https://www.prothomalony.com/

14208

literature

সাহিত্য

শিল্প আমার কাছে এক আত্মদর্শনের আয়না- চিত্রশিল্পী ফারহানা ইয়াসমিন

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৫ ০৫:৪৭

"করোনা ও যুদ্ধের সময় পৃথিবী যেন থমকে গিয়েছিল। চারদিকে শোক, যন্ত্রণা, অসহায়ত্ব, নিস্তব্ধতা, হতাশা। সেই নৈঃশব্দ্যের মধ্যেই আবারও ক্যানভাসে ফিরে আসি। আমার আঁকা ছবিগুলোতে সেই একাকিত্ব, ভয়, কিন্তু একই সঙ্গে এক নতুন জন্মের অপেক্ষাও ছিল। রেখা ও রঙ দিয়ে এক ধরনের মানসিক দিনলিপি তৈরি করেছিলাম, যেখানে প্রতিটি স্তর একটি অসম্ভব সময়ের সাক্ষ্য হিসেবে ফুটে উঠেছিল বলে মনে করি",- গত বৃহস্পতিবার ১৭ই জুলাই প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার আয়োজনে সাপ্তাহিক সম্প্রচার "টক অফ দ্য উইক" অনুষ্ঠানে নিজ চিত্রকল্প নিয়ে এভাবেই অভিব‍্যক্তি প্রকাশ করেন ফারহানা ইয়াসমিন। 
অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনায় ছিলেন রোকেয়া দীপা। পরিচালনায় এ‌ইচ বি রিতা।
 
ফারহানি ইয়াসমিন এর জন্ম বাংলাদেশ চুয়াডাঙ্গা জেলায়। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী চুয়াডাঙ্গা জেলা শাখায় তিনি আর্ট শিক্ষক হিসেবে বাচ্চাদের শেখাতেন। তারপরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে তিনি অনার্স করেছেন। এবং পরবর্তীতে তিনি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউ ও ডি এ থেকে মাস্টার শেষ করেন ২০০৭ সালে। বর্তমানে তিনি বাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রে।
 
ফারহানা ইসমিনের একেকটি কাজ যেন একেকটি জীবন বয়ে আনা। চিত্রে কখনো তিনি নিজেকে দেখেন, কখনো একজন নারীকে, কখনো আবার এক অজানা অনুভবকে। 
গল্প তো শুরু ও শেষের একটি রেখা, কিন্তু শিল্প, সে তো অনেকগুলি অনুভূতির সঙ্গে একসঙ্গে চলা। একটা ছবি যেমন একসাথে শোক ও শক্তি ধারণ করতে পারে, ছবি তেমনি প্রেম ও প্রতিবাদের কথাও বলতে পারে।
 
ফারহানা ইয়াসমিনের প্রবাস জীবনের শুরু ২০১৯ সালে। এখানকার বহুত্ববাদ, বৈচিত্র্য, এবং 'নিজের মত করে বাঁচার' পরিবেশ তাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ দিয়েছে বলে জানান। তিনি বলেন, "প্রবাসে প্রথমবারের মতো নিজের শিকড়কে গভীরভাবে অনুভব করেছিলাম। এতে করে আমার কাজগুলো আরও বেশি ধাপে ধাপে সাজাতে পেরেছি। বাংলাদেশের মাটি ও আমেরিকার শহুরে বাস্তবতা দুটোই একসঙ্গে এসেছে আমার ক্যানভাসে।
 
করোনা ও যুদ্ধের সময়ে যখন সারা পৃথিবী দম বন্ধ পরিস্থিতিতে, তখন ফারহানার ক্যানভাসে সেই সময়কাল প্রতিফলিত হয়েছে। এই অনুভূতি থেকেই তিনি কিছু চিত্র নির্মাণ করেছিলেন, যা সময়ের সাক্ষী। ফারহানা মনে করেন, শিল্পীর ভেতরে একটি আয়না থাকে, যে আয়নায় তিনি শুধু বাহ্যজগত নয়, বরং মানুষের অন্তর্গত আবেগ, ক্ষয়, আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিবাদকে দেখতে পান। এই আয়নাটি কখনো ঝাপসা হয় না, বরং সংকট যত গভীর হয়, তত স্পষ্ট হয় শিল্পীর দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। সেই স্পষ্টতার আলোতেই জন্ম নেয় শিল্প, যা সময় পেরিয়ে হয়ে ওঠে ইতিহাসের প্রতিধ্বনি।
 
'The Woman and Her Golden Rose' সিরিজের পেছনের গল্পটি কি-রোকেয়া দীপার এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, "এই সিরিজটি একজন ক্যানসার রুগীর যাত্রার অংশ। যখন ক্যানসার ধরা পড়ে, তখন তার শরীর আর শুধু শরীর থাকে না, সেটি হয়ে ওঠে এক সংগ্রামের ভাস্কর্য। এই সিরিজে গোলাপ একটি প্রতীক, যন্ত্রণার মাঝেও সৌন্দর্য ও শক্তির ছিল। এই কাজগুলো করেছিলাম যেন অন্য নারীরা বুঝতে পারেন, তারা একা নন-এই চিন্তা থেকে।" 
 
নারীর মুখ ও গোলাপ, এই কম্পোজিশনের পেছনের  তার ভাবনা সম্পর্কে জানান, "নারীর মুখ আমার আত্মার দর্পণ, আর গোলাপ আমার কাছে ছিল প্রতীক হিসেবে যা একধরনের গভীর আত্ম-ভালোবাসার গল্প থাকে। এই দুটি উপাদান নারীর ভেতরের সংলাপ ও বাহ্যিক অভিব্যক্তির মধ্যে এক সেতুবন্ধন। আমার ছবিতে গোলাপ কখনো চোখে উঠে আসে, কখনো ঠোঁটে, সবই নারীকে নিজেকে দেখার ভাষা।" 
ফারহানা জানান, তার জন্য লাল মানে শক্তি, সবুজ মানে বেঁচে থাকা, আর নীল একধরনের আত্মিক প্রশান্তি। তিনি মনে করেন, রঙ শুধু দৃশ্য নয়, অনুভব। তিনি বলেন, "নারী যখন নিজের দিকে ফিরতে শেখে, তার ভেতরে এই রঙ গুলোর জন্ম হয়, কখনো লাল, কখনো সবুজ, কখনো বা নীল।" 
 
ফারহানা ইয়াসমিন বলেন, "শিল্প আমার কাছে একটি আত্মদর্শনের আয়না। একজন নারী যখন নিজের চেহারা আঁকে, নিজের গল্প বলে, সে তখন আর কেবল দর্শক নয়, বরং নির্মাতা হয়ে ওঠে। আমি নিজেও শিল্পের মাধ্যমে বুঝেছিলাম, আমার শরীর ও অস্তিত্ব সম্পর্কে কত ভুল ধারণা মেনে নিয়েছিলাম। শিল্প সেই জায়গাগুলো ভেঙে নতুন করে একজন মানুষকে গড়ে তোলে।" 
 
ফারহানার শিল্পে নারীর মুখ কেন বারবার ফিরে আসে? এ সম্পর্কে তিনি বলেন, "নারীর মুখে অনেক কিছু দেখি।  যন্ত্রণা, শক্তি, গভীর প্রেম, কখনো এক রহস্য। এসব মুখ কোনো নির্দিষ্ট মানুষের নয় বরং এক সম্মিলিত সত্তা, যাকে আমি খুঁজে পাই। তাদের চোখে আমি ইতিহাস দেখি, আর তাদের ঠোঁটে প্রতিবাদ শুনি।" 
 
বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করছেন ফারহানা। নিউইয়র্কে একাধিক প্রদর্শনী করেছেন। তার চোখে বাংলাদেশী শিল্পের অবস্থান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে কেমন-জানতে চাইলে বলেন, "বাংলাদেশি শিল্পের মধ্যে অসাধারণ গভীরতা ও স্বাতন্ত্র্য আছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে তারা হয়তো সংখ্যায় কম, কিন্তু কাজের মান বা ভাবনার দিক থেকে একেবারেই পিছিয়ে নেই।" 
 
তিনটি একক প্রদর্শনী করেছেন ফারহানা ইয়াসমিন। প্রথম প্রদর্শনী হয় UODA ক্যাম্পসে ২০০৬ সালে। যাএা বিরতি গ্যালারিতে ২০১৮ সালে "Surrounding Faces" শিরোনামে প্রদর্শনী হয়। ২০১৯ সালে EMK Center এ "EVANESCENCE" শিরোনামে তৃতীয় একক প্রদর্শনী হয়।এছাড়াও বিভিন্ন গ্রুপ প্রদর্শনী অংশ নিয়েছি, জাতীয় পর্যায়ে এবং এশিয়ান আর্ট বিয়েনালে প্রদর্শনী করেছি।
 
ফারহানা ইয়াসমিনের শিল্প জগতের নানা জানা অজানা গল্পের  মাধ্যমে সেদিনের অনুষ্ঠানটি শেষ হয়। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার "টক অফ দ্য উইক" অনুষ্ঠানটি প্রতি বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় রাত নয়টায় ফেসবুক লাইভে প্রচারিত হয়ে থাকে।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন