https://www.prothomalony.com/
14315
literature
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণদিবস বাঙালি মানসে শুধুমাত্র একটি ক্ষতচিহ্নই নয়, এ এক ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত অনন্ত রূপান্তরের বেদনাসুর। বাইশে শ্রাবন, যে দিনটিতে তিনি শারীরিক অবসান ঘটালেন, সে দিনটি তার অক্ষয় সৃষ্টিসাধনার আলোকবর্তিকাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলল; যেন মৃত্যুর মধ্য দিয়েই তিনি হয়ে উঠলেন চিরকালীন। তিনি কেবল একজন কবি নন, তিনি এক যুগচেতনা, নন্দনতাত্ত্বিক রাজপথের পথিক, যার ধ্বনি আজও প্রতিধ্বনিত হয় আমাদের চেতনার অন্তঃপুরে।
এই পত্রিকার পাতা নিবেদিত সেই কালজয়ী সাধকের স্মৃতির প্রতি, যিনি শব্দে নির্মাণ করেছেন অনন্তের সেতু, যিনি জীবনের সূক্ষ্মতম অনুভবকে রূপ দিয়েছেন ছন্দে, গানে, নাটকে, চিত্রে ও দার্শনিক বচনে। এই সংখ্যায় সংকলিত হয়েছে তাঁর সৃষ্টিসম্ভারের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি-রূপে নিবেদিত প্রবন্ধ, কবিতা ও বিশ্লেষণ।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের যে পাঠ দিয়েছেন, তা কেবল শব্দে নয়, চিন্তায়, বোধে এবং মানবিকতায়; সেই পাঠকে নতশিরে স্মরণ করাই আমাদের এই প্রচেষ্টার মূল লক্ষ্য।
ধন্যবাদান্তে- এইচ বি রিতা।
রবীন্দ্রনাথ ও শান্তির দূতিয়ালি
তমিজ উদ্দীন লোদী
তুমি কৌতূহলে নাকি সংশয়ে বলেছিলে-
"কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি কৌতূহল ভরে ...''
কবিতাবিমূখ লোক, কবিতা থেকে ফিরিয়ে নিয়েছে মুখ
তবু আজও কখনো সখনো তোমাতেই ফিরায় মুখ এই ঘোর কালে
' নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস ' বলে
অযথাই ক্ষোভ ঝাড়ে। নাগিনীরা এখনো নিয়ত 'ফেলিছে নিঃশ্বাস।'
এখনো ঝড়ের মতো হানছে তারা শান্তিকামি মানুষের ঢলে
এখনো এখানে-সেখানে আগুনের উষ্ণীষ
মানুষেরা খুব সচেতনে সরিয়ে রেখেছে মোৎসার্ট, বেঠোফেন
সরিয়ে রেখেছে গীতাঞ্জলী
মানুষ মারবে বলে মারণাস্ত্রেই মানুষের বসবাস
মনে পড়ে তলস্তয়ের 'যুদ্ধ ও শান্তির' কথা
এখন শুধুই যুদ্ধ আছে, শান্তি চলে গেছে অদৃশ্য ভাগাড়ে
তুমিওতো শান্তি চেয়েছিলে, জানি না কি শান্তি বিরাজিত এখন
তোমার শান্তি নিকেতনে?
তবু তোমার শান্তির সাথে আরও আরও শান্তি যোগ হোক
আমরা যেন দেখে যেতে পারি চারিভিতে শান্তির গৌরব ।
শ্রাবণধারা জানে
শঙ্খশুভ্র পাত্র
'আমার এ ঘর বহু যতন ক'রে
ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে৷ আমারে যে জাগতে হবে,
কী জানি সে আসবে কবে...'
শ্রাবণধারা জানে, শ্রবণ... জ্যোৎস্না রাতে
সবাই যাব বনে...
বানিয়ে তোলা নয় সে দুঃখ— দাহ তো সেই
অন্তর্লীন ধ্বনি৷
অশ্রুত সুর— অশ্রুকণায় পরিস্রুত৷ সমস্ত বন্ধনী
অস্তরাগে মিলাই৷ আখর, জোড়াসাঁকোয় স্থিতি৷
তুমিই শ্রাবণ... অনুধাবন, ক্ষমার মতো প্রীতি
আত্মীয়তার পাঠে
নতজানু হয়েই আছি— বন্ধুর সেই বাঁক
স্পর্শ করি৷ দহন, আমার একান্ত বৈশাখ...
এ ছাড়া কি জীবন মেলে?
সকলই কি পাঠ যোগ্য, টীকা?
শ্রাবণধারা জানে প্রদীপ— প্রজ্জ্বলিত শিখা...
ঠাকুরপুরাণ
সুমন শামসুদ্দিন
তোমার দীপনে চির-উজ্জ্বল শব্দতটিনী যত;
কবিতা তোমায় জড়িয়ে ঘুমায় কনকলতার মতো।
কাব্যানুরাগ অনন্তসুরে তুমি যে প্রাণের কবি;
কাব্যাকাশের অধিপতি তুমি, এঁকেছো জীবনছবি!
দীপ্তিপূর্ণ অহোবৈশাখ, পদ্মকরের রাগে;
শ্রাবণের ধারা অকালসন্ধ্যা হৃদয়শোণিতে জাগে।
কৃষ্টিজগতে চারণ-ভূপতি তুমি সুপ্তোত্থিতা;
গীতাঞ্জলির স্ফুরিতকিরণ বিশ্বকোষ বিজিতা।
গুরুদেব তুমি ব্রজ্যা সকল, কৃষ্টি সৃষ্টিমূলে;
ধ্রুপদি নৃপতি মহারাজ তুমি বিশ্বভারতী কূলে!
তোমার রচনা অমৃতসুরেলা বিশ্বহৃদয়ে বাজে;
ইন্দো-আর্য নরপতি তুমি বিদ্যাবিনোদ সাজে।
শত-শতাব্দী পার হয়ে যায় অমলিন তবু রবি;
বাঙালিপ্রাণের নবীন কিশোর তুমি যে শাশ্বত কবি।
তুলনারহিত
কোমল দাস
লেখনি দিয়েই আজও বেঁচে আছো তুমি,
লেখার জাদুতে কেড়েছো সবার মন।
কলম খোঁচায় চাষ করে মরুভূমি,
হয়ে গেছো তুমি সবার আপনজন।
মনে হয় তুমি শত জনমের চেনা,
প্রিয়জন সেজে কথা বলি মাঝে মাঝে।
তুমি তো জানো না এইসব লেনাদেনা,
তবুও হারাই তোমার প্রেমের ভাজে।
অঢেল অঢেল কাব্য আলাপ করে,
মনে যেই ওঠে দোলনার শিহরণ।
সেই বলে উঠি অনেক অনেক জোরে,
কেন তাকে ভাবি এতোটা আপনজন?
মন হেসে বলে অনেক কারণ এর,
দেখিস না তুই তাঁর কাব্যের সুর?
খুঁজে দেখলেই সবকিছু পাবি টের,
তুলনারহিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
আমরা আছি সব যুগে
আশরাফ হাসান
রবিযুগে এলো নোবেলযুগ
গীতিযুগে শব্দ-ছন্দ মুক্ত "হংস বলাকা"
কবিতা দম নেয়, রিল্যাক্স করে ;
তন্দ্রা-তন্দ্রা সাস্থ্যবান যুগ
রবিযুগে বৃষ্টি-বৃষ্টি "ঘন-বরষা"
রবিযুগে সুরে সুরে আত্মার আরাম
কবি হাফিজের ভাবনা ওড়ে আসা
মন মজে মনের কতকথায়
নদীদের পথচলা ছেলেদের আনন্দ--
"আঁচলে ছাকিয়া তারা ছোট মাছ ধরে"
তারপর প্রশান্তির ছায়ায়
তপ্ত বালিকা ভেজাতে আসে রবিযুগ
কবিতা দম নেয়, রিল্যাক্স করে ;
হঠাত্ লাফ দেয় অগ্নিযুগ
অগ্নিযুগে রবিযুগ, রবিযুগে অগ্নিযুগ
সমুদ্র- স্বপ্নযুগ, জোছনাযুগ
আমরা আছি সব যুগে
মিলেমিশে ক্রান্তিযুগ।
রবিচ্ছায়া
বেনজির শিকদার
বৃক্ষছায়ায় দাঁড়ায় যখন এসে
সামনে হাসে আদিগন্তের ছবি।
সূর্য তখন আছে কোথাও দূরে
গান-কবিতায় মগ্ন তখন কবি।
কবির চোখে সুদূর খেলা করে
গহীন মনে অস্তাচলের মোহ।
কণ্ঠে ধরে ঘুমভাঙানি গান
দৃষ্টিজুড়ে খেলে কবির দ্রোহ!
ছায়ার সাথে কথা বলেন কবি
ধুলোর সাথে সখ্য গড়েন মনে।
লোকালয়ে বসে থেকেও তিনি
পাখ-পাখালির আওয়াজ শোনেন বনে!
শব্দ যখন আলোর নেশায় মাতে
ভাবের হাঁটে কল্পলোকের ছবি!
কবির নামটি সূর্যরোদের মিশেল
ভালোবেসে জপ করি তাই রবি।
প্রণতিস্মরণ: কবিতার চূড়ান্ত ঋষি
এইচ বি রিতা
তুমি জাগালে আলো, না শুধু দীপশিখায়
বরং চেতনার জ্যোতির্ময় ঘূর্ণিতে।
জীবন-প্রণালির প্রতিটি বাঁকে তোমার পাদচিহ্ন,
তোমার শব্দে পায় আত্মার মুখরতা।
তুমি তো জানালে-
"মরণ রে, তুঁহুঁ মম শ্যামসমান",
কোন ঋষি এমন নিঃশঙ্কে মৃত্যুকে আহ্বান করে?
কে এই জীবনমোহের রঙ্গমঞ্চে নির্মোহ হয়ে বাজায়
চিরপ্রেমের বীণা?
তুমি 'জীবনের জয়' রূপে এসেছিলে বেদনার ভেতর
পত্রপাতার শব্দে, শূন্যতার ভিতর দীপ্ত ব্যঞ্জনায়।
তোমার ছায়াপথ ধরে হাঁটে আজও
সব অরণ্যভুল পথিক-প্রতিটি শ্রাবণ ভোরে,
বৈশাখী রৌদ্রে, শ্রুতি ও নীরবতার সন্ধিক্ষণে।
তোমার রচনার প্রতিটি অলিন্দ
ভাষার বেদীর মতো,
যেখানে উচ্চারণ নয়, অনুভবই আরাধ্য।
তুমি স্বরের অতীত, ছন্দের আরাধ্য পুরুষ,
কবিতার জ্যোতিষ্ক-যার তেজস্বরূপে ঝরে পড়ে
বিশ্বচেতনার সন্ধ্যাবর্ণা।
তোমার কাব্যে 'বিশ্বমানব' বাঁচে,
'বঙ্গমানব' শিখে উড়তে,
তোমার গানে মেলে 'নির্জর স্বপ্নের সেতুবন্ধ',
আর আমরা...
আমরা শুধু সেই নদীর তীরে বসে, শব্দ তুলে বুনি,
যেখানে তুমি একা বয়ে যাও ধ্রুপদ প্রতিস্বরে।
বাইশে শ্রাবণের রবীন্দ্রনাথ
স্বপন বিশ্বাস
ছোটবেলায় রবি ঠাকুরের ছবি সবাই আঁকে। আমিও আঁকতাম। সেদিন খুব বৃষ্টি ছিল। জানালার ওপারে বর্ষার থৈ থৈ বিল ।অঝর ধারায় বৃষ্টি ঝরছে। আকাশ জুড়ে গরুর পালের মত দলে দলে মেঘ চরে বেড়াচ্ছে। এরমাঝে বাংলা স্যার এসে ক্লাসে ঢুকলেন। রবি ঠাকুরের 'সামান্য ক্ষতি' কবিতা পড়াবেন। পড়াবেন মানে কঠিন কঠিন শব্দের অর্থ জিজ্ঞাসা করবেন। এই কঠিন কঠিন শব্দের অর্থ না জানলে কি এমন অসামান্য ক্ষতি হয় তা আমি আজও জানিনা। তবে সেদিন তিনি তা পড়ালেন না। বললেন, আজ বাইশে শ্রাবণ। রবীন্দ্রনাথের প্রয়াণ দিবস। প্রয়াণ মানে যে মৃত্যু সেটা ততদিনে জেনেছি। স্যার বললেন রবি ঠাকুর হলেন কবিগুরু বিশ্বকবি। তার মৃত্যুতে প্রকৃতিও মেঘ মেদুর হয়ে ওঠে। মৃত্যু সম্পর্কে কবি বলেছেন, মরণ রে, তুঁহুঁ মম শ্যামসমান। সে কথার অর্থ কি তা তখন যেমন জানতাম না এখনও যে তার চেয়ে বেশি কিছু জানি তা আমি মনে করি না। স্যার এরকম বিভিন্ন কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছেন আর মাঝেমাঝে বলছেন রবি ঠাকুর হলেন বিশাল ব্যক্তিত্ব। আমি তখন মনযোগ দিয়ে বিশাল ব্যক্তিত্বের ছবি আঁকার চেষ্টা করছি। এক পর্যায়ে স্যার বুঝতে পারলেন আমি তার কথা শুনছি না। খাতার ভেতরে অন্য কিছু আঁকিবুকি করছি। তিনি আমার দিকে এগিয়ে এলেন। তারপর খাতাটা হাতে নিয়ে বললেন, বাহ! খুব সুন্দর এঁকেছিস তো। নিজের সৃষ্টি কর্মের এমন প্রশংসা শুনলে কারোরই হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। আমি প্রশ্রয় পেয়ে মুখ ফসকে বলে ফেললাম।এতো বড় 'বিশাল ব্যক্তিত্ব' তাকে ঠিক ছবির মাঝে আঁকতে পারছি না। স্যার কিছুক্ষণ অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আমি স্যারের চোখ থেকে চোখ নামিয়ে নিয়েছি। হাত ঘামছে। গলা শুকিয়ে আসছে।স্যার বিশাল ব্যক্তিত্ব কথাটা অনেক বার বলেছেন আর আমি সে কথাটাই তাকে আবার শুনিয়েছি। ভাবছি, না জানি কত বড় অপরাধ করে ফেলেছি। স্যার হয়তো এখনি বেতটা নিয়ে এসে বলবেন, হাত পাত। তারপর সপাং সপাং দিয়ে বলবেন, আমার সাথে ফাজলামি হচ্ছে! কিন্তু স্যার এ সবের কিছুই করলেন না। আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, খুব ভাল বলেছিস তো। তারপর কেমন যেন উদাস হয়ে বার বার বলতে থাকলেন, এতো বড় 'বিশাল ব্যক্তিত্ব' তাকে ঠিক ছবির মাঝে আঁকতে পারছি না। স্যার নিজেও কবিতা লিখতেন। মাঝেমাঝে এমন উদাস হয়ে যেতেন। উদাস হয়ে গেলে তিনি আর পড়াতেন না। আজও কাউকে কিছু না বলে বিড়বিড় করতে করতে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন। ক্লাসের সবাই যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। তবে আমার এই উপলব্ধিটা মগজের মাঝে স্থায়ী হয়ে গেল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আর্ট কলেজের এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম এই উপলব্ধির কথা। বিশালত্বকে কিভাবে ছবির মাঝে ফুটিয়ে তোলা যায়। বন্ধু শুনে বলল, এই জন্যই তো শিল্পীরা আ্যবস্ট্রাক্ট মানে বিমূর্ত ছবি আঁকে। আমাদের যেসব অভিব্যক্তি বা উপলব্ধিকে ছবিতে মূর্ত করা সম্ভব নয় সেগুলোই বিমূর্ত করে আঁকা হয়। আমি হেসে বললাম ওটাতো আমার কাছে আরও দুর্বোদ্ধ মনে হয়। আমার শিল্পী বন্ধুটি খুব অনুযোগের সুরে বলল, তুই সব কিছুকেই অন্যভাবে দেখিস। যেটা যেভাবে দেখা উচিত সেটা সেভাবেই দেখা বা বোঝা উচিত। ভেবে দেখলাম বন্ধুর কথা হয়তো অনেকাংশেই ঠিক। এই যেমন বাইশে শ্রাবন। রবি ঠাকুরের মৃত্যুর দিন। মৃত্যু মানেই দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়। চোখে জল ছল ছল। অন্তত পক্ষে একটা শোকের ব্যাপার তো থাকাই উচিত। যে আমি বাংলা সিনেমার সংলাপ শুনে চোখের জল ধরে রাখতে পারি না। ছেলে মেয়ের সামনে বিব্রত বোধ করি। সেই আমার কাছে বাইশে শ্রাবনকেও পঁচিশে বৈশাখের মতো কবিগুরুর জন্মদিন মনে হয়। মনে হয় আমরা যে রবি ঠাকুরের কথা বলি সেতো জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়ীর পিতা মাতার স্নেহ ভালবাসা বন্চিত চাকর বাকরের অধিনে থাকা ছোট্ট রবি নয়। আমরা যে রবি ঠাকুরের কথা বলি সে বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাকে তো আমরা পরিপূর্ণ ভাবে পেয়েছি বাইশে শ্রাবন। যেমন খেলার মাঠে আমরা টান টান উত্তেজনা নিয়ে খেলা দেখা শুরু করি। মাঝেমাঝে চিৎকার দিয়ে উল্লাস করি, গো-ল ছ-ক্কা আ-উ-ট। সেটা কিন্তু কোন খেলার ফলাফল নয়। সাময়িক উল্লাস। ফলাফল নির্ধারিত হয় শেষ বাঁশি বাজার পর। তখন আমরা মূল্যায়ন করতে পারি খেলার ভালো মন্দ জয় পরাজয় সব কিছু। একথা ঠিক কোন কোন খেলা শেষ বাঁশির সাথে সাথে শেষ হয়ে যায়। কোন কোন মৃত্যুও শেষ করে দেয় সব কিছু। কখনও অপরিণত অসম্পূর্ণ জীবনের মৃত্যু, কখনও বা সম্পূর্ণ জীবনের মৃত্যু অথচ সারা জীবনের এমন কোন অর্জন নেই যা তাকে মৃত্যুর পরেও বাঁচিয়ে রাখবে। রবীন্দ্রনাথ আমাদের জীবনের হাসি-কান্না সুখ-দুঃখ আনন্দ- বেদনা প্রেম-বিরহ সব সময়ের আশ্রয়। সব সময়ের অবলম্বন। তিনি আমাদের কাছে জীবিতের অধিক জীবিত। তিনি চিরঞ্জিব। তার কোন মৃত্যু নেই। তার কথা বলতে গেলে আমাদের ভাষা শেষ হয়ে আসে। তখন গঙ্গাজলে গঙ্গা পূজা করতে হয়। তার ভাষাতেই তার কথা বলতে হয়।
তোমায় নতুন করেই পাব বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণ
ও মোর ভালোবাসার ধন।
দেখা দেবে বলে তুমি হও যে অদর্শন,
ও মোর ভালোবাসার ধন॥
এই সুর এই ভাষা হয়তো তিনি নিবেদন করেছেন তার ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে। অথচ এই ভাষা যখন আমাদের প্রাণে সুর তোলে তখন তিনিই হয়ে ওঠেন আমাদের ভালোবাসার ধন, প্রাণের ঠাকুর। তখন খুব জানতে ইচ্ছা করে জীবন মৃত্যুকে তিনি কিভাবে দেখেছেন।বিশেষ করে পরিণত বয়সে মৃত্যুর আহ্বান যখন শতত আমাদের প্রাণে পরশ বুলিয়ে যায় তখন তো তার কাছেই আমাদের আশ্রয় নিতে হয়। রবীন্দ্রনাথ কৈশোর ও প্রথম যৌবনে "ভানুসিংহ" ছদ্মনামে ১৮৮৪ সালে সেই ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলীতেই লিখেছিলেন, মরণ রে, তুঁহুঁ মম শ্যামসমান ... মৃত্যু অমৃত করে দান। মৃত্যু অবধারিত জেনে তিনি মৃত্যু চিন্তার মাঝে নান্দনিকতার সন্ধান করেছেন।লিখেছেন 'তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে যত দূরে আমি ধাই- কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু, কোথা বিচ্ছেদ নাই'।
তিনি জীবনের শেষ বেলায় এসে 'প্রাণ' কবিতায় লিখেছিলেন, 'মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে/মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।' মানুষের মাঝেই তিনি বেঁচে আছেন। বেঁচে থাকবেন তিনি আনন্তকাল। তিনি আমাদের আশ্রয়। সুখের সাথি আর দূ:খের সহায়।তিনি আমাদের পথপ্রদর্শক। আঁধার পথে তিনি আমাদের অন্তরে আলো জ্বেলে দেন। সেই আলোয় আমরা আমাদের পৃথিবীকে খুঁজে পাই। 'নয়নসমুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই - আজি তাই, শ্যামলে শ্যামল তুমি, নীলিমায় নীল। আমার নিখিল, তোমাতে পেয়েছে তার অন্তরের মিল।'
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন