https://www.prothomalony.com/
14105
literature
বৃষ্টির বন্দনা সংখ্যা। যে দেশে বর্ষা ঋতু নেই, সেখানেও হঠাৎ হঠাৎ ঝর ঝর বৃষ্টি নামে। বারিধারায় স্নাত হয় তপ্ত ভূমি। বৃক্ষরাজির পত্র পল্লব চুঁয়ে নেমে আসে আকাশের বারিবিন্দু। জানালার কাচ বেয়ে ধেয়ে নামে জলের ধারা। কবির মন ছোটে বাংলার নববর্ষার জল ভরা ধানক্ষেতে, মাঠে,খালে-বিলে!
আমাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ হলো। নিশ্চয় আপনাদের মনে জায়গা করে নেবে কবিতাসমূহ! ভালোবাসা!
-ফারুক ফয়সল
এক ভিজেরাত্রির দুপুরে
শামীম আজাদ
পরতে পরতে রাতপ্রহরের পালক খসে যাচ্ছে। হঠাৎ
জানালার সাদা ঝালরের ঝরোকা ফুঁড়ে বৃষ্টিবিচ্ছুরিত আলোর ব্লেড
আমার সময়ের শিরা কেটে দিল।
চমকে উঠে দেখি কাচ বেয়ে বাইরে,
বিলেতেই বয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের আষাঢ়,
লন্ডনের এপ্রিল শাওয়ার।
সে বারির আঘাতে আঘাতে
ছুটছে হ্যালোজেন হরিৎ মাউন্টেন এ্যাশের বৃন্তচ্যুত বয়সী পাতা।
তাদের চোখের গলুইয়ে ফাঁকে পড়ে
জল-পারদের ফোঁটা ফেটে যাচ্ছে
যেন জ্যাকসন পোলোকের রঙ-ককটেল।
আরতো পারা যায় না,
জলে ডুবে মরার এই তো সময়॥
তোমার দুঃখযাত্রা আমাকে কী বিষণ্ণ করেনি
আবদুর রাজ্জাক
বরষায় ডুবে যাওয়া নীল আজ সন্ধ্যার আকাশ, তুমি যে
প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলে, প্রার্থনার উঁচু পাহাড়ের থেকে
সেই প্রতিশ্রুতি গড়িয়ে পড়েছে, সমতলে।
প্রজ্ঞাময় এক অপূর্ব নদী বাঁকা মৃত্যুর জলে, শিলীভূত হয়ে
ঘন বায়ুস্তরের ভিতরে এখনো ভাসমান,
আমাদের অহমিক মাথা না করেও দৃশ্যত চিররশ্মিময়,
বিশ্বাস করো: অশ্রু ফেরানোর দিন সমাগত প্রায়।
জলপাই বনের নিস্তব্ধতা ভাষাহীন ছিল না, এখনো নয়,
দিনের ঝরাপাতা মসৃণ উৎসবে উড়ছে, খর-বিভূতি মাঠে
আমরা বারবার বসন্ত হবো এমতো প্রতীক্ষায় রয়েছি।
আমাদের বাড়িটি বেশি ডুবে যায়
রাকীব হাসান
এই শহরে বৃষ্টি নামলে
আমাদের বাড়িটি বেশি ডুবে যায় –
জানালায় অল্প খোলা জলের শব্দে
গাছের ডালে বৃষ্টি ভেজা পাখির শব্দ শুনি
সবকিছু ভেজা কন্ঠের গানে ভেসে যায়;
নদীর বাড়ি আমাদের
কতো রঙে যে ভিজতে জানে!
প্রেমে পড়া মুহূর্তের মতো মেঘ দাঁড়িয়ে থাকে
বাড়ির টিনের চালে জাকির হোসেনের আঙুল বাজে
আমার আঙুলের তবলায় যেভাবে বেজেছো বহুকাল।
পাতার বৃষ্টি চোখে নেমেছে আজ
জলের জন্মে কেঁদে ফিরে আসে মন
মেঘের আকাশ তখন চোখ ভরা জল –
তুমি আরও কাঁদো, আমরা শ্রাবণে সংসারী হই।
ছেড়ে যাওয়ার শব্দে মেঘে মেঘে বাজে
বিসমিল্লাহ খানের সুরের সুখটান,
বরষায় সানাইয়ের শব্দে আমাদের বিরহ ভেসে যায়!
পটোমেখে বৃষ্টি
শিউল মনজুর
গাড়ির চাকায় ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ দেখি ঝমাঝম
বৃষ্টি হচ্ছে পটোমেখে, বৃষ্টি হচ্ছে রিগ্যান এয়ারপোর্টের
রানওয়ে ছুঁয়ে এয়ারবাসের গ্লোবাল ডানায়, আর ওই দূরে
পেন্টাগণের আকাশ মাড়িয়ে মেরীল্যাণ্ডের অরণ্যচূড়ায়
আমি তাকিয়ে রইলাম অপার মুগ্ধতায় এবং
দেখতে দেখতে বৃষ্টিভেজা দুটি সীগাল উড়াল দিল
নদী তীরবর্তী লতাগুল্মের গোপন রেস্তোরাঁয়…অথচ বৃষ্টি নেই
এই যাযাবরের বুক পকেটে কিংবা খরাক্লান্ত মৌসুমী বাংলায়
যে মৌসুমের গল্প ছন্নছাড়া কিশোর যুবকও জানে
আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টিছাড়া পোকারা বসতি গড়ে
বাসাবাড়ির লতায় পাতায় এবং অজানা শহরের বিষণ্নতা
ছুটে আসে স্কুল গোয়িং বালিকার রাফখাতায়
দীর্ঘপথের দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়ে আবারো বৃষ্টি হোক
বৃষ্টিগল্পে ধুয়ে মুছে যাক ডানাভাঙা পরীর দুঃখ বেদনা
এবং অবিরাম বর্ষণে আবারো হেসে উঠুক
যাযাবরের হৃদয় সীমান্ত পেরিয়ে খরাক্রান্ত সমগ্র বাংলায়…
অলীক কল্পনা
জিললুর রহমান
আমাদের বোবা ধরা দিন
কবে শেষ হবে জানা নেই,
সূর্য উঠবেই, ফুলও ফুটবে
— এমন সকলে ভাবে।
একদিন সূর্য মরে যাবে,
কালো গর্তে পথ হারাবে সাধের পৃথিবী।
অঝোর বৃষ্টি ধারায়
আমাদের কান্না মিশে যাবে,
রক্ত ভেসে যাবে।
ধরাপৃষ্ঠে তবুও উত্তাপ কমে না একটুও।
এই তাপ অলীক কল্পনা।
আদি-অন্ত বর্ষণগাথা
তুষার গায়েন
গ্রীষ্মের আকাশ প্রসারিত হতে হতে যখন প্রকাণ্ড সূর্যকে
মাটিতে নামিয়ে আনে, শুষে নেয় প্রায় সব জলাধার
গুমোট অন্তরে জলানুভব গুমরে গুমরে ওঠে মেঘের প্রার্থনায়—
নামুক অঝোর ধারায় আদিবৃষ্টি, উল্কাপিণ্ডে দগ্ধ ক্ষতবিক্ষত পিঠ
যখন জীবনের প্রয়োজনে ফুঁসে ওঠে সাগরের গীত, জলকল্লোল
আছড়ে পড়ে বালিয়াড়ি তটে— জায়মান এককোষী জীব
টিকে যেতে যেতে গড়ে তোলে বহুকোষী বিন্যাসে উচ্চতর
জীবনের ভিত কোনো চেতনাদীপ্ত প্রাণের সন্ধানে, কাতর মানব :
'বড় আশা নিয়ে এসেছি গো, ফিরাইও না জননী'
গর্ভ নিষ্ক্রান্ত হয়ে দস্যুবৃত্তি তার ছারখার করে দিগন্ত, চরাচর
যা কিছু আছে শ্যামল মাটির 'পর সবই তো গিলে খেল, তারপর
উদর উন্মুক্ত করে যা কিছু ভেতরে আছে তাকে বানাও ভোগের সামগ্রী—
শুষ্ক পত্র-পল্লব, বিলুপ্ত জীব প্রজাতি, অনিঃশেষ কার্বন নিঃসরণ
পুঁজির বিক্রমে ফেটে পড়ে যুদ্ধ দেশ-দেশান্তরে— বন্ধ্যা পৃথিবী
গ্রীষ্মের দাবদাহে অবশেষে কাতর অনুনয় করে : একটি কদম ফুটুক
ঘন কালো মেঘভারে স্ফীত আলুলায়িত কেশের আধারে !
ভিন শহরে বৃষ্টি আসে
আদিত্য শাহীন
মেঘের ভেতর মা থেকে যান, বৃষ্টি সুখের মন্ত্র ভাজেন
ধুলো জানে উঠোন জানে পিপড়ে সারি সেও জানে
মাঝ দুপুরে মা-ই আমার বৃষ্টি নামান, খাদের ধারে
কচুর পাতায় কাচের পানি পারদ যেন পলকা রূপে
ছোবে আমার বুকের জমিন,
আমারও খুবে ইচ্ছে করে বৃষ্টি হতে
এমনতর বৃষ্টি তো নয়, মেঘ ডাকে না প্রেমিককে তার,
হঠাৎ আকাশ কালো করে ঝরলো শুধু-পাহাড়, সবুজ, শহরময়
বৃষ্টি শেষে সুখপ্রপাতের স্মৃতিটুকুও উড়ে উড়ে
কোথায় যেন মিলিয়ে যায়, এই শহরে বৃষ্টি মানে বর্ষা তো নয়
এখানটাতে বৃষ্টি আসে ভিখেরি এক থালা হাতে
দৃষ্টি সবার কাড়ার আগেই সে ফিরে যায় শূণ্য হয়ে
বর্ষা রাণীর মুকুট কভু তার হলো না,
বৃষ্টি এলো বৃষ্টি গেল এই শহরের গতর জুড়ে
টের পেল না হৃদয় কোনো ।
খাঁটি দেশী মেঘ
শামীম রেজা
আমি যেদিন প্রথম প্রবাসে এলাম
এয়ারপোর্টের প্রহরীরা চালিয়েছিল তুমুল তল্লাসি;
আমার সুটকেসে তারা খুঁজে পেয়েছিলো এমন কিছু
যা তাদের দ্রব্য তালিকায় ছিলোনা।
আমার ব্যাগ ঠাসা ছিলো মেঘে-
বাংলাদেশের খাঁটি দেশী শ্রাবণের মেঘ
জল টইটুম্বুর, কিশোরীর অভিমানের মত
একটু টোকাতেই ঝরঝর করে ঝরবে মুষলধারা।
ব্যাগে আরও ছিলো-
মফস্বলের দোতলার বাড়ীর আস্ত একটা খোলা ছাদ;
বৃষ্টির জলে পা ডুবিয়ে হেঁটে যাওয়া ছপছপ শব্দ।
এই ভ্যালির শহরে কদাচিৎ বৃষ্টি হয়
হলেও অসময়ে-
ভিখিরির থালায় ঢেলে দেয়া বালকের এক মুঠো চালের মতো।
এখন যখনই বৃষ্টির তৃষ্ণা পায়
আমার সঞ্চিত মেঘ থেকে
অল্প অল্প ভেঙ্গে ভেঙ্গে বৃষ্টি ঝরাই।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন