https://www.prothomalony.com/

14937

literature

সাহিত্য

উত্তরের স্বাস্থ‍্য-সচেতনতা

স্বাস্থ্যকর জীবনধারায় লাইফস্টাইল মেডিসিন

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৬:৩১

আপনি কি জানেন শুধু জীবনধারা বদলেই অনেক স্বল্পমেয়াদী বা দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রতিরোধ বা কমিয়ে আনা সম্ভব? এটাই হলো লাইফস্টাইল মেডিসিন বা জীবনযাপনভিত্তিক চিকিৎসা -একটি প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিশেষ শাখা, যেখানে জীবনধারাভিত্তিক থেরাপিউটিক পদ্ধতি ব্যবহার করে বিভিন্ন রোগ যেমন হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, এবং স্থূলতা-সহ অন্যান্য রোগের চিকিৎসা, প্রতিরোধ এবং কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। এটি যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দ্রুত বাড়ছে।

লাইফস্টাইল মেডিসিন আজ বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ বলে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য নেতারা বলছেন, শুধুমাত্র চিকিৎসার উপর নির্ভর না করে জীবনযাপনের পরিবর্তন রোগ প্রতিরোধ করতে সহায়ক। 

'আমেরিকান কলেজ অফ লাইফস্টাইল মেডিসিন এর সার্টিফাইড বিশেষজ্ঞ ডাঃ রিচার্ড রোজেনফেল্ড বলেন, "আমরা এমন একটি সময়ে পৌঁছেছি যেখানে স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগের সমাধান হলো স্বাস্থ্যকর জীবনধারা অবধারিত করা, খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে ধূমপান ছাড়া, নিয়মিত ব্যায়াম ও মানসিক চাপ কমানো এতে অন্তর্ভুক্ত। এটাই হলো লাইফস্টাইল মেডিসিনের মূল-দীর্ঘমেয়াদী, সুস্থ জীবনযাপন।" 

গবেষণায় দেখা গেছে, লাইফস্টাইল মেডিসিন-একটি দ্রুত বিকাশমান ও উদ্ভাবনী ক্ষেত্র, যা ছয়টি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত স্তম্ভের মাধ্যমে মানুষের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে কাজ করে। যেমন-সর্বোত্তম পুষ্টি, শারীরিক কার্যকলাপ, আরামদায়ক ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক সংযোগ এবং ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে বিরত থাকা।

১. সর্বোত্তম পুষ্টি: আমেরিকাতে অকাল মৃত্যুর একক প্রধান কারণ হলো খাদ্যের নিম্ন মান। দীর্ঘস্থায়ী রোগের মূল কারণের চিকিৎসার জন্য সর্বোত্তম পুষ্টি অপরিহার্য। লাইফস্টাইল মেডিসিনে আমেরিকান কলেজ (ACLM) প্রধানত কম প্রক্রিয়াজাত শাকসবজি, ফলমূল, গোটা শস্য, শিম/ডাল জাতীয় খাদ্য, বাদাম এবং বীজের ওপর ভিত্তি করে একটি খাদ্যভ্যাসের পরামর্শ দেয়।

২.শারীরিক কার্যকলাপ: আরামপ্রদ জীবনযাত্রার নেতিবাচক প্রভাব কাটানো, দীর্ঘস্থায়ী রোগ সামলানো এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে সমর্থন করার জন্য নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট মাঝারি মানের অ্যারোবিক এবং পেশী শক্তিশালী করার কার্যকলাপের লক্ষ্য রাখা উচিত, যা অস্টিওপোরোসিস এবং হৃদরোগের মতো সমস্যা প্রতিরোধে সহায়তা করে।

৩.পুনরুদ্ধারমূলক ঘুম: অস্বাস্থ্যকর ঘুম অকাল মৃত্যু এবং অক্ষমতার সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর সাথে সম্পর্কিত। এটি স্মৃতিশক্তির দুর্বলতা, ডিমেনশিয়া এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। গুণগত মানের ঘুম দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসা এবং সামগ্রিক সুস্থতাকে দারুণভাবে সমর্থন করে। প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করার জন্য সঠিক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা উচিত, যাতে শরীর বিশ্রাম ও মেরামত হতে পারে।

৪. স্ট্রেস ব্যবস্থাপনা: দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ হৃদরোগ, বিষণ্নতা, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং আরও অনেক স্বাস্থ্য সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলে। দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য মানসিক চাপ মোকাবিলার কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৫. সংযোগ: মানুষের সুখ, দীর্ঘ জীবন এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসায় অর্থপূর্ণ সামাজিক সম্পর্ক একটি মূল চালিকাশক্তি। দৃঢ় সামাজিক সংযোগ, পাশাপাশি জীবনের উদ্দেশ্য এবং অর্থ থাকার অনুভূতি শারীরিক, মানসিক এবং আবেগিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করে এবং এমনকি বিষণ্নতা ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকিও হ্রাস করতে পারে।

৬.ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থ পরিহার: অ্যালকোহল, তামাক এবং অন্যান্য মাদকের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থ মৃত্যু এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় এবং রোগের খারাপ প্রভাবগুলোকে আরও বাড়িয়ে তোলে। অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ ও সংস্পর্শ মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য এই আচরণগুলোকে প্রমাণ-ভিত্তিক পদ্ধতির মাধ্যমে মোকাবিলা করা একটি অপরিহার্য উপাদান বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞকা। 

আজ বিশ্বের ৮,০০০-এরও বেশি চিকিৎসক লাইফস্টাইল মেডিসিনে সার্টিফাইড, যারা রোগী সেবার মান উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। সার্টিফিকেশন কেরিয়ার উন্নয়ন, কাজের সন্তুষ্টি বাড়ানোর পাশাপাশি মূল কারণভিত্তিক যত্নের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা খরচ কমাতে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ফলাফল উন্নত করতে সাহায্য করে।

ডাঃ জনাথন বনেট (ACLM সার্টিফাইড বিশেষজ্ঞ) বলেন, "আমাদের আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি রোগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রস্তুত নয়। ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি অসাধারণ, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্য অর্জনে সীমিত। লাইফস্টাইল মেডিসিন হলো দীর্ঘমেয়াদি রোগের মূল কারণ চিহ্নিত করে চিকিৎসা এবং জীবন পরিবর্তনের চাবিকাঠি। আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও সমাজ আরও ভালো করতে চাইলে, সার্টিফাইড হওয়াই শুরু করার সঠিক জায়গা।"

 

প্রি-ডায়াবেটিস: সতর্কতা ও সুস্থতার পথ

প্রি-ডায়াবেটিস একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যগত অবস্থা যা বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতে দ্রুত বাড়ছে। এটি এমন এক নীরব সতর্কতা সংকেত যা আমাদের জানায় যে, আমরা টাইপ ২ ডায়াবেটিসের একেবারে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছি। সুসংবাদ হলো, সঠিক সময়ে শনাক্ত এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনার মাধ্যমে এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিকে বহুলাংশে হ্রাস করা সম্ভব।

প্রি-ডায়াবেটিস হলো সেই অবস্থা যখন আপনার রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, কিন্তু এটিকে পুরোপুরি টাইপ ২ ডায়াবেটিস হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য যথেষ্ট বেশি নয়। এটিকে 'বর্ডার লাইন ডায়াবেটিস' নামেও অভিহিত করা হয়। এই অবস্থার মূল কারণ হলো ইনসুলিন হরমোনের অকার্যকারিতা। যখন শরীর ইনসুলিনের প্রতি প্রতিরোধী হয়ে ওঠে বা অগ্ন্যাশয় পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না, তখন রক্তে গ্লুকোজ জমা হতে শুরু করে। এই অবস্থাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর তথ্য এবং গবেষণামূলক প্রকাশনা অনুসারে, বিশ্বে প্রাপ্তবয়স্কদের একটি বিশাল অংশ প্রি-ডায়াবেটিসে ভুগছেন।.তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজনের প্রি-ডায়াবেটিস থাকতে পারে, কিন্তু তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ তা জানেন না। এটি একটি উদ্বেগের বিষয়, কারণ চিকিৎসা-বিহীন প্রি-ডায়াবেটিস কয়েক বছরের মধ্যে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে পরিণত হতে পারে। পিএমসি-তে প্রকাশিত ২০১৭-২০১৮ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ১৪.২ শতাংশ মানুষ প্রি-ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এই হার ডায়াবেটিস আক্রান্তের (৯.৮ শতাংশ) চেয়েও বেশি। 

প্রি-ডায়াবেটিসের কোনো প্রকাশ্য উপসর্গ দেখা দেয় না। তবে এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডা. আলিম কানজি বলেন, যদি রক্তে শর্করা যথেষ্ট বেশি বা প্রায়ই বৃদ্ধি পায়, তবে কিছু সাধারণ হাইপারগ্লাইসেমিয়ার (উচ্চ রক্তশর্করা) উপসর্গ দেখা দিতে পারে, যা রোগীদের জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে। যেমন-প্রস্রাবের মাত্রা বৃদ্ধি, তৃষ্ণা বৃদ্ধি, ক্ষুধা বৃদ্ধি, দৃষ্টি ঝাপসা দেখা, হাত বা পায়ের নড়াচড়ায় অসাড়তা বা সুঁচ অনুভূতি, হঠাৎ এবং অপ্রত্যাশিত ওজন কমা, ঘন ঘন সংক্রমণ বা ঘা সারতে দেরি হওয়া। 

ডাঃ সাবরিনা হক এ নিয়ে বলেন, "যাদের সুগার লেভেল হাই থাকে তাদের মুখ শুকিয়ে যাওয়া, ঘনঘন ইউরিনেশন দেখা যায়। তাছাড়া অনেকের গলার কাছে কালো দাগ কিংবা স্কিন ট্যাগ লক্ষ্য করা যেতে পারে। শরীর ইনস্যুলিন তৈরিতে ব্যর্থ হলে এই দাগ দেখা যায়, যা প্রিডায়াবেটিস কিংবা ইনস্যুলিন রেজিস্টেন্সের লক্ষণ।"  

প্রি-ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য কিছু রক্ত পরীক্ষা করা হয়: ফাস্টিং প্লাজমা গ্লুকোজ (FPG), ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট (OGTT), হিমোগ্লোবিন A1C (HbA1c) পরীক্ষা। 

ডাঃ সাবরিনা হক জানান, "ইএইচ বি এ ওয়ান সি (HbA1c)' রক্ত পরীক্ষায় খুব সহজেই প্রিড্যাবেটিস ধরা পড়ে। যার স্বাভাবিক রেঞ্জ হচ্ছে ৫.৬ পর্যন্ত। এই রেঞ্জ ৫.৭-৬.৪ হলে সেটাকে প্রিডায়াবেটিস ধরা হয়।"

ডাঃ সাবরিনা হক জানান, প্রি-ডায়াবেটিসের সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো জীবনধারায় পরিবর্তন আনা। গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শরীরচর্চা পরিবর্তন করলে টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি প্রায় ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত কমানো যায়। 

এ নিয়ে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, স্বাস্থ‍্যকর খাদ‍্যাভাস গড়ে তুলতে পারেন। চিনি ও মিষ্টিজাতীয় পানীয় যেমন সোডা বা বোতলজাত জুস সম্পূর্ণ বাদ দিন। আঁশযুক্ত খাবার, যেমন সব ধরনের শাক-সবজি, হোলগ্রেইনস,ডাল ও ফল খান, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্স যুক্ত খাবার যেমন লাউ, পেঁপে, চিচিঙ্গা খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করুন। ফাস্টফুড, প্যাকেটজাত খাবার এবং উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার যেমন ঘি বা মাখন সীমিত পরিমাণে গ্রহণ করুন।

নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপে, সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট মাঝারি মানের ব্যায়াম, যেমন দ্রুত হাঁটা বা জগিং করার চেষ্টা করুন। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা এড়িয়ে চলুন এবং কাজের ফাঁকে ছোট বিরতি নিয়ে নড়াচড়া করুন। যদি আপনার ওজন বেশি থাকে, বিশেষ করে পেটের চারপাশে চর্বি জমে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওজন কমানোর চেষ্টা করুন। গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের মোট ওজনের মাত্র ৫–৭ শতাংশ কমালেও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।


প্রতি রাতে ৭–৯ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করুন। যোগা, ধ্যান বা শখের মাধ্যমে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করুন। ধূমপান সম্পূর্ণ বন্ধ করুন এবং মদ্যপান থাকলে তা সীমিত করুন।

প্রি-ডায়াবেটিস একটি সতর্কতা; এটিকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে জীবনধারায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনলে আপনি কেবল ডায়াবেটিসই নয়, হৃদরোগ এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকিতেও নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন। রক্তে শর্করার মাত্রা যদি বর্ডার লাইনে থাকে, তবে দেরি না করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারা শুরু করুন।

 

আলঝেইমারঃ ঘরের নিরাপদ যত্ন 

আলঝেইমার-এক ধরনের মস্তিষ্কজনিত ব্যাধি, যা ধীরে ধীরে স্মৃতি, চিন্তাশক্তি এবং সবচেয়ে সহজ কাজগুলো করার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, আলঝেইমারের উপসর্গ জীবনের পরবর্তী সময়ে দেখা দেয়। ধারণা করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ৬ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ, যাদের বেশিরভাগের বয়স ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে, এ রোগে ভুগছেন। 

আলঝেইমার-ডিমেনশিয়ার সবচেয়ে সাধারণ রূপ। 

ডিমেনশিয়া হলো জ্ঞানীয় ক্ষমতা-যেমন চিন্তা, স্মৃতি, যুক্তি এবং আচরণগত দক্ষতাগুলো এমনভাবে হারিয়ে ফেলা-যা দৈনন্দিন জীবন ও কর্মকাণ্ডে গুরুতর প্রভাব ফেলে। এটি হালকা পর্যায় থেকে শুরু হয়  এবং সবচেয়ে গুরুতর পর্যায়ে গিয়ে মানুষকে সম্পূর্ণভাবে অন্যের উপর নির্ভরশীল করে ফেলে। আলঝেইমার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতে, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত প্রায় ৬০–৮০ শতাংশ মানুষ আলঝেইমার রোগে ভোগেন। এ রোগে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কের কোষ নষ্ট হয়ে যায়। 

আলঝেইমার'স রোগের সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, বয়সজনিত মস্তিষ্কের পরিবর্তন, জিন, পরিবেশ ও জীবনধারা একসাথে এর পেছনে কাজ করে।

 

ডাঃ অ্যালোইস আলঝেইমার-এর নামে এই রোগের নামকরণ। ১৯০৬ সালে তিনি একজন মহিলার মৃত্যুর পর তার মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেন, যিনি স্মৃতিভ্রংশ, ভাষাগত সমস্যা এবং অস্থির আচরণের মতো উপসর্গে ভুগছিলেন। মস্তিষ্ক পরীক্ষায় তিনি দুটি প্রধান অস্বাভাবিকতা খুঁজে পান-অ্যামাইলয়েড প্ল্যাক (অস্বাভাবিক দলা), এবং নিউরোফাইব্রিলারি বা টাউ ট্যাঙ্গলস (জট পাকানো তন্তু)। 

এগুলোই আজও আলঝেইমার রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্য একটি বৈশিষ্ট্য হলো নিউরনের সংযোগ নষ্ট হওয়া। নিউরন মস্তিষ্কের ভেতরে এবং মস্তিষ্ক থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে বার্তা আদানপ্রদান করে।

 

কারণ যাইহোক, আলঝেইমার-এ  আক্রান্ত বয়স্কদের যত্ন নেওয়া একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ, যার জন্য প্রয়োজন প্রচুর ধৈর্য, সহানুভূতি এবং সঠিক কৌশল। তাদের যত্নের জন্য বাড়ির পরিবেশকে কীভাবে নিরাপদ করবেন, সেই বিষয়ে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিং-এর দেওয়া পরামর্শের সারসংক্ষেপ নিচে দেওয়া হলো।

১. সাধারণ সতর্কতা ও পরিবেশ তৈরি: আলঝেইমার  রোগীর নিরাপত্তার জন্য ঘরের পরিবেশ সহজ ও সুরক্ষিত করা জরুরি। সিঁড়ির ধাপ, বাথরুম, রান্নাঘর বা শোবার ঘর উজ্জ্বল রঙ ও সহজ চিহ্ন দিয়ে আলাদা করে রাখুন যেন তারা সহজে চিনতে পারে। আয়না সীমিত করুন এতে তারা বিভ্রান্ত হয়। দেয়াল ও মেঝেতে বৈপরীত্য রঙ ব্যবহার করুন, জটিল নকশা এড়িয়ে চলুন। গরম জলের হিটার ১২০°F এ সেট করুন, ঠান্ডা-গরম কলগুলো ভিন্ন রঙ বা লেখা দিয়ে চিহ্নিত করুন। আসবাবের ধারালো কোণে নরম প্যাড লাগান, কাঁচের দরজা-জানালায় স্পষ্ট ডিকাল দিন যেন কাঁচ বুঝতে পারে। সব ফোনের পাশে জরুরি নম্বর ও ঠিকানা লিখে রাখুন। এছাড়া, নিয়মিতভাবে স্মোক ডিটেক্টর ও গ্যাস ডিটেক্টরের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা জরুরি।

 

২. বিপজ্জনক জিনিসপত্র নিরাপদে রাখুন: ওষুধ, অ্যালকোহল, ক্লিনিং পণ্য, বিষাক্ত গাছপালা, অস্ত্র, কাঁচি, ছুরি, পাওয়ার টুলস, দেশলাই, লন্ড্রি ডিটারজেন্ট এবং দাহ্য বস্তু-এসব রোগীর নাগালের বাইরে রাখুন বা তালাবদ্ধ করুন।

 

৩. রান্নাঘর: ওভেন, স্টোভ, টোস্টার বা ইস্ত্রির কাছে সতর্কতামূলক চিহ্ন দিন, যেমন-"থামুন!" বা "হাত দেবেন না—খুব গরম!" স্টোভে সেফটি নব ও স্বয়ংক্রিয় শাট-অফ সুইচ রাখুন। ফ্রিজের খাবার নিয়মিত পরীক্ষা করুন, পচে যাওয়া খাবার ফেলে দিন। বিভ্রান্তিকর বস্তু যেমন কৃত্রিম ফল বা ম্যাগনেট সরিয়ে দিন, কারণ রোগী সেগুলোকে আসল খাবার মনে করে খেয়ে ফেলতে পারেন।

 

৪. বেডরুম: রাতের মনিটরের মাধ্যমে পড়ে যাওয়া বা সাহায্যের প্রয়োজনে রুম মনিটরিং ডিভাইস বযবহার করুন। পোর্টেবল স্পেস হিটার সরিয়ে দিন। পোর্টেবল ফ্যান ব্যবহার করলে নিশ্চিত করুন যে কেউ ফ্যানের ব্লেডের মধ্যে কিছু ঢোকাতে পারবে না। বৈদ্যুতিক কম্বল বা হিটিং প্যাডের নিয়ন্ত্রণ রোগীর নাগালের বাইরে রাখুন।

 

৫. বাথরুম: বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম সরিয়ে দিন, আউটলেট ঢেকে দিন। টুথপেস্ট, লোশন, শ্যাম্পু তালাবদ্ধ রাখুন, কারণ রোগী ভুল করে সেগুলোকে খাবার মনে করতে পারে। টাব/শাওয়ারে গ্র্যাব বার বা হাতল লাগান। দেয়ালের সাথে বৈপরীত্যপূর্ণ রঙের হাতল সহজে চোখে পড়ে। উঁচু টয়লেট সিট বা পাশে গ্র্যাব বার রাখুন। টাব এবং শাওয়ারে নন-স্কিড আঠালো স্ট্রিপ, ডিকাল বা ম্যাট ব্যবহার করুন। কার্পেটবিহীন বাথরুমে টাব, টয়লেট এবং সিঙ্কের পাশেও এই স্ট্রিপগুলো ব্যবহার করার কথা ভাবুন।

 

৬.যোগাযোগকে সহজ করুন: সাথে ধীরে ও শান্ত স্বরে কথা বলুন, জটিল প্রশ্ন এড়িয়ে চলুন। তাদের আবেগ  মনোযোগ দিয়ে শুনুন এবং পাশে থাকার আশ্বাস দিন। তাদের স্মৃতিশক্তি হারানোর জন্য তিরস্কার করবেন না। রোগের কারণে তাদের যুক্তি করার ক্ষমতা কমে যায়, তাই ভুল করলে তর্ক না করে মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে দিন। প্রয়োজনে হাত ধরে বা কাঁধে স্পর্শের মাধ্যমে তাদের আশ্বাস দিন।

 

৭.খাদ‍্যাভ‍্যাস ও ঘুম: আলঝেইমার রোগীর জন্য নিয়মিত রুটিন রাখা জরুরি। নরম ও সহজ খাবার শান্ত পরিবেশে পরিবেশন করুন, উজ্জ্বল প্লেট ব্যবহার করুন এবং পর্যাপ্ত পানি দিন। দিনে হালকা কাজ বা হাঁটা রাতে ভালো ঘুমে সহায়তা করে। শোবার ঘর সবসময় শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখুন।

 

আলজাইমা রোগীর যত্ন নেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য হলো তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করা এবং তাদের মর্যাদা বজায় রাখা। মনে রাখবেন, এই রোগের কারণে রোগীর মানসিক পরিবর্তন হচ্ছে, এটি তাদের ইচ্ছাকৃত আচরণ নয়। 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন