https://www.prothomalony.com/

14094

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৫ ০২:১০

মুক্তির ডাক

জসীম উদ্দীন মুহম্মদ

আঁধারের চাদরটা যখন ঘন হয়ে নামে শহরে, তখন নিশির বুকটা ছমছম করে ওঠে। দিনের বেলায় ইট-কাঠের এই শহর তাকে গ্রাস করে না, বরং কর্মব্যস্ততা এক ধরনের সুরক্ষা দেয়। কিন্তু রাত নামলেই একাকিত্বের ভূতটা কাঁধে চেপে বসে। নিশি কাজ করে একটা কল সেন্টারে, যেখানে রাতের শিফটে অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কথা বলাই তার কাজ। দিনের আলোয় ব্যস্ত রাজপথে হেঁটে বেড়ানো আর রাতের নিস্তব্ধতায় হেডফোনে কণ্ঠস্বর শোনা - এই দুই পৃথিবীর মাঝে নিশির জীবন এক অদ্ভুত দোলাচলে আটকে আছে।

সেদিন ছিল পূর্ণিমা রাত। জানালার বাইরে চাঁদের আলো ঝলমল করছিল, যেন প্রকৃতির এক অপার্থিব রূপ শহরের কংক্রিটের জঙ্গল ভেদ করে উঁকি মারছে। নিশি তার ডেস্কে বসেছিল। চারপাশে অন্যান্য সহকর্মীদের চাপা গুঞ্জন আর কিবোর্ডের খটখট শব্দ। হঠাৎ তার হেডফোনে এক অদ্ভুত কণ্ঠস্বর ভেসে এল, "হ্যালো, আপনি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছেন?"

নিশি অভ্যস্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল, "হ্যাঁ, বলুন। কী ধরনের সমস্যা?" কল সেন্টারের প্রশিক্ষণে তাকে শেখানো হয়েছে, যেকোনো পরিস্থিতিতে শান্ত এবং পেশাদার থাকতে হবে। কিন্তু এই কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যা তাকে মুহূর্তে অস্বস্তিতে ফেলে দিল।

ওপাশ থেকে ফ্যাসফেসে গলায় ভেসে এল, "সমস্যা? সমস্যা তো আমার ভেতরে, আপনার মধ্যে, এই পুরো পৃথিবীতে। আপনারা সবাই সমস্যার জালে আটকে আছেন।"

নিশি একটু অবাক হলো। এমন অদ্ভুত গ্রাহক সে খুব কমই পেয়েছে। সাধারণত মানুষ ইন্টারনেট বা বিলের সমস্যা নিয়ে ফোন করে; কিন্তু এমন দার্শনিক কথাবার্তা শুনতে সে অভ্যস্ত নয়। সে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, "আপনি কি আপনার অভিযোগটা পরিষ্কার করে বলতে পারবেন? আমি আপনার সমস্যাটা বুঝতে পারছি না।"

কণ্ঠস্বরটা হাসল। এক বীভৎস, শুকনো হাসি। সে হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক চিরন্তন ক্লান্তি আর হতাশা। "আমি অভিযোগ করতে আসিনি। আমি এসেছি আপনাকে ডাকতে।"

নিশির শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল। তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছিল। এমন কথা এর আগে কোনো গ্রাহক বলেনি। "কীসের ডাক?" নিশির গলা দিয়ে স্বর বের হতে চাইল না।

"মুক্তির ডাক। এই খাঁচা থেকে মুক্তির ডাক।" কণ্ঠস্বরটা আরও কাছে মনে হলো। যেন নিশির কানের পাশেই কেউ ফিসফিস করছে। "আপনারা সবাই এক অদৃশ্য খাঁচায় বন্দি। সময়ের বাঁধনে। নিয়মের বেড়াজালে।  স্বপ্নের মায়াজালে... মুক্তির আলো দেখতে পাচ্ছেন না।"

নিশি আশেপাশে তাকাল। অন্য সহকর্মীরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত। কেউ তার দিকে খেয়াল করছে না। সে যেন একাই এই অদ্ভুত কথোপকথনের অংশ। হঠাৎ করেই লাইনটা কেটে গেল। হেডফোনটা খুলে রাখল নিশি। তার শরীর কাঁপছিল। সে কি স্বপ্ন দেখছে? নাকি রাতের এই নিস্তব্ধতা তাকে বিভ্রম দেখাচ্ছে?

পরদিন সকালে অফিসে এসে নিশি শুনল এক ভয়ংকর খবর। তাদের এক সহকর্মী, রাজিব; যে গতকাল রাতে নিশির পাশের ডেস্কেই ডিউটিতে ছিল, তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার ডেস্কে একটা চিরকুট পাওয়া গেছে, তাতে লেখা— "আমি মুক্ত।" 

নিশির মনে পড়ল, রাজিবেরও হেডফোন লাগানো ছিল গতকাল রাতে। সেও কি সেই কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়েছিল? চাঁদের আলোয় কী এক অদ্ভুত মায়ায় সেও যেন মুক্তির ডাক শুনতে পাচ্ছিল। শহরের এই কংক্রিটের জঙ্গল, এই যান্ত্রিক জীবন, সত্যিই কি এক অদৃশ্য খাঁচা? নিশির কানে তখনো বাজছিল সেই কণ্ঠস্বর— "মুক্তির ডাক।" 

সে জানে না রাজিব কোথায় গেছে, কিন্তু এক অজানা ভয় আর কৌতূহল তাকে গ্রাস করে নিল। কে জানে, এই শহরের অলিতে গলিতে, রাতের অন্ধকারে আরও কতজন এই মুক্তির ডাক শুনতে পাচ্ছে? আর এই ডাকের পরিণতিই বা কী?

 

হই নাকো নিঃশেষ

ইশতিয়াক রুপু 

বর্ষা কালে ভিট বরাবর হলুদ ছানার দল,আধখানাতে ডুবে আছে ধাতব জলের কল। বসত ঘরের নাউরি দিয়ে বৃষ্টি ঝরা জল, বারান্দায় ইতি উতি লাল পিঁপড়ের দল। উঠোন জুড়ে ডুবোকাঁদা, উড়ছে মেঘ তুলো সাদা, ঝড়ো হাওয়ায় আসবে উড়ে, ঝাঁপ দিবে সে হাওর জুড়ে। 

দখিন হাওয়ায় ঢেউয়ের খেলা, সন্ধ্যা কালে আপদ মেলা।বসত ভিটার দখিন পাশে, রক্ষা দেয়াল আড়া বাঁশে।আছাড় খেয়ে জলের ঢেউ, রাখছে নজর বাড়ির কেউ।

কামলা কামিন বাহির ঘরে, দখিন হাওয়ায় দরজা নড়ে, মহাজনের উঁচু ডাকে, মন ভাবনা নজর রাখে। হর হামেশাই বর্ষা কালে, ভালো মন্দের বর্ন তালে। মহাজনের চিন্তা আসে, সুখের নদী না যায় ভেসে। হাওর পাড়ের সুখ গল্প, বসত জুড়ে জমে স্বল্প। লড়াই করে কাটে দিন, ধীরে ধীরে শোধ হয়ে যায় মহাজনের জন্মঋন।

বসতভিটা শতের ঘরে, নৈমুদ্দি সবার পরে, আধখানা তার ঘরের চালে, পাথর চাপা গেলো সালে। আফাল এলে জুতমত, ঘরখানা তার হবে নত, রক্ষা নাহি পাবে, নৈমুদ্দি তাইতো সদাই ভাবে। হাওর জুড়ে দুঃখ গাঁথা, কবে হবে শেষ। আজো মোরা লড়াই করি, হই নাকো নিঃশেষ।

 

লাল ট্রেনের সুজাতা

জামাল সৈয়দ

 

ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই শুনি ঝুম বৃষ্টির শব্দ। মিনেসোটায় গ্রীস্মের শুরুটা হয় বৃষ্টি দিয়ে। দীর্ঘ পাঁচ কি ছয় মাস সাদা বরফে ঢাকা পরিবেশ ধীরে ধীরে সবুজ হতে শুরু করে বৃষ্টি দিয়ে।

চোখ মেলতেই দেখি বিছানার চারপাশে গল্পের বিভিন্ন চরিত্র বসে আছে। রুম ভর্তি। তাদের মধ্যে আবার একটা কঙ্কালও দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ এতগুলো চরিত্র দেখে একটু চমকে গেলাম। 

"এই তোমরা কারা? এখানে কী চাও? কঙ্কাল এখানে দাঁড়িয়ে কেন?"

আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা দেখে কঙ্কাল সামনে এগিয়ে এলো। মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল:

"স্যার, গত রাতে ঘুমাতে যাবার আগে আপনি আমাদের সবাইকে এখানে ডেকেছিলেন। এখন হয়তো ভুলে গেছেন।

তখন থেকেই আমরা সবাই অপেক্ষায় আছি।" 

কঙ্কাল'কে বললাম, "কিসের অপেক্ষা? তুমি কে?"

"স্যার, আমি আকবর। আপনি আমাকে অর্ধেক বানিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। শরীরে এখনো গোস্ত, চামড়া, রক্ত, জাত, ভাষা ঠিক করেন নাই। তাই এই অবস্থায়। আপনি আমারে মাত্র বানানো শুরু করেছিলেন। কিন্তু শেষ করেন নাই।"

"স্যার, আমার একটা অনুরোধ...গল্পে আমারে ভালো কিছু একটা পাট দেন। ভালো কিছু। যাতে দুনিয়ার মানুষ আমারে চিনে, জানে।"

কঙ্কালের কথা শেষ হওয়ার আগেই পেছন থেকে এক মহিলা চিৎকার করে বলে উঠলো,

"এ্যাই, আকবইড়া? চুপ থাক। তোরে তো পরে বানাইছে। আমাগো আগে কিছু একটা হোক..."

মহিলা বলে চলল, "লেখক সাহেব, আপনে আমারে দিয়া শুরু করছিলেন। আগে সেইটা শেষ করেন। আমি আপনের লিখা পছন্দ করছি। আমারে ওই লাল টেরেন গল্পের যেই পাট দিছেন ওইডা অনেক পছন্দ করছি। 

আমারে দেয়া সুজাতা নামটাও সুন্দর। আবার টেরেনে কইরা ইন্ডিয়ার সব জায়গার ঘুইরা বেড়াই, সেইডাও সুন্দর হইছে।" 

মহিলাকে বললাম, "আপনি 'লাল ট্রেনের সুজাতা' গল্পের কথা বলছেন?"

সে বলল, "হ, হ ওইডাই"

আমি বললাম, "কিন্তু সেটা তো একটা প্রেতাত্মার চরিত্র। সুজাতা নামের এক সুন্দরী শাড়ি পরা মহিলাকে প্রায়ই পুরাতন দিল্লি স্টেশনে দেখা যায়। একটা লাল রেলগাড়িতে চড়ে সে কোথাও যায়। কোথায় যায়? কেন যায়? কার কাছে যায় এগুলো কখনও জানা যায় না। কিন্তু সে যখনই যায় তখনই ওই ট্রেনের কোনো এক যাত্রী খুন হয়। গল্পের নাম-লাল ট্রেনের সুজাতা"

আমার কথা থামিয়ে কঙ্কাল বলে উঠলো.."স্যার, আমারে সুজাতার পাট দেয়া যায় না? "

সুজাতার দিকে ইঙ্গিত করে কঙ্কাল বলল, "দ্যাহেন, ওরে কী সুন্দর করে বানাইছেন। স্যার, আমারে তো এখনও শেষ করেন নাই। আপনি চাইলে আমারে ওর চাইতে সুন্দর করে বানাইতে পারেন। এই কঙ্কাল শরীল নিয়া আমি কী করমু? মানুষ আমারে দেখলেই ভয় পায়।"

আমি বললাম, "দেখো কঙ্কাল..."

"স্যার, আমার নাম দিছেন কিন্তু আকবর..."

"দেখো আকবর, তুমি কঙ্কাল হলেও গল্পে তোমার অসাধারণ ক্ষমতা দেয়া আছে। সবচেয়ে বড় কথা তোমার কোনো মৃত্যু নাই। সুজাতা সুন্দরী হতে পারে কিন্তু একসময় সে তার সৌন্দর্য হারাবে। এমন এক সময় আসবে সেই রেল স্টেশনের যাত্রীদের কেউ আর তার রূপে ঈর্ষান্বিত হয়ে ফিরেও তাকাবে না।"

আকবর আমার সাথে যুক্তি তর্ক করতে করতেই পেছন থেকে আরেক মহিলা চিৎকার করতে করতে ছুটে এলো...

"এই যে গল্পকার সাহেব, এই মহিলাকে (সুজাতার দিকে ইঙ্গিত করে) আমার হাজবেন্ডের সাথে দিল্লি ট্রেনের কামড়ায় গায়ে গা লাগানো সিট দিসেন ক্যান?" 

রাগান্বিত মহিলাকে বললাম, "চিৎকার করবেন না প্লিজ! বাসায় বউ, বাচ্চা-কাচ্চা আছে। ওরা ঘুমাচ্ছে... আগে বলুন আপনি কে? চরিত্র নিয়ে আপনার অভিযোগটা কী?"

"আমার নাম দিয়েছেন বীণা। স্বামীর নাম জাহাঙ্গীর। কিন্তু দয়া করে আমার সংসার ভাঙবেন না। আল্লাহর রহমতে আমরা দুজনেই সুখে আছি। আমার স্বামীর সাথে ওই মহিলাকে একসাথে দিল্লির ট্রেনে একই কামড়ায় দিবেন না।"

"তাতে কী হয়েছে? সে তার মতো করে সিট পেয়েছে। আর নারী পুরুষ একই ট্রেনের এক অপরের পাশের সিটে থাকতেই পারে। অসুবিধা কী?"

"না, না "(সুজাতার দিকে ইঙ্গিত করে) এই মহিলাকে আমি চিনি। ওর কারণে  শুধু মানুষই খুন হয় না। ওর স্বভাব চরিত্রও ভালো না। আমার স্বামীর পাশে কোন পুরুষ অথবা খালি সিটে বসান, প্লিজ।" 

"দেখি কি করা যায়। কিন্তু আপনার স্বামী সুজাতার পাশের সিটে বসে গন্তব্যে যাবে এটা জানলেন কীভাবে?"-আমার জিজ্ঞাসা।

"আপনি যখন ঘুমিয়ে ছিলেন তখন কঙ্কাল আকবড় সহ আমরা সব চরিত্ররা একসাথে বসে আপনার গল্পটা নিয়ে বেশ আলাপ করেছি। আপনার গল্প পুরোপুরি ঠিক হয় নাই। অনেক কিছু বদলাতে হবে। এক সুজাতা আর আমার স্বামী বাদে অন্য কেউ তাদের চরিত্র পছন্দ করে নাই। 

সবচাইতে বড় কথা আপনি আকবরকে অনেক ক্ষমতা দিয়েছেন। এত ক্ষমতা যে সে আপনি সহ যে কোন চরিত্রকে মেরে ফেলতে পারে!" 

 

চন্দ্রযোগ 

মুহাম্মদ ফজলুল হক 

কমলাপুর রেলস্টেশনের প্লাটফর্মে শুয়ে আছে মুকবল হোসেন। তার ঘুম আসছে না। আশেপাশের মানুষ ঘুমে। বিকট শব্দে ট্রেন আপ-ডাউন করলেও কারো ঘুমের ব্যঘাত নেই। ঘুমানোর প্রশান্তি অন্যরকম। অশান্তির চাপ থাকলেও মুকবল হোসেনের ঘুম আসে। শান্তির ঘুম। মাঝ রাতে টহল পুলিশ এসে বিরক্ত করলে পকেট হাতরে কিছু টাকা দিলে চলে যায়। ঘুম আরো গাঢ় হয়। ঘুমের মধ্যে সে দেখে চাঁদ তার নিকটে চলে এসেছে। এত নিকটে ইচ্ছে করলে সে চাঁদ স্পর্শ করতে পারে। 

পুলিশের হাঁকডাক ও বাঁশির শব্দে ঘুম ভাঙ্গে। চিরকালীন ট্যাপে হাতমুখ ধুয়ে পানি পান করে স্টেশন থেকে বের হয়। এখন এখানে থাকা যাবে না। রাতে আবার আসবে। মুকবল হোসেন একা আসে না। তার মত শত শত লোক প্রতিদিন প্লাটফর্মে ঘুমাতে আসে। দেশের রাজধানী ঢাকা শহর যাদের আশ্রয় দেয়নি তাদের রাতের আশ্রয়স্থল কমলাপুর রেলস্টেশন।

নব্বাই দশকের শুরু। উন্নয়নের উচ্ছ্বাসে ভাসছে ঢাকা শহর। বড় বড় দালানের মাঝ দিয়ে গরম পিচঢালা পথে হাটছে মুকবল হোসেন। গন্তব্য বাসাবো। এলাকাটি নতুন হলেও পরিপাটি বাড়িঘর গড়ে উঠেছে। ঢাকার প্রথম বৌদ্ধ মন্দির পেড়িয়ে সামনে এগুলে মসজিদ। মসজিদ পেড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে ডানদিকে মোড় নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বামে ঘুরে সরু রাস্তা পার হয়ে পাঁচতলা ভবন সংলগ্ন ছোট গেইট দিয়ে কুর্ণিশ করে টিনশেড গৃহে প্রবেশ করে সে। বারান্দায় একপাশে যতটুকু খাট ততটুকু রুমে বাস করে এক রহস্যময় মানবী। 

এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তিনি। তাঁর ছায়া মুকুবল হোসেন। মুকবল হোসেন তাঁর জন্য অপেক্ষা করে। যতক্ষণ তিনি না আসেন ততক্ষণ মুকবল হোসেন বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। কোন বাক্য বিনিময় করে না। ক্ষিধা ও গরমে কাবু হয় না মুকবল হোসেন। রহস্যময় মানবী দৃশ্যমান হয়। কৃশকায়। চুল সাদা জটাযুক্ত। শীর্ণ বিভা ছড়ানো দেহ সাদা শাড়িতে আবৃত। শাড়ির মতই চোখ সাদা। কালো ভ্রযুক্ত পরিষ্কার চোখে মুকবল হোসেনকে পর্যবেক্ষণ করে স্পর্শ করে। কিছু বোঝার আগেই তার হাতের মুঠোয় কি যেন ঠেসে দেয়। কেঁপে উঠে মুকবল। নিঃশব্দে বেড়িয়ে যায় সে।

মুকবল হোসেন গোলাপ শাহ মাজারের উদ্দেশ্য হাঁটা শুরু করে। গুলিস্তানে অবস্থিত এই মাজার নিয়ে বিস্তর কাহিনি প্রচলিত হলেও মাজারটি নব দম্পত্তির নিকট জনপ্রিয়। জনশ্রুতি আছে এই মাজার জিয়ারতে নবদম্পতির জীবন সুখের হয়।

মুকবল বাসবো থেকে বেড়িয়ে খিলগাঁও-শাহজাহানপুর-মতিঝিল হয়ে বাইতুল মোকাররমের সামনে দিয়ে মাজারে পৌঁছে। উন্মুক্ত মাজারের সামনে বিয়ের পোষাকে সজ্জিত এক দম্পতির সামনে বসে। দম্পতি মুকবলকে বেশ সমীহ করে। টিফিনবাক্স খুলে খাবার পরিবেশন করে। খুশি হয় মুকবুল। খাওয়া শেষ হলে পরম যত্নে তারা মুকবলের হাত পরিষ্কার করে। মুকবল কাগজে মোড়ানো আলোকিত বস্তু তাদের হাতে সমর্পণ করে ওসমানী উদ্যানে গমন করে।

ক্লান্তি দূর হলে মুকবল শাহ আলী মাজারের উদ্দেশ্য নগ্ন পায়ে হাঁটা শুরু করে। হযরত আলীর বংশধর শাহ আলী বাগদাদী মোঘল আমলে দিল্লি থেকে ইসলাম প্রচারে ফরিদপুর হয়ে ঢাকায় আগমন করে মিরপুরের এক জরাজীর্ণ মসজিদে অবস্থান করেন। তাঁর মৃত্যু হলে মসজিদ কেন্দ্র করে সমাধি নির্মিত হয়। হিন্দু মুসলিমসহ সব ধর্মের মানুষ প্রত্যাশা পূরণে এখানে সমাবেত হয়। মাগরিবের আযান শুনতে শুনতে মুকবল মাজার কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে। নামাজ শেষ না পর্যন্ত অপেক্ষা করে। নামাজ শেষে দীর্ঘকায় এক ব্যক্তি তার নিকটে আসে। সে হাতের মুঠো থেকে আলোর পরশ লোকটির হাতে বলিয়ে দেয়। আনন্দের ঝিলিক দেখা যায় লোকটির মধ্যে।  

দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে হাইকোর্ট মাজারে গমন করে মুকবল। হালকা বাতাসে মানুষের ভীড় ভেদ করে এগিয়ে চলে। রাত বাড়লে চাঁদের আলো স্পষ্ট হয়। বিদ্যুৎ বিহীন শহরে চাঁদ পথ দেখায়। চাঁদের পিছনে সে হাঁটে নাকি তার পিছনে চাঁদ বোঝা যায় না। হাইকোর্ট গেইট দিয়ে প্রবেশ করে মুকবল। এখানে খাজা মুঈনুদ্দিন হাসান চিশতীর দ্বিতীয় পুত্র খাজা শরফুদ্দিন চিশতীর মাজার। 

প্রতিদিন হাজারো মানুষ মনোবাঞ্ছা পূরণে মাজারে আসে। মাজারের সন্নিকটে মধ্যবয়সী অন্ধ এক ভিক্ষুক হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে। মুকবল তার হাত ভিক্ষুকের হাতে রাখে। চমকে উঠে ভিক্ষুক। আলোর বিনিময় ঘটে। সে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। অন্ধকারে চাঁদের আলো তার নিত্যসঙ্গী।

কেউ কি ডাকছে তাকে। অদৃশ্য অস্পষ্ট স্বর। ঘুমের আবেশ উপলব্ধি করে রহস্যময় মানবী দাঁড়িয়ে। সাদা শাড়ি বাতাসে উড়ছে। চোখের সাদা অংশে মুকবলের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। "তুমি কি জানো, তুমি কোথায় যাচ্ছ?" মানবীর কণ্ঠ মৃদু কিন্তু স্পষ্ট। "শুধু বার্তা পৌঁছে দিয়েছি", বলে সে। মানবী হাসে, রহস্যময় হাসি। "হাতের মুঠোয় কী জানো?" মুকবল মাথা নাড়ে। কিছু বলতে পারে না। ঘুমে চোখ ভারী হয়ে আসে। চোখ বন্ধ করে ধীরে ধীরে তলিয়ে যায় অদ্ভুত ঘুমের গভীরতায়।

প্লাটফর্মে মুকবলের ঘুমানোর স্থান আলো ছড়াচ্ছে।নিস্তব্ধ স্টেশন। ট্রেনের যান্ত্রিক শব্দও মাঝেমাঝে থেমে যায়। ঘুমন্ত শহরকে বিরক্ত করে না। চাঁদের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুকবল। চাঁদের মায়াময় আলো তাকে শান্ত করে। চাঁদ আরো নিকটে চলে আসে। মনের খুশীতে সে চাঁদের হাসিতে মিশে যায়।

ভোরের আলো ফোটে। স্টেশনে কোলাহল শুরু হয়। লোকজন আসা-যাওয়া শুরু করে। মুকবল জাগে না। পুলিশ দেখে প্ল্যাটফর্মের কোনে মুকবলের নিথর দেহ পড়ে আছে। তার মুখ চাঁদময়। হাতের মুঠোয় কি যেন মোড়ানো। পুলিশ কৌতূহলী হয়ে হাত খুলে অবাক হয়। চাঁদের স্পর্শে লেখা,  "তুমি শেষ করেছো গল্পের এক অধ্যায়। কিন্তু এই গল্প কখনো শেষ হয় না।"

 মুকবলের মাধ্যমে চাঁদের স্পর্শ পাওয়া নবদম্পতি, দীর্ঘকায় ব্যক্তি ও অন্ধ ভিক্ষুক একই স্বপ্ন দেখে। চাঁদের মরমী আলো অনুভব করে শান্তিতে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়। সবার মুখে যেন চাঁদের হাসি।

রহস্যময় মানবীর নতুন গল্প শুরু হয়। সকালে তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। চাঁদের বিভায় আলোকিত সে। যদিও মুকবল হোসেনের সাথে তার কখনোই দেখা হয়নি!

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন