https://www.prothomalony.com/

14549

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৫ ০১:২৭

ট্রমা

আলতাফ শাহনেওয়াজ


মানুষের ব্যক্তিগত ব্যথা, বলতে না পারা 

অনেক কথা—

এক সকালে ট্রেনের জন্য সেজে থাকা 

গভীর এক রেললাইনের সামনে 

গলা খুলে বলতে চেয়েছিলাম, 

আমাকে অক্ষত রেখেই ট্রেন চলে গেল,

একফালি রোদ পাতার ওপর বসে 

হাসল, বিহ্বল হয়ে দেখলাম: সব চিৎকার, 

প্রতিধ্বনিগুলো সাউন্ডলেস, শোনা যায় না;

ঝিক ঝিক আন্তনগরের গন্তব্য 

আমার এ দরদি হৃদয় ফুঁটো করতে পারে, 

কেবল বলতে না পারা কথা,

তারে আমি হৃদয়ের কোন পাশে রাখি?

.

সমান্তরাল রেললাইনে দাঁড়ানো আমি,

আমার মেয়ে ফোন করে বলে, 'বাবা, আসো'!

তাই কোনো কথাই আর বলা হয় না আমার!

কথা আর চিৎকার বুকের মধ্যে ভেঙে ভেঙে 

রক্ত খুবলে খায়; আর ট্রমা—

নিই যদি মেনে যতি দাঁড়ি-কমা 

হে আমার অমোচনীয় ক্ষত,

তোমাদের—তোমারেও আমি বুকের তন্ত্রীতে বেঁধে

কাউকে কিছুই বলিনি, যেমন গোধূলি বলে না 

কোনো অস্থির পাখির শব্দ

.

কত মানুষই কথা না বলে জীবন কাটায়! 

সন্ধ্যাবেলা তারা মদ খায় 

পায়ের পাতায় বিঁধে যাওয়া কাঁটা খুলতে খুলতে;

আবার কত মানুষ কথা বলে শুধু বলার জন্যই; 

আমাতে একাকার হও যদি তুমি মম ব্যাথিত হৃদয়,

তুমি এই নিঃসহায় জুলাইয়ের বরিষণে

ভিজেই যাচ্ছ, তবু কেউ তোমাকে দিচ্ছে না  

জল থেকে বাঁচার একটুকরো পলিথিন',—এটাই এস্থেটিক্স ম্যান, টেক ইট ইজি' 

ফুল লেন্থ ছবি তুলতে গেলে ফটোগ্রাফার তোমাকে

হয়তো এভাবেই বলবেন!

.

হাত তো বাঁধা, মুখ দিয়ে শব্দ বের হয় না,

রাজশাহীগামী আন্তনগর প্রতিসকালে 

তোমাকে-আমাকে ক্রস করে চলে যায়!

আর রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে আমার বোন 

বারংবার ঝুলে পড়ে ফ্যানের সঙ্গে, আহা চক্রাকার—

.

সেই ফ্যানের রাক্ষুসী বাতাসও আমি খাই?

হে আমার পাষাণ হৃদয়, না বলতে পারা কথাগুলো

ভয়াবহ নাকি? এক্সেটিক্স?

যে লোকটাকে মেরে ফেললে চুপচাপ

তার কানে ব্রার্দার এ বেলা বেলিফুল গুঁজে দাও, 

এই ঝম ঝম বোমবাস্টিং রেইনি সিজনে

তোমাদের রবিবাহিত বাদলমুখর দিন...আমার বাকরুদ্ধ লাশ পানিতে ভাসে; 

প্রিয়তম ব্যথিত হৃদয়, তুমি জুলাইয়ের টুপটাপ বরষায়

ট্রমার মতো এস্থেটিক্স...আঝোরে দেখাও আমাকে শেখাও

শাহ মখদুমের রেললাইনে কীভাবে দাঁড়াতে হয়...

 

 

উৎপত্তি 

মঈনউদ্দিন মুনশী  

 

মানুষ বলেছিল এটা প্রয়োজন,

সেটা হয়নি।

মানুষ বলেছিল এটা ক্ষতিকর,

সেটা হয়েছে।

 

একটা রক্তবর্ণ কুয়াশা নেমে এসেছে বিশ্বের উপর।

বৃক্ষের শিকড়গুলো কুঁকড়ে গেছে।

নদীতে বইছে রক্তস্রোত। 

 

পৃথিবী ভাগ হয়ে গেছে দুটো দেশে।

 

প্রতিটি আলোকচিত্র যা প্রথমে তোলা হয়েছিলো 

সেগুলো ছিল মানুষের। 

প্রতিটি আলোকচিত্র যা পরে তোলা হয়েছিলো 

সেগুলো ছিল শূন্য। 

 

সব মেয়ে শিশুদের নাম রাখা হয়েছিলো এবং।

সব ছেলে শিশুদের নাম রাখা হয়েছিলো তখন।

 

 

কতদাহের পরে

দীপংকর গৌতম

 

কতকাল যে তোমায় খুঁজে পাচ্ছি না।

তোমায় মোটেই পাচ্ছি না।

আমার কি আর তেমন জীবন ঘুরবো বেঘোর সবখানে।

খুঁজে যাওয়ার টানটা আমার যাচ্ছে নিয়ে কোনখানে।

পাহাড় বলে নদীতে যাও, নদী বলে পাহাড়, 

পাক পাখালি পাতার ভিড়ে সাহস পাইনা যাওয়ার।

ফুলের বনে গিয়ে বলি দাওনা আমার তাকে।

 ফুলেরা সব বললো হেসে সে কি এখন থাকে?

সেতো থাকে রাতের বেলায় নাক্ষত্রিক কালে

আকাশ খুঁজে নিও ,বৃষ্টি ধোয়ার কালে।

দিন ফুরালো কাল ফুরালো,তোমার আাশায় থাকি

রাত চলে যায় দিন চলে যায়,পাখির ভিড়ে দেখি।

স্বপ্নলতা ছিলে বলে, লতার বনে যাই

কত লতায় জিজ্ঞাসিলাম, সবাই বলে নাই|

অনেক কালের পরে, সূর্য গেছে পাটে

হঠাৎ দেখি ঘরের পাশে,তুমি আছো ফুটে।

তুমি আমার কাজল রেখা, ফিরে পাওয়া নদী

মনে ভেতর যাও বয়ে যাও, চক্ষুতে পাই যদি। 

 

 

আজিমপুর গোরস্থান 

শেখর ভট্টাচার্য

 

আজিমপুর গোরস্থানে কবিতার মতো রহস্য কিছু নেই

রমনীর শাড়ির ভাঁজে গাঁথা নন্দন কাননের ছায়া নেই

হোমারের চোখের আলো খেলা করে এপিটাফের গায়ে গায়ে

মিছিল, মিটিং, বিক্ষোভ মিউট করা আছে অনন্ত কাল ধরে।

 

কবিতা আছে, আর্তনাদ আছে, পবিত্র চোখের জলে 

লেখা আছে- "তাকাও পথিক 'আমাদের বুকের মানিক নিলু ঘুমায় এখানে',

অগণন পংক্তিমালা তারার মতো জ্বলজ্বল করে চোখের আকাশে।

ভাইয়ের আর্তনাদ মূর্ত হয়ে ওঠে কবিতার অক্ষরে অক্ষরে

"বিকশিত না হতেই মুকুলের মতো ঝরে যায় সোনা বোন রত্না"

 

শীতল পাটির মতো হিম গালিচাতে রাখা আছে থোকা থোকা ফুল,

গোরস্থানের সজীব বৃক্ষের ছায়ায় লিখি নিজেকে নিয়ে এলিজি

এবার থামো, প্রতিহিংসার আগুন নেভাও, নিজেকে শীতল করো

অদেখা, অজানা নদীতে রাত শেষে ভাসবে তুমি শীতল পাটিতে

অনন্ত যাত্রা পথ, কৃত্রিম স্বপ্ন সৌধ মিশে যাবে কোমল মাটিতে।

 

 

আয়ুরেখা 

হাশিম কিয়াম 

 

কাকের মেলায় তুমি নপুংসক ইগল

আকাশটাও বেদখল 

সুমুদ্দুরে খুইয়েছো চোখ

মাছের লেজের ওজন মাপা এতো সহজ না 

না খেয়ে মরো

শুয়োরের বাচ্চায় রূপান্তরিত হতে 

তপস্যায় মগ্ন হও

আয়ুরেখায় ঘুমন্ত ভাগ্যলিপি ছিঁড়ে 

ফেলে লাভ নেই

যা হবার তা হবে না একালে

বুনো মহিষের শিং থেকে লাফিয়ে পড়ছে সৃষ্টিক্ষণের

সব উৎসব

পালাবে? পথ চেনো তো?

ঠোঁটের ভেতর বরং ঢুকে কাতরাতে থাকো

যতক্ষণ না ঘাসের বাগানে আগুন লাগে...!

 

 

পাথর চোর

আশরাফ চঞ্চল

 

প্রতিহিংসায় মানুষ মানুষেরই রক্ত খায়

অভাবের তাড়নায় কেউ কেউ কচু আর ঘাস খায়

পানি আর পানি খায়!

কিছু খারাপ লোক ঘুষ খায়

অপরের খাবার লুটেপুটে খায়

 

আমরা মদখোর

গাঁজাখোর

নারীখোর দেখেছি

 

সৃষ্টিজগতে কোন প্রাণিই পাথর খায় না

শুনছি সিলেটের মানুষেরা নাকি এখন পাথর চুরি করে

পাথর খায়!

 

 

কল্কেসুন্দা 

বশির আহমেদ 

 

পচা শরীরে জৈব বাড়ে! 

আমাকে কবরস্থ করার পর জৈবের অভাবে যে গাছ 

বেড়ে উঠতে পারে না, 

তেমন একটি গাছ লাগিয়ে দিও কবরের পাশে, 

জেরানিয়াম অথবা গ্ল্যাডিলোয়াস,

এসবের গন্ধে আমাকে পাবে। 

চাকুন্দার মতো আড়ালে কেটেছে জীবন, 

দাঁতের চিপায় কল্কেসুন্দার বিষ!

বিষক্রিয়ায় নীল হলে জৈবে রূপান্তরিত হয় পচা শরীর।

 

 

উত্তরাধুনিক কাজী নজরুল 

আহম্মদ হোসেন বাবু

 

চুরুলিয়ায় জন্ম বাংলাদেশে মৃত্যু 

কবি কাজী নজরুল 

দুখু মিয়া থেকে বিদ্রোহী কবি সে 

বাংলায় ফোটা এক ফুল। 

 

তোমার কবিতা ও গানে জেগে ওঠে 

প্রগাঢ় অভিমান 

শত অভাব অনটন করেছে মহান 

তুমিই বাংলার সম্মান। 

 

বাংলা, উর্দু, ফার্সি ভাষার ভুবনখ্যাত 

অহংকারের এক নাম 

"মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই" বলেন-

কাজী নজরুল ইসলাম। 

 

প্রেম, দ্রোহ, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা 

মানবতার উজ্জ্বল ছবি 

লেটো গান, রুটির দোকান পেরিয়ে তুমি 

আজ জাতীয় কবি! 

 

তোমার গল্পে, উপন্যাসে জীবনদর্শন 

আজও খুব প্রাসঙ্গিক 

তোমার সুরে শেকল ভাঙার গাই গান, তাই-

তুমি উত্তরাধুনিক।

 

তুমি জেল, জুলুম, হুলিয়া হাসিমুখে 

করেছিলে বরণ 

লাল-সবুজের পতাকা তোমাকে শ্রদ্ধার 

সাথে করে স্মরণ।।

 

পঞ্চাশ বছর 

চাষা হাবিব

 

তখনও ধ্রুবাবর্ত জীয়ন কূপে

ঢালছিল বিবস্ত্র জল;

উড়তে উড়তে উড়নচন্ডী দেহখান কইতে থাকে

হামার বাড়িত আছিলো বড় বড় মোটকা ভর্তি চাল;

আজ সেই চালে মায়ার চাদর বালিশ চাপাকল;

উত্তেজনা আর পঞ্চাশ বছরের পুরান একরত্তি

ছিপছিপে বংশাল শাল। 

এখনো ঢালে ধ্রুবজল;

হামরা হাপশাই যাই; হামার দাদা হাপশায়—

বাপ হাপশায়; কোটিবর্ষ—উলগুলান—ভিতরগড়;

দমের ভিতর শালখানি গন্ধছড়ায়

দাদার বিড়ির গন্ধ—তামুক—খুঁইনি

পঞ্চাশ বছরের পুরান একরত্তি ছিপছিপে শাল।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন