https://www.prothomalony.com/

14698

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০১:৩৫

পরিযায়ী চিঠি

মধুরিমা দে 

 

আকাশে এই অসময়ে ধূসর মেঘ!

পরিযায়ী পাখিরা কালই যে যার ঘরে ফিরে গেছে।

তুমি কী এখনও তাকে চিঠি লেখো?

 

আমি এখন আর গাছে জল ঢেলে দিই না,

নদীর চরে সেই রুদ্রপলাশের স্মৃতি আজ বড় ফিকে!

শিমুল পলাশ জারুল অমলতাস-কত কী গাছ !

এখনও বুঝি বইয়ের ভাঁজে ফুল রাখো ?

 

চলে যাও প্রিয়—

আজ আর তোমার সাথে কথা বলার মন নেই আমার।

এই তনু-মন কেবলই পুড়ছে জ্বরে!

 

ঠিক এতটা পোড়ার কথা-তো ছিল না আমার!

 

 

মানবেতিহাস ও নরকের কার্বনকপি 

অনন্য কাওছার 

 

ধূপের মত উড়ে আহত হরিণ লাফের মানব-আর্তি;

দেখি মানবেতিহাসের আবলুস অধ্যায়—

আমি ধর্ষিতা নারীর চোখে দেখি মানুষ ও পৃথিবীর ভবিষ্যৎ,

জলের উপর প্রলেপিত ডুমুরের কাতর চিৎকারে 

আমি নাচাই বেদনার উদাম নর্তকী-  শ্মশানের জবা কুসুমের

বিশ্রী প্রলাপে কবি হয়ে উঠে খিলনগরীর অবুঝ বালিকা।  

কৃষাণ, লাঙ্গলের কর্ষণে মাটিতে কেবলই বেদনার চাষ

মনে সজীবতা নেই, বাতাসে ঘনীভূত কার্বনডাইঅক্সাইড 

মিথেনের সঙ্গে আমার বহুদিনের বন্দোবস্ত, শান্তিচুক্তি; 

এই বিধ্বস্ত পৃথিবীর উপরে আদিম নরকের কার্বনকপি

দেখতে পাই আমি, জলমিশ্রিত চোখে ঈশ্বরের ছায়া। 

 

 

নিয়তি 

ইসলাম মুহাম্মদ তৌহিদ 

 

প্রতিদিন নিজেকে কফির কাপ থেকে চুমুক দিয়ে খাই,

চিনির বদলে ফেলে দিই কিছু ভুল সিদ্ধান্ত।

তবু সকাল নামে—

একটা পরিত্যক্ত ডায়েরির মত,

যার প্রতিটি পাতায় গতকালের অনুশোচনার জলছাপ।

 

জীবনের দরজা খুলে দেখি 

এক টেবিলভর্তি সাদা কাগজ আর একটা ভাঙা কলম—

লেখা যায় না কিছুই,

তবু প্রতিদিন সেখানে জন্ম নেয় অদৃশ্য চুক্তি,

যাতে সই করি নিজের অজান্তেই।

 

 

 

ক্লান্তিতে শিল্পী হৃদয় 

সোহরাব হোসেন 

 

বলবো বলবো করে কেটে গেল কতটা দিন, মাস। 

অযথা চিন্তার ভিড়ে-সুতরাং না বলাটাই এখন উত্তম ;

কারণ বলার ধৈর্যটা যদিও আমার মস্তিষ্কে আর নেই

তবু আজও আফসোসে পিছনে ঘুরে হাঁটি ;

অতীত শব্দরা যেন কেবলই একবুক স্মৃতিতে ভরা! 

 

ভাবতে ভাবতেই বেলা গড়িয়ে খাড়া দুপুর খা খা রৌদ্র 

নিমিষেই বিস্তার দক্ষিণা বাতাসে পুবালি মেঘের তেজ, 

সহসা মস্তিষ্ক জুড়ে নেমে এলো ঝিরিঝিরি বৃষ্টির শব্দ। 

হঠাৎ করেই শব্দরা তাল ছন্দ হারিয়ে পতনেই নিশ্চুপ! 

 

সুরে জেগেছে বেসুরে টান ক্লান্তিতে বিষন্ন শিল্পী হৃদয়। 

অবশেষে বলার মতো সময় ধৈর্য হারিয়ে নিরাকার! 

 

 

 

একটি অসমাপ্ত কবিতা

জহিরুল হক বিদ্যুৎ

 

তবু আমরা থেকে যাই

মনের ভিতরে ফ্র্যাগমেন্ট ফ্লেভারের মতো,

যেখানে নিঃশ্বাস হয়ে ওঠে অতীতের চিঠি।

আমরা কেউ কারো নই,

তবু কত কথা জমে থাকে ঠোঁটের কোণে

না বলা, অপ্রকাশ্য, অথচ প্রিয়।

বুকের গভীরে এক আকাশ, যেখানে তারারা 

তোমার নাম ধরে জ্বলে ওঠে।

তবু আমরা থেকে যাই,

একটা পুরনো অপেক্ষার পাশে,

অদৃশ্য মায়ায় বাঁধা- ভাষা নেই, ব্যাখ্যা নেই,

তবু ছেড়ে যাওয়া হয় না কোনোদিন!

এই থাকাও একদিন হারিয়ে যাবে

তবু মায়া ফুরাবে না।

তুমি থাকবে, আমি থাকব

একটা অসমাপ্ত কবিতার মতো।

 

 

কাশফুলের গভীর গল্প

ফারুক মোহাম্মদ ওমর

 

দুই শীতের মাঝখানে একটি পুরস্কার

আমার দিকে অভ্যন্তরীণ ব্যাধি নিয়ে তাকিয়ে আছে

আমি কালিগঙ্গা নদীতে ভেসে আসা

মুর্মূষু শিশুটির মতো অসহায় হয়ে চেয়ে রইলাম।

 

বহু মানুষ সেদিন

সংক্ষিপ্ত আশ্বিনের আয়ু জানিয়ে

আমাকে বলেছিলো- উঠে এসো, ভিড়ে চিৎকারে

এই যে এদিকে শব্দের যুদ্ধ ভেলায়।

 

আমি দুই শীতের মাঝখানে

কাশফুলের গভীর গল্পে

একমাত্র মায়েরই ডাক শুনতে পেলাম

'ওই দিকে যাসনে বাবা-

ওটা সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিজমের আড্ডা'।

 

 

বুকপকেট

মাজহারুল ইসলাম 

 

গোঁফ ওঠা কৈশোরে হাফশার্টের 

বামপাশে ছোট্ট থলিটা 

সারাক্ষণ যেখানে বইয়ের ভাঁজে চ্যাপ্টা হওয়া 

গোলাপের গোটাকয়েক পাঁপড়ি জমা থাকতো। 

সময় সুযোগের অপেক্ষায় কখনও কখনও 

সাবানফেনার সাথে ভেসে যেত কলের জলে,

তারপর আবারও নতুন করে বইয়ের পাতা থেকে 

আরও কয়েকটা সুদর্শন পাঁপড়ি  

খুঁজে খুঁজে জমা করতাম ঠিক ঐখানে,

বুকের পাঁজর বরাবর ছোট্ট থলিটায়। 

 

এখন ও নানা রঙবেরঙের হাফশার্ট পরি

থলি ভর্তি সিগারেট আর পাঁজর জুড়ে 

পারফিউমের গন্ধ ছাড়া আর কিছুই থাকেনা সেখানে। 

মাঝেমধ্যে ভুল করে হাতড়াতে হাতড়াতে ভুলেও

একটা পাপড়ি মেলে না বুকপকেটে! 

 

 

যান্ত্রিকতাবাদ

ফারজানা ইয়াসমিন 

 

নিশুতি রাতে নির্লিপ্ত চাঁদের চেয়ে থাকা, 

জ্যোৎস্নার বুকে ঢেউ তোলে আঁকাবাঁকা। 

কুয়াশা ঢাকা শহরে চাদর মুড়িয়ে জেগে থাকে 

নিশাচর পেঁচার ঘুমহীন দু'টি চোখ। 

পদ্মের শরীরে অধিপত্যের হুল ফুটিয়ে বসে প্রাণ ভোমর, 

নিকোষ কালো চোখে তাকিয়ে আকাশ ঝরায় শুধু অশ্রু। 

নাড়ী ছেঁড়া মায়ায় জড়িয়ে থাকা সবুজ পাতায় 

আজ বিবর্ণতা এঁকে দিয়েছে মাতৃগর্ভে ঠাঁই দেওয়া 

বৃক্ষ নিজে।

অনুভূতির মৃত্যু হচ্ছে রাজপথে চলন্ত যান্ত্রিকতাবাদ চর্চায়, 

ক্ষতচিহ্ন লেগে আছে অর্ধমৃত রঙচটা দেয়ালের গায়। 

 

 

কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যে দেশপ্রেম 

সাঈদুর রহমান লিটন 

 

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য প্রতিভাবান ব্যক্তিত্ব। তাঁর কাব্য ও গানে যেমন বিদ্রোহের ঝড় উঠে, তেমনি ফুটে ওঠে অগাধ দেশপ্রেম ও ভালোবাসা। ঔপনিবেশিক শাসনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ উপমহাদেশ যখন নিস্তব্ধ, তখন নজরুল ছিলেন দ্রোহের দীপ্ত কণ্ঠস্বর। তাঁর কাব্যে দেশপ্রেম কেবল আবেগ নয়, বরং এক রকম সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে সবার মাঝে প্রতিফলিত হয়।

 

নজরুলের দেশপ্রেম প্রথাগত বা ভক্তিমূলক ধাঁচে বাঁধা নয়। তাঁর লেখায় দেশপ্রেম এসেছে বিদ্রোহের মাধ্যমে, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বানে। তিনি বলেন, 

"বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত, আমি সেই দিন হব শান্ত, যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবেনা, আমি সেই দিন হব শান্ত।"

এই কবিতায় নজরুলের দেশপ্রেমের নিগূঢ় রূপ প্রকাশ পেয়েছে। দেশপ্রেম মানে শুধু দেশকে ভালোবাসা নয়, বরং মানুষের মুক্তির জন্য সংগ্রাম, সাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা মাধ্যমে ফুঁটে ওঠে।

তাঁর বিখ্যাত কবিতা আনন্দময়ীর আগমনে,  ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অমর দলিল। এই কবিতায় তিনি সরাসরি ইংরেজ শাসকদের সমালোচনা করেন, "মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি,মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো ফলে অস্ত্র ধরি।" এখানে তাঁর দেশপ্রেম রূপ নিয়েছে কৃষকের প্রতি সহমর্মিতা, মাটির প্রতি প্রেম, ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি হিসেবে।

 

নজরুল কেবল বাংলার জন্য নয়, সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর গান, "চল চল চল, উর্ধ্ব গগণে বাজে মাদল,অরুণ প্রাতের তরুণ দল, তোরা চলরে চল চল চল"-আজও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রণসংগীত হিসেবে চালু আছে। এই গান শুধু উজ্জীবনী শক্তি নয়, বরং একটি জাতিকে জাগিয়ে তোলার আহ্বান।

নজরুলের দেশপ্রেম ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের জন্য। তিনি বারবার বলেছেন, হিন্দু-মুসলিম এই দ্বন্দ্ব নয়, ঐক্যই দেশের মুক্তির পথ। তাঁর কবিতায় তিনি বলেন, "গাহি সাম্যের গান"-এই সাম্যের বাণীই প্রকৃত দেশপ্রেমের পরিচয় বহন করে, যেখানে জাতি গঠনের ভিত্তি হয় মানবিকতা ও সম্মিলিত চেতনা।

 

নজরুল ইসলামের কাব্যে দেশপ্রেম এক গীতিকাব্যিক দ্রোহ, যেখানে দেশ মানে কেবল ভৌগোলিক সীমা নয়, বরং মানুষের অধিকার, সম্মান ও স্বাধীনতার প্রতীক। তাঁর লেখা আজও যুগে যুগে মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, সাহস জোগায়, এবং  অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার শক্তি যোগায়। এটাই প্রকৃত দেশপ্রেম।

নজরুল ইসলামের দেশপ্রেম অন্ধ ভক্তি নয়, বরং মুক্তির দর্শনে উদ্ভাসিত এক সংগ্রামী চেতনা। তাঁর কাব্য আমাদের শেখায় কিভাবে দেশকে ভালোবাসতে হয়, এবং সেই ভালোবাসাকে রূপ দিতে হয় কাজ, আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে। তাঁর দেশপ্রেম আজও প্রাসঙ্গিক, আজও আমাদের পথ দেখায়।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন