https://www.prothomalony.com/

14572

literature

সাহিত্য

উত্তরের জনপদ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৫ ০৮:৫৮

ভূমিকাঃ বিদেশে গিয়ে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখলেও বাস্তবতা প্রায়ই হয় ভিন্ন। প্রবাস জীবনের একদিকে থাকে সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা, অন্যদিকে থাকে বিচ্ছিন্নতা, মানসিক একাকিত্ব, কিংবা সবচেয়ে ভয়াবহভাবে প্রিয়জনের অবহেলা। এবারের উত্তরের জনপদ সমৃদ্ধ করেছেন-রাশিদা কামাল ও শামছুন ফৌজিয়া। তাদের গল্প আমাদের দেখায়-আমেরিকার প্রবাস জীবনে স্বপ্ন ও বাস্তবের এই দ্বন্দ্ব কেমন করে মানুষের ভেতরকে নাড়িয়ে দেয়। আশা করি এই গল্প দুটো পাঠকের মনে প্রবাস জীবনের আড়ালের বাস্তবতাকে নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করবে। 

ধন‍্যবাদান্তে- সোহানা নাজনীন/ ফরিদা ইয়াসমিন। 

 

 

 

বাঙালি কমিউনিটিতে আমার মূল্যায়ন

রাশিদা কামাল


 


 

নভেম্বর মাস। স্কুলে বসে পরীক্ষার খাতা চেক করছিলাম। এ সময় বাসা থেকে ফোন এলো-রূপমের ফোন। অল্প কথা তবুও এতে আমি নড়েচড়ে বসলাম। কথাটা ছিলো-আমেরিকান এম্বাসি থেকে ফোন এসেছে আমার ইন্টারভিউয়ের তারিখ জানিয়ে।

যথা সময় ইন্টারভিউ দিলাম। এরপর যাবার পালা। দিনও ঠিক হলো। এরই মধ্যে আমি কথাটা প্রিন্সিপালকে জানালাম। শুনে তিনি মোটেই খুশি হলেন না। সিরিয়াস মুখ করে বললেন, কেন যাবে ওদেশে? তুমি এখানে খুব ভালো আছো। 

আমি মিনমিনে গলায় কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারলাম না। শুধু একটু হাসলাম। এর আগে আমি ভিজিট ভিসায় আমেরিকা গিয়েছি, তবে এবারের যাওয়াটা অন্য রকম লাগছে। বার বার মনে হচ্ছে এবার আমি সব ছেড়ে চলে যাচ্ছি। উত্তেজনার পাশাপাশি বিষণ্ণতাও ঘিরে রইলো আমাকে। 

ডিসেম্বর মাস। শিকাগো থেকে কলম্বাস যাব। বেশ অনেকটা পথ। এখানকার শীতের সাথে আমার পরিচয় নেই। তাই জুবুথুবু হয়ে গাড়িতে উঠলাম। রথী চাইছিলো রাতের শিকাগো দেখাতে, কিন্তু আমার খুব ঘুম পাচ্ছিলো। কথার ফাঁকে ফাঁকে আমি ঘুমিয়েও পড়েছিলাম।

এভাবেই এক সময় বাসায় পৌঁছালাম। দিন না রাত সে হিসেব না করেই খাওয়া - দাওয়া সেরে ঘুমাতে গেলাম। এভাবে ঘুম আর জেগে থাকার ভেতর দিয়ে কাটলো সাতদিন। ঘুমের ঘোর কাটার পর বুঝলাম বাসায় আমি একা! সবাই যার যার কাজে চলে গেছে। আমার সঙ্গী কেবল কাঠবেড়ালি আর খরগোশ। আমি একাই পড়ে আছি। এই একাকিত্ব আমার ভালো লাগলো না। কয়েকদিনের মধ্যে একাকিত্বটা দুঃসহ হয়ে ধরা দিলো। মনে পড়লো প্রিন্সিপালের কথা- "এখানে তুমি ভালো আছো....!"

একদিন ভয়ে ভয়ে রথীকে বললাম, এখানে ভালো লাগছে না। আমি চলে যাব। রথী ব্যাপারটা বুঝলো। নরম সুরে বলল, কয়েকটা মাস থাকো তারপর ঢাকা যেও। 

রথীর কথায় আমার মন গলল না। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম চলেই যাব। সবার অনান্তরিকতা আমার ভালো লাগছে না।আমি আমার বর্ণিল জীবনে ফিরে যেতে চাই! মনে হতো আমি পড়ে আছি কলম্বাসে কিন্তু আমার মন পড়ে আছে ঢাকা, উত্তরায়।

সত্যিই আমার জীবনটা ছিলো কর্মময়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নানা কাজে জড়িয়ে থাকতাম। সেই আমি নিজেকে খুঁজে পেলাম ভীষণ একাকিত্বের মাঝে। কেউ কথা বলে না যার যার কাজ নিয়ে সবাই ব্যস্ত। আমি সারাদিন একা বসে থেকে কখনও বই পড়ি, টিভি দেখি আর ফোনে কথা বলি। তবুও সময় ফুরায় না! নিঃসঙ্গতা কাটে না। 

ক্রমেই মানসিকভাবে দুর্বল হতে লাগলাম। মাঝেমাঝে বেয়ানের বাসায় যাই। সেখানে গেলে কিছুটা চাঙ্গা হই। আমার ইচ্ছে হতো বেয়ানের বাসায় থেকে যেতে । কিন্তু কথাটা লজ্জায় বলতে পারতাম না। অনেক সময় রথীরা দাওয়াতে যায়। আমাকেও সঙ্গে নিয়ে য়ায় কখনও কখনও। সেখানেও একই অবস্থা-কেউ আমাকে তেমন চেনে না। তাই পাত্তা পাওয়ার প্রশ্নই আসে না। যার যার গ্রুপ নিয়ে তারা গল্পে মশগুল হয়। আমি সেই একা আগের মতো। প্রায়ই কান্না পেত। আর তখনই মনে পড়তো প্রিন্সিপালের কথা- "কেন যাচ্ছো....?"

খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা আমার অভ্যেস। কলম্বাসে আমার রুমটা ছিলো পুবমুখী ।আমি পুব আকাশের দিকে তাকিয়ে সূর্যের নরম গোলাপি রঙ থেকে কমলা রঙের পরিবর্তনের অপূর্ব দৃশ্য দেখতাম। আমার জানালার আলসেতে এক ঘুঘুদম্পতি বাসা বেঁধেছিল-আকাশটায় আলো ফুটতে না ফুটতে ঘুঘুদম্পতি মিষ্টি সুরে ডেকে উঠতো। তখন আমার একাকিত্ব কিছুটা হলেও দূর হতো। 

ওদের ডানা ঝাপটানোর শব্দে আমি শিহরিত হতাম । মনে হতো আমি একা না! আমার সঙ্গী কেউ আছে! 

একটু বেলা হলে কাঠবেড়ালি আর খরগোশের আনাগোনা টের পেতাম। কখনও কখনও মেপেল গাছ থেকে পাখিদের ডাক ভেসে আসতো। আমি সবাইকেই তখন সঙ্গী মনে করতাম। তবুও মন খারাপের অনিশ্চয়তা থেকেই যেতো । আর তখনই সিদ্ধান্ত নিতাম-আমি চলেই যাব। রথী যতই রাগ করুক থাকব না এখানে। 

এখানে শীতের দিনগুলি খুব কষ্টকর। দুপুর গড়াতেই সন্ধে নামে। লম্বা রাতটা তাই পার হতে চাইত না । মন খারাপের ছোঁয়াটা আমাকে গভীরভাবে আঁকড়ে ধরতো। সেই মুহূর্তে আমি প্রাণপণ চেষ্টা করতাম ফেলে আসা স্মৃতিটাকে ফিরে পেতে। বুকের ভেতরে একটা পাখি অস্পষ্ট আওয়াজ তুলে টুই টুই করে ডাকতো আর আমাকে কাঁদাতো। আমি ভাবতে চেষ্টা করতাম টুই টুই আওয়াজটা যেন আমার উত্তরার বাসার সামনের মেহগিনি গাছ থেকে আসছে।

এখানে আসার পর আমার গুরুত্বটা একেবারেই কমে গেলো। কষ্ট হলেও এই গুরুত্বহীনতাকে মেনে নিতে চেষ্টা করলাম। কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে পড়লাম। তাই অতীতকে বর্তমানের মাঝেই খুঁজতাম। 

আমাদের হিলিয়ার্ডের বাসার পাশেই থাকতো এক আমেরিকান পরিবার। প্রতিবেশী হওয়াতে ওদের সাথে প্রায়ই দেখা হতো। সৌজন্য বিনিময় ছাড়া তেমন কোন কথা হতো না। একদিন এই বেড়াটা ভাঙ্গলো-আনা। খুব আন্তরিকতা নিয়ে কথা বলল আমার সাথে। এভাবে আনার সাথে ভাব হলো। জন আর আনা-দুজনেই খুব ভালো প্রতিবেশী। এরপর থেকে আনা আমার কাছে প্রায়ই আসতো। আমার দুপুরটা কাটতে লাগলো আনার সাথে গল্প করে। মাঝে মাঝে ডেকের ওপাশ থেকে জনও কথা বলতো। আমি কিছুটা পাল্টে গেলাম বন্ধু পেয়ে। আমার জীবনে আনা এলো একমুঠো রোদ নিয়ে। 

আমার জীবনে কিছুটা গতি ফিরে এলো আনার কারণে। তবুও এখানকার অনান্তরিকতা আমাকে ছুঁয়ে থাকতো। কত উপায়ে পরিচিত মানুষকে তুষ্ট করতে চাইতাম। দিনশেষে দেখতাম কেউই তুষ্ট হয় নি! সব ফাঁকা-সব মেকি! আমার ভেতরের আন্তরিকতার ছোঁয়া কেউ বুঝতেই পারতো না। হয়তো কেউ বুঝতে চাইতো না। মেকি মানুষগুলি আমাকেও হয়তো ভাবতো মেকি! ভালোবাসা যেমন নিতে জানতে হয় তেমনি দিতেও জানতে হয়। আমি এদের কাউকে কাউকে চিনতে পেরে সরে এলাম। গুটিয়ে নিলাম নিজেকে। কিছুটা নির্বিকার ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠলাম। প্রশ্ন করতাম নিজেকে- আমি কেন সব ছেড়ে এখানে এসেছি? কেনই বা পড়ে আছি জগদ্দল পাথরের মতো? 

তবুও আমি রয়ে গেলাম এখানে।রথীর ঐকান্তিক চেষ্টায় আমি যেতে পারলাম না। গোত্তা খাওয়া ঘুড়ির মতো আকাশের দিকে তাকিয়ে পড়েই রইলাম । তবে রথী আরও একটা কাজ করলো। আমার লেখার সরঞ্জামের ব্যবস্থা করলো। আর আমি লিখে ফেললাম তিনটে উপন্যাস। 

বয়ে যায় বেলা, চারুলতা ও তোমার হাওয়ায় হাওয়ায়। 

আমাদের সবার জীবনেই গল্প থাকে কোন কোন গল্প জীবনকে থামিয়ে দেয়। আবার কোন কোন গল্প গন্তব্যে পৌঁছাতে সাহায্য করে। আমি থামা বা পৌঁছানোর হিসেব করি নি। করি নি কারণ জীবনের সব হিসেব অংকের মত মেলে না। তাই মেলাতে যাওয়া বৃথা। জীবন থেকে একটা অধ্যায় হারিয়ে গেলে জীবন কি শেষ হয়ে যায়! এ কথার উত্তরও খুঁজি নি । ইচ্ছে - অনিচ্ছে বা প্রাপ্তি - অপ্রাপ্তি নিয়ে আমি বেশ আছি। এক জীবনে মানুষ এর বেশি আর কী চায় ? আর কী চাওয়ার থাকে !

 

স্বপ্নের দেশ ও আত্মজা 

শামছুন ফৌজিয়া

 

 

 
 

প্রায় ছয় মাস পর ছোলাভুনা দেখে খুশিতে বলে উঠলেন রুবিনা বেগম, "আমেরিকায় ছোলা পাওয়া যায়?"

হেসে ফাবিহা বলল, "এখানে সবই পাওয়া যায়।"

এরপর আরও অবাক হলেন রুবিনা বেগম, যখন ফাবিহার ঘরে পানসুপারি দেখতে পেলেন। নাস্তা না খেয়েই তিনি আরাম করে পানসুপারি চিবুতে লাগলেন। আর সেই মুহূর্তে তার চোখ ভরে উঠল অশ্রুতে। 

ফাবিহা জিজ্ঞেস করল, "খালা! আপনার মেয়ের ঘরে  কি পানসুপারি চলেনা? "

রুবিনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "কি বলব মা! মেয়ে বলেছে এগুলো এখানে পাওয়া যায় না, পানের অভ্যাস যেন ছেড়ে দিই।"

 

রুবিনা বেগম ও তার স্বামী আহমদ হোসেন-মেয়ে রায়নার মাধ‍্যমে আমেরিকা এসেছেন। আহমদ হোসেন অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট- দেশে নিজের বাড়ি, ক্ষেতের জমি, সন্তানাদি নিয়ে খুব ভালোই ছিলেন তিনি। 

নিউজার্সির প‍্যাটারসনে রায়নার নিজের বাড়ি রয়েছে এবং তার স্বামী ট‍্যাক্সি চালায়।রায়না স্কুল বাসে কাজ করে,পাঁচ ও দুই বছরের ছেলে মেয়েকে তার মা দেখাশোনা করেন সেইসাথে রান্নাবান্নাও করেন। কিছুদিন যাবার পর রায়নার বাবাও মাংস প্রসেসিং এর কোম্পানিতে লং টাইমের কাজ নেন। 

ফাবিহার মায়ের বান্ধবী-রুবিনা বেগম। সেই সুবাদে তিনি আমেরিকা এসে ফাবিহার সাথে যোগাযোগ করেন। ফাবিহা ও প‍্যাটারসনে থাকে বলে তাদের দেখা সাক্ষাৎ হয় কিন্তু দাওয়াত দিলেও রায়নার সময় হয়না বলে, ফাবিহা নিজেই গিয়ে তাদেরকে নিয়ে আসেন। 

এবারো নিয়ে এলেন, যাবার সময় ফাবিহা উনার হাতে পানসুপারি ও ছোলাভুনা দিতে ভুললেন না।

 

এরপর থেকে ফাবিহা ফোন করলেও তারা ফোন ধরেনা, ধরলেও বলে-ব‍্যস্ত আছি। 

একবছর পরে আহমদ হোসেনের সাথে ফাবিহার স্বামীর দেখা হয় এক গ্রোসারিতে। আহমদ হোসেন জানান, মেয়ে তাদেরকে নিষেধ দিয়েছে কারো সাথে যোগাযোগ বা দেখা না করতে। তিনি দুঃখ করে বললেন, "আমি যা রোজগার করি সব মেয়ের হাতে দেই।মেয়ে ঘরের কাজ কিছুই করেনা সবই তার মাকে করতে হয়। ধরে নাও বাবা, আমার মেয়ে দেশ থেকে মাকে ঘরের কাজের জন্য এনেছে.."-বলেই তার গলাটা ধরে এলো। 

 

ফাবিহা তার স্বামীর কাছে রুবিনা বেগমের এমন অবস্থার কথা শুনে আহত হলেন। দেখা করে আবারো দাওয়াত দিলেন। এবার তাদের মেয়ে রায়না তাদেরকে নিয়ে এলেন, একা ছাড়লেন না। 

এরই ফাঁকে রুবিনা বেগম আফসোস করে বলে ফেললেন, "এই মেয়েকে আমি চিনিনা। মেয়ের ঘরের কাজ করতে আমার কষ্ট হয়না, কষ্ট হয় ওর আচরণে। কাজ থেকে এসেই বিছানায় শুয়ে পড়ে আর কাজের লোকের মত খবরদারি করে। যত্ন নিয়ে রান্নাবান্না করি, নাতি নাতনিদের দেখে রাখি তবুও সন্তুষ্ট হয়না।" 

তিনি আরো বললেন, "আমি প্রেশারের রোগী। দেশ থেকে ছেলে ঔষধ পাঠায়। মেয়ে ও জামাইর সময় নেই ডাক্তার দেখানোর। আসার পরে তারা মাত্র দুইবার হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল।"

এসব শুনে ফাবিহার ভীষণ মন খারাপ হলো, কিন্তু কিছুই করার থাকল না। 

 

বছর দুয়েক পর আবারো আহমদ হোসেন স্ত্রীকে নিয়ে ফাবিহার বাসায় আসলেন। ঘরে স্ত্রীকে বসিয়ে রেখে বাংলা শপ থেকে কিছু জিনিস কিনে আনলেন-পানসুপারিও। ফাবিহাকে বললেন, "লুকিয়ে অভারটাইম করছি কিছু ডলার জমলে ওমরাহ করে একেবারে দেশে চলে যাব। অসুস্থ হয়ে পড়লেও এখানে ডাক্তারের কাছে যেতে পারিনা!  তোমাদের মামী জ্বর নিয়েও কাজ করেন নিজের মেয়ে দেখেনা পরের ছেলে দেখবে কেন?"

ফাবিহার সাথে রায়নার একদিন দেখা হয়। কথায় কথায় ফাবিহা বলল, মা বাবাকে যত্ন নেওয়ার কথা। এতে রায়না বেশ রেগে যায়। বলে, "আমার মা-বাবার যত্ন নেইনা আপনি কিভাবে জানলেন?"

ফাবিহা বলল, "কেউ বলেনি নিজের মন থেকে বলছি কারণ বাবা মা চিরকাল কারো থাকেনা। তুমি ছোটবোনের মত তাই বললাম। "

 

দুঃখের ভার হালকা করতে, আহমদ হোসেন মাঝে মধ্যে ফাবিহার বাসায় চলে আসেন। একদিন আফসোস করে বললেন, বেইজমেন্টে যে রুমে তারা থাকেন সেখানে মেয়ে অনেক জিনিস রাখায় হাঁটার পথ নেই! তাছাড়া মেয়ে আবারো প্রেগন্যান্ট,জব ছেড়ে দিয়েছে। জানালেন, তার মেয়ে এখন তার স্ত্রীর হোম কেয়ারার জব করে। অথচ বাস্তবে মাকেই মেয়ের কাজ করতে হচ্ছে। মেয়ের জামাইও ঘরে এসে টেবিলে ভাত রেডি না পেলে রাগ করেন। 

তিনি বলেন, "আমার শরীরটা ভালো নেই মা। দোয়া করিও যাতে ওমরাহ করে দেশে চলে যেতে পারি।ইদানিং বুকের বাম পাশে ব্যথা বেড়েছে কাজ করতে হাঁপিয়ে যাই।"

রায়না ও ফাবিহারা একই এলাকায় থাকে বলে রায়নার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সাথেও ফাবিহার পরিচয় আছে।আত্মীয়স্বজনের অনেকেই নিজের চোখে দেখেছেন মা বাবার সাথে রায়নাদের দূর্ব‍্যবহার। 

 

এর কিছুদিন পরে ফাবিহার স্বামী মসজিদ থেকে এসে জানালেন, রায়নার বাবা হার্ড অ‍্যাটার-এ ঘরেই মারা গেছেন। লোকজন বলাবলি করছে, তিনদিন ধরে বুকে ব্যথা হচ্ছিল কিন্তু কেউ হাসপাতালে নেয়নি। এখন হয়তো থানা পুলিশ হতে পারে। 

ফাবিহা ছুটে গেলেন রায়নার বাড়িতে, রায়নার মা কেঁদেই যাচ্ছেন। ফাবিহাকে দেখে বললেন, "মা আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করোনা প্লিজ। মেয়ের জামাই কাউন্সিল ম‍্যানের সাথে যোগাযোগ আছে যাতে সহজে হাসপাতাল হতে ডেথ সার্টিফিকেট পাওয়া যায় সেই ব‍্যবস্থা করছেন।"

দেশ থেকে আহমদ হোসেনের বাকি ছেলেমেয়েরা ফোনে কান্নাকাটি করছে। এর মাঝেও রায়না সচেতন ভাবে চোখ রাখছে মায়ের ওপর যাতে কারো সাথে কথা না বলেন। তার কথা-আমার বাবা চলে গেছেন আল্লাহর হুকুমে। এখন মাকে সবাই একা থাকতে দেন, তার রেস্ট দরকার।

এরইমধ‍্যে রায়নার স্বামী শ্বশুরের লাশ দেশে পাঠানোর ব‍্যবস্থা করে দিয়েছে। 

 

পরদিন ফাবিহা কিছু খাবার নিয়ে রায়নার বাড়িতে আসেন। রায়নার মা চুপিচুপি বললেন, "আমি যদি মুখ খুলি তারা বলেছে-আমার ছেলেদের এপ্লাই করা আছে তা বন্ধ করে দিবে। আমার ছেলেদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে মুখে কুলুপ দিলাম মা, তুমিও এই নিয়ে কিছু বলিওনা।আসার আগে মনে করেছিলাম আমেরিকা স্বর্গের দেশ। আজ পাঁচ বছর ধরে বড় জোর হাসপাতালে দুই তিনবার যাওয়া ছাড়া বাইরের কিছুই দেখিনি। এসেছিলাম বড় শখ করে কিন্তু রায়নার বাবা এই বয়সে এত কাজ করে কুলিয়ে উঠতে পারেননি! আর কাজ না করে  কোন উপায় ছিলনা। আমার বড় আদরের মেয়ে ছিল রায়না, এখানে এসে আমার মেয়েকে আমিই চিনতে পারিনা...,"-বলে আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদতে লাগলেন তিনি। 

 

ফাবিহা আবারো ব‍্যাথিত হলো। কিন্তু কিছুই করার থাকল না। 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন