https://www.prothomalony.com/
14419
literature
কবি শামসুর রাহমান বাংলা সাহিত্যের এক অমর কীর্তি, যার কাব্যস্বর স্বাধীনতা, মানবতা ও সামাজিক ন্যায়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর রচনা আমাদের এক সাহিত্যিক মেলবন্ধন-দেশের ইতিহাস, মানুষের সংগ্রাম এবং জীবনের গভীর অর্থের প্রতিফলন। ১৭ আগস্ট-এই প্রয়াণদিবসে তাকে স্মরণ করার কারণ হলো, তাঁর চেতনা ও শব্দসম্ভার আজকের প্রজন্মকে জাতির মুক্তি ও সাম্যের পথে উদ্বুদ্ধ করে। তাকে স্মরণ করা মানে তাঁর আদর্শ ও বার্তাকে জীবন্ত রাখা, যেন আমরা হারিয়ে না যাই মানবিক মূল্যবোধ থেকে। বিশেষ করে যখন আজ আমাদের সমাজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, শামসুর রাহমানের কবিতা আমাদের নৈতিক দিশারী হিসেবে কাজ করে। তাই এই দিনে তাকে স্মরণ করা শুধু অতীতের প্রতি শ্রদ্ধা নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য এক দায়িত্ববোধ।
ধন্যবাদান্তে-এইচ বি রিতা।
ক্লান্তিহীন কবিতার মুখচ্ছবি
অলোক আচার্য
এক শহর-নির্বাক কংক্রিট আর হাঁপ ধরা গলি
মঞ্চের আলো নন, কিন্তু রাস্তায় হেঁটে যাওয়া মানুষ
তাঁর আঙুলেই জ্বলে উঠত শিরোনামহীন কবিতা।
শব্দ নয় যেন বন্দুকের গুলি, শাসকের রক্ত নিতে
তিনি জানতেন-
যুদ্ধ মানে শুধু রক্ত নয়, শব্দও অস্ত্র।
আমরা যাদের হাত ধরিনি কোনোদিন,
তাদের হাতেও তুলে দিয়েছিলেন কবিতার অধিকার।
সে-ই আমাদের শিখিয়েছেন ভালোবাসা মানে গোলাপ নয়,
ভালোবাসা মানে ব্যর্থতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করা।
তিনি শহরের বুকে লিখেছেন গ্রামের কথা, নদীর কথা
এই শহর, এই দেশ-যতবার ভেঙেছে,
তাঁর কবিতায় জোড়া লেগেছে কিছু নৈঃশব্দ্য।
তাঁর কবিতা আসলে এক দীর্ঘ পথ হাঁটা-
আজও যখন সন্ধ্যায় ঝরে পড়ে ধুলোমলিন আলো,
আমরা বুঝি-
শামসুর রাহমান কবিতা নয়,
একজন জীবন্ত বিবেক, যিনি এখনো আমাদের ভেতর হাঁটছেন, অদৃশ্য পদচিহ্ন রেখে।
নাগরিক কবি
জেবুন্নেছা জোৎস্না
তুমি শুধু এক নাম নও; প্রেমে ও অপ্রেমে
এক অন্তহীন কবিতার জয়গান ।
"প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে",
সময়ের উত্তাল সমুদ্র ফুঁড়ে যে সোনালী পর্বত শিখর
উদ্ভাসিত হলো, তুমি সেই সুদর্শন মৈনাক
তুমি বিভোর রাজপথে একটি পতাকার জন্যে।
যখন শহর কেঁপেছে বুটের আওয়াজে
সাঁজোয়া ট্যাংকের হঠাৎ গুলিতে -
তুমি সেই দীর্ঘ আন্দোলনে মজলুম আদিব
দাঁতাল হায়েনা, গলিত নগরে পতিত মানুষে
ধর্মান্ধতার অসুখে, সাম্প্রদায়িকতার আগুনে
মুখেতে মুখোশ, ক্লেদাক্ত মানুষ হাঁটে সরীসৃপে
তোমার বুলেট শব্দ ঝলসায় শ্লোগানে -
তুমি হতে চেয়েছো হুডিনি। -জাদুর ছোঁয়ায়
ব্যালোরিনা নাচে বদলে দিতে চাইলে যুদ্ধ, বোমা,
রক্তপাত- স্বজাতির হানাহানি ।
নিমজ্জিত অন্ধকারে ছড়ালে সফেদ জ্যোৎস্না-
কেমন সহজে বলে গেলে জনতার কথা
কবি শামসুর রাহমান-তুমি ধূসর বাংলার সৌম্য;
আমাদের অস্থি-মজ্জায় গ্রন্থিত: -নাগরিক কবি।
সাধক
সুবীর কাস্মীর পেরেরা
নেই ছিটেফোটা গগনে সুপ্ত জলধারা;
এখানে ওখানে করে খেলা মন যমুনার নোনা জল,
রৌদ্র বিলাসে আঁচল পাতে এক রাশ সুখবাস,
অনিদ্রার সুখে কবি করে বীজ বপন
ভালোবাসার প্রত্যাশার নীড়ে।
আম্র কাননে জেগেছে আজ হলুদ বসন্ত,
ফোটা ফোটা সঙ্গমের বাঁধা খেলাঘর,
সৃষ্টি সুখেরা আকাশের সমীরণে
বিনম্রতার বাণী, শোনায় গানে গানে।
আশার পথেরা, তারকালোকের সন্ধানে
জেগে থাকে মনে মনে।
নাগরিক কবি
তুহীন বিশ্বাস
শব্দবাজিকর শব্দ বোমায় বিস্ফোরিত কলম
নাগরিক কবির নিসর্গ চয়নে মুগ্ধ বাংলাদেশ,
সাহিত্যের আধুনিকতার স্পর্শ পঙক্তিমালায়
একজন কলম যোদ্ধা স্বাধীনতার অংশীদার।
নগর কেন্দ্রিক যান্ত্রিক আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া
অভিঘাত, নৈরাশ্য, আত্মবিরোধ, ব্যর্থতার ধোঁয়া ;
ক্লান্ত নাগরিক জীবন শোভাযাত্রার এক প্রদর্শক-
সাহিত্যে নাগরিকতার ধারক কবি শামসুর রাহমান।
সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর কবিসত্তার বিবর্তন;
স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন, বিষাদ, অন্তর্দহন উপস্থিত কবিতায়
চিত্রকল্প কিংবা রূপকে দেশের সীমারেখা পার,
সৃষ্টিশীলতা কবিতার ভুবনে অনন্য, অশ্রুতপূর্ব।
আজও কবি শামসুর রাহমান...
বারবার ফিরে আসেন দুই বাংলার সাহিত্য ভূবণে
নিস্পৃহ শূণ্যতার কষ্ট বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন মরণে।
তাঁর চুল বাবুই পাখির বাসা
দ্বীপ সরকার
তাঁর ঝাঁকড়া চুলের ভেতর কবে বুনে রেখেছিল এত কবিতার চারা! যখন সিগ্রেট টানতেন- বাবুই ছানারা এসে খেয়ে যাচ্ছিল ধুঁয়োর দুঃখ। কেন প্রতি সকালে এসে খেয়ে যাচ্ছিল কবির এত এত ধূঁয়োসমগ্র- কেউ জানতেন না।
শামসুর রাহমান আমাকে কানে কানে বলে গিয়েছিলেন, তার ঝাঁকড়া চুল আর বাবুই পাখির গল্প।
বাবুই একদিন, তার তালগছে ঝুলন্ত বাড়িটির গন্তব্য ভুলে কবির চুলের ভেতর ঢুকে পড়েছিল। অতঃপর-সখ্যতা, বন্ধুত্ব, কিচিরমিচির। কবি ঝাঁকড়া চুলে গড়ে তুলেছিলেন পাখিদের মত ভাষার বাগান। আমি এর রহস্য বুঝে গেছি।
আমার অস্বস্তির আগুন
আবদুল বাতেন
এখানে সেখানে অবিরাম ধুলাবালি উড়ছে
ধুলাবালির সাথে
বিড়ি- সিগারেটের ধোঁয়া ধুমসে গান গাচ্ছে
সেই গানের বানে
হাঁচি কাশির জীবাণু ধেই ধেই করে নাচছে
হাঁচি কাশির সাথে
মশা- মাছির মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে
মিছিলের লাইন ধরে
মুখ ও বগলের দুর্গন্ধ বাতাসে বেতাল ভাসছে
সেই সাথে
যানবাহনের হর্ন হামেশাই সাঁতার কাটছে
হর্নের হাত ধরে
খিস্তি খেউর খালি উপচে উপচে পড়ছে
তার সাথে
খাদ্যে ভেজাল দেশটাকে গিলে ফেলছে
একই সাথে
ভেজাল মানুষ মসনদে গিজগিজ করছে
সেই ঠেলাঠেলি দেখে
শত শত শূকর আনন্দে আবর্জনা ঘাটছে
শূকরকে গুরু মেনে
তরুণ এবং বৃদ্ধ বানর দিকবিদিক লাফাচ্ছে
সেই লাফালাফির তালে
হুক্কা হুয়া ডাকে শিয়ালেরাও দিগন্ত কাঁপাচ্ছে
কিন্তু আমার আগমনে
একটি জীর্ণ জবা খুশিতে ঝলমল করে উঠছে
সেই খুশিতে
আমার অস্বস্তির আগুন নিভতে শুরু করেছে
নাগরিক কবি
কুলসুম আক্তার সুমী
স্বনামেই তোমার অতুল কীর্তি,
এপার-ওপার দু'পারেই অম্লান!
বেনামেও লিখে গেলে কত কী
সিন্দবাদ, চক্ষুষ্মান, লিপিকার, নেপথ্যে, জনান্তিকে,
মৈনাক; বিপন্ন সময়ে বিপন্ন পরিচয় মজলুম আদিব-
অথচ দৃপ্ত আত্মবিশ্বাস...
'দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক
এই বাংলায় তোমাকে আসতেই হবে।'
নয়া ঔপনিবেশিকতায় নতুন বাস্তবতা,
কণ্ঠরোধ প্রতিরোধ ভাষার লড়াই;
একুশের হাত ধরে উত্থিত জাতীয়তাবাদ,
রাজনৈতিকভাবে কল্পিত সম্প্রদায়...
জনমনে, ঘরে বাইরে প্রস্ফুটিত গল্পে কবিতায়।
স্বাধীন রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অসঙ্গতি; হাহাকার
'উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ'।
পঞ্চকবির পর শ্রেষ্ঠত্বের মালা গলে চলে গেলে,
যেমন যায়; যেতে হয় সকলের।
শহর ঢাকা, রাষ্ট্র বাংলাদেশ
জন্ম ও বিকাশে জড়াজড়ি এক নাম -
এক নাগরিক কবি শামসুর রাহমান।
শামসুর রাহমান তিনি দ্রোহের কবিও
খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন
একজন নাগরিক কবি যখন লিখেন, দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে পোষণ করেন, কিংবা তিনি যখন দেশদ্রোহীতার নিষিদ্ধ অবয়বে নিজেকে আবৃত করতে চান, তখন তাঁকে কী কেবলই প্রেমের কবি বলা যায়? হ্যাঁ। প্রেম যেখানে, পাশাপাশি সেখানে সমূহ বিরহের সম্ভাবনাও থাকে।একজন কবি, তিনি যখন 'নাগরিক কবি' হিশেবেই তাঁর কলমে প্রেমের পঙক্তিমালা বিধৃত করেন, তখন আমরা তাঁকে 'প্রেমের কবি' বলেই স্বাগতম জানাই।
'কতকাল ছুঁই না তোমাকে। কতকাল/ / তোমার অধর থেকে আমার তৃষ্ণা ওষ্ঠ বিচ্ছিন্ন/ এবং কাঁপে না তোমার স্তন বনকপোতীর/ মত থরো থরো/ আমার মুঠোয়।/ আমার নিঃশ্বাসে নেই বিষ/ স্পর্শে যার গোলাপের বুকে/ ছড়িয়ে পড়বে কীট।' -[হাসপাতালের বেডে শুয়ে]
কবি শামসুর রাহমান, তিনি তো দেশের আমজনতার প্রাণের কথাই তাঁর কবিতায় প্রকাশ করছেন। তখন তিনি সকলের প্রিয় কবি হয়ে ওঠেন।
কিন্তু তিনি তাঁর ভালোবাসা এবং প্রেমকে কলমের উপজীব্য করেই বসে থাকেননি। তিনি টেবিলের উপর রাখা ফুলদানিটি, সন্তর্পণে সরিয়ে রেখেছেন দৃষ্টির বাইরে। এবং তাঁর সামনের দেয়ালে রাখা দেশের মানচিত্রের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, 'দেশপ্রেম' এর যত ব্যঞ্জনা দান করেছেন তাঁর কাব্যে, এ সময় তাও তিনি নিজ মনোজগৎ থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছেন। একজন নাগরিক কবিকে যখন তাঁর কাব্য-প্রেমিকা গোলাপের স্তবক দিয়ে তাঁকে অভিনন্দিত করেছেন, তখন তিনি একজন হৃদয়বান কবি হিশেবেই প্রেমিকাকে স্বাগতম জানিয়ে-তাঁর মনোজগতে তাঁকে ঠাঁই দিয়েছেন।
আবার একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোর প্রেক্ষাপটে যখন তিনি লিখেন 'স্বাধীনতা তুমি' বা তার আগে 'আসাদের শার্ট' কবিতায় ঊনসত্তরের বিক্ষুব্ধ সময়ের চিত্রকে বাঙময় করে তোলেন, তখন আমরা তাঁকে অকুণ্ঠ সমর্থন করি।
সেই ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কবি লিখেছেন, 'আসাদের শার্ট' কবিতা।
'গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের/ জ্বলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট/ উড়ছে হাওয়ায়, নীলিমায়।
... ... ... ...
আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা/ সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;/ আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।'
আবার একাত্তরের নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন,
'স্বাধীনতা তুমি/ শহীদ মিনারে অমর একুশে ফেব্রুয়ারির উজ্জ্বল সভা/ স্বাধীনতা তুমি/ পতাকা-শোভিত শ্লোগান-মুখর ঝাঁঝালো মিছিল।'- [স্বাধীনতা তুমি]
'তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,/ তোমাকে পাওয়ার জন্যে/ আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ? আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ?
... ... ...
আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুডে বেডানো/ সেই তেজী তরুণ যার পদভারে/ একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হ'তে চলেছে –/সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।'-[তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা]
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তিরিশ লক্ষ শহীদদের হারানোর শোকে কাতর কবি লিখেছেন,
'এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?/ তেমন যোগ্য সমাধি কই?/ মৃত্তিকা বলো, পর্বত বলো/ অথবা সুনীল-সাগর-জল-/ সব কিছু ছেঁদো, তুচ্ছ শুধুই!/ তাইতো রাখি না এ লাশ আজ'/ মাটিতে পাহাড়ে কিম্বা সাগরে,/ হৃদয়ে হৃদয়ে দিয়েছি ঠাঁই।'-[এলাশ আমরা রাখবো কোথায়?]
পাকিস্তানী বর্বর হানাদার এবং তাদের দোষরদের অভিশাপ দেওয়া ছাড়া, একজন সহজ সরলপ্রাণ কবির আর কী করার আছে?
'তবু, আজ এখানে দাঁড়িয়ে এই রক্তগোধূলীতে অভিশাপ দিচ্ছি/ আমাদের বুকের ভেতরে যারা ভয়ানক কৃষ্ণপক্ষ দিয়েছে সেঁটে/ মগজের কোষে কোষে যারা পুঁতেছিলো আমাদের আপনজনের লাশ- দগ্ধ, রক্তাপ্লুত/ যারা গণহত্যা করেছে শহরে গ্রামে টিলায় নদীতে ক্ষেত ও খামারে/
আমি অভিশাপ দিচ্ছি নেকড়ের চেয়ে অধিক পশু সেই পশুদের;' - [অভিশাপ দিচ্ছি]
তারপর দেশী স্বৈরাচার প্রবল আক্রোশে চেপে বসে লাল-সবুজ পতাকার ছায়াতলে। তিনি সেই 'নাগরিক কবি' রাজপথে নেমে আসেন শিল্পী, সাহিত্যিক, এবং অন্যান্য পেশাজীবিদের সাথে। তখন তিনি নিজেকে কেবল 'নাগরিক-কবি' ভাবতে রাজী নন। লেখনীতে কেবল; দেশপ্রেমের শব্দাবলী ঝরিয়ে ক্ষান্ত হতে চান না তিনি। যখন সেলিম-দেলোয়ার, ডাক্তার মিলন-জেহাদ-নূর হোসেন পীচঢালা রাজপথে অকাতরে ঢেলে দিচ্ছে, তখন একজন প্রধান কবি তিনি নিজেই আন্দোলিত হন। প্রণোদিত হন তাঁদের মত হতে। হ্যাঁ। উত্তাল রাজপথে জীবন উৎসর্গকারী সেই শহীদেরা, তো শুধু সাধারণ নাগরিক নন। তাঁরা পরীক্ষিত খাঁটি দেশপ্রেমিকও বটে। এবং তাঁরা স্বৈরাচারের ভাষায় 'দেশদ্রোহী'ও বটে। তাই একজন কবি শামসুর রাহমান তিনি নিজেকে ওদের মতোই, নিজেকে আপাদমস্তক 'দেশদ্রোহী' ভাবতে চান। তাই তিনি তাঁর কলমে তুলে আনেন কুণ্ঠাহীন শব্দ, 'দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে।'
'বিবরে লুকিয়েছিল যারা গির্জের ইঁদুর হয়ে/ ইদানীং তারা বনবেড়ালের রূপে/ তুমুল ঝাঁপিয়ে পড়ে শান্তির চাতালে,/
যখন তখন বসায় নখর দাঁত/ জায়মান সৌন্দর্যের গোলাপি গ্রীবায়।/ এখন লুকাতে চাই আমি/ আরো অনেকের মতো মেঘের আড়ালে,/মেঘনার তলদেশে, শস্যের ভেতরে রাত্রিদিন।'- [দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে]
দেশের প্রধান নাগরিক কবি শামসুর রাহমান, এখন বেঁচে নেই। এ সময় বেঁচে থাকলে; তিনি হয়তো লিখতেন, 'শেষ পর্যন্ত আমি দেশদ্রোহী হয়ে গেলাম!'
এরশাদের সময়, স্বৈরাচারের শাসনের প্রতিবাদে এবং পরে বিএনপির শাসনামলে গোলাম আযমের ফাঁসীর দাবীতে ঢাকায় শহীদ-জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে প্রতিকী গণ-আদালতের তিনি অসংখ্য শিল্পী-সাহিত্যিক-পেশাজীবিদের সাথে শরীক হয়েছিলেন। দেশের জনগণের উপর চেপে থাকা, স্বৈরাচারী শাসনের প্রতিবাদে রাজপথে সোচ্চার ছিলেন কবি। গোলাম আযমের বিচারের দাবীতে প্রতিকী 'গণ-আদালত' করার দায়ে, তাঁর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহীতার মামলাও হয়েছিল।
তো আমাদের স্বীকার করতেই হবে, কবি শামসুর রাহমান স্বীয় কাব্যের উপমায়, উৎপ্রেক্ষায়, ভাবের ব্যঞ্জনায়, শব্দের অলঙ্কারত্বে এবং মাত্রাগত চমৎকারত্বে নিজেকে এবং তাঁর সময়কে উপস্থাপন করেছেন সুনিপুণ ভাবেই। প্রেমের পাশাপাশি, দ্রোহকেও তিনি তাঁর কাব্যে গুরুত্ব দিয়েছেন।
দু'হাজার চব্বিশে বেঁচে থাকলে, কী করতেন তিনি? তাঁর চরিত্রে কী অভিধা যুক্ত হতো? এবং বর্তমান সময়ে কী হতো তাঁর অবস্থা? আবার কি 'হরকাতুল জিহাদ' সশস্ত্র হয়ে চড়াও হতো তাঁর উপর? কারণ একাত্তরের পাকিস্তানী হায়েনাদের দোসরচক্র তো, এই স্বাধীন বাংলাদেশে নতুন রূপে আবার আবির্ভূত হয়েছে! এখন তারা স্লোগান দেয়, 'গোলাম আযমের বাংলায়, মুজিববাদের ঠাঁই নাই ...।' এবং তারা সদম্ভে এদেশে, পাকিস্তানী পতাকা উড়িয়ে কায়েদে আযমের জন্মদিন উদযাপন করে! তাঁর ভাগ্যে, একটা কিছু ঘটতো নিশ্চয়!
কবি শামসুর রাহমান কি, এ সময় তাঁর নিজ বাসভূমে, একাত্তরের পাকিস্তানী দোসরদের দাপাদাপি দেখতে পাচ্ছেন? তাই কবির উদ্দেশে বলি, 'হে কবি, তুমি দেখতে পাচ্ছ সবই। তাই তুমি, তোমার উত্তরসূরি করে একজন দ্রোহের কবিকে, পাঠিয়ে দাও তোমার এই বাংলাদেশে!'
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন