয়া নিয়ে কোনও অসুবিধে হলে মুখ ফুটে কিছু বলবেও না।
সাকিনা একবার জানতে চেয়েছিল জায়গাটা কোথায়। সেও বলতে চায়নি ছেলে। শুধু এটুকু বলেছিল, 'ও তুমি বুঝতে পারবেনি মা, হাওড়া ইস্টিশান থেকে ট্রেনে চেপে গেলে এক দিন এক রাতের পথ।'
ছেলে যার সঙ্গে গেছে সেই সওদাগর মিস্ত্রি ভালো মানুষ। পাড়ার আরও সব ছেলেরাও তার দলে। তাদের সঙ্গে এক করে সুকুর-কে সে দেখে না। যতই হোক ওর বাপের বন্ধু বলে কথা। যাবার সময় সাকিনাকে বলে গেছে, 'সুকুরকে নিয়ে একদম ভাববে না ভাবী। তুমি দেখবে আমি ওকে জোগাড়ে থেকে মিস্ত্রি বানিয়ে ছাড়ব।'
এসব ভাবতে ভাবতে ছেঁড়া মাদুরে এপাশ ওপাশ করতে করতে ভারি হয়ে এসেছিল চোখের পাতা। তারপরে রাতভোরের দিকে ওই স্বপ্ন। মন ভালো করা স্বপ্ন। মনেই হচ্ছিল না ওটা স্বপ্ন। আহা এমন ভাগ্যি কী হবে সাকিনা বেওয়ার। রাকিবুল নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করছে। এমএলএ সাহেবের অর্ডার প্রধান বাবুর হুকুম। এ কি কম কথা। এমন ভাগ্যি হয়ক'জনের।
পরক্ষণেই মনে হল ভাগ্যি আবার কী। অমন ভাগ্যির দরকার নেই তার। আজ বছর তিনেকের বেশি হয়ে গেল রাকিবুলরা খালপাড়ের ছায়া পর্যন্ত পাড়ায় না। সাকিনা অবশ্য তার ঘর করে দেওয়া নিয়ে কাউকে কিছু বলতেও যায়নি, কইতেও যায়নি। নদীবাঁধের ভাঙনে যখন খালপাড়ের আরও অনেকের সঙ্গে বাঁধভাসি হয়েছিল সে, তখনও কিছু বলেনি।এমনকী পঞ্চায়েতের 'লিস্টিতে' তার যখন নাম উঠেছিল তখনও আরও সবার মতন রাকিবুলের কাছে তদ্বির তদারকি করতেও যায়নি। তার ধাতেও সব সয় না। সে খেটে খাওয়া মানুষ। গঞ্জের বাজারে রাস্তার ধারে বসে শাকপাত বেচা মানুষ। যা দু-পয়সা হয় আল্লার দয়ায় তাতে তার দুটি চাল-ডাল ফুটিয়ে খাওয়ার মতন ব্যবস্থা হয়ে যায়। এর বেশি আর কী দরকার।
তাছাড়া যে মানুষটার সঙ্গে সারাজীবন ঘর করেছে সাকিনা বেওয়া, সে ছিল এই ধাতেরই মানুষ। গঞ্জের বাজারে ভ্যান রিকশা টানত।কোনওদিন কারো কাছে হাত পাতেনি। তার ইমান ছিল আলাদা।সাকিনা বেওয়া সে-সব ওই মানুষটার কাছে শিখেছে।
ঘুরেফিরে একটা কথাই বলত, 'দেখ সাকিনা, আমরা খেটে খাওয়া মানুষ, কারো দয়া নিয়ে বাঁচব না। যে ক-দিন বাঁচব মাথা উঁচিয়ে বাঁচব, নিজের হিম্মতে বাঁচব। আল্লার দয়াতে দু-বেলা দুটো ডাল ভাত জুটছে এর বেশি আর কিছু চাই না। আর একটা কথা বলি শুনে রাখ, কে কত বড়োলোক হয়েছে, কার কত পয়সা হয়েছে ওসব দেখতে যাবি না। ওই আমিনুদ্দির কথাই দেখ, আমাদের অঞ্চল প্রধান আমিনুদ্দি। আগে গঞ্জের বাজারে আমার সঙ্গে ভ্যান রিকশা চালাত। তখন কত কথা হয়েছে, গপ্পো হয়েছে ওর সঙ্গে। তোর মনে আছে যে-বার ওর ছোটো ছেলেটার খুব অসুখ হল, বড়ো হাসপাতালে ভর্তি হল, সেবার আমিই ওর পাশে ছিলাম। টাকাপয়সা যা লেগেছিল সে-সব আমরা ভ্যানওয়ালারা চাঁদা তুলে দিয়েছিলাম ওর হাতে। সেই আমিনুদ্দি এখন কত বদলে গেছে দেখ। পঞ্চায়েতের ভোটে পার্টি থেকে যেই মেম্বর দাঁড়াল, মেম্বর থেকে প্রধান হল তারপর আর চিনতে পারে না। গঞ্জের ইস্টিশান মোড়ের কাছে জায়গা কিনে তিনতলা দালান তুলেছে, তিনখানা বাইক, দু-খানা চারচাকা গাড়ি, তার উপরে নামে-বেনামে কত জমিজমা কিনেছে তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। ওসব হারামের পয়সা। আল্লা সব দেখছে। চিরকালতো আর থাকতি পারবেনি, সময় হলে গোরস্তানে যেতেই হবে, তখন আল্লা সব হিসাব বুঝে নেবে। ওদের চেয়ে আমরা অনেক ভালো আছি বুঝলি। আমরা খেটে খাই। হারামের পয়সায় খাই না।'
আরও কত কী এরকম ভালো ভালো কথা বলত মানুষটা। জ্বরজারি তো অনেকেরই হয়। হঠাৎ কী যে হল, কোত্থেকে যে একটা উৎকট জ্বর বাধিয়ে নিয়ে এল। শুধু জ্বর না তার সঙ্গে খিঁচুনিও। গঞ্জের হাসপাতালে ভর্তি করেছিল সাকিনা। রোগটা ধরতেই পারল না ডাক্তার বাবুরা। কপাল খারাপ। কলকাতার বড়ো হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই চলে গেল মানুষটা।
কবরে মাটি দেওয়ার দিনে খুব কেঁদেছিল সাকিনা। বুক চাপড়ে অঝোর ধারায় কেঁদেছিল। পাড়ার সবাই ওকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল, কাঁদিস না সাকিনা, ভালো মানুষেরে আল্লা বেশিদিন রাখে না।
ও, সে এক দিন গেছে! সুকুরটা তখন কোলে। গঞ্জের বাজারে রাস্তার ধারে ছেলে কোলে নিয়ে শাকপাত বেচে উপাসে-কাপাসে সে এক দুঃসহ কষ্টের, দুর্ধর্ষ লড়াইয়ের দিন গেছে কেটে।
এসব ফেলে আসা দিনের কথা ভাবতে ভাবতে কানে এল আজানের ডাক। ভোরবেলায় এই আজানের ডাক কানে এলে আর শোয় না সাকিনা। বারো মাস এভাবেই তার ঘুম ভাঙে। আর ঘুম ভাঙলে দিন শুরু হলে মেলা কাজ। ঘরদোর ঝাড়ু দেওয়া, খালের জলে বাসন কোসন ধোয়া, টিপকলে জল আনা, উনুনের ছাই ফেলা, কাঠকুচো আর ঘুঁটে জোগাড় করে রাখা আরও কত কী।
দেখতে দেখতে রোদ ওঠে। রোদ উঠে গেলে গঞ্জের বাজারের দিকে হাঁটা লাগানো। রোজ দিন একটা তাড়া থাকে। পা চালিয়ে তাড়াতাড়ি করে না গেলে ভালো জিনিসটা পাওয়া যায় না। পাইকারদের কাছে দাম-দর করে দেখেশুনে নিতে হয়। তারপরে শাকপাতের মোট মাথায় নিয়ে বড় খাঁগাজী-র মাজার পেরিয়ে ইস্টিশানের লাইন-পারের বাজারে রাস্তার ধারে শাকপাত বেচা। এ তার রোজ দিনের রুটিন।
(চলবে)
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন