https://www.prothomalony.com/
14252
literature
মাইলস্টোনের বিমান দুর্ঘটনায় নিহত-আহত শিশুদের স্মরণে
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৫ ০২:৫৩
(ছবি-AI)
ভূমিকাঃ
গত ২১ জুলাই দুপুরে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের ভবনের মুখে একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এই দুর্ঘটনায় হতাহতদের বেশির ভাগই শিশু। আগুনে শুধু ভবন পুড়ে যায়নি, পুড়ে ছাই হয়েছে আমাদের প্রজন্ম, মায়েরা, শিক্ষকরা। মাইলস্টোনে বিমান দুর্ঘটনায় যেসব শিশু নিহত হয়েছে, যারা এখন আর খেলবে না, হাসবে না, বা মা বাবার কোলে ফিরবে না-এই কবিতার পাতা তাদের স্মৃতির প্রতি এক নিঃশব্দ শ্রদ্ধার্ঘ। এখানে শব্দেরা কেবল শোক প্রকাশ করছে না; তারা প্রশ্ন তোলে: কেন? কার জন্য এই আগুন? এই কান্না? এই ছটফটানি?
এই পৃষ্ঠার প্রতিটি কবিতা সেই অসহায় মানুষের মুখপাত্র, যারা এখনো সন্তানের লাশ খুঁজে ফেরে ধ্বংসস্তূপে, যারা হাসপাতালে ছটফট করছে, যারা সন্তানের পোড়া শরীরের সামনে চিৎকার করছে, অথচ কোনো জবাব পাচ্ছেনা। এই কবিতাগুলো কোনো রাজনীতির পক্ষ নেয় না-এরা কেবল মানবতার পক্ষ নেয়। কারণ এই আগুনের মাঝখানে প্রথম যে মরেছে, সে হলো ভবিষ্যৎ। প্রার্থনায় আমরা শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করছি।
ধন্যবাদান্তে-এইচ বি রিতা।
এঞ্জেল মাহরিন ম্যাম
সাকিব জামাল
বাংলাদেশের নাইটিঙ্গেল
এঞ্জেল মাহরিন,
আপনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা
আর আজীবনের ঋণ।
বাঁচাতে গিয়ে ছাত্র-ছাত্রী
নিজেই হলেন লাশ!
মানবতা ও আত্মত্যাগের
এক অম্লান ইতিহাস।
আপনি বাঁচবেন হৃদয়ে হৃদয়ে,
ভাস্বর চিরদিন,
জান্নাতের পাখি হয়ে থাকুন
এঞ্জেল মাহরিন।
হায়! আমাদের স্বপ্নগুলো
খ্রীষ্টফার পিউরীফিকেশন
আমাদের স্বপ্নগুলো উড়ে যায়
হায়! স্বপ্নগুলো সব পুড়ে যায়!
ছোট ছোট সরল প্রাণ, সম্ভাবনাও অফুরান
থোকায় থোকায় স্বপ্ন ছিল; বুক ভরা আশা ছিল!
স্বপ্নগুলো রঙ খুলে, পাখা মেলে বড় হবে,
একসময় ছোট্ট প্রাণের-আকাশ ছোঁয়া বিকাশ হবে।
এই শপথে ওরা সবাই, বই খাতা কাঁধে নিল
দীপ্ত পায়ে ছুটে গেল; পাঠশালায় শামিল হল
আহা! আনন্দে মাতল তারা, সবাই হলো আত্মহারা
সুরে ছন্দে নাচে গানে; হই-হুল্লোড়-কলতানে
ক্লাস-রুমে খুনসুটি, খেলার মাঠে ছুটাছুটি
সূর্যালোকে ঘেমে ওঠা; গায়ে জামায় ধুলি মাখা
তারা সবাই মেতে উঠবে-সৃষ্টি সুখের উল্লাসে।
আহা! কী আনন্দ আকাশে বাতাসে!
কিন্তু হায়! কোথা দিয়ে কী হলো!
স্বপ্ন সবার ভেঙ্গে গেল!
আচমকা দানব এসে; তাদের উপর থাবা মারল!
আগুনের শিখায় তাদের; সবকিছু জ্বলে গেল!
পুড়ে গেল! হায় তারা মরে গেল!
ফুলের মত উজ্জ্বল তারা, কেন এমন ঝরে গেল?
উত্তর নেই! পথ নেই! বিচারের সুযোগ নেই!
তোমরা অবুঝ সোনামণি, স্বর্গের রঙিন বাগানে;
চিরকালই সতেজ থাকো। নাচে গানে মেতে থাকো।
রঙিন হয়ে সবুজ হয়ে-চিরকালই বেঁচে থাকো।
নীরবতার পাঠশালা
হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া
কাল আর কাউকে ডাকা হবে না-
ঘুম ভাঙবে না ঘণ্টাধ্বনিতে।
দরজায় দাঁড়িয়ে থাকবে না টিফিন হাতে মা,
গল্পে মাখানো বাবার অফিসপথ আজ শুন্য।
হোমওয়ার্ক নেই, হই-হুল্লোড় নেই,
নেই খেলার বায়না কিংবা বিকালের আকাশ-
শুধু বোবা ব্যাগ, নিস্তব্ধ বেঞ্চ,
কালো পাতায় জমে থাকা অদেখা প্রশ্নপত্র।
স্কুল আর জায়গা নয়,
সে আজ সময়ের এক স্থবির যাদুঘর
যেখানে প্রতিটি ডেস্কে জমা
অপ্রকাশিত স্বপ্নের খসড়া।
কেউ আর ফেরে না-
না ক্লাস থেকে, না খেলাঘর থেকে।
কে যেন প্রশ্ন রেখে যায়-
"শিশুদের মৃত্যুও কি আজ পাঠ্যসূচির অংশ?"
সান্ত্বনার ভাষা জানা নেই
আশরাফ চঞ্চল
যে মায়ের কোল আঁকড়ে ধরে থাকত
ফুলের মত শিশুটি
সারাক্ষণ মা মা বলে ডাকত
সে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেল
যে বাবার হাত ধরে থাকত আরেকটি কোমল হাত
গুটিগুটি পায়ে হাটত
সে এক নিমিষেই নাই হয়ে গেল
যে বাগানে ফুটেছিল নানান রঙের ফুল
ফুলেল সৌরভে ছেয়ে থাকত চারপাশ
আগুনের দৈত্য এসে সেটা ধ্বংস করে দিয়ে গেল
কাকে কিভাবে সান্ত্বনা দেব আমি
সে ভাষা আমার জানা নেই!
পোড়া যন্ত্রণা
আব্দুস সাত্তার সুমন
আম্মু আম্মু! বলো খুকু? দেহ আমার পুড়ে,
জ্বলছে আমার চামড়া টুকু খাচ্ছে কুড়ে কুড়ে।
আব্বু আব্বু! বলো খোকা? স্বর্গের ফেরেশতা দাঁড়ি,
আমি নাকি বড্ড বোকা নিয়ে যাবে বাড়ি।
ভাইয়া-আপু! শুনছি জান? ধরে আমায় রাখো,
উড়ে যাচ্ছে নিঃশ্বাস প্রাণ একটু পাশে থাকো!
তীব্র ব্যথায় চোঁখের পানি, কষ্টে আমার জীবন দানি,
পোড়া যন্ত্রণায় পুড়ছি আমি, ধরে রেখো একটুখানি।
এপার থেকে যাচ্ছি একা, ওপার আছে বন্ধু সখা,
আর করবে না বকাঝকা-মাটির ঘরে থাকবো একা!
চিরস্মরণীয় সুর
জাহাঙ্গীর চৌধুরী
তোমরা চলে গেলে মাইলস্টোন পেরিয়ে,
তোমরা ছিলে কাননে সদ্য ফোটা ফুল।
ফুলের শোকে মালী পাথর বেঁধেছে বুকে,
সবার এখনো অজানা কিসে ছিল ভুল?
মানুষ আমরা পশুর মতো,
মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে প্রাণ শতশত,
পশুর দল হয়েছে বানিজ্যরত।
নিরদ্বিধায় প্রাণ বিসর্জন করলো,
পাইলট শিক্ষাগুরু পুষ্পগুলো রক্ষায়।
তোমরা ঝরে বেঁচে আছ আমাদের মাঝে,
তোমরা শহীদ তোমরা অমর,
আমাদের চিরস্মরণীয় হৃদয় বিদারক সুর।
জান্নাতি ফুল
বশির আহমেদ
মাইলস্টোনে ঝলসে গেছে শিশু ফুলের বাগান,
আগুনের কোন আদর্শ নেই!
কনফুসিয়ার অভাবে বিক্ষিপ্ত আচরণ,
তবে আগুন হতে পারতো এথেন্স শহরে জন্ম নেওয়া
বড় কোন দার্শনিক।
আগুনের রূঢ়ভাষা ইতিমধ্যে আতস্ত করেছে
আমার সন্তান তুল্য মাইলস্টোনের অসংখ্য জান্নাতি ফুল!
আহাজারি
আসাদ সরকার
সন্তান হারা মায়ের বুকে-চলছে আহাজারি,
হাসপাতালে পাশে আছে; লাশ সারি সারি।
আকাশ বাতাস কম্পনে-কাঁপছে গোটা জাতি,
সন্তান ছাড়া ক্যামনে কাটবে; বাবা মায়ের রাতি।
জাদু ময়না খোকন সোনা-ডাকবে তারা কারে,
বুক তাঁদের যাচ্ছে ভেঙে; খোকার লাশের ভারে।
অভিমানী খোকন সোনা-আয় না ঘরে ফিরে
সারাজীবন বুকের মাঝে; আগলে রাখব তোরে।
স্বপ্নগুলো আগুনে পুড়ে গেছে
গোলাম সরোয়ার
ফুলগুলো সব ঝরে পড়েছে
পরিপক্ক হওয়ার আগেই
এক মূহুর্তেই আগুনে পুড়ে কয়লা হলো
আমাদের কলিজার সন্তান
কি হতে সব কি হয়ে গেল
কে দিবে তার জবাব?
জলজ্যান্ত সন্তানকে স্কুলে নিয়ে এসে, এক টুকরো
কয়লা নিয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার মতন দুঃখ বোধহয়; পৃথিবীতে আর কোন কিছুতে নেই।
অথচ একটু রোদে পুড়লেই এসব সন্তানদের মা-বাবারা কতটা বিচলিত হতেন, কতটা কষ্ট পেতেন!!
আমরা কতশত প্ল্যান করে রাখি অথচ -
জীবন কত অনিশ্চিত।
মৃত্যু মাটিতে নামে আকাশে নয়
চাষা হাবিব
তারা আর নামেনি! একটি খেলনা ছিল, একটি গল্প ছিল, ছিল দুর্দান্ত আকাশ। কে জানত, মেঘের ভেতরেও লুকিয়ে থাকে নিঃশেষ নীরবতা!
একটা বিকট শব্দ, থেমে যাওয়া ডানার গতি; তারপর সব নিস্তব্ধ। শুধু ধোঁয়া, ছেঁড়া জামা, আর একটি পুতুল পড়ে থাকে নিঃসঙ্গ।
তারা আর ফিরবে না স্কুল থেকে, চকলেট চাইবে না,
গল্প শোনাবে না-মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়বে না
আর কেউ-শুধু শূন্যতা বোবা শূন্যন।
কতটা স্বপ্ন ভেঙে গেলে একটি পৃথিবী থেমে যায়!
কতটা কান্না জমলে আকাশ কেঁপে ওঠে এমন!
আমরা শুধু কাঁদি, অথচ সেদিনও ছিল শিশিরের মতো
স্বপ্ন আকাশ-মায়ের মায়াবী চুম্বন; ছোট দুটি হাত
জানালার কাচে, নভোযানের ডানায় আঁকা ছিল হাসি।
তারা জানত না, আকাশও রুদ্র হয়-যেখানে মেঘেরা
তুলো নয়, থাকে নিঃশব্দ বিস্ফোরণ-মুহূর্তেই থেমে যায় কোলাহল; ভেঙে পড়ে ভোররং নীল শিশির।
আকাশে শিশুরা-জ্বলছে, নিভছে, বলছে-
আমরা হারাইনি বাবা, রয়ে গেছি আলোয় মা; মৃত্যু
শুধু মাটিতে—আকাশে নয়।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন