https://www.prothomalony.com/
14797
literature
শাহনাজ বেলীর সাথে আটলান্টায় একদিন
ড.আব্দুস সাত্তার
"আইলায় না; আইলায় নারে বন্ধু
করলায় রে দিওয়ানা
আইলায় না; আইলায় নারে বন্ধু
করলায় রে দিওয়ানা
সুখ বসন্ত সুখের কালে
শান্তি তো দিলায় নারে বন্ধু
আইলায় নারে ; ও বন্দু আইলায় নারে"
যাকে নিয়ে আজকের লেখা তাঁর প্রিয় একটি গান দিয়েই শুরু করলাম। তিনি হলেন শ্রোতাপ্রিয় লালন ও লোকজ সংগীতশিল্পী শাহনাজ বেলী। কুষ্টিয়ার এ শিল্পীর শুরুটা হয়েছিল বাবার সাথে লালনের গান করার মধ্য দিয়ে। ১৯৮৯ এ প্রথম ঢাকায় অনুষ্ঠান করতে আসা তাঁর। সেখান থেকে আনসার বাহিনীর অর্কেস্ট্রায় গান শেখার সুযোগ পান তিনি। ১৯৯০ সালে ঢাকার মঞ্চে গেয়ে প্রাথমিক পরিচিতি তৈরি হয়। এরপর তিনি নিজের প্রথম অ্যালবাম 'একবার পাইলে' প্রকাশ করেন ২০০৫ সালে। এখন পর্যন্ত একক, ডুয়েট, মিশ্র মিলে ১০০র বেশি অ্যালবামে গান গেয়েছেন তিনি। এছাড়াও কণ্ঠ দিয়েছেন চলচ্চিত্র, নাটক ও বিজ্ঞাপনে।
মা-বাবার প্রতি পরম শ্রদ্ধাশীল তিনি। নিজ দায়িত্বেই তিনি মা-বাবাকে হজ্ব করিয়েছেন। আবার তার নিজের একমাত্র কন্যা মোবাশ্বিরা কবির আভাকেও মানুষের মতো মানুষ করার চেষ্টা করছেন। শাহনাজ বেলী যে শুধু নিজের পরিবার আর নিজের গান নিয়েই ভাবেন-এমনটি একদমই নয়। তিনি শ্রোতা-দর্শকের কথা ভেবে যেমন ভালো ভালো গান প্রকাশের চেষ্টায় মত্ত থাকেন, ঠিক তেমনি আগামী প্রজন্মের মাঝে লালন সংগীতের আরও প্রসার ঘটাতে তিনি নিজ উদ্যোগে কুষ্টিয়াতে নিজ গ্রামে পশ্চিম আবদালপুরে 'শাহনাজ বেলী সংগীত একাডেমি' প্রতিষ্ঠা করেন।
গত ৩ এপ্রিল জাতীয় চলচ্চিত্র দিবসে একাডেমিটির যাত্রা শুরু হয়েছে। একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি শাহনাজ বেলী। একাডেমিতে বর্তমানে ৫০ শিক্ষার্থী গান শিখছেন। নিজের একাডেমি নিয়ে স্বপ্ন প্রসঙ্গে শাহনাজ বেলী বলেন, 'বিশেষত লালন সংগীত নিয়েই একাডেমি ঘিরে আমার স্বপ্ন। লালনের গানের আরও অনেক বেশি প্রসারের ক্ষেত্রেই এই একাডেমি বিশেষ ভূমিকা রাখবে। যেহেতু আমি লালনের গানে নিজেকে মগ্ন করেছি, আমি চাই এই গানের আরও প্রসার ঘটাতে। আমার একাডেমিতে যারা গান শিখবে, তারা মূলত লালন গানেই নিজেকে দক্ষ করে তুলবে। আমি চাই সত্যিকারের শিল্পীরা বেরিয়ে আসুক। লালনের গানের আরও প্রসার হোক। লালন সংগীতে আগ্রহীরা এখানে তালিম নিতে আসেন। এর চেয়ে বড় স্বপ্ন আর কী হতে পারে আমার। আমার সৌভাগ্য আমার মাথার ওপর আমার মা-বাবা ছায়া হয়ে আছেন। এটাও আমার জন্য অনেক বড় আশীর্বাদ।"
শাহনাজ বেলী এসেছিলেন আটলান্টা, জর্জিয়া ৩৯তম ফোবানায় গান করতে। চমৎকার গান পরিবেশন করলেন। সময় শেষ হবার পরেও দর্শকের অনুরোধে দুইটি গান করেন। অনুষ্ঠান শেষে সাধারণ মানুষের মতো অডিটরিয়ামের বাহিরে হাঁটছিলেন আর অনেকের অনুরোধে ছবি তুলছেন। আমিও সামনে যেয়ে কুশল বিনিময় করে কিছুটা সময় কথা-বারতা বলে একটি ছবি নিলাম। ছবি নেওয়ার সময় বলেছি আপনাকে নিয়ে কিছু লিখব এবং প্রচার করবো। এই গুণী শিল্পীকে নিয়ে লিখে শেষ করা যাবে না। শাহনাজ বেলী সত্যি একজন ভালো মনের মানুষ। তার কন্ঠ ও সুরের মূর্ছনা যেমন হদয়ে নাড়া দেয় তেমনি তার স্বভাবসুলভ ব্যবহার চমৎকারI শাহনাজ বেলী আপনি ভালো ও সুস্থ থাকুন এবং আপনার সব স্বপ্ন পূর্ণ হউক এই প্রত্যাশায়।
হাতির দয়া
ইয়াছিন ইবনে ফিরোজ
বাংলাদেশের সবুজ পাহাড় আর অরণ্য একসময় ছিল গভীর ও অবারিত। শীতল ছায়া, পাখির কলতান, ঝরনার শব্দ সব মিলিয়ে যেন প্রকৃতির স্বর্গরাজ্য। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষের সংখ্যা বাড়তে লাগল, আর সেই সঙ্গে শুরু হলো বনজঙ্গল উজাড়ের কাজ। গাছ কেটে ফেলা হলো ঘর বানানোর জন্য, জমি বানানো হলো চাষাবাদের জন্য। বনজঙ্গল সঙ্কুচিত হতে লাগল, আর তার সঙ্গে সঙ্কুচিত হলো বন্য প্রাণীদের আবাস। প্রাণীরা একে একে হারাতে লাগল তাদের নিরাপদ আশ্রয়। খাবারের সংকট দেখা দিল। শেয়াল আর হরিণেরা খাবার না পেয়ে অস্থির হলো, পাখিরা হারাল তাদের ডাল-পাতার নীড়।
সবচেয়ে বিপদে পড়ল হাতিরা, তাদের বড় দেহ। তাই তাদের প্রয়োজন বেশি খাবারের, অথচ খাবার নেই। তারা বাধ্য হয়ে নেমে এলো মানুষের ধানের জমিতে সোনালি ধানের শিষ তারা গিলে খেল, খেয়ে নিল গম ও কলা বাগান। কৃষকদের মনে তখন ক্ষোভ জমতে লাগল। জমির ফসল নষ্ট হলে ক্ষুধায় কষ্ট পায় কৃষকের পরিবার। তাই অনেকেই রাগে হাতিদের বাধা দিতে শুরু করল। কেউ লাঠি ও আগুন নিয়ে তাড়া করল, কেউ ফাঁদ পাতল, কেউবা গুলি চালাল। অনেক নিরীহ হাতি প্রাণ হারাল মানুষের হাতে। তবুও আশ্চর্যের বিষয় হাতিরা তাদের শক্তি দিয়ে কখনো মানুষকে আঘাত করল না। চাইলে তারা সহজেই গ্রাম গুঁড়িয়ে দিতে পারত, পাহাড়ি ঘরবাড়ি মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারত। কিন্তু তারা তা করল না।
একদিন গভীর জঙ্গলে একত্র হলো কয়েকটি প্রাণী। শেয়াল বলল, "হাতি ভাই, মানুষ তো তোমাদের একের পর এক হত্যা করছে। তোমার দেহ তো পাহাড়ের মতো বড়। এক লাফে তুমি একটি ঘর ভেঙে ফেলতে পারো, একটা শুঁড়ের আঘাতে মানুষ মাটিতে ফেলে পিষে মারতে পারো। কিন্তু তুমি কেন চুপ করে এতো অত্যাচার ও কষ্ট সহ্য করছ?"
হায়েনা হেসে হেসে যোগ দিল, "সত্যি কথা বলেছ শেয়াল। মানুষকে একবার শিক্ষা দাও। ভয় দেখাও। তবেই তারা হাতিহত্যা বন্ধ করবে।"
বনবিড়াল ফিসফিস করে বলল, "তাদের ধানের ফসল নষ্ট করে দাও, ঘর-বাড়ি ধ্বংস করে দাও। দেখবে কেমন ভয় পায়!"
বানর গাছ থেকে লাফিয়ে নেমে বলল, "হাতি ভাই, তুমি এত শক্তিশালী! অথচ মানুষ তোমাদের শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেন তাদের ছেড়ে দিচ্ছ?"
হাতি ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল, "তোমরা সবাই মনে কর আমি কেন প্রতিশোধ নিই না। শোনো, আমি তো প্রাণী। মানুষও প্রাণী। মানুষ তাদের ভাইকে হত্যা করে, জবাই করে, কষ্ট দেয় এটা আমি দেখি। তারা নিজেদের জাতের প্রতিই এত নিষ্ঠুর এবং তারা প্রতিনিয়ত এই পৃথিবীর ক্ষতি করে চলেছে। আমি কি তাদের মতো হবো? আমার দেহ বড়, আমার শক্তি অনেক। কিন্তু দয়াশীলতা আমার স্বভাব। আমি যদি কাউকে হত্যা করি, তবে আমি আর মানুষের মধ্যে যে অমানুষ আছে তার আর আমার পার্থক্য রইল কোথায়? যে মানুষ তার ভাইকে আঘাত করে, সে তো আমাকেও আঘাত করতে পারে। তবুও আমি মানুষ নামে অমানুষ নই আমি হাতি। আমার সৃষ্টিকর্তা আমাকে যে জ্ঞান দিয়েছে, তাই আমার জন্য যথেষ্ট। আমাকে আর আলাদা করে জ্ঞান অর্জন করতে হয় না।" সে এক মুহূর্ত থেমে আবার বলল, "মানুষের সুযোগ আছে মানুষ হয়ে অমানুষ হওয়ার। তাই তারা নিষ্ঠুর হয়, অমানুষ হয়। কিন্তু আমি হাতি, আমার কখনো অহাতি হওয়ার সুযোগ নেই। আমি হাতি হয়েই থাকব। আমার স্বভাব দয়া, তাই আমি দয়াশীল।"
হাতির কথা শুনে প্রাণীরা চুপ হয়ে গেল । তার চোখে ছিল শান্ত জ্যোতি, যেন সে সত্যিই অরণ্যের বয়োজ্যেষ্ঠ জ্ঞানী। শেয়াল মাথা নিচু করল, হায়েনা আর কথা বলল না। বানর অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
সেদিন থেকে তারা বুঝল, শক্তি যেকোনো জিনিসকে ধ্বংস করার, কাউকে কষ্ট দেয়ার বা অহংকার করার বস্তু নয়, শক্তির আসল মর্যাদা দয়ার মধ্যেই নিহিত। আর হাতির দয়াশীলতা হয়ে রইল বনজঙ্গলের এক শিক্ষণীয় শিক্ষা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ল। হাতির কথা শুনতে শুনতে হাতি প্রেমিক কিশোর রায়সানের ঘুম ভেঙ্গে গেল। রায়সান এক গরীব কৃষক বাবার ছেলে। তার স্বপ্নের কথা শুনে বাবার চোখ জলে ভরে উঠল। সে ফিরে গিয়ে বলল অন্য কৃষকদের, "আমরা হাতিদের উপর অন্যায় করেছি। তারা ফসল খেয়েছে ক্ষুধায়, কিন্তু আমাদের ঘর ভাঙেনি, সন্তান হত্যা করেনি। অথচ আমরা তাদের ওপর নির্বিকারভাবে, অন্যায়ভাবে গুলি চালিয়েছি। হাতি মানুষের মতো নিষ্ঠুর হতে চায়নি, অথচ আমরা মানুষ হয়েও অমানুষ হয়েছি।"
গ্রামে ছড়িয়ে গেল এই উপলব্ধি। অনেকেই সিদ্ধান্ত নিল হাতি হত্যার বদলে তাদের জন্য আলাদা খাবারের জমি রাখা হবে, পাহাড়ের গাছ আর কাটা হবে না, আগের মতো ঘন জঙ্গল ফিরিয়ে আনা হবে। তারপর থেকে সেই গ্রামে যখনই হাতির দল আসে, মানুষ আর গুলি চালায় না। তারা দূর থেকে হাতিদের দলের দিকে তাকিয়ে থাকে আর হাতি গুলো শুঁড় তুলে সালাম করে। এইসব দেখে মনে পড়ে যায় সেই কথাগুলোঃ মানুষ অমানুষ হতে পারে কিন্তু হাতি কখনো অহাতি হয় না।
কেতাবি বেগম
এম এ ওয়াজেদ
দু'দিন হলো কেতাবি বেগম মারা গেছে। গতকাল তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। কেতাবি বেগমের স্বামী আদর আলী দশ বছর আগে মারা যায়। তাদের দাম্পত্য জীবন একান্ন বছর সাত মাস একুশ দিনের। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে তাদের একমাত্র পুত্র সন্তান রজব আলী। আদর আলী ও কেতাবি বেগম তিন শতাংশ জমি কিনে সে জমির ওপর একটা খড়ের ছাউনি দিয়ে শোয়ার ঘরে বসবাস করে আসছিলো।
কেতাবি বেগমের বয়স যখন নয়, তখন তার পিতা অভাবের কারণে কাজের মেয়ে হিসেবে গ্ৰামের মাতব্বর রহিমুদ্দি মণ্ডলের বাড়িতে তাকে রেখে আসে। প্রথম প্রথম সারাদিন কাজ শেষে কেতাবি বেগম পিতার বাড়িতে রাতে ঘুমাতো। খুব ভোরে আবার চলে যেতো। এগারো বছর বয়স হতে আর পিতার বাড়িতে না ঘুমিয়ে মণ্ডলের বাড়িতে একা ঘুমায়। প্রথমে ভয় করলেও এখন একাকি ঘুমাতে ভয় করে না।
কেতাবি বেগমের পনেরো বছর বয়সে তার পিতা মাতা তিন দিন আগে পিছে মারা যায়। তার পিতার নিজ মালিকানাধীন দুই শতাংশ জমিতে একটা বাড়ি ছিলো। পিতৃ-মাতৃহীন কেতাবি বেগমের জীবন নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করে। কেতাবি বেগমের জন্মের দু'বছর পূর্বে একমাত্র ভাই কেরামুদ্দি আলী নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে মূর্খ ছিল তাদের পিতা ও মাতা। জীবন ও জগত-সংসারের সহজাত প্রশ্ন তাদের মনে উদয় হয়েছিল কি না, তা নিয়ে হয়তো কোনো দরদি মন গবেষণা করছে। কিন্তু সামাজিক বৈষম্যের দুঃস্বপ্নে তাড়িত ভয়ার্ত মুখগুলো রাষ্ট্রীয় বণ্টনের ভাগ আগেই খেয়ে শেষ করেছে।
অসহায়া কেতাবি বেগমের চোখের কান্না থামেনা। কান্নার সাথে অভিমান, অভিযোগ ও অভিশাপ ঝরে পড়ে। রহিমুদ্দি মণ্ডলের স্ত্রী কেতাবি বেগমের দুঃসময়ে সান্ত্বনা দেয়। কেতাবি বেগম জানে মানুষের জীবন পাঠ্যপুস্তকের সিলেবাস মেনে চলে না। তার মাথার ওপর ছাদ হয়ে এতো দিন পিতা মাতা ছিলেন। এখন থেকে সে কার কাছে মনের কথা খুলে বলবে ? কে তার কথা শোনবে ? কোনো কোনো মানুষের জীবন হঠাৎ কেনো জানি অন্ধকারের কালো মেঘে ঢেকে যায়, এর উত্তর কে দিবে ?
কেতাবি বেগমের বিয়ে ঠিক হয়েছে। পাত্রের নাম আদর আলী-এতিম ও দিনমজুর। আদর আলী গত দশ বছর ধরে রহিমুদ্দি মণ্ডলের বাড়িতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করে। রহিমুদ্দি মণ্ডলের স্ত্রী ঘটক সেজে নিজ বাড়িতে বিয়ের বন্দোবস্ত করে। এ বিয়েতে কোনো যৌতুক ছিলো না। মোহর ধার্য হয় এক হাজার একশো টাকা। আদর আলী একশো টাকা নগদ মোহর পরিশোধ করে। সেটাও রহিমুদ্দি মণ্ডলের স্ত্রীর কাছ থেকে ধার নেয়া। বিয়ের পর তাদের বাসরঘর কেতাবি বেগমের পিতার বাড়িতে সম্পন্ন হয়। বাসর রাতে কেতাবি বেগম তার ভালোবাসার মানুষটির সাথে অনেক অনেক কথা শেয়ার করে, বলে যে তারা একটানা এক বছর রহিমুদ্দি মণ্ডলের বাড়িতে কাজ করে যে টাকা পাবে, সে টাকা বছর শেষে একবারই নিয়ে আর কাজ করবে না। দুজনে মিলে কাছাকাছি দেড় লাখ টাকা পেয়ে আদর আলী একটা চার্জার রিকশা কিনবে । বাকি টাকা দিয়ে কয়েকটা ছাগল কিনে কেতাবি বেগম নিজে লালন পালন করে স্বয়ং সম্পূর্ণ হবে ।
আদর আলী এখন চার্জার রিকশা চালক। ইনকাম মোটামুটি ভালো। সংসারে খরচ করেও প্রতিদিন হাতে নগদ টাকা জমা হয়। ওদিকে কেতাবি বেগমের আদর যত্নে দুটো ছাগল বছর শেষে বৃদ্ধি পেয়ে সংখ্যায় ছ'টিতে দাঁড়ায়। কেতাবি বেগম বিয়ের এক বছর ছয় মাস পরে গর্ভবতী হয়ে পড়ে। নতুন অতিথির আগমন উপলক্ষে তাদের হৃদয় মন্দিরে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়। ছেলে বা মেয়ে হোক তাকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে এবং উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবে বলে তারা প্রতিজ্ঞা করে।
সেদিন ছিলো শনিবার। আষাঢ় মাস। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। কেতাবি বেগমের ছেলে হয়েছে তিন মাস হলো। বুকের দুধ খাওয়ানো শেষ হলে কেতাবি বেগম বাচ্চাকে ঘুম পাড়ায়। বৃষ্টির কারণে আদর আলী বাড়িতে অবস্থান করছিলো। হঠাৎ দেখে দরজার সামনে রহিমুদ্দি মণ্ডল আরো পাঁচজন লোক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটু পরে থানা পুলিশের একজন এসআই ও সাথে কয়েকজন কনস্টেবল ঘটনাস্থলে পৌঁছে। গ্ৰামের আরো লোকজন হাজির হয়। বৃষ্টি থেমে গেলে রহিমুদ্দি মণ্ডলের সাথে আসা লোকজন নিজেদের কোর্টের লোক পরিচয় দিয়ে কেতাবি বেগম ও তার স্বামীকে বাড়ি খালি করতে বলে এবং সে মর্মে কোর্টের জারি পরোয়ানা আছে বলে প্রকাশ করে।
উপস্থিত সবার সামনে রহিমুদ্দি মণ্ডল প্রকাশ করে যে, কেতাবি বেগমের পিতা মৃত্যুর এক বছর আগে এ জমি টাকা নিয়ে দলিল রেজিস্ট্রি করে দিয়ে গেছে। সে দলিল দিয়ে উচ্ছেদের মামলা করে কোর্ট হতে ডিক্রি পেয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জমির দখল না ছাড়ায় কোর্ট ডিক্রি জারি দিয়েছে। তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে কেতাবি বেগম কোলের বাচ্চার জন্য এক মাসের ভাড়া চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।
শনিবারের পরের সোমবার আদর আলী কোর্টে গিয়ে মামলার খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, রহিমুদ্দি মণ্ডল উচ্ছেদের যে মামলা দায়ের করেছিলো, তার সমন কেতাবি বেগমকে না দিয়ে জারিকারকের সাথে যোগসাজশ করে জারি দেখায়। মামলার আরজিতে রহিমুদ্দি মণ্ডল কেতাবি বেগমের পিতাকে দাতা হিসেবে যে দলিলের বর্ণনা দিয়েছে, তার পিতা সে দলিল রেজিস্ট্রি করে দেয়নি। রহিমুদ্দি মণ্ডল যেবার মেম্বার হয়েছিলো, বয়স্ক ভাতা দেয়ার নাম করে কেতাবি বেগমের পিতার বাড়িতে এসে কিছু কাগজপত্রে সই নিয়েছিলো।
কেতাবি বেগমের ছেলে রজব আলী মেধাবী ছাত্র। সে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে। একসময় এডভোকেট হিসেবে বারে যোগদান করে। সে রহিমুদ্দি মণ্ডলের ডিক্রিপ্রাপ্ত মামলার রায় ও ডিক্রির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। সে মামলার সমন হাতে পেয়ে রহিমুদ্দি মণ্ডল অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে জানে দলিল জাল। অপরদিকে, পূর্বের মামলার সমন মিথ্যাভাবে জারি করা হয়েছে। তার অসুস্থতা দিন দিন বেড়েই চলে। চূড়ান্ত শুনানির দিন রহিমুদ্দি মণ্ডল হার্ট অ্যাটাকে মারা যায় ।
কেতাবি বেগম ও তার স্বামী কবরে শুয়ে আছে। রজব আলী মায়ের কবরে গিয়ে কাঁদতে থাকে। ফিরে পাওয়া জমিতে রজব আলী একটা নৈশ বিদ্যালয় স্থাপন করে অক্ষর জ্ঞানহীন লোকজনের জন্য দান করে। রজব আলী অধ্যায়নে জানতে পারে, সমাজে হাজারো রহিমুদ্দি মণ্ডল অবশেষে পরাজিত হয়, কেতাবি বেগমেরা জয়ী হয় ।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন