https://www.prothomalony.com/
14431
bangladesh
"আমি চোর না, ডাকাতও না। মুচি, তারাগঞ্জ বাজারে জুতা সেলাই করি"-মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে হাত জোড় করে এই আকুতি জানিয়েছিলেন রূপলাল দাস ও প্রদীপ লাল। কিন্তু ৯ আগস্ট, রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় ভ্যানচোর সন্দেহে জনতার পিটুনিতে শেষ হয়ে যায় তাদের জীবন।
পরদিন, ১০ আগস্ট, মাদারীপুরে চোর সন্দেহে তিনজনকে গণপিটুনি দেওয়া হল, একজনের চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা পর্যন্ত করা হল।
১১ আগস্ট, টঙ্গীতে মুঠোফোন ছিনতাইয়ের অভিযোগে পিটিয়ে মারা হল আরেক যুবককে। এর আগে, ৩১মে-রাজধানীর দারুস সালামের দ্বীপনগর এলাকায় মাইকিং করে তানভীর ও ফাহিম নামের দুই তরুণকে পিটিয়ে হত্যা করল স্থানীয়রা। স্থানীয়সহ পুলিশের দাবি, নিহতরা মাদক কারবারি। এ কারণে এলাকাবাসী ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁদের পিটিয়ে হত্যা করে।
আমরা দেখছি অন্তরবর্তিকালীন সরকার বিগত এক বছরে বেশ কিছু ভালো কাজ করেছেন, যা প্রশংসার দাবী রাখে। তারমধ্যে একটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। তা সত্ত্বেও ইউনূস সরকারের সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে বেশ উদ্বেগ বাড়ছে। খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, চুরি, অপহরণ ও মাদক অপরাধের লাগাম টানা যাচ্ছে না, ফলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও হতাশা তৈরি হচ্ছে। অপরাধীরা যেন আগের চেয়েও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, তারা সরকারের আইন ও নীতিকে তাচ্ছিল্য করছে।
মূলত, ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর থেকে 'মব জাস্টিস'-এর ঘটনা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যগুলো মব জাস্টিস এর ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়ে তোলে। দৈনিক আজকের পত্রিকা জানাচ্ছে, ১০ মাসে মব সহিংসতায় নিহত ১৭২ জন। এমএসএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম আলোর প্রতিবেদন বলছে, শুধু জুলাই মাসেই মবের হাতে ১৬ জন নিহত এবং ৫১টি লাশ অজ্ঞাতনামা হিসেবে উদ্ধার হয়েছে এবং এবং ৫৩ জন গুরুতর আহত হয়েছে। যুগান্তরর খবর অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত 'মব সন্ত্রাসে' নিহত ১১১ জন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবও কম ভয়াবহ নয়।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএফএস) জানাচ্ছে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত গণপিটুনিতে নিহত ৭৮ জন; আগস্টের প্রথম ১০ দিনের ৯টি মৃত্যু যোগ করলে মোট দাঁড়ায় ৮৭ জন। এই সময়ে আহত ২৬৬ জন। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, ১ জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত 'মব সন্ত্রাসে' নিহত ১১১ জন। শুধু সংখ্যাই নয়, প্রবণতাও উদ্বেগজনক। গত বছরের ৫ আগস্টের পর মব সহিংসতার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই জরিপ পরিচালনা করেছে ভয়েস ফর রিফর্ম ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি)। ফলাফল প্রকাশিত হয় ১১ আগস্ট, জাতীয় আর্কাইভস অডিটরিয়ামে।
মব জাস্টিস এখন দেশের জন্য এক ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। এ কথাটি বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। "মব" মানে, জমায়েত, ভিড়, বা লোকসমূহের একটি দল। "জাস্টিস" মানে ন্যায়বিচার-নিরপেক্ষ তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ, এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটে। তাহলে "মব জাস্টিস" মানে উত্তেজিত জনতা আইন অমান্য করে কাউকে শাস্তি দিবে, সেটা সঠিক-ভুল বিবেচনা না করেই।
যারা এই "মব" এ "জাস্টিস" প্রয়োগ করছেন, তারা কারা? বাংলাদেশ সংবিধানের কোন অনুচ্ছেদে তাদের এই "মব" অধিকার কি নিশ্চিত করা হয়েছে?
না, হয়নি। বাংলাদেশের সংবিধানে কোনো অনুচ্ছেদে "মব" বা জনগণের হাতে আইন নিজের মতো করে প্রয়োগ করার অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি। বরং সংবিধান ও বিদ্যমান আইন স্পষ্টভাবে বলে যে, ন্যায়বিচার প্রয়োগের একমাত্র ক্ষমতা আদালতের হাতে এবং আইন প্রয়োগের দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় সংস্থা যেমন পুলিশ, র্যাব, আদালত ইত্যাদির ওপর ন্যস্ত।
"গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধান"-অনুচ্ছেদ ৩১– এ বলা হয়েছে, "প্রত্যেক নাগরিক ও দেশের অন্যান্য ব্যক্তির আইন দ্বারা সুরক্ষিত থাকার অধিকার আছে, এবং আইনের বিধান ব্যতীত কারও জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির প্রতি কোনো ক্ষতিকর ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।"
অনুচ্ছেদ ৩৫(৩)–দণ্ডবিধান ও শাস্তির ব্যাপারে বলা হয়েছে, "ফৌজদারী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্য বিচারলাভের অধিকারী হইবেন।"
অনুচ্ছেদ-৭(১)–বলে, "প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে৷"
তার মানে, কোনো "মব" কারো শাস্তি দিতে পারে না এবং "মব জাস্টিস" এই সাংবিধানিক কাঠামো ভেঙে ফেলে।
যদি কোনো চোর ধরা পড়ে, তাহলে সঠিক কাজ হবে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া। কিন্তু যদি জনতা তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলে, সেটা হবে মব জাস্টিস যা বেআইনি হত্যাকাণ্ড। মব জাস্টিস এর নামে "ছেলেধরা", "কোরআন অবমাননা", বা "চোর সন্দেহে" অসংখ্য নির্দোষ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। অনলাইনে ফেসবুক পোস্ট ঘিরে ধর্মীয় উসকানির পরিপ্রেক্ষিতে সংখ্যালঘুদের বাড়ি-দোকানেও হামলা হয়েছে।
মিটফোর্ডের ঘটনার পাশাপাশি খুলনায় যুবদলের এক নেতাকে হত্যার পর পায়ের রগ কেটে দেওয়া, চাঁদপুরে মসজিদের ভেতরে ইমামকে চাপাতি দিয়ে কোপানো, দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা ও চাঁদাবাজি-সবই ইঙ্গিত দেয় যে সহিংসতার ধারা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সাবেক সিইসি নূরুল হুদার গলায় জুতার মালা পরানো এবং লালমনিরহাটে সংখ্যালঘু বাবা-ছেলের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগ এনে হেনস্তার ঘটনায় মব সহিংসতার বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। এছাড়া, গত বছর সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে এক মানসিক রোগী যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, অভিযোগ ছিল তিনি চুরি করতে গিয়েছিলেন।
প্রশ্ন হচ্ছে-কেউ চুরি করতে এলে কি তাঁকে পিটিয়ে মারতে হবে? একইভাবে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরোধিতা করায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শামীম আহমেদকে হত্যা করা হয়। তাহলে কি আন্দোলনের বিরোধিতা করলেই মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্য?
এই প্রশ্নগুলোই রাষ্ট্রের আইনি কাঠামো নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। দেশের আইন কি তবে গণঅভূত্থানের শক্তি, বা উত্তেজিত ভিড়ের হাতে?
জনগণের একাংশ এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে, আদালত নয়, মিছিল-মিছিলেই বিচার হবে। এই "মব জাস্টিস" বা জনতার হাতে বিচার নিয়ে জনগণের মধ্যে আজ ব্যাপক বিভ্রান্তি বিরাজমান।
বেশিরভাগ মানুষই "মব জাস্টিস" এর নেতিবাচক প্রভাব বুঝে থাকলেও, তাদের মধ্যে অনেকেই নির্দিষ্ট কিছু ঘটনার ক্ষেত্রে "মব"কে নীরব সমর্থন দেয়, আবার কখনে চুপ থাকেন। যেমন-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, কোনো দলীয় কর্মী বা নেতা যখন মবের শিকার হন তখন তার সমর্থকরা তা 'রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র' বলে আখ্যায়িত করেন এবং প্রতিবাদ করেন। কিন্তু অন্য পক্ষের লোকজনের ওপর একই ঘটনা ঘটে গেলে তা 'জনতার বিচারের অংশ' বলে বোঝানো হয়। অনেকের দাবি, 'মব জাস্টিস'-এর ঘটনায় পুলিশ উপস্থিত হলেও তারা প্রায়শই নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকে; ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বদলে সহিংসতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
আমরা জানি, মানুষের মধ্যে দীর্ঘ ১৬ বছর দমন-নিপীড়নের একটা গভীর কষ্ট ও ক্ষোভ জমে আছে। এই আঘাত ও অবিচারের বুকে আজও অনেকের মনে দগদগে আগুন জ্বলছে। যখন মানুষ আদালত, পুলিশ বা বিচার ব্যবস্থার উপর আস্থা হারায়, তখন তারা ক্ষিপ্ত হয়, তখন তারা নিজের হাতে শাস্তি দেওয়ার "অধিকার" কল্পনা করে। সেই ক্ষোভ ধীরে ধীরে "মব জাস্টিস" এ রূপ ধারণ করে-যা আমরা পরখ করেছি ৫ আগস্টের পর বঙ্গবন্ধুর ৩২নং বাড়ি ও ভাস্কর্য ভাঙ্গন সহ আ'লীগ নেতাদের বাড়ি ঘর, স্থাপনা, অফিস ভাঙ্গন ও জ্বালানীর মধ্য দিয়ে।
কিন্তু, ভুলে গেলে চলবে না-"মব জাস্টিস" যদি চলমান থাকে, তবে তা কেবল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই সীমাবদ্ধ থাকে না; একসময় এর থাবা সাধারণ মানুষের ঘরদোর, জীবিকা ও নিরাপত্তার ওপরও নেমে আসে।আজ যাকে ভিড় তাড়িয়ে মারছে, কাল সেই ভিড় অন্য কারণে আরেকজনের প্রাণ কেড়ে নেবে। হয়তো কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ, হয়তো মিথ্যা গুজব, অথবা কোনো তুচ্ছ অপরাধের অভিযোগে। "মব জাস্টিস" যেমন আইনের শাসনকে অবমূল্যায়ন করে, তেমনি এটি সমাজে বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার মাত্রা বাড়ায়। যারা এই "মব জাস্টিস"কে ন্যায়বিচার মনে করেন, তারা নিজেদের হাতেই দেশের আইন-শৃঙ্খলার ভীতিত্ব সৃষ্টি করেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক সর্বজনীন ঘোষণার মতে, 'মব জাস্টিস' মানবাধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন। ঘোষণার ১০ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, "স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালের অধীনে সবার সমানভাবে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।" ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করা হয়েছে-আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত অভিযুক্তকে নিরপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং বিচার চলাকালে তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকতে হবে। একইভাবে, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে-"সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।"
গণপিটুনির প্রতিটি ঘটনা শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, এটি রাষ্ট্রের আইনের শাসনের উপর প্রকাশ্য অবিশ্বাসের ঘোষণা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের দুই মাস পরই 'মব সন্ত্রাস' রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী ১০ মাসে এ বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী মাঠে থাকলেও মব জাস্টিস থামানো যাচ্ছে না। এটাই প্রমাণ করে যে, নীতি-প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যকার ব্যবধান এখনো বিপজ্জনকভাবে বিস্তৃত।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে মানুষের প্রতি যে অনিয়ম ও অবিচার হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম ছিল 'মব জাস্টিস'। গুম-খুনের রাজনীতি চালিয়ে হাসিনা বিরোধী দলগুলোকে কোণঠাসা করে রেখেছিল। তাঁর বিরুদ্ধে যে-ই আওয়াজ তুলত, তাকেই হত্যা বা গুমের শিকার হতে হতো। বিগত ১৬ বছরে এসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে বেশি শিকার হয়েছেন বিএনপি দলীয় নেতা-কর্মীরা। শুধু 'মব জাস্টিস' নয়, আওয়ামী লীগ ও হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত 'মিডিয়া ট্রায়াল'-ও ছিল রাজনৈতিক দমননীতির অংশ। কিন্তু, ছাত্র জনতা আমাদেরকে সেখান থেকে বের করে নিয়ে এসেছে-আমরা সাধারণ মানুষ এমনটাই ভাবছি।
কিন্তু বাস্তব চিত্র কি সত্যিই এত সরল? হাসিনা পতনের পর ভিন্ন শাসন কাঠামো এসেছে বটে, তবে সহিংসতা, প্রতিশোধ আর 'মব জাস্টিস'-এর প্রবণতা কি কমেছে? বরং আমরা দেখছি, ক্ষমতার শূন্যতায় নতুন নতুন শক্তি উঠে এসেছে, যারা আইন ও ন্যায়বিচারের বাইরে গিয়ে একই ধরনের দমন, ভয়-প্রদর্শন আর প্রতিপক্ষ নিধনের পথ বেছে নিচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা বারবার আশ্বাস দিচ্ছেন-কোনো ধরনের "মব সহিংসতা"কে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। বিএনপির নেতারাও স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, "মব জাস্টিস" বা সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আশ্বাস ও নিন্দা সত্ত্বেও মব জাস্টিসের ঘটনা অব্যাহতভাবে ঘটছে।
অন্যদিকে, অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বুজে থাকার কারণে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে নাগরিক সমাজে সমালোচনা তৈরি হচ্ছে। অনেকের মতে, "মব সহিংসতা" বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ার পেছনে সরকারের উদ্দেশ্য সংখ্যাগরিষ্ঠ শক্তির কাছে জনপ্রিয় থাকা।
আজকের বাংলাদেশে "মব জাস্টিস" শুধু আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি ন্যায়বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার অভাবের ফল। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হলে সহিংসতা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। আর তখন ন্যায়বিচারের স্থলাভিষিক্ত হয় প্রতিশোধ, আর প্রমাণ, বিচার বা মানবাধিকারের পরিবর্তে জনতার ক্ষণিক রোষই হয়ে ওঠে চূড়ান্ত বিচারক। এর ফলে রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে কেউই নিরাপদ থাকে না-না ধনী, না গরিব, না ক্ষমতাবান, না প্রান্তিক। সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব আইনের শাসন নিশ্চিত না করা পর্যন্ত এই প্রবণতা থামবে না, বরং বৃদ্ধি পাবে।
তাই, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে এখনই বুঝতে হবে, জনতার ক্ষণিক আবেগে পরিচালিত সহিংসতা কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। আইনের শাসন ভেঙে গেলে ক্ষমতা ও প্রতিশোধের আগুন সবার ঘরেই গিয়ে লাগবে, কে বন্ধু আর কে শত্রু- তা তখন আর কেউ মনে রাখবে না। তাই সরকারের উচিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করা, প্রতিটি ঘটনার তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা, এবং নাগরিকদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনা। নইলে "মব জাস্টিস" ধীরে ধীরে শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, পুরো সমাজের জন্যই এক অচেনা দানবে পরিণত হবে। আজকের "মব জাস্টিস" কালকের সর্বনাশা গৃহযুদ্ধের পূর্বাভাস হয়ে উঠতে পারে। তখন আর কেউ নিরাপদ থাকবে না-না শাসক, না বিরোধী, না সাধারণ মানুষ।
রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকের ন্যায়বিচারের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি ক্ষয়ে যায়। আর ক্ষয়প্রাপ্ত ভিত্তির ওপর কোনো সভ্য সমাজ দাঁড়াতে পারে না।
বাংলাদেশ থেকে আরো পড়ুন