https://www.prothomalony.com/
14432
bangladesh
ভূমিকাঃ সিরামিক ভাস্কর্য শিল্প মানব সভ্যতার অন্যতম প্রাচীন ও মূল্যবান সৃষ্টির মধ্যে একটি। প্রাকৃতিক কাদা, মাটি, সিলিকা ও অন্যান্য উপকরণকে উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়ে শক্তিশালী ও স্থায়ী আকার দেওয়া এই শিল্প হাজার হাজার বছর ধরে বিকশিত হয়েছে। কখনো কখনো সিরামিকের সঙ্গে প্লাস্টিক, ধাতু বা অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে ভাস্কর্যের গঠন ও স্থায়িত্ব আরও বাড়ানো হয়।
বিশ্বের প্রাচীনতম সিরামিক ভাস্কর্যের নিদর্শন হিসেবে গ্র্যাভেটিয়ান সংস্কৃতির মূর্তিগুলো (২৯,০০০ থেকে ২৫,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) প্রমাণ করে, প্রাগৈতিহাসিক মানবেরা শিল্পকলায় ছিল অত্যন্ত দক্ষ; কেবল ব্যবহারিক নয়, আধ্যাত্মিক ও নান্দনিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সিরামিক শিল্প করতো।
শুধু ভাস্কর্য নয়, সিরামিক শিল্প মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন উপকরণ যেমন পাত্র, মগ, থালা ইত্যাদির জন্যও বহুল ব্যবহৃত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিরামিকের নকশা ও প্রযুক্তিতে বৈচিত্র্য ও উৎকর্ষতা এসেছে। আধুনিক যুগে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে কৃত্রিম সিরামিক, ফাইন সিরামিক থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক্স এবং চিকিৎসাক্ষেত্রেও সিরামিকের ব্যবহার ব্যাপক। পরিবেশগত দিক থেকেও সিরামিক শিল্প গুরুত্ব বহন করে, কারণ এটি প্রাকৃতিক উপকরণ থেকে তৈরি ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় পরিবেশে কম প্রভাব ফেলে। তাই সিরামিক শিল্প ঐতিহ্যের পাশাপাশি আধুনিক যুগের পরিবেশবান্ধব শিল্প হিসেবেও বিশেষ ভূমিকা রাখছে।
আজকের 'শিল্পঘর'-এ আমরা আপনাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিবো দুই প্রতিভাবান সিরামিক শিল্পীর সঙ্গে। আশা করি, এই আয়োজন আপনাদের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা এবং আনন্দদায়ক হবে।
শিল্পী বিশ্বজিৎ চৌধুরী

শিল্পী বিশ্বজিৎ চৌধুরী সিরামিক শিল্পের পরিশ্রমী এক পথিক। তিনি ১৯৬৬ সালে টাঙ্গাইলে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর স্কুল জীবন শুরু হয় করোটিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে। ১৯৮৩ সালে ঢাকায় চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি, যা পরে চারুকলা ইনস্টিটিউটে রূপান্তরিত হয়।
বিশ্বজিৎ ছিলেন চারুকলা ইনস্টিটিউটের প্রথম ব্যাচের ছাত্র এবং সিরামিক মাধ্যমটিকে প্রধান বিষয় হিসেবে বেছে নেন। তাঁর শিক্ষক ছিলেন মরন চাঁদ পাল এবং নিজামি।
ছেলেবেলা থেকেই রং নিয়ে খেলা এবং মাটি দিয়ে বিভিন্ন জিনিস তৈরি করাই তাঁর শখ ছিল। তিনি একজন পরিশ্রমী শিল্পী যাঁর সৃষ্টির মূল প্রেরণা হল শিল্পে নিজস্ব আনন্দ। বিশ্বজিৎ জানান, "মৃৎশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ হলো মাটি, পানি, ধাতু ও রাসায়নিক পদার্থ, আর পোড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয় উচ্চ তাপমাত্রার বিশেষ চুলা।"
জটিল এই প্রক্রিয়া শিল্পে রূপান্তরিত হলে শিল্পীর স্বার্থকতা প্রকাশ পায় বলে তিনি মনে করেন।
অভিজ্ঞতা ও আগ্রহ সম্পর্কে বিশ্বজিৎ জানান, তিনি চারুকলায় সিরামিক বিভাগে ভর্তি হয়ে বিভিন্ন পটারি, টেরাকোটা, ভাস্কর্য এবং হুইল প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তাঁর আগ্রহ ছিল ক্যানভাস পেন্টিংয়ের মতো সিরামিক টেরাকোটা পেন্টিং তৈরি করা, যা দেয়ালে প্রদর্শন করা যায়। তিনি কখনো হাই গ্লেজ, কখনো মেট ফিনিশ ব্যবহার করে মিশ্র মাধ্যমেও কাজ করেছেন। বিমূর্ত বিষয়াবলীর প্রতি তার ঝোঁক ছিল, যা তাঁর কাজের ভেতরে মানুষের আবেগ, অনুভূতি, সুখ-দুঃখ, চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ পায়।
বিশ্বজিৎ একটি স্মরণীয় কাজের উদাহরণ দিয়ে বলেন,
"সারাউন্ডিং আইস-এর কাজটি আমি ২০০১ সালের নাইন ইলাভেন ট্রাজেডির সময় মানুষের চোখের অভিব্যক্তিকে টেরাকোটায় ফুটিয়ে তুলি। এই কাজ থেকে মূলত মানুষের অন্তরের যন্ত্রণা, সন্দেহ, দুঃখের চিত্র তুলে ধরা হয়।"
বিশ্বজিৎ, ১৯৯১ সালে অনার্স পরীক্ষা শেষে দেশে "প্রবর্তনা" নামে একটি কোম্পানিতে যোগ দেন, যেখানে হস্তশিল্পের বিভিন্ন পণ্য তৈরি ও রপ্তানি হয়। তার প্রচেষ্টায় প্রথম মাটির গহনা তৈরি হয়, যা গহনাশিল্পে বিপ্লব ঘটায়। পরে ১৯৯৭ সালে আমেরিকায় স্থায়ী হন। ২০০৪ সালে নিউইয়র্কের লেহমান কলেজে মাস্টার্স কোর্সে সিরামিক বিভাগে ভর্তি হন। সেখানেও তাঁর কাজের ভিন্নত্ব সকলের নজর কেড়ে নেয়।
২০০৭ সালে লেহমান কলেজের বার্ষিক প্রদর্শনীতে সেরা শিল্পী হিসেবে নির্বাচিত হন বিশ্বজিৎ। ২০০৮ সালে নিউইয়র্কে তাঁর একক প্রদর্শনী হয়। এরপর নিয়মিত গ্রুপ প্রদর্শনীতে অংশ নেন তিনি এবং আজও শিল্পচর্চা অব্যাহত রেখেছেন।
বিশ্বজিৎ তার শান্তি ও শখ নিয়ে বলেন, "ছবি আঁকা আমার শান্তির স্থান; আর এক্রেলিক ক্যানভাসে কাজ করা আমার বর্তমান শখ।"
শিল্পী ফয়জুন্নাহার তাসরিন মিশু
নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার গ্রাম বাংলার মেয়ে ফয়জুন্নাহার তাসরিন মিশু। শৈশব ছিল তাঁর আনন্দে ভরা। প্রিয় কাজ বলতে, মাঠ-ঘাটে দৌড়ঝাঁপ, পুকুরে সাঁতার কাটা, বৃষ্টিতে ভিজে গান গাওয়া। গ্রামের চৈত্র সংক্রান্তি মেলা 'বারুণী' ছিল তাঁর বর্ষার সবচেয়ে প্রিয় সময়, যেখানে মাটির চুলা, হাড়ি-পাতিল, হাতি-ঘোড়া ও নানান খেলনা কেনা হতো।
ফয়জুন্নাহার বলেন, "আব্বা ছিলেন কঠোর মানুষ। পরীক্ষায় ফেল হলে মারধর হতো। তাই পড়াশোনায় ফেল করা চলত না, কিন্তু নম্বর নিয়ে ভাবনা ছিল না। ছোটবেলা থেকেই হাঁস-মুরগি, কুকুর-বিড়ালের যত্ন নেওয়া এবং পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় মগ্ন থাকতাম আমি। বড় ভাই ঢাকায় চারুকলা মৃৎশিল্প বিভাগে পড়তেন, পরিবারের আটজন সদস্যই চারুকলা থেকে শিল্প শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।"
ফয়জুন্নাহার তাঁর পরিবারের শিল্পী ঐতিহ্য সম্পর্কে বলেন, "আমাদের দাদা ছিল সেই শিল্পীর মূল কারণ।"
শিল্পী পরিবারে বেড়ে ওঠা ফয়জুন্নাহার ছোটবেলা থেকেই নানা কাজের প্রতি উৎসাহী ছিলেন-জামাকাপড় ডিজাইন থেকে শুরু করে ফটোগ্রাফি পর্যন্ত। এসএসসি পাশের পর ভাইয়ের প্রভাবেই মৃৎশিল্পে পড়াশোনা করার সংকল্প নেন। প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষায় সফল না হওয়া, তারপর অসুস্থতার কঠিন সময় অতিক্রম করে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ভর্তি হন।
চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়ে নতুন জীবনের সূচনা করেন তিনি। কঠোর পরিশ্রম ও অবিচল সংকল্পে অসুস্থতা কাটিয়ে উঠে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলেন। মাটির সঙ্গে তাঁর গভীর ও প্রাণবন্ত সম্পর্কের সাক্ষী তাঁর কাজ। গ্রামের মাটি থেকে সংগ্রহ করা উপকরণ দিয়ে তিনি নানা পাত্র, খেলনা, বস্তুর ছাপ এবং মাটির চুলার কাজ করতেন, যা গ্রামীণ জীবনের সরলতা ও প্রাণকে শিল্পের মাধ্যমে তুলে ধরে।
ফয়জুন্নাহার জানান, শিল্পের প্রতি তার ভালোবাসা ও পরিশ্রম আজও অব্যাহত রয়েছে।
শিল্পী হিসেবে ফয়জুন্নাহার তাসরিন মিশু তাঁর প্রতিভা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন-যা ভবিষ্যতে আরও সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় শিল্প সৃষ্টি করবে বলে আশা করা যায়।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন