https://www.prothomalony.com/
14164
literature
পরিযায়ী পাখি
সন্তোষ ঢালী
যদিও বেশ শীত এবং কুয়াশা জেঁকে বসেছে, তবুও আজকের সকালটা খুব ভালো লাগল তিতলির। আজ খুব মজা হবে। সারাদিনের জন্য বন্ধুদের সাথে পিকনিক করে কাটাবে। স্কুলের বাসে চলছে সবাই গান গাইতে গাইতে। উদ্দেশ্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে নাচ-গান হবে, খেলাধুলা হবে। দুপুরে পোলাও-মাংস, রোস্ট। তারপর বিকেলে ফেরার আগে পাখি দেখা। খুব এক্সাইটেড লাগছিল তিতলির। শান্তা, পুষ্পিতা, টুম্পা, নিধি আরও কত কত বন্ধুরা? বাবা-মাকে ছাড়া শিক্ষকদের সাথে একারা এই প্রথম। শুধু বন্ধুরাÑ কী যে মজা! বাসে কেক, কলা, ডিম দিয়ে নাশ্তা। বলতে বলতে কখন যেন পৌঁছে গেল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, টেরই পায় নি। সেখানে হারিয়ে যাওয়ার অনেক জায়গা। তবু কাছাকাছি থাকা চাই সবার। শান্তা আর টুম্পা ঘাসে হাত ছুঁইয়ে খুশিতে হেসে ওঠে। তিতলি কাছে যায়। অবাক হয়ে যায় কাণ্ড দেখে। হাত ছোঁয়ালেই চিরল চিরল পাতার সবুজ লতা কেমন চুপসে যায়। শান্তা তিতলিকে বললÑ দ্যাখ দ্যাখ, এটা লজ্জাবতী লতা। আগে কখনও লজ্জাবতী লতা দেখে নি তিতলি। তিতলিও খেলায় যোগ দেয়। হাত ছোঁয়ায়, আর চুপসে যায়। গাছেরও লজ্জা আছে! জীবনে এই প্রথম দেখল, গাছও মানুষের মতো লজ্জা পায়। গাছও তাহলে মানুষের মতো! চোখে তার বিস্ময়। খেলাধুলা হলো, নাচ-গান হলো, দুপুরের খাওয়া হলো। এরপর পাখি দেখতে বেরুনো।
লেকের জলে হাজার হাজার পাখি। পদ্মফুলের মতো ফুটে আছে তারা, লাল শাপলার ফাঁকে ফাঁকে। ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে। নামছে। জলে ভাসছে। কিচিরমিচির করছে। পাখিদের মেলা। সে এক দেখার মতো দৃশ্য। এ যেন পাখিদের গান। এত পাখি একসাথে কখনও দেখে নি তিতলি। পাখিদের আনন্দ দেখে তারও আনন্দ হয়। ধরিত্রী আপু বুঝিয়ে দিলেনÑ এগুলো পরিযায়ী পাখি। সুদূর সাইবেরিয়া থেকে আসে, প্রতি বছর। সাইবেরিয়াতে তখন প্রচণ্ড শীত। মাইনাসে চলে যায়। হিমালয় ডিঙিয়ে এ পাখিরা তখন উড়ে উড়ে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসে। শীত শেষে আবার চলে যায়। মাত্র কয়েক মাসের জন্য আসে। এ জন্য এদেরকে অতিথি পাখি বলে। এরা এক ধরনের বালিহাঁস। এরা খুব পরিশ্রমী হয়। অনেকে পাখি হত্যা করে। পাখির মাংস খায়। পাখি ধরে বিক্রি করে। তা অন্যায়। বাড়িতে কোনো অতিথি এলে আমরা কি তাকে মারি? আদর-যত্ন করি। তাকে অপমানিত করি না। অথচ মানুষ পাখিকে মারে। কোনো কোনো শিক্ষিত মানুষও পাখির মাংস খায়। অতিথি পাখি নিধন করা অন্যায়।
মনোযোগ দিয়ে এসব কথা শুনছিল তিতলি ও তার বন্ধুরা। এত কিছু জেনে ছোট্ট তাদের হৃদয় কানায় কানায় ভরে গেল। সবে ক্লাস থ্রিতে উঠেছে। বছরের শুরুতেই আনন্দ-ভ্রমণ। খুব ভালো লেগেছে গোটা আয়োজন। সন্ধে হয় হয়। সবাই বাসে উঠে গেছে। এবার ঘরে ফেরার পালা। তিতলির মনে হলো পরিযায়ী পাখিরাও এরকম কিছুদিনের জন্য বেড়াতে আসে। তারপর বাড়ি ফিরে যায়। বাবা-মা'র কথা মনে পড়ল। সারাদিন তেমন মনে পড়ে নি। এখন মনটা কেমন করছে। তিতলির মনে হলো অতিথি পাখিদেরও খুব কষ্ট। ঘর ছেড়ে কতদিন এদেশে। ওরাও যখন বাড়ি ফেরে, ওদেরও এমনি আনন্দ হয় নিশ্চয়!
স্কুলের গেটে যখন পৌঁছল তখন সন্ধে উত্রে রাত। বাবা দাঁড়িয়েছিল তার অপেক্ষায়। সকল বাবা-মা ই অপেক্ষা করে আছে সন্তানের জন্য। তিতলির মনে হলো পরিযায়ী পাখিদের বাবা-মাও কি তাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে? বাবাকে দেখে কী যে খুশি! পাখিরাও নিশ্চয়ই তেমন খুশি হয়? পাখিরা তার মনের মধ্যে একটা দাগ কেটে গেছে। পাখির সাথে নিজের, আর নিজের সাথে পাখির মিল খুঁজতে থাকে। বাবার সাথে বাসায় পৌঁছে গেল। ফ্রেশ হয়ে খাওয়া শেষ করে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। বকবক করে বাবা-মাকে সারাদিনের মজার কথা বলতে লাগল। লজ্জাবতী লতার কথা, পরিযায়ী পাখির কথা, খাবার কথাÑ বন্ধুদের কথাÑ কত কথা! বেশ পরিশ্রম হয়েছে। বিছানায় শোয়ামাত্র বকবক করতে করতে ঘুমিয়ে গেল।
তিতলি দেখতে পেলÑ সে লেকের ধারে একা বসে আছে। দুটো পরিযায়ী পাখি এসে তাকে বলছেÑ তুমি যাবে আমাদের দেশে? সাইবেরিয়া? অনেক দূর। প্রচণ্ড শীত। চারদিকে শুধু তুষার আর তুষার। হিমালয়ের উপর দিয়ে যেতে হয়। খুব ভালো সে দেশ। কোনো মানুষ সেখানে যেতে পারে না। তুমি যাবে? আবার ফেরত দিয়ে যাব তোমাকে তোমার বাবা-মার কাছে। তিতলি রাজি হয়ে গেল। একটা বড় পরিযায়ী পাখির পিঠে চড়ে বসল। অমনি পাখিটা উড়তে শুরু করল। আকাশ থেকে পৃথিবীকে অন্যরকম দেখায়। গাছপালা ছোট ছোট গুল্মের মতো। নদীগুলো যেন রাস্তার মতো শুয়ে আছে। রাস্তাগুলো দড়ির মতো। কী যে ভালো লাগছিল তার! হিমালয়ের উপর দিয়ে সাইবেরিয়া পৌঁছে গেল। তিতলির বেশ শীত শীত লাগছিল। কিছুদিন পরে আবার বাংলাদেশের পথে উড়াল দিলো। লেকের কাছাকাছি আসতেই বিকট এক শব্দ। এক শিকারী পাখিটাকে গুলি করল। পাখিটা রক্তাক্ত হলো। ডানা ভেঙে গেল। তিতলি ছিটকে পড়ল জলের মধ্যে। সাঁতরাতে চেষ্টা করছে। পারছে না। চিৎকার দিয়ে উঠল। ঘুম ভেঙে গেল। বিছানায় বসে পড়ল। পাখিটার জন্য মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। যদিও স্বপ্ন, তবুও। তার মনে হলো, মানুষ কত খারাপ! এভাবে পাখিকে কেউ গুলি করে?
কিছুদিন বাদে এক বিকেলে তিতলির বাবা ঘরে ঢুকেই ডাকলÑ তিতলি, দেখে যাও, কী এনেছি?
তিতলি দৌড়ে দরোজার কাছে গিয়ে হতবাক। একজোড়া বালিহাঁস। দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বললÑ
বাবা, এ তো পরিযায়ী পাখি! এদের কেন এনেছো?
তুমি কী করে জানলে এদের পরিযায়ী পাখি বলে?
ধরিত্রী আপুমণি বলেছে না? অনেকে এ পাখির মাংস খায়। এটা অন্যায়।
আমিও তো খাবার জন্যেই কিনে এনেছি। খুবই সুস্বাদু এ পাখির মাংস।
কথাটা শুনেই কান্না জুড়ে দিল তিতলি। তার বাবাও তাহলে অন্য মানুষের মতো? ছুটে দৌড়ে বেড রুমে গিয়ে দরোজা আটকে দিলো। তার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। পাখি দু'টো তার দিকে কেমন কাকুতি করে তাকাচ্ছিল। বালিশে মুখ গুঁজে সে কান্না জুড়ে দিলো। হাত-মুখ ধুয়ে বাবা এসে সান্ত্বনা দিচ্ছেÑ এগুলো তো পাখি? মানুষ তো পাখির মাংস খায়? তুমিও তো আগে খেয়েছ? এতে কোনো সমস্যা নেই তো?
আগে তো আমি বুঝি নি। তাছাড়া তা যে এ পাখি, তাও তো জানতাম না। আমি আর পাখি খাব না। তোমরাও খাবে না। কেউ খাবে না। ওরা অতিথি। অতিথিকে কি কেউ খায়?
অনেক টাকা দিয়ে কিনেছি মা? এবার খাই। পরে আর খাব না।
না। এবারও খাওয়া যাবে না।আমি বড় হয়ে চাকরি করে তোমার টাকা ফেরত দিয়ে দেবো। তুমি ওদের ছেড়ে দাও। বলো বাবা, ছেড়ে দেবে? ওদের ছেড়ে না দিলে আমি আর কিচ্ছু খাব না।
আচ্ছা, আচ্ছা, আমার বুদ্ধিমতী মেয়ে। সত্যি আমার ভুল হয়ে গেছে মা। আর কোনোদিন পাখির মাংস খাব না। ওরা অতিথি। কাল সকালেই ধানমণ্ডি লেকে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে আসব ওদের।
আমিও যাব তোমার সাথে।
আচ্ছা মা। তুমি আমার চোখ খুলে দিলে।
সকালে ধানমণ্ডি লেকে গিয়ে দু'টো হাঁসকেই নিজের হাতে উড়িয়ে দিল তিতলি। প্রথমে গিয়ে জলে পড়ল। তারপর উড়াল দিলো আকাশে। উড়তে উড়তে হাঁসদু'টো ক্যাঁক ক্যাঁক করে ডেকে উঠল। তিতলির মনে হলো, হাঁস দু'টো তাকে থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ বলল।
পেছনে ঘুরে বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল তিতলিÑ থ্যাঙ্ক ইউ বাবা। তুমি খুব ভালো।
মিনা
দিনা ফেরদৌস
"তুমি কি মিথ্যা বলতে পারো?"
নরম করে প্রশ্নটা ছুড়ে প্রশ্নকারী উত্তরের আশায় মিনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। কিন্তু মিনার মনে হয় সে কিছু বুঝতে পারছে না। শুধু মনে পড়ছে সত্য-মিথ্যা বিষয়গুলো নিয়ে তার জীবনে কী যেন একটা ঘটনা ঘটে গেছে।
মিথ্যা বলাটা সে সচেতনভাবেই শুরু করেছিল। তারপর একটার সাথে আরেকটা জোড়া দিতে গিয়ে, কিংবা পুরনো একটা মিথ্যাকে নতুন করে জাস্টিফাই করতে গিয়ে মিথ্যা বলা তার স্বভাবের অংশ হয়ে যায়। এখন মাঝে মাঝে সে নিজেও হিমশিম খায়, তার নিজের সম্পর্কে বলা গল্পগুলোর কোনটা সত্য আর কোনটা বানানো।
মিনার মিথ্যাচর্চা শুরু হয়েছিল ছোটবেলায় স্কুলের বন্ধুদের আড্ডায়, অন্যের কাছে শোনা ঘটনা নিজের নামে চালিয়ে দিয়ে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার এই গুণটা নিখুঁত হয়ে ওঠে। সে শুরু করে নিজের জীবনের আকর্ষণীয় গল্প তৈরি। সেগুলোর কারণে আশপাশে তার সম্মানও বাড়ে।
পরিবারে মিনার জীবনটা ছিল অপমানের। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়ো মিনা বরাবরই ছোট ভাইবোন কিংবা প্রতিবেশীদের চেয়ে পরীক্ষায় কম নম্বর পেত। গুছিয়ে কোনোকিছু করতেও পারত না। ফলে তাকে থাকতে হতো সংকুচিত হয়ে। সেই সংকোচন কাটাতেই সে শুরু করে মিথ্যা, ভান, অভিনয়।
নিজের আর পরিবার সম্পর্কে দারুণ দারুণ কিছু গল্প বানিয়ে মাহিনকে পটিয়ে ফেলে মিনা। মাহিনের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসার পর পরিবারও তাকে সমীহ করা শুরু করে। ছোটবোন তো জিজ্ঞেসই করে ফেলে, "এত দামি পাত্র বাগালে কীভাবে?"
মিনা উত্তর দেয় না। চাওয়ার জিনিস যদি মিথ্যা দিয়ে পাওয়া যায় তাহলে সত্য বলার কী দরকার?
মাহিন উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে, তার আত্মীয়স্বজনের বেশিরভাগই বিশ্ববিদ্যালয় ডিঙানো মানুষ, অনেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ায়ও। এমন পরিবারে বিয়ে করে নিজের কৃতিত্বে প্রথম সে নিজেই মুগ্ধ ছিল। কিন্তু একটা হিসাব সে আগে মেলায়নি। সেটা হলো সমাজে আনাগোনা, দেখাশোনা, আলোচনা হয় যার যার উচ্চতার সমানে। কলেজের বারান্দায় পা না দেয়া, টেনেটুনে সংসার চালানো তার বাবা যেখানে নিজের সমাজে আলাপ করতেন বাজারে তেল-ডালের দাম নিয়ে। সেখানে মাহিনের সমাজ আলোচনা করে কোন দেশ থেকে কোন জাতের তেল-ডাল আমদানি করলে ব্যবসা ভালো হবে তা নিয়ে। স্কুলের পরীক্ষায় কার বাচ্চা কত নম্বর পেয়েছে এর বাইরে যেখানে তার পাড়ার লোকজন পড়াশোনা নিয়ে আলোচনার আর কোনো বিষয় জানত না, সেখানে মাহিনের বাড়িতে লোকজন এসে আলোচনা করে জার্নালে ছাপানো গবেষণাপত্র নিয়ে।
এমন সমাজের উপযোগী গল্প তৈরির মালমসলা তার ভাণ্ডারে নেই। মাহিনের বন্ধুদের আড্ডায় মিনা না পারে বিষয়গুলো ধরতে, না পারে কিছু বলতে। প্রথম প্রথম অনুমান করে খাপছাড়া কিছু বলে ধরাও খেয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাকে দেখলে মাহিনের বন্ধুরা মুখ টিপে হাসতো, মাহিনকে খোঁচাত।
ফাঁপা বুলি দিয়ে প্রতিদিনের সংসারে পার পাওয়া মুশকিল। মাহিন বুঝলেও কিছু বলে না। তবে আত্মীয়বাড়ি কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় তাকে নেয়া বন্ধ করে দেয়। এটা অবশ্য এক দিকে ভালো, ওইসব পার্টিতে গিয়ে তাকে আর তামাশা সাজতে হয় না।
কিন্তু হারা তো যাবে না।
মিনা কৌশল পাল্টায়। কোথায় কোন জিনিস থাকে সে আর মনে করতে পারে না। মাহিনের শার্ট সে নিয়ে রেখে আসে শ্বশুরের ঘরে। সে মনে করতে পারে না এটা কার শার্ট। একদিন সে শাশুড়ির কাছে অভিযোগ জানায়- মাহিন বাথরুমে গিয়ে সিগারেট খায়।
মাহিন জানতে চায়, "কবে থেকে আমি সিগারেট ধরলাম?"
মিনা অবাক হয়, "তুমি আবার কবে সিগারেট ধরলে? তুমি তো এর গন্ধই সহ্য করতে পারো না।"
"কে নাকি মাকে বলেছে আমি বাথরুমে গিয়ে সিগারেট খাই।"
"এই আজব গল্পটা কে বানালো? মাকে জিজ্ঞেস করোনি কে বলেছে?"
"নাহ। নাম জিজ্ঞেস করিনি। বাদ দাও।"
মিনা বোঝে মাহিন তার আচরণ মানতে শুরু করেছে। পদ্ধতিটা কাজ করছে তাহলে।
ইন্টারনেট ঘেঁটে প্রতিদিনই মানসিক রোগীদের দুয়েকটা আচরণ সে এক্সপেরিমেন্ট করে। আগে যারা তাকে নিয়ে হাসত, এখন তারা তার সাথে নম্র ব্যবহার করে।
কিন্তু মাহিন সত্যি সত্যি সিগারেট ধরেছে, বাথরুমে বসেই খায়। একদিন বাথরুমে ঢুকে সিগারেটের গন্ধে মিনা ছিটকে বেরিয়ে আসে। কিন্তু তারপরেই মনে হয়, মাহিন তো সেই সকালে বেরিয়ে গেছে। এর পরে মিনা আরো দুবার এই বাথরুমে গেছে। তখন তো সিগারেটের গন্ধ ছিল না। এই বাথরুমে সে আর মাহিন ছাড়া কেউ যায় না। তাহলে সিগারেটের গন্ধ এলো কীভাবে?
পরীক্ষা করতে মিনা আবার বাথরুমে ঢুকে দেখে কোনো গন্ধ নেই। কিন্তু সে নিশ্চিত আগের গন্ধটা সিগারেটেরই ছিল। তবে কে খেলো? সে নিজে?
স্কুলে থাকতে বন্ধুদের সাথে দুয়েকবার সে সিগারেটে টেনেছে। বাড়িতে তার ব্যাগ কেউ চেক করে না বলে বন্ধুরা মাঝেমধ্যে সিগারেট কিনে তার ব্যাগেই রাখত। মিনার মনে হয়, হতে পারে স্কুলব্যাগ খুলে তেমনই একটা সিগারেট সে নিজেই বাথরুমে গিয়ে টেনেছে। কিন্তু সেই স্কুলব্যাগ তো বহু বছর আগেই সে ফেলে দিয়েছে। সেটা এখানে আসবে কী করে?
মিনার হিসাব মিলে না।
মাহিন তার সাথে খুব সতর্ক ব্যবহার করে। এটা তার পছন্দ হয়। মিনা ইন্টারনেট দেখে আরো কিছু আচরণ শেখে। একদিন সে মাহিনের সব সার্টিফিকেট ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দেয়। একদিন সে তার শ্বশুরকে ঘরে ঢুকতে দেয় না, কী চাই, কাকে চাই বলে বহুক্ষণ ইন্টারভিউ নেয়। একদিন মাহিন তাকে ডাক্তারে যাবার কথা বলে।
মাহিন যুক্তি দেখায়, বাথরুমে সিগারেটের গন্ধ, সার্টিফিকেট ফেলে দেওয়া এগুলো নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা দরকার।
মিনা জানতে চায় কার সার্টিফিকেট কে ফেলেছে। কোন বাথরুমে সিগারেটের গন্ধ পাওয়া গেছে।
মাহিন আরো কিছু ঘটনা বলে, মিনা বলে ওসব তার কিছু মনে নেই। মাহিন বলে, "তাহলে মনে না থাকা নিয়ে ডাক্তারের সাথে কথা বলা দরকার।"
মিনা হিসাব মেলায়, ডাক্তারের কাছে গেলে কয়েকদিন পরে সে আবার সুস্থ হওয়ার ভান করতে পারবে। লাইফটা স্বাভাবিক হবে। কিন্তু ডাক্তার যে তাকে মানসিক পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি করে দেবে, মিনা তা কল্পনাও করতে পারেনি।
পুনর্বাসন কেন্দ্রে মিনার হাতে তার ফোনটাও নেই। মাহিন প্রায় প্রতিদিনই আসে। মাঝেমধ্যে আসতে না পারলে পরের দিন এসে আসার অজুহাত দেয়। হঠাৎ মিনার মনে হয়, মাহিনের অজুহাতগুলো তো মিথ্যাও হতে পারে। এমন যদি হয় যে তাকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে আটকে রেখে মাহিন অন্য মেয়েদের সাথে সময় কাটায়?
মিনা ছটফটায়। তাকে এখন দ্রুত সুস্থ হওয়ার ভান করতে হবে। কেন্দ্রের ডাক্তার-নার্সদের কথাগুলো সে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। সে এখন বহু কিছুই মনে রাখতে পারে। টিভি সিরিয়ালের চরিত্র আর ঘটনাগুলোর বিবরণ সে ঠিক ঠিক দিতে পারে। মাহিন কবে কোন কালারের শার্ট পরে এসেছে তাও বলতে পারে। তার স্মৃতিশক্তি ফিরছে। ডাক্তার বলেছে সে দ্রুতই বাড়ি ফিরতে পারবে।
ডাক্তাররা তার সত্যমিথ্যা বলারও পরীক্ষা নেয়। ডাক্তার আজকে তার সাথে একটা মিথ্যা বলার গেম খেলবে। এই গেমের শর্ত হলো সত্য বলা যাবে না।
অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর ডাক্তার প্রশ্নটা আবার করে, "মিনা। তুমি কি মিথ্যা বলতে পারবে?"
মিনা ডাক্তারের চোখের দিকে তাকায়, "ওইটাই তো সমস্যা। মিথ্যা বলতে পারি না বলেই তো মাহিন আমাকে এখানে ফেলে গেছে।"
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন