https://www.prothomalony.com/

14457

literature

সাহিত্য

কবিতার এক পাতা— আগস্ট সংখ‍্যা

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৫ ০৫:৫৭

মানুষ হয়ে জন্ম নেয়াটাই মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ঘটনা। এ এক বিষ্ময় ও আনন্দের বিষয়। অন্য পিঠে, মানুষ হয়ে জন্ম নেবার দায় বড় কম নয়! ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক দায় যেমন আছে, পাশাপাশি তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, যাপিত জীবনের পুরো সময়ের সমস্ত ঘটনার জন্যে সে তার দেশমাতৃকার কাছে দায়বদ্ধ।

দায়িত্ববোধের সেই জায়গা থেকে কবি তার সমাজ ও দেশের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকেন। লিখেও তাঁর দায়িত্ব পালন করতে হয়। আগস্ট সংখ্যার কবিতাগুলির ভাষাপাঠ নিশ্চয় আমাদেরকে সেই ইংগিত দেয়। কবিদের লেখনীর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা। আপনাদেরকে আমার ভালোবাসার আলিঙ্গন!
ফারুক ফয়সল


অনন্ত জিজ্ঞাসা
বিমল গুহ

অনন্ত জিজ্ঞাসার কাছে পেতেছি দুহাত
আত্মার বিলাপ নাকি স্মৃতির রোদন
-কী উত্তর হতে পারে এর?
মানুষের বোধির ভেতরে আরো
আরো আরো... বোধ উঁকি দেয়
ডালপালা চারপাশে পাখা মেলে ঢের।
তবু কি উত্তর মেলে
অনন্ত জিজ্ঞাসা থাকে সতত লালিত!
চেয়ে দেখো চারপাশে কেবল রোদন- রোদনের সুর
তবু যেন পরিবেশ শত উচ্ছ্বসিত।
এই জিজ্ঞাসার সীমা-পরিসীমা নেই
ঝরাপাতাদের দিকে তাকাও একবার
কান পেতে শোনো তার প্রকৃত রোদন
কালপরিক্রমনে অশ্রু হচ্ছে উজার;
এই বোধ অনন্তর মানুষের মনে!

আমরা দাঁড়িয়ে আছি প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে
রোদনের শব্দের ভেতর;
বজ্রবিদ‍্যুতের ফুলকি, ওই দেখো, অবিরল
সময়ের ইতিহাস লেখে।


প্রতিস্থাপিত বিভ্রম
কাজী আতীক

 
এইতো আকাশ- যথারীতি নীলই আছে
বৃষ্টি বুকে মেঘও আছে জমাট বেধে,
সদ্য ফোটা গোলাপ যেমন
তুমিও আছো তোমার মতো মগ্ন বিভুর!
 
পৃথিবীটা নিজ অক্ষে ঘুরছে ঠিকই
তবু উল্টোরথে পলাতকা সময় শোভন
দুর্বহ ক্ষত বুকে নিয়ে ধুকছে আবার
পথ হারানো পথিক যেমন
দিশাহারা মানুষ যেমন সংক্রমণে কোভিড যখন।
 
কিছু হায়েনা আর এক ধূর্ত শিয়াল জানিয়ে দিলো-
তারা গিলে খেয়েছে তাবৎ সময় শোভন,
অতঃপর বিভ্রম প্রতিস্থাপিত হয়েছে আবার।
 

 

কেউ বাড়ি ফিরতে বলে না
 হোসাইন কবির

কেউ.... বাড়ি ফিরতে বলে না
ধূসর কালোয় পথরোধ করে– ধোঁকাবাজ প্রতারক
         কোথাও কোনো বাতির ঘর– দেখি না!

দেয়াল জুড়ে গ্রাফিতি– ক্ষতচিহ্ন পুরনো স্লোগান 
পিছনে তাকাই— কেউ নেই 
সামনে এগোই— মুখোশের ভিড়ে অবয়ব অচেনার
     দূরের সংলাপ– স্মৃতি কাতরতা।
তবু পথ দেখাবে বলে
কারা যেন নিভে যাওয়া প্রদীপে–
      ফুঁ দিয়ে আলো হতে চায়

হৃদয়জুড়ে বালির স্রোত–
জলের প্রবাহ কোথাও দেখি না
এই যে দাঁড়িয়ে থাকা— একা একা—
              অভিমানে বাতাসও ফেরে না আর

না, কেউ আর বাড়ি ফিরতে বলে না–
হাওয়ায় ভাসে কণ্ঠস্বর–
বৃক্ষলতা  ফুল-পাখি পাতাদের কথোপকথন
আর দৃশ্যে-অদৃশ্যে লাশ নিয়ে বাড়ি ফেরা–
যেনো নিজের কাঁধে নিজের লাশ
      সমগ্র মানচিত্রে শুয়ে থাকা
                 সাহসের চিহ্ন– পূর্বপুরুষের

 


নক্ষত্র পতন
পারভীন শাহনাজ 

অন্ধকার আরো প্রগাঢ় হলে নিস্তব্ধ হয় চরাচর 
জমাট বাঁধে কিছু আততায়ী ফিসফাস 
অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠে গুমোট বাতাস 
আতঙ্কিত নিশাচর পাখিরাও এডাল ওডাল
দাপিয়ে বেড়ায় অত:পর ভয়ার্ত-চিৎকার,
 কেঁপে উঠে স্বজনের অন্তর 
আকাশের জ্বলজ্বলে কালপুরুষ নক্ষত্রটি হারিয়ে 
যায় চিরতরে 
অকাল প্লাবনে ভিজে যায় - ভেসে যায় আমার 
 অসহায় মানচিত্র 
মস্তিষ্কের কপাটে সজোরে করাঘাত 
শেকড় বাকরে জড়ানো নিউরন ভাতঘুমে
 পাশ ফিরে শোয়
কে বাজায় গির্জার মাঙ্গলিক ঘন্টা! 
যারা জেগে ছিল ইতিহাস লিখবে বলে
একে একে তারাও ঘুমিয়ে যায়
কালঘুম শেষে কলম গর্ভবতী হলে প্রসব করে
বিকলাঙ্গ কবিতা 
সেই থেকে আকাশে ঝলসানো এক টুকরো 
রুটির মতো ঝুলে আছে ব্যথাতুর  চাঁদ।
 

 

অনলাইন-অফলাইন
রুদ্রশংকর

সেই কবে তোমাকে হারিয়েছি, তবু আজও মস্তিস্কে জড়িয়ে আছ
ইতিহাস তো কোনো জাদুঘরের কাঁচে আটকানো নিদর্শন নয়,
সে বরং টাইম-ট্রাভেল অ্যাপ
এক ক্লিকেই মুঠোর মধ্যে নিয়ে আসে শতাব্দীর স্মৃতি
প্রতিটি ইট যেন পুরোনো নোটিফিকেশন,
যেখানে সজনে পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে প্রেম, যুদ্ধ
আর বিশ্বাসঘাতকতার অদৃশ্য স্ক্রিনশট
এই দ্যাখো আমাকে ঘিরে
ভাঙা প্রাসাদগুলো দাঁড়িয়ে আছে , যেন অফলাইন সার্ভার...
কেউ কেউ দেওয়ালে শোকের অথবা উচ্ছ্বাসের থিম শেয়ার করছে
কেউ কেউ লাইক-কমেন্ট ছাড়াই
অসংখ্য ইচ্ছে নিয়ে অনলাইনের অসংখ্য গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

 

হলুদ কোকুন
লায়লা ফারজানা
 
(নরম) বুকের বাম দিকটা ছুরিতে প্রথমে ছিঁড়ল তারা
খয়েরি হৃদয়, গোলাপি যকৃত, দুটি ফুসফুস
তারপর আঠালো মলমে অভ্যন্তরীণ সমস্ত
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মশলা দিয়ে মুড়িয়ে লাগিয়ে দিল চটচটে সিল-মোহর
সেলাই করল জিহবা ঠোঁট চোখ কান
ঘুমিয়ে পড়লাম যোজন মাইল:
 
সেদিন বিকালে — বিবর্ণ বাগানে ধূসর আকাশ
বরফে আবৃত নিথর শরীর
ধুলোর চেয়েও কম
 
আমার মুখের সাথে যুক্ত
আমার সেলাই করা হাত স্পর্শ করেই
চমকে উঠল সে —
 
একটি সুবাস ঘিরে ছিল আমার উজ্জ্বল ত্বক
বর্ধমান পৌনঃপুনিক


শেষকৃত্য 
মিলটন রহমান 

 তোমার আঙুলগুলো পুড়ে যাওয়ার সময় 
প্রচ্ছন্ন সাদা ধোঁয়ায় তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ বন্দিশ 
আশপাশের হাওয়া-বৃক্ষ-ঘাস ও আমাদের সাঙ্গিতিক কোলাহলে উদ্বেল করে গেলো,
 যখন দেখলাম দাউ দাউ আগুনে পুড়ে যাচ্ছে তোমার পাঁজর, 
গড়িয়ে পড়ছে জমে থাকা রাগ দীপক, হিন্দোল, মালকোষ আর বেহাগ 
তখন তোমার হৃদস্পন্দন আমি দেখতে পেলাম 
সিঁদুরের রেখার মতো আগুনের বক্র শিখারা 
তোমার মতো গাইলো, নিঝুম সন্ধ্যায় ক্লান্ত পাখিরা
মৃদু হাসির সাথে মিশে যাওয়া অশ্রু টেনে দেখলাম 
লাল গোলাপ সদৃশ আগুনের স্ফুলিঙ্গ 
তোমার ঠোঁটজোড়া উপড়ে ফেলছে হলকা টানে 
আগুনের উত্তাপে ফুটতে থাকা চন্দন কাঠের সাথে 
শুনতে পেলাম তবলার বোল 
তোমার সেই পোড়া ঠোঁট খসে যেতে যেতে যেনো গাইলো
তোমার না গাওয়া কোন গান যে গান তুমি গাইতে চেয়েছিলে, 
আমি বহু চেষ্টা করেও জোনাকির মতো উড়ে যাওয়া কথাগুলো ঠিক ধরতে পারি নি, 
অথচ স্পষ্ট দেখলাম উদগাতার সাথে নামছে-উঠছে তোমার হাত 
কি সৌকর্যে আলোকস্নাত মঞ্চে বসে তুমি আগের মতোই গান গাইছো!
 মঞ্চে এতো আগুন, এতো আলো আমি আগে কখনো দেখি নি, 
দেখি নি এমন পুষ্পকরথ! 
হঠাৎ ড্রামসেটে বিকট শব্দ হলো, তোমার করোটি থেকে নীল রঙের
কিছু একটা স্পট লাইট হয়ে গেলো
অনেক যত্ন করেও তোমাকে দুঃখ দিতে না পারার অহমিকা 
আলোর সাথে তড়পাতে তড়পাতে শূন্য আকাশ হয়ে গেলো!
ধীরে বুঁজে আসা তোমার চোখ জোড়া বরাবরের মতো ন্যস্ত ধ্যানে 
অগ্নুৎপাতের সাথে গলে গলে নীল পদ্ম হয়ে গেলো! 
ও চোখে কত কথা ছিলো জমা, ছিলো দেখতে পাওয়া না পাওয়ার সংগীতময় বিহঙ্গবেলা, 
চোখ ঠুয়ে গড়িয়ে পড়া জল সন্ধ্যের আয়ুর মতো শেষ হয়ে আসে 
তোমাকে ঘিরে জমা উৎসব একে একে নিভে যায় সব আলো,
 তুমিও চলে গিয়েছো মঞ্চ ছেড়ে 
আমি ভাঙা উৎসবের বিকট নিরবতায় অন্ধকার খালি মঞ্চের দিকে কান পেতে 
শুনতে চেষ্টা করি কোন সুর অবশিষ্ট রইলো কিনা,
 শুনি বিমর্ষ অন্ধকারে কেউ একজন বলছে, 
যাও সুমিতাকে বলো আমার দেয়াল ঘড়িতে যেনো নিয়মিত দম দেয়।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন