https://www.prothomalony.com/

14160

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৫ ০১:৩৮

 

উপসংহারে

অমিত দে

পলেস্তরা খসে পড়া দেওয়াল
এখনও প্রাণপণ দাঁড়িয়ে একটি দরজা
ধুলো হাওয়া এসে দু'দণ্ড বসে ঘরে 
চেয়ারে জাগিয়ে রাখে হাতের ছাপ 
মেঝেতে পড়ে থাকা নীল ছায়া,
ভাঙা কাচে আকাশ চিরে নেমে এসেছে মেঘ
আলোর কাছে ঋণ রেখে চমকায় 

খোলা বই, পাতাগুলো স্বাধীন
নিঃশব্দ ভেঙেও ফুরোয় না গল্প
এগিয়ে যায় না উপসংহারে,
তাকিয়ে থাকে 
প্রায় খুলে পড়া জানালার দিকে-
যেন মুছে যাওয়া মুখের আদলে 
এখনও কাহিনীর অবশেষ জেগে আছে!

 

 

 

অনুকরণ 

আহসানুল করিম

মূলঃ মিমেসিস (ফাদি জৌদাহ)
 

কন্যা আমার

মাকড়শাটার কোন ক্ষতি করতে চায় না

যেটা বাসা বেঁধেছে

ওর বাইসাইকেলের হ্যান্ডেলের মাঝে

প্রায় দু'সপ্তাহ সে

অপেক্ষা করেছে 

যতদিন না ওটা নিজে নিজে চলে যায়

মেয়েকে বললাম তুমি যদি জালটা ভেঙ্গে দিতে

ওটা বুঝে যেত

ওখানে ওর বাসা বানাবার কথা নয়

আর তুমিও সাইকেল চালাতে পারতে

 

ও বলল, এভাবেই তো সবাই

রিফিউজি হয়ে ওঠে, তাই না?

 

 

 

নীরব ঋণ

হোসাইন মুহাম্মদ মুরাদ মিয়া

আকাশটা ছোট ছিল না, শুধু ডানার সীমা ছিল।

বাবা চেয়েছিলেন সূর্য দিতে, পকেটে ছিল কেবল ছায়া।

মা ছিঁড়ে দিয়েছিলেন নিজের নীল শাড়ির আঁচল,

সন্তানের একটি লাল ফিতে কেনার জন্য।

 

চাওয়া, যদি বুঝতে পারতো ক্ষমতার ব্যাকরণ,

তবে অনেক কান্না-জন্মই নিত না।

 

সন্তান যখন দাবি করে অবিমৃশ্যকৃত স্বপ্ন,

তখন একজোড়া চোখ-পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব ঋণ

হয়ে ওঠে।

তুমি যদি শ্রদ্ধা বুঝতে চাও,

তবে মায়ের নিঃশব্দতা পড়ো;

তুমি যদি ভালোবাসা বুঝতে চাও,

তবে বাবার নীরব ত্যাগ স্পর্শ করো।

 

সব আবদার পূরণ হয় না,

কিছু আবদার পূর্ণ হয় না বলেই-

ভালোবাসা সত্য হয়।

 

 

 

হই নাকো নিঃশেষ

ইশতিয়াক রুপু 

বর্ষা কালে ভিট বরাবর হলুদ ছানার দল,আধখানাতে ডুবে আছে ধাতব জলের কল। বসত ঘরের নাউরি দিয়ে বৃষ্টি ঝরা জল, বারান্দায় ইতি উতি লাল পিঁপড়ের দল। উঠোন জুড়ে ডুবোকাঁদা, উড়ছে মেঘ তুলো সাদা, ঝড়ো হাওয়ায় আসবে উড়ে, ঝাঁপ দিবে সে হাওর জুড়ে। 

 

দখিন হাওয়ায় ঢেউয়ের খেলা, সন্ধ্যা কালে আপদ মেলা।বসত ভিটার দখিন পাশে, রক্ষা দেয়াল আড়া বাঁশে।আছাড় খেয়ে জলের ঢেউ, রাখছে নজর বাড়ির কেউ।

 

কামলা কামিন বাহির ঘরে, দখিন হাওয়ায় দরজা নড়ে, মহাজনের উঁচু ডাকে, মন ভাবনা নজর রাখে। হর হামেশাই বর্ষা কালে, ভালো মন্দের বর্ন তালে। মহাজনের চিন্তা আসে, সুখের নদী না যায় ভেসে। হাওর পাড়ের সুখ গল্প, বসত জুড়ে জমে স্বল্প। লড়াই করে কাটে দিন, ধীরে ধীরে শোধ হয়ে যায় মহাজনের জন্মঋন।

 

বসতভিটা শতের ঘরে, নৈমুদ্দি সবার পরে, আধখানা তার ঘরের চালে, পাথর চাপা গেলো সালে। আফাল এলে জুতমত, ঘরখানা তার হবে নত, রক্ষা নাহি পাবে, নৈমুদ্দি তাইতো সদাই ভাবে। হাওর জুড়ে দুঃখ গাঁথা, কবে হবে শেষ। আজো মোরা লড়াই করি, হই নাকো নিঃশেষ।

 

 

 

জুলাইয়ের কবিতা

শাহীন সুলতানা 

একটি বৈষম্যের দেওয়াল উঁচু হতে হতে চীনের 

প্রাচীর হয়ে ওঠে, বিবেক ভাসে বেনো জলে।

 

ধূর্ত শেয়াল চিবিয়ে খায় সভ্যতার হাড় মাংস,

আর সবুজ জমিন হয় ওঠে শ্বাপদ সংকুল 

আসে গুলি আর গ্রেনেডের দিন, 

রাবার বুলেট খেয়ে নেয় তরতাজা ফুলের পরাগ

খর্ব হয় অধিকার, কালিমায় ভরে যায় সভ্যতার পিঠ।

 

দিনের আলো লুকিয়ে পড়ে ভুতুড়ে রাতের পেটে

মায়ের জায়নামাজে থমথমে নিস্তব্ধতা... 

আতঙ্কিত জনপদে বাজে ভয়াল সাইরেন 

তারপর দাসত্বের শিকল ভেঙে গর্জে ওঠে চতুর্দশী

জোছনা, বেগবান ঘোড়ার মতো জোনাকির ঝাঁক 

হয়ে নেমে আসে অপ্রতিরোধ্য জোয়ানের দল।

 

কেঁপে ওঠে জনপদ, জ্বলে ওঠে শিক্ষাঙ্গন ; সময়ের 

ঘড়ি মেপে ঝরে পড়ে অসংখ্য নক্ষত্র। মায়ের চোখে

জলের কলস।

 

অতঃপর একটি বন্ধ্যা সময় শেষে কুয়াশার জাল 

ছিঁড়ে জেগে ওঠে সুবেহ-সাদিকের নরম আলো।

 

 

 

 

সত্যের জয়গান

এম. আবু বকর সিদ্দিক 

সত্য চিরসত্য রূপে নীল গগনে হাসে

হয়ত কভু রয় পালিয়ে মেঘমালার ওপাশে,

সত্য কভু লুকায় যদি ধুলো-বালির তলে

মুশলধারে বৃষ্টি হলে আবার ওঠে জ্বলে।

 

সত্য-ন্যায়ের স্বচ্ছমালা পরল যারা গলে

তারা সবার আস্থাভাজন সদা সর্বকালে,

সত্য-ন্যায়ের কঠিন পথে উঠল যারা বেড়ে

যতই বাধা আসুক তারা দেয়না সেপথ ছেড়ে।

 

মিথ্যাচারী আপন মনে নিজকে জানে দোষী

নিভৃতে সে নিজের উপর হয়না কভু খুশী,

সত্য হল দিনের আলো সত্য মানে দীপ্তি

সত্যবাদী হারুক জিতুক হৃদয়ভরা তৃপ্তি।

 

 

 

বেহুলা 

আহাম্মদ উল্লাহ 

বেহুলা ভাসিয়েছিল ভেলা মৃত নিয়ে

 আশীবিষে মৃত স্বামী সঙ্গী; সে রাতে ভয় ছিল কি-

বেহুলা?

মোমের জোছনায় তরঙ্গের খেলা, জলে জলে কানাকানি ;

কারে তুমি নিয়ে যাও-কোন সূদুরে?

 

বেহুলার রাঙা মুখ ডালিমের ফুলের মতন, অস্ফুটস্বর;

আলতার রং জলে ধুয়ে গেছে-রাঙা সিঁদুর রাঙা সিঁথি 

রয়ে গেছে।

 

এই প্রাণ তার প্রাণ, এই তার পণ 

আঁধারের অবয়ব–ভুতপ্রেত ভয় পায় নাকো সে;

স্বামী ছিল সাথে কৃষ্ণপক্ষের রাতে।

 

 

 

শ্রাবণ-স্মৃতি

মুস্তাফিজ রহমান

আগুন জ্বলছে নিভুনিভু-

ধীরে, অতি ধীরে ধুন তুলছে একর্ডিয়্যান

বহতা নদীর তুষাগ্নি নাকি অতল জলধারা 

সপ্তবাহু ধান্যবতীর এই প্রত্ন-শ্যাওলা ঘাটে।

 

তারপর একদিন প্রবল বৃষ্টিতে-
"বরষন লাগে বাদারিয়া রুমঝুম কে"...
তোমার স্বর্ণালু পায়ের তালুতে

শুধুই ঝড়জল হাওয়া-ডাকা আষাঢ়স্য দিবসে।

 

কুহেলী রাত নামছে, যদিও 

ঘনঘোর বাদলের মৃদঙ্গ মাদল, চারুকেশী ঘুমঘোরে

গুঁড়ো গুঁড়ো ছড়িয়ে যাচ্ছে হৃদকম্পন,

বিমুগ্ধ নীল নীল ঢেউয়ের বর্ষাসিক্ত অশোক বনে।

 

অথচ কখন চলে গ্যাছো ফেলে রেখে-

শ্রাবণ স্মৃতি, আকাশ ভেঙে নেমে আসা বৃষ্টি
হ্যারিকেন-আলোয় ভিজে যাওয়া, 
হরিণ চোখ, তমিস্রার মত একান্ত শাড়ি।

 

 

 

তোমার জন্যে বেঁচে আছি

কাজী নাজরিন 

শত আক্ষেপ তুড়ি মেরে মিষ্টি চোখের নীরব ভাষার 

মায়াজালে বন্দী হলাম

যৌবনের রূপ দিয়ে মন কেড়ে না নিলেও 

মনের লেনদেন ঠিকই হয়েছে গভীর মায়ায়।

অনুভূতির মূল্য ছিলো পাহাড়সম,

সাজ কিংবা খোলা চুলে হাত-ধরাধরি কিংবা 

প্রজাপতির মতো ওড়াওড়ি, ঘোরাঘুরি করা হয়নি 

যৌবনের বালুকাবেলায়। 

টুকরো টুকরো ক্ষণিকের সুখস্মৃতি আঁকড়ে ধরে 

তোমার জন্যে বেঁচে আছি।

 

 

 

নির্বাক শহরের কান্না

আয়াজ আহমদ বাঙালি 

রাতে ঘুম আসে না এই শহরে।

ঘুমিয়ে থাকে শুধু ট্রাফিক সিগন্যাল আর ভাঙা 

স্বপ্নগুলোর ছায়া।

রাস্তার পাশের ভিখারিরা জানে, কেমন লাগে ইট আর কংক্রিটের নিচে বেঁচে থাকা-

যেখানে মানুষ, মানুষ নয়; কেবল হাঁটাচলা করে 

এমন এক ধরনের ছায়া।

 

আমি হেঁটে যাই নীরব ইলেকট্রিক পোস্টের নিচ দিয়ে।

আলো ফেলে সে—কিন্তু আলোয় উষ্ণতা নেই।

এই শহর আলো দেয়, উষ্ণতা না।

ভালোবাসা দেয় না, দেয় শীতল স্পর্শ।

 

তবু কেউ কেউ ভালোবাসে এই শহরকে।

হয়তো অভ্যেস, হয়তো অভাব।

হয়তো কোনো এক মধ্যরাতের স্মৃতি যা এখনও

দেয়াল জুড়ে ঝুলে আছে,

একটি ছবির মতো-রঙহীন, তবু প্রিয়।

 

এই শহর আমার মতো,

বেঁচে আছে-কিন্তু বেঁচে থাকা মানে কি সত্যিই জীবন?

 

 

 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন