https://www.prothomalony.com/
14024
literature
নাকবোঁচা নৈঃশব্দ
ইসলাম মুহাম্মদ তৌহিদ
চোখে তার বর্ণান্ধতা; তবু সে রঙ খোঁজে গন্ধে,
পাতার ফাঁকে কুঁচকে-থাকা পদ্য
উল্টে দেয় অ্যালার্ম ঘড়ির গা।
পিরামিড গলায় ঝুলিয়ে সে হাঁটে,
চাঁদ ছেঁড়া জুতো জোড়া পায়ে।
নাকবোঁচা, নাম নয়, কোডনেম।
আঙুলে দাগ, তর্জনীতে অলিখিত হুকুম।
সে জানে, 'ক' মানে কখনো কারফিউ,
'খ' মানে খুন হওয়া এক বাতিঘর।
তার চোখে করিডোর, দরজাগুলো সব ভাঁজে লুকিয়ে,
শব্দহীন ছায়া হাঁটে, পায়ের নিচে চাপা পড়ে সংলাপ
অন্য এক তোমাকে
শামসুল বারী উৎপল
চোখের মৃত্তিকায় সামুদ্রিক চাঁদ
প্রলাপ বকে নিশাচর কবি
জল-কাদা কবিতায় নয়
নয় আষাঢ়ের বর্ষণে
স্নান শেষের জবুথবু শাড়িতে
অপুষ্টি খচিত মৃত্তিকার পুরোনো শ্লোকেও নয়
খুঁজে ফিরি অন্য এক তোমাকে।
বিবস্ত্র জামানার বিপণন সময়ে
অর্থনীতির পরিধি যেখানে সীমান্ত ছাড়িয়ে
ছুঁয়েছে পৃথিবীর মানচিত্র
সেখানে হীরক খচিত স্বর্ন গোলাপ খুলে রেখে
ফিরে এসো আফ্রোদিতি
অন্য এক তোমাকে চাই।
বাসিফুল
সাব্বির আহমাদ
চারদিকে গুড়ো গুড়ো হয়ে ছড়িয়ে আছে কালোত্তীর্ণ
এক রূপক সন্ধ্যা। এখন এমনই এক থকিত মূহুর্ত ;
এমনই এক রুপার পারদ অস্তমিত হওয়ার মূহুর্ত —
যেনবা অগুনিত খন্ড খন্ড মুক্তদানা একসাথে ডুবে
মরছে কোনো এক কদার্য জলের গর্তে। পথিক তুমি
হাঁটতে থাকো এবং দূরবর্তী এক অচিন গানের সুর সালমাও। কোনো আজনবি গায়ক যেভাবে হারিয়ে
ফেলছে তার পরিচিত গলার হাড়। কোনো কোনো ধূর্ত হরিণী যেভাবে ছলনায় ভুলিয়ে নিয়ে যায় শিকারীর লালসায় আদ্র চোখ।
তুমি এবার নিজেকে সামলাও পথিক! এই পথ,
এই কালোত্তীর্ণ সন্ধ্যা, এইসব রূপক সময়ের সন্ধিক্ষণ ক্ষয়ে ক্ষয়ে যেন আলগোছে ঝরে পড়ছে বিগত রাতের কয়েকটা বাসিফুল।
চাঁদের আলোয় দেখা যায় না মুখাবয়ব
দেওয়ান নাসের রাজা
সাগর আমায় ডাকছে, যেতে হবে
কচুরিপানা প্রবাহে দ্রুত যাচ্ছে ভেসে
মানুষেরা ভাগ হয়ে ক্রমে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে
আয়নাটা অযত্নে ভেঙে গেছে।
চাঁদের আলোয় দেখা যায় না মুখাবয়ব
ঝলমলে উজ্জ্বল বাবলার সারি
প্রদীপ শিখায় উড়ে পোকাদের ঝাঁক
মুখোশের আড়ালে হিংস্রতা থাকে বাঁধা।
দলে দলে ছোটে চলে পতঙ্গের মতো।
ছালহীন অর্জুন নিঃসঙ্গ ঘুমাই
উত্তাল সমুদ্রে একদিন তৃণলতা-
চন্দন কাঠের মতো স্রোতে ভেসে যায় শহুরে
ঝলকানিতে বাড়ে শিশুদের আকর্ষণ
নিয়ন আলোয় চাঁদ ঢেকে যায়
সবাই প্রাচীন নাট্যমঞ্চের সেপাই।
নাবিকের চোখ খোঁজে তীরের ঠিকানা।
বৃষ্টির আদরে
মোঃ ইজাজ আহামেদ
মেঘ রোদ্দুরের লুকোচুরি,
আঙিনায় দাঁড়িয়ে আমি
হঠাৎ করে শুরু হলো মুষলধারে বৃষ্টি।
বৃষ্টির আদরে মনে পড়লো তোমাকে
বৃষ্টি মেখে বৃষ্টিস্নাত হয়ে মনে কল্পনা আঁকি
তুমি আমি বৃষ্টিতে ভিজি
আনন্দের জোয়ার উঠে মনের সমুদ্রে
দিগন্ত পেরিয়ে মেঘ বালিকারা আমাদের দেখতে আসে;
আমাদের সাথে তারা হেসে উঠে মহাউল্লাসে।
মাঝে মাঝে হাত ধরে দুজনে
বৃষ্টির জলে লাফালাফা করি,
জলের ফোঁটা ছিটিয়ে একে অপরকে উপহার দি,
মাঝেমাঝে দুজনে পাশাপাশি
দু'হাত ছড়িয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থাকি।
বৃষ্টি থামলো, থামলো আমার কল্পনার স্বপ্ন;
এক পশলা বৃষ্টি আমার মনের দেশে নিয়ে এসেছিল
রোমান্টিসিজমের বৃষ্টিধারা;
মেঘের খামে তোমায় দিলাম পাঠিয়ে
আমার এই বৃষ্টি ভেজা কল্পনার বর্ণনা।
-
রাতের গলায় মালা
মোঃ আব্দুর রহমান
ঘুটঘুটে যুদ্ধের চাবিটা কোথায়?
সেখানে কী বকুলের সুবাস যায় না
নিঃশ্বাসে শুধুই কী পারমানবিকের আতর!
কোকিলের বদলে বইছে পেঁচার মিহি গান!
নিস্পাপ প্রাণ নিয়ে বসে ডাংগুলির বাজি!
নেই কোন আফসোস মনের চতুর্ভুজে-
জল্লাদি নিমগাছে পাতো রুআপজার হাড়ি!
বিদ্যার পাতায় ঢালছো জিদের এসিড
মাথায় আছেতো মানবতার বিজলি?
তাহলে জ্বালাও করমর্দনের ঝারবাতি
শান্তির গোল্লাছুটে বাক-বাকুম শুনুক পৃথিবী....
ঘুমন্ত আত্মা
মোঃ রহমত আলী
বোবার মুখ খুলে গেছে আজি,
এতদিন কণ্ঠে ছিল চাপা
মিথ্যার জয় গানের জয় জয় সুর।
বয়রা এখন দেখি শুনছে কানে,
এতদিন তো শোনেনি মজলুমের আর্তনাদ
আজি শুনেছে তাঁরা শতবছরের চিৎকার।
অন্ধের চোখে যখন সূর্যের জ্যোতি পড়েছে,
তখনই চোখে দেখেছে সে.. লাল লাভা ! যা
রাজপথে ঝরে পড়া তাজা রক্ত, অতঃপর
শুকিয়ে যেতে না যেতেই হয়তো প্রাণ-সঞ্চালন
হতেও পারে, মৃত বিবেকবানদের আবেগের
শিরা-উপশিরা হতে ঘুমন্ত আত্মা পর্যন্ত ।।
গরীবের মুক্তি
হাফিজুর রহমান
শুনি, কে বলেছে হে - তুমি গরীব?
বলেনি চাঁদ, বলে না দিনের সূর্য
পার্থক্য করতে দেখিনি আকাশকে
গাছকে দেখিনি ভিন্ন রকমের হতে
ধ্বসে পড়েনি পাহাড়, ডুবায়নি জল।
যে বলে, তাকে কি মানুষ বলা চলে?
ইচ্ছে করে কাউকে গরীব বানানোর
কে তুমি, আমিই-বা কে? পৃথিবীর।
দৃষ্টিনন্দন চোখ, কর্মঠ হাতের স্পর্শ
দুরন্ত পা, অকল্পনীয় হৃদয় সম্পদের
মহামূল্যের মানুষ কেন - হবে গরীব?
'গরীব', তুমি আসলে মানুষের নও;
চাপানোটা অবিচার - অমানুষের।
জন্ম-মৃত্যু একই - ভেবে মানুষের;
আমি তোমাকে মুক্তি দিলাম যেতে,
মুছে ফেলে ঘুচে দিতে কষ্ট তোমার।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও শিশু-সাহিত্য
শেখ একেএম জাকারিয়া
যাঁদের বাদ দিলে বাংলা সাহিত্য পূর্ণতা পায় না, তাঁদের অন্যতম হলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছোট-বড় সবার জন্য তিনি রেখে গেছেন অসংখ্য কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। কবিতা, গল্প, নাটক, সংগীত, প্রবন্ধ—সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তাঁর পদচারণা সমুজ্জ্বল।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের ধর্মগুরু এবং মাতা সারদাসুন্দরী দেবী। তিনি ছিলেন তাঁদের চতুর্দশ সন্তান।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যচিন্তায় শিশুমনের কল্পনা, স্বপ্ন, আকাঙ্ক্ষা ও অনুভূতি গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। শিশুরা তাঁর মনকে নাড়া দিয়েছে বলেই তাঁর কবিতা, ছড়া, নাটক, গল্প—সবখানেই শিশুদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তিনি চাইতেন, শিশুরা যেন নাটকের মাধ্যমে শিক্ষালাভ করতে পারে। তাঁর 'তোতাকাহিনী' গল্পটি তারই একটি দৃষ্টান্ত।
এই নোবেলজয়ী কবি শিশুদের জন্য গান, নৃত্যনাট্য, ছড়া-কবিতা, গল্প-নাটিকা রচনা করেছেন, যা আজও পাঠকহৃদয় জয় করে চলেছে। মাতৃভাষার বিকাশে এবং বিশ্বসভায় বাংলা ভাষার পরিচিতি বাড়াতে তিনি রেখেছেন অসাধারণ অবদান। তাই তিনি শুধু কবি বা সুরস্রষ্টা নন, তিনি আমাদের ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক।
শিশুরা থাকে কল্পনার জগতে। সেই কল্পনার জগতে প্রবেশ করতে গিয়ে কবি নিজেই যেন শিশু হয়ে উঠেছেন। তাঁর কবিতায় শিশুদের চাওয়া-পাওয়া, কথা বলা, কল্পনা ও কৌতূহল জীবন্তভাবে ফুটে উঠেছে। যেমন—
"মেঘের কোলে রোদ হেসেছে,
বাদল গেছে টুটি,
আজ আমাদের ছুটি ও ভাই,
আজ আমাদের ছুটি।"
এই ছড়ার ছন্দ ও সুর শিশুদের মনে আনন্দের জোয়ার তোলে।
তাঁর লেখা শিশু ভোলানাথ, খাপছাড়া, শিশু, ছড়ার ছবি প্রভৃতি গ্রন্থ আমাদের শিশুসাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। ছুটি গল্পের ফটিক কিংবা ডাকঘর নাটকের অসুস্থ বালক অমল তাঁর সাহিত্যিক মমতার নিখুঁত প্রতিরূপ।
রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে ভালোবাসতেন। তাঁর শিশুতোষ কবিতায় প্রকৃতি এসেছে এক শিশুর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।
"আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে,
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।"
এই কবিতার নদী যেন শিশুর চোখে দেখা তার গাঁয়ের পাশের সেই ছোট নদী। কবির খেয়ালি মন ছিল শিশুদের মতোই সহজ ও সরল। যা দেখেছেন, তা-ই হতে চেয়েছেন; যা অনুভব করেছেন, তা-ই লিখেছেন।
উনিশ শতকে ছোটগল্প বিশ্বসাহিত্যে একটি নতুন ধারার সূচনা করে। ফ্রান্সে গি দ্য মপাসা, রাশিয়ায় আন্তন চেখভ, ইংল্যান্ডে সমারসেট মম আর ভারতবর্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই ধারার পথিকৃৎ। বাংলা ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই এসেছে বিপ্লব।
১৮৭৭ সালে ভিখারিনী গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর গল্পলেখা। এরপর হিতবাদী ও সাধনা পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় দেনা-পাওনা, গিন্নি, পোস্টমাস্টার, তাঁরাপ্রসন্নের কীর্তি, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, কঙ্কাল, একটি আষাঢ়ে গল্প, স্বর্ণমৃগ, জয়ই পরাজয় ইত্যাদি গল্প।
তাঁর ছোটগল্পে গ্রামীণ জীবনের ছবি, পদ্মার ভাঙন, প্রকৃতির লীলা এবং ভাগ্যাহত মানুষের করুণ বাস্তবতা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। জমিদারি সূত্রে বাংলার গ্রামে অবস্থান করে তিনি যেসব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, সেগুলো তাঁর গল্পকে দিয়েছে বাস্তবতার ছোঁয়া ও মানবিক গভীরতা।
রবীন্দ্রনাথ ছোটদের জন্য লিখেছেন মজার মজার ছড়া, গল্প, নাটিকা এবং শিশুতোষ গান। তাঁর লেখা যেমন কল্পনায় ভরপুর, তেমনি বাস্তব জীবনের পাঠও বয়ে আনে। তাঁর শিশুদের উপযোগী রচনাসমূহের মধ্যে রয়েছে— সহজপাঠ ১ ও ২, খাপছাড়া, ছড়া ও ছবি, গল্পস্বল্প, ছেলেবেলা, বিশ্বপরিচয়, লিপিকা, মুকুট প্রভৃতি।
এছাড়া সোনার তরী, কাহিনী, কড়ি ও কোমল, চিত্রা, ক্ষণিকা, কল্পনা, লেখন প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থেও শিশু-কিশোরদের উপযোগী অনেক কবিতা রয়েছে।
বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক আলোকবর্তিকা। সভ্যতার সংকটে তিনি আশ্রয়, ভাষার সংকটে তিনি পথপ্রদর্শক। শিশুর হাসি-কান্না, কল্পনা, স্বপ্ন—সবকিছু তিনি সাহিত্যে ধারণ করেছেন অপার মমতায়। কবি দীনেশ দাশ একথাই বলেছিলেন—"তোমার পায়ের পাতা সবখানে পাতা।"
এই চিরায়ত মানবিক কবি চিরকাল বাংলা সাহিত্যে শিশুদের প্রাণসঙ্গী হয়ে থাকবেন।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন