https://www.prothomalony.com/
14632
literature
পাখি
জামাল সৈয়দ
আজ খুব ভোরে
আমি তখনও ঘুমের ঘোরে
জানালার পাশে এসেছিল এক নীল রঙা পাখি
আমায় ডেকে প্রশ্ন করেছিল,
জলে ভরা কেন তোমার আঁখি?
বলেছিলাম একদিন সময় করে এসো
ঐ নদীটির বাঁকে
আকাশ যখন মেঘের রঙ আঁকে
শোনাবো জীবনের সব গল্প
যতটুকুই বা বাকি আছে অল্প...
জল দিয়েই তৈরি যে আঁখি
বল তার অশ্রু কোথায় লুকিয়ে রাখি?
রাতে গান না শুনলে যাদের ঘুম আসে না
অমিতাভ সরকার
শিল্প যাদের মনের আনাচে-কানাচে তাদের জন্য
কথায় কথায় শুকনো হাসির ভালোবাসা কথাটা ভুল
গল্পের দোহাই দিয়ে সকালে তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে
ভেবে কোনোরকমে নাকেমুখে গুজে রাস্তায় নেমেই প্রাণপণে ছোটা, কিংবা খাবার নষ্ট হবে বলে রাতে পেট ঠেসে শোয়ার আগে কোল্ড ড্রিংকস নেওয়া অনেকের যেমন অভ্যাস,
তেমনি সারা বছর যারা নিরামিষ খেয়ে ভাবেন, দিন রাতের দূরত্ব এত কম হলো কেন, তাদের বলি, আকাশ আর মাটির রং এখনো চেনা আছে বলেই সারাক্ষণ কাজের এত কষ্টের পরে নিজের গলাটা শুনে বুঝতে পারি হারমোনিয়ামটা কতদিন নিয়ে বসা হয় না-
তখন থেকে চেষ্টা করলে আমিও আজ আমিও হয়তো গুগলের গাল ভরা খোলা মাঠে শাস্ত্রের নামাবলি গায়ে পছন্দের জল বিশেষজ্ঞ হতে পারতাম।
মুখোশের ভিতর মুখোশ
রুদ্র সাহাদাৎ
কতো আর রক্তের খেলা
কতো আর লাশের মিছিল
নিরব দীর্ঘশ্বাস ঘরে ঘরে
শিশুরা উড়ে যায় হয়ে ষিশু
খোলা আকাশ -রোদ বৃষ্টি ঝড়..
মানুষের দীর্ঘশ্বাস উড়ে যায়
সীমানা পেরিয়ে আরও দূর
শূন্যতায় ঘেরা জীবন
নো ফুড, নো ওয়াটার, নো হোম
নো ফুড, নো ওয়াটার, নো হোম
ফিলিস্তিনের মতো বিধ্বস্ত যৌবন
ভাঙ্গছে কেবল ভাঙ্গছে চারদিক
চোখ মেলে দেখি মুখোশের ভিতর আরও মুখোশ।
যে আগুন নিভানো যায় না
আ ই না ল হ ক
আজ কোন আনন্দোৎসবে গা ভাসাবো না
আজ কোন মেকি প্রলোভনে নিজেকে জড়াবো না
সূর্য গ্রহণের দিনে উৎসব মানায় বলো?
উৎস ভুলে যাওয়া অথবা ভুলতে চেষ্টা করা অপরাধ,
আর যা হোক আগুন নিয়ে খেলা যায় না
আমাদের অন্ধত্বের সুযোগে চাঁদ আলো হারিয়েছে বলে
নিত্য যে মিথ্যাচার করো, যখন দৃষ্টিশক্তি ফিরবে তখন?
আকাশের গায়ে কালিমা লেপন অসম্ভব,
সমুদ্রের বুকের গর্জন থামানো অসম্ভব
তদুপরি দুরভিসন্ধি সফল হলে ব্যর্থ হয় সকাল
তদুপরি দুরভিসন্ধি সফল হলে ব্যর্থ হয় ইতিহাস
কবি নজরুল
আব্দুস সাত্তার সুমন
চুরুলিয়ায় জন্ম তাহার ক্ষুধার জ্বালা সয়ে,
তবু গেল লেখনিতে হাজার লেখা বয়ে।
বজ্রকন্ঠে মধুর সে গান লেখায় তাহার নূর,
সবার তরে বিলিয়ে গেছেন স্বাধীনতার সুর।
নজরুল ছিলেন বিদ্রোহী আর ছন্দস্বরের কবি,
বাংলাভাষার সাহিত্যে সে উজ্জল এক রবি।
আত্মহত্যা
শিশির আজম
'ভালো একটা বই', সে বললো,
'তোমাকে অনেক দিন বাঁচতে শেখাবে।'
বইগুলো আগের মতোই আছে
আলমারিতে,
পাতাখোলা একটা বই
টেবিলে।
টেবিলল্যাম্প, সাদা কাগজে পেন্সিলের আঁকিবুকি,
কাগজ-কাটা রঙিন ফুল--
যেন কোন বাচ্চার কাজ।
'ভালো একটা বই', সে বললো,
'যেখানে তুমি যেতে চাও
সেখানে নিয়ে যেতে পারে
তোমাকে।'
স্তবক
নবী হোসেন নবী
.
প্রেমের উপন্যাস পড়েছি
পড়া হয়নি তবু
ভালোবাসার শেষ অধ্যায়।
যেখানে তাজমহলের ভেতর
শান্তিতে ঘুমায় নারী মমতাজ
বাহিরে মোগলরাজ
আলপনায় এঁকে দেয়
প্রমের কারুকাজ।
.
ফোটা ফোটা বৃষ্টি পড়ে পদ্মপাতায়
মাকড়সা জাল বোনে কবিতার খাতায়
ছন্দের সন্ধানে কবি ঘুরে নিসর্গপুরে
মাকড়সা ডেকে বলে-
আমার জালটা তোমার ঘরে
পদ্মপাতার মত বাতাসে নড়ে।
তুমি আমার শুভ্র
কাজী নাজরিন
প্রাণে প্রাণে মিশে গড়েছো বিস্তৃত আকাশ
যে আকাশ ভালোবেসে জ্যোৎস্নায় স্নান করে-
মনোজগৎ ভিজিয়ে দেয়,
আর সেখানে সুখের নির্লিপ্ত আভায় গড়ে তোলা
স্বর্গরাজ্য উঁচু পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
সমুদ্রসম হৃদয় হতে আলিঙ্গনের
সুর বাজে প্রতিনিয়ত,
বেসুরো কন্ঠের গানও কবিতায় বলতে ইচ্ছে করে,
ওগো পাহাড় তুমি, আকাশ তুমি
বিশাল সমুদ্র তুমি, বিস্তৃত মরুভূমি!
যা-ই বলি না কেন, মনে হচ্ছে কমতি আছে,
তবুও তোমায় শুধুমাত্র শুভ্র বলেই ডেকে যাবো,
শুভ্রতা ছড়িয়ে ঠিক এমনই থেকো.....!
গভীর জলের কান্না
পলি শাহীনা
সার্টিফাইড নার্স বিলকিস আক্তার আমার কর্মস্থলের পাশের ক্লিনিকে সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজ করে। ওর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় কফিশপে। নিউইয়র্কের মাল্টিকালচার সোসাইটিতে পোশাক পরিধানে বিশেষ কোনো নিয়ম নেই। যে যার খুশী ও ইচ্ছেমতো যে কোনো পোশাক পরলেও এশিয়ান, চাইনিজ, স্পেনিশ, আফ্রিকান মানুষগুলোর রঙ, গড়ন, প্রকৃতি দেখে সহজে একে অন্যকে চিনে ফেলে। তো, পোশাক যেমনই হোক স্বজাতিকে চেনা যায়।
কোনো এক শীতের সকালে কফি কেনার জন্য একই সারিতে অপেক্ষারত অবস্থায় পরিপাটি ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরিহিত স্বজাতি বিলকিসকে চিনতে আমার বেগ পেতে হয় নি। আমিই প্রথম কথা বলি। বিলকিসও প্রথম সাক্ষাতে আমার সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলে, কাছে টেনে নেয়। সেদিন থেকেই আমাদের ঘনিষ্ঠতা শুরু। শেকড় ছেড়ে আসা মানুষগুলো কারও মধ্যে স্ব দেশের ঘ্রাণ পেলে অতি সহজেই আপন করে নেয়।
পরিচয়ের পর হতে লাঞ্চ ব্রেকে বিলকিস আমার কাজের জায়গায় ছুটে আসে। মায়ের ভাষায় কথা বলার যে কী অদ্ভুত আনন্দ, প্রবাসী মাত্রই জানে। ওই আনন্দটুকু নিংড়ে নিংড়ে উপভোগ করতে ও কখনও ম্যাংগো, কেরোট জুস, কখনওবা হাট ভ্যানিলা কফি হাতে আসে। মিষ্টিভাষী বিলকিস আর আমি জমিয়ে গল্প করি। গল্পের বেশির ভাগজুড়ে থাকে ফেলে আসা দেশ-পরিবার- স্বজন, গান- গল্প - কবিতা ইত্যাদি। এভাবে রোজ আমাদের কর্মমুখর দিনের মধ্যবর্তী অবসরটুকু ভরে উঠে হাসি- আনন্দ, প্রাণচঞ্চলতায়। নির্দিষ্ট সময় শেষে বুকপকেটে সুখ স্মৃতি নিয়ে আমরা যে যার কাজের জায়গায় ফিরে যাই।
উত্তর গোলার্ধের প্রচণ্ড শীতের দেশ আমেরিকায় শীতের চাদর জড়িয়ে বাঁচতে হয়। নাতিশীতোষ্ণ দেশের মানুষ আমি, জীবনের প্রয়োজনে বরফ মাড়িয়ে কাজে গেলেও মন জমে আছে। কফি হাতে উষ্ণতা নিয়ে বিলকিস আসবে, সে অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছি। দূর থেকে ওকে আসতে দেখে আমার মন ময়ূরের মতো নেচে ওঠে। ভাবি, ঝিম ধরা সকাল, শীত শীত অনুভূতি কেটে যাবে এখনই। শীতের পোশাকে মোড়ানো ওকে দূর হতে বুঝতে না পারলেও, কাছে আসতেই ওর শুকনো মনমরা মুখটা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্য দিনের মত আজ ওকে প্রাণবন্ত দেখাচ্ছে না। অনেকটা নীরবে আমার পাশে বসে হাতের কফি শেষ করে উঠে যায়। আমি ওর পথ আগলে বলি,
-তোমার কী শরীর খারাপ?
শীতল গলায় উত্তর দিল,
-শরীর ঠিক আছে, মন খারাপ।
-কী হয়েছে?
-কাজের জায়গায় কলিগের সাথে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সে আমাকে রিফিউজি বলেছে। যদিও পরে সে সরি বলেছে, তবুও মনটা ভাল হচ্ছে না।
বিলকিসের কথা শুনে মনে পড়ে যায় আমার নিজের কথা। কয়েক বছর আগে আমি নিজেও একই ভৎর্সনার স্বীকার হয়েছিলাম আমেরিকান কলিগের কাছ হতে। কাজে সময়মতো না আসা এবং আসার পরও কাজের প্রতি মনোযোগ না দেওয়ায় বাক বিতন্ডার এক পর্যায়ে সে রেগে গিয়ে আমাকে রিফিউজি বলেছিল। রাগ নামার পর সেদিন সেই লোকটাও আমাকে সরি বলেছিল। অনেক বছর আগের বুকের ক্ষতটা আজ যেনো আবার মাথা ছাড়া দিয়ে ওঠে।
আমরা দু'জনই চুপ হয়ে আছি। কারো মুখে কোনো কথা নেই।
মৌনতা ভেঙে বিলকিস শূন্যে তাকিয়ে বলে,
-এই ছোট্ট আমিটার গল্প শুনবে? অনেক পথ পেরিয়ে এসে যে আমিটার জন্য আজ বড্ড মায়া হয়।
-হুম, শুনব।
-আমার দাদা ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন, বাবা মুক্তিযোদ্ধা। বাবা-মায়ের আদরের সন্তান আমি। পুতুল খেলায় ঘরের কোণে কখনো মন বসতো আমার। স্কুলে পড়াকালীন দাবা প্রতিযোগিতায় মফস্বল থেকে জিলা শহরে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলাম। আমার পরিবার এবং স্কুল, কলেজের শিক্ষকরা আমাকে ঘিরে স্বপ্ন বুনতো। কলেজে পড়ার সময় রাস্তার দ্বারে নিজ হাতে লাগানো কাঠ গাছগুলো অনেক বড় হয়েছে। পথচারীদেরকে এখন বুক চিতিয়ে ছায়া দেয়। ঝড়, বৃষ্টির মত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে দেশ ও মানুষকে রক্ষা করে। গতবছর দেশে গিয়ে গাছের গায়ে সাদা রঙে আমার নাম লিখে এসেছি।
বড় ভাই বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেয়ার পর আমারও ইচ্ছে ছিল পড়াশুনা শেষ করে দেশের সেবায় নিজেকে সঁপে দিব।। দেশকে ভালোবেসে দাদা, বাবা, ভাইয়ের মতো দেশেই থাকবো, কিন্তু তা আর হলো না। বাবা-মায়ের ইচ্ছেতেই প্রাবাসীর সঙ্গে বিয়ে হয়। এদেশে এসে অনেক বছর আমি দেশের সবুজ পাসপোর্ট বহন করেছিলাম, আমেরিকার নাগরিকত্ব পর্যন্ত নিই নি।
আট বছর পর দেশে ফিরে গিয়ে অনুভূতিগুলো চেনা মনে হলেও দৃশ্যগুলো অচেনা লাগে। আমার পরিবারেই দেখলাম ছোট ভাই-বোনগুলো ভালো ফলাফল নিয়ে পড়াশুনা শেষ করে, সার্টিফিকেট হাতে হন্যে হয়ে চাকরি খুঁজছে, পাচ্ছে না। ওদের চোখে ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন জ্বলজ্বল করছে , কিন্তু স্বপ্ন পূরণের জায়গা খুবই সীমিত।
দেশে যাওয়ার কয়েকদিন পরই সকলে জিজ্ঞেস করা শুরু করেছে, আমি কবে নিউইয়র্কে ফিরে যাব? মামাতো ভাই অনুনয় করে বললো, তাকে ব্যবসার জন্য আমি যেনো পাঁচ লক্ষ টাকা ধার দিই। পাঁচ লক্ষ টাকা পেলে বড় ছেলে হিসেবে সে ব্যবসাটা শুরু করবে, পরিবারের হাল ধরবে। আমার মাথা তখন লাটিমের মত ঘুরতে লাগলো। চারপাশে শিক্ষিত এতো বেকার ছেলেমেয়ে, এবং তাদের বাবা-মায়ের করুণ চাহনি আমার বুকে তিরের ফলার মত আঘাত করে। নিশ্চুপ আমি কান্না গিলে কয়েকদিন পরই এদেশে ফিরে আসি।
এদেশে কাজ করে আমার জীবনধারণের সুযোগ আছে, দেশে ওদেরতো সে সুযোগ খুবই কম। সেবার দেশ থেকে এসেই আমেরিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করি। কাজে মনোযোগ দিই, দিনরাত পরিশ্রম করে দেশে টাকা পাঠাই। আমার পাঠানো টাকায় মামাতো ভাই ব্যবসা শুরু করে, পরিবারের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলে। ফুফাতো বোন উচ্চশিক্ষা শেষে এখন কলেজে শিক্ষকতা করে। নিউইয়র্ক থেকে পাঠানো আমার টাকায় পড়াশুনা শেষ করে ফুফাতো বোনটা দেশের ছেলেমেয়েদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে, ভাইটা পরিবারের হাল ধরেছে। ওরা বেশ হাসিখুশি আছে, শুধু আমার আর দেশে ফিরে যাওয়া হলো না। এদেশেই রয়ে গেলাম রিফিউজি হয়ে।
বিলকিসের জীবনের গল্প শুনে শীতের মধ্যেও আমি ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে যাই। কথাগুলো শেষ হতেই অশ্রুসজল চোখ মুছে ও চলে যায়। আমি ওর চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থেকে মন খারাপের অঝোর বৃষ্টিতে ভিজে যাই, ভেসে যাই।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন