https://www.prothomalony.com/
13975
literature
ভূমিকাঃ
"স্বাধীনতা মানে শুধু একটি দিন নয়, একটি পতাকার নিচে বহু স্বপ্নের সম্মিলন।"
১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই ঘোষিত হয়েছিল এক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম যেখানে স্বাধীনতা ছিল অস্তিত্বের কেন্দ্রে এবং মানুষের অধিকারের প্রশ্ন ছিল জাতির ভিত্তি। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস শুধু একটি জাতীয় উৎসব নয়, বরং একটি চেতনার উদ্যাপন, যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের অধিকার, এবং স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলার সাহস প্রতিটি নাগরিকের অস্তিত্বে বেঁচে থাকে।
এই সাহিত্য পাতা সেই চেতনাকে ধারণ করার একটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। এখানে আছে অভিবাসীর চোখে দেখা 'স্বাধীনতা'র মানে, আছে দূরদেশে জন্ম নেওয়া সন্তানদের আত্মপরিচয়ের টানাপড়েন, আছে বাংলাদেশি হৃদয়ে বাজতে থাকা 'স্টার-স্প্যাঙ্গল্ড ব্যানার'-এর ছায়াপথ।
এই সংখ্যা শুধুই আমেরিকার জন্মদিন স্মরণ নয়-এটি অভিবাসনের গল্প, পরিচয়ের দ্বন্দ্ব, বহুস্বত্বার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার ভাষা ; যা কেবল রাষ্ট্রীয় নয়, বরং গভীরভাবে ব্যক্তিগত। আমরা বিশ্বাস করি, স্বাধীনতা মানে নিজের কণ্ঠ খুঁজে পাওয়া। স্বাধীনতা মানে, কোথাও না থেকেও পুরোপুরি 'আছে' হয়ে ওঠা। এই সাহিত্য সংখ্যাটি সেই কণ্ঠগুলোরই এক মৃদু-স্পষ্ট প্রতিধ্বনি।
-ধন্যবাদান্তে এইচ বি রিতা।
জুলাই ঝলমলে
সুমন শামসুদ্দিন
হাডসনের পাড়ে, বারোটা এক বাজে,
আকাশ আলো করে আতশবাজি ফোটে,
বাতাস চমকিত, আকাশ আলোকিত,
আলোতে জল নাচে, দুধারে ইমারত।
নদীর চারিধারে, হর্ষধ্বনি রাতে-
উল্লসিত সব আমুদে দর্শক,
ম্যানহাটন আর জার্সি সিটি যেন
ঘুমকে আজ রাতে বিদায় জানিয়েছে!
স্বাধীনতার সাজে সারাটি রাত জাগে,
লাল ও নীল, সাথে শুভ্র তারা ওড়ে;
স্মৃতিতে অমলিন উত্তরীয় দিন,
মুক্তি যেন ভাসে জুলাই পটভূমে।
মাঠ ও প্রান্তরে বনফায়ার রাতে,
বন্ধু, পরিবার, বারবিকিউ চলে,
কান্ট্রি সঙ্গীতে ভূবন মূর্ছণা
দীর্ঘ অবকাশে ছুটির দিন কাটে।
জুলাই ঝলমলে যুক্ত-রাষ্ট্রতে,
লাল ও নীল, সাথে শুভ্র তারা ওড়ে।
স্বাধীনতা
আবদুল বাতেন
হাহ্ স্বাধীনতা!
চোরেরা পেয়েছে পুকুর- নদী- সাগর চুরির
দলবদ্ধ ডাকাতেরা রাত ও দিনে, ডাকাতির
ধর্ষকেরা সরল শিশু কী বৃদ্ধা ধর্ষণের
স্বাধীনতা পেয়েছে খুনিরা ঘরে বাইরে খুনের
রাক্ষসেরা পেয়েছে স্বর্গ মর্ত্য গোগ্রাসে গেলার
নষ্টরা স্বাধীনতা পেয়েছে মানবতা গুঁড়িয়ে ফেলার
যুদ্ধবাজেরা রক্তপাতের, দশদিক দখলের
স্বাধীনতা পেয়েছে কীটেরা হাসি হজম করার, ফুল- ফসলের
দানবের পশ্চাদ্দেশে ক্ষমতার সিংহাসন পাতা
স্বাধীনতা পেয়েছে, জীবনভর
দুর্ভোগে- দুঃস্বপ্নে সাঁতার কাটার, আমজনতা।
দুই পতাকার মাঝখানে
রোকেয়া দীপা
তারা-ডোরা পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে,
তবু বুকের ভিতরে বাজে অন্য এক বাঁশি।
এক ভাষায় বলে মা,
আরেক ভাষায় শেখে মানচিত্র আঁকতে।
স্কুলে শিখেছে "হোম অফ দ্য ব্রেভ",
কিন্তু দাদুর চোখে আজও গানের সুর
"আমার সোনার বাংলা..."
কে আমি? কাকে বলি আমার?
এখানে জন্ম, ওখানে রক্তের ছাপ
দুই ভূগোলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে
আমি নিজেই এক প্রশ্নচিহ্ন।
ফোর্থ অফ জুলাই- শুভেচ্ছা
কুলসুম আক্তার সুমী
আজ পয়লা জুলাই। যখন আমি লিখতে বসেছি আমার শহরে তখন আতশবাজির আয়োজন চলছে। বিকেল বেলায় বাচ্চাদের নিয়ে আমি সেই আতশবাজি দেখতে যাবো। প্রতিবছরই যাই, আশপাশের আরো অনেক জায়গাতে যাই। আমেরিকার স্বাধীনতার উদযাপন উপভোগ করি।
এদেশে বসবাস শুরু করেছি দেড় যুগ আগে। নাগরিক হয়েছি তাও যুগ পেরিয়েছে। একবার জুরি হওয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে কোর্ট থেকে ঘুরে এসেছি। আইনানুগ কাজ করছি, কখনো কোন কারণে আইন ভঙ্গ করিনি। নাগরিক হিসেবে যা যা করণীয় কর্তব্য তা পালনের চেষ্টা করি, করেছি কারণ নাগরিক হিসেবে অধিকারটা আমি ভোগ করছি ষোলো আনা। চার জুলাই আমিরিকার স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে তাই সকলকে জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা।
কিভাবে এই দিনটি আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস হলো একটু জানার চেষ্টা করি।
১৬০০ খ্রিস্টাব্দ হতে ব্রিটিশরা আমেরিকায় উপনিবেশ গড়ে তুলতে থাকে। শত বর্ষেরও অনেক বেশি সময় ব্রিটিশের অধীনে থেকে স্বাধীনতার সাধ জাগে আমেরিকানদের। ১৭৭৬ সাল থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছর আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ চলেছিল, যা আমেরিকার বিপ্লবী যুদ্ধ নামেও পরিচিত। ব্রিটেনের প্রতিনিধিত্ব ছাড়া করারোপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে আমেরিকার স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়। তখন আমেরিকার কলোনি বা প্রদেশ বর্তমান সময়ে যাকে রাজ্য বলা হয় তা ছিলো ১৩টি। ১৭৭৬ সালের জুলাই মাসে এই ১৩ টি কলোনি ব্রিটেনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। যদিও যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তার আগের বছর মানে ১৭৭৫ সালের এপ্রিল মাস থেকে। এই যুদ্ধে আমেরিকান বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন জর্জ ওয়াশিংটন। টানা কয়েক বছর যুদ্ধের পর ফরাসি বাহিনী ও জর্জ ওয়াশিংটনের যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন ব্রিটিশ সেনা কর্মকর্তা চার্লস কর্নওয়ালিস।
২ জুলাই লেখা হয় আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের প্রথম খসড়া। পরবর্তীতে এটিকে আরো সংশোধন ও পরিমার্জনের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে গ্রহণ করা হয় ৪ জুলাই এবং 'ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স' ঘোষণা করা হয়। পরে ১৭৭৬ সালের আগস্ট মাসে, এই ঘোষণাপত্রের হাতে লেখা কপিতে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সই করেন। যা ইতিহাসের দলীল হিসেবে জাদুঘরে রক্ষিত আছে আর ৪ জুলাই আছে আমেরিকার প্রতিটি নাগরিকের প্রাণে প্রাণে।
রাজনৈতিক স্বাধীনতা ১৭৭৬ সালে এলেও প্রকৃত স্বাধীনতা এসেছে আরো শতবছরেরও পর ধীরে ধীরে। ১৮৬৩ সালে মহান প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন দাস প্রথা বাতিল করেন, ১৮৭০ সালে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার এবং ১৯২০ সালে নারীদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়। ভোটাধিকার পাওয়ার আরো শত বছর পরও কালোদের ভালো স্কুলে যাওয়া, ভালো রেস্টুরেন্টে খাওয়া, সব পার্কে যাওয়া বা পাবলিক বাসে বসার অধিকার ছিল না। ১৯৫০ এর দশকে মার্টিন লুথার কিংয়ের আন্দোলনের ফলে কালোরা সব অধিকার লাভ করে। মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ অনুভব করতে শুরু করে।
এ বছর আমেরিকার ২৪৫ তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপিত হচ্ছে। এতোগুলো বছরে দিবসটির উদযাপনে বহুমাত্রিক বৈচিত্র্য এসেছে। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতির এই সময়ে এসেও পুরানো অনেক কিছু এখনো বহাল আছে। এ সময়ে লাল নীল সাদা রঙে সেজে উঠে সারা দেশ। বড় বড় স্থাপনা, সুউচ্চ ভবন, শপিংমল সবখানেই সাজ সাজ রব। জুলাইয়ের প্রথম দিন থেকেই সন্ধ্যেবেলায় শুরু হয় আতশবাজি। নানা প্রতিষ্ঠান, সিটি কর্পোরেশন এমনকি ব্যক্তিগতভাবেও আতশবাজি করে উপভোগ করা হয় স্বাধীনতার আনন্দ। সপ্তাহজুড়ে প্যারেড হয় সকালে। পরবর্তী সময়ের যুদ্ধ যেমন ভিয়েতনাম যুদ্ধ, বেঁচে থাকা সৈনিকদের সম্মাননা দেওয়া হয়, স্মৃতিচারণ হয়, হয় পারিবারিক পুনর্মিলনী এবং রাত্রি জেগে সংগীতের মূর্ছনা। 'গড ব্লেস আমেরিকা', 'আমেরিকা বিউটিফুল', 'লিবার্টি সং' 'দিস ল্যান্ড ইজ ইয়োর ল্যান্ড', 'ইয়োলো রোজ অব টেক্সাস'...
প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণাকালে আমেরিকার ১৩টি রাজ্য ছিলো, বর্তমানে ৫০টি। এটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ; যার জনসংখ্যা প্রায় ৩৪ কোটি। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ এবং জাতিগোষ্টির মানুষের বসবাস রয়েছে এদেশে। ৫০ টি রাজ্যের অনেকগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহ্য এবং রীতি। ফলে যুক্তরাষ্ট্র সাংস্কৃতিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় দেশগুলোর একটি। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলের সংস্কৃতি এখানকার সংস্কৃতিকে কমবেশি প্রভাবিত করেছে।
তাইতো আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসে আমিও স্বাধীনতার গান শুনি, পছন্দের খাবার রান্না করি, সন্তানদের নিয়ে তাদের প্রিয় কোন জায়গায় ঘুরে আসি। মনে মনে প্রার্থনা করি আমার জন্ম বেড়ে উঠা দেশের মতোই আমায় আশ্রয় এবং মর্যাদা দেওয়া দেশও সংহত, সমৃদ্ধ হয়ে বিশ্বে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকুক দীর্ঘ দীর্ঘ কাল।
দ্য স্টার-স্প্যাঙ্গল্ড ব্যানার
এইচ বি রিতা
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত, "দ্য স্টার-স্প্যাংলড ব্যানার।" এর গীতিকাব্য নেওয়া হয়েছে "ডিফেন্স অফ ফোর্ট ম্যাকহেনরি" নামক একটি কবিতা থেকে, যা ১৮১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, আমেরিকান আইনজীবী ফ্রান্সিস স্কট কি লিখেছিলেন।
মাত্র এক মাস আগেই, ১৮১২ সালের যুদ্ধের উত্তপ্ত পর্যায়ে ব্রিটিশ বাহিনী হোয়াইট হাউস জ্বালিয়ে দিয়েছিল। মূলত ১৮১২ সালে ব্রিটেনের সাথে আমেরিকার আরেক দফা যুদ্ধ হয়, এই যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ওই সময়ের সবচাইতে দুর্ধর্ষ ব্রিটিশ নৌ-শক্তিকে মোকাবেলা করে। ঠিক সেই সময়, ফ্রান্সিস স্কট কি ছিলেন একটি ব্রিটিশ জাহাজে, যেখানে তিনি তার বন্দী এক বন্ধুকে মুক্ত করার জন্য আলোচনায় অংশ নিচ্ছিলেন। কিন্তু আলোচনার সময়েই ব্রিটিশ বাহিনী ম্যারিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট ম্যাকহেনরি দুর্গে হামলা চালানো শুরু করে, এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে কি সহ তাদের কাউকেই জাহাজ ত্যাগ করতে দেওয়া হয়নি। ফলে, ফ্রান্সিস স্কট কি ও তার বন্ধু জাহাজ থেকেই দেখতে থাকেন ব্রিটিশ নৌবাহিনী কীভাবে ফোর্ট ম্যাকহেনরি দুর্গে টানা বোমাবর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে।
একটি দীর্ঘ দিন এবং পুরো একটি রাত ধরে ব্রিটিশ গোলাবর্ষণ চলতে থাকে, আর ফ্রান্সিস স্কট কি বিশ্বাস করে বসেন যে আমেরিকান দুর্গ নিশ্চয়ই ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু পরদিন ভোরে, সূর্যের প্রথম আলোয় তিনি দেখেন—দুর্গের ওপর এখনো অক্ষতভাবে উড়ছে একটি বিশাল মার্কিন পতাকা, যাতে ছিল ১৫টি তারা ও ১৫টি লাল-সাদা ডোরা। তখনো তিনি ব্রিটিশ জাহাজেই অবস্থান করছিলেন।এবং সেই গর্ব, বিস্ময় এবং বিজয়ের অনুভব থেকেই তিনি রচনা করেন কবিতাটি; যা পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে পরিগণিত হয়। পতাকার সেই দৃশ্য হয়ে ওঠে মার্কিন জাতির স্বাধীনতা, প্রতিরোধ আর দৃঢ়তার চিরন্তন প্রতীক।
কবিতাটি পরে "দি অ্যানাক্রিওন্টিক সং" নামক একটি সুরে রূপান্তরিত হয়, যা ১৭০০-এর দশকের শেষ দিকে জন স্ট্যাফোর্ড স্মিথ রচনা করেছিলেন। এই সুরটি ছিল একটি অপেশাদার সংগীত ও গানের ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত, যাদের নাম ছিল অ্যানাক্রিওন্টিক সোসাইটি, যার নামকরণ করা হয়েছিল গ্রিক কবি অ্যানাক্রিওন এর নামে। কিছুদিনের মধ্যেই গানটি প্রকাশিত হয় বাল্টিমোর প্যাট্রিয়ট পত্রিকায়, এবং অল্প সময়েই তা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র দেশে "দ্য স্টার-স্প্যাংলড ব্যানার" নামে।
"দ্য স্টার-স্প্যাঙ্গল্ড ব্যানার" কবিতাটি প্রথমে ১৮৮৯ সালে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের সরকারিভাবে ব্যবহারের জন্য স্বীকৃতি দেয়। এরপর ১৯১৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন এটিকে সরকারি অনুষ্ঠানে বাজানোর অনুমোদন দেন। কিন্তু জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে এর পূর্ণ মর্যাদা পায় আরও পরে—১৯৩১ সালের ৩ মার্চ, যখন মার্কিন কংগ্রেস একটি অনুবন্ধ অনুমোদন করে এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভার তাতে স্বাক্ষর করেন। সেদিন থেকেই "দ্য স্টার-স্প্যাঙ্গল্ড ব্যানার" যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়।
এটি চারটি স্তবকে রচিত, তবে সাধারণত প্রথম স্তবকটিই জাতীয় সংগীত হিসেবে ব্যবহার করা হয়। প্রথম স্তবকটি এই রকম:
"ওহ! বলো তো,
তুমি কি দেখতে পাচ্ছো-প্রভাতের কোলে, সেই পতাকাটি,
যেটিকে আমরা গোধূলির শেষ রঙে গর্বভরে অভিবাদন জানিয়েছিলাম?
যার প্রশস্ত ডোরা আর দীপ্ত তারা—ভয়াবহ যুদ্ধের মাঝেও,
দুর্গপ্রাচীরের উপর দিয়ে;
বীরত্বের সাথে উড়ছিল অবিরাম।
আর সেই রকেটের রক্তিম আলো,
আকাশে বিস্ফোরিত বোমাগুলো,
পুরো রাত জুড়ে প্রমাণ দিয়েছিল-আমাদের পতাকাটি তখনো অক্ষত আছে।
অহ! বলো তো,
আজও কি সেই তারামণ্ডিত পতাকাটি উড়ছে
এই স্বাধীন ভূমির আকাশে-বীরদের ঘরে?"
এটিকে যদি লাইন ধরে ভেঙে দিই, তখন এমন অনেক শব্দ ও বাক্যাংশের মানে স্পষ্ট হয়-যা সাধারণত আমরা গানটি বারবার গাইলেও বুঝে উঠতে পারি না। লাইনগুলি একটু ভেঙ্গে বোঝার চেষ্টা করি-
(১)
"ওহ! বলো তো, তুমি কি দেখতে পাচ্ছো-প্রভাতের কোলে, সেই পতাকাটি, যেটিকে আমরা গোধূলির শেষ রঙে গর্বভরে অভিবাদন জানিয়েছিলাম?"-
এই পঙ্ক্তি বোঝাতে চায়-ফোর্ট ম্যাকহেনরি দুর্গে আমেরিকান পতাকাটি এখনো উড়ছে কি না। যুদ্ধের সময়, যদি পতাকাটি না দেখা যেত, তাহলে বোঝা যেত আমেরিকানরা হেরে গেছে। কিন্তু ফ্রান্সিস স্কট কি যুদ্ধের ১২ ঘণ্টা পর, সেই ভোরবেলা, দূর থেকে পতাকাটি দেখেন। তাঁর জন্য সেটি ছিল আশার প্রতীক।
(২)
"যার প্রশস্ত ডোরা আর দীপ্ত তারা—ভয়াবহ যুদ্ধের মাঝেও, দুর্গপ্রাচীরের উপর দিয়ে-বীরত্বের সাথে উড়ছিল অবিরাম"-
এখানে পতাকার দৃশ্য শুধু অস্তিত্ব নয়, সাহস, প্রতিরোধ ও আত্মবিশ্বাসের চিহ্ন হয়ে উঠেছে।
(৩)
"আর সেই রকেটের রক্তিম আলো, আকাশে বিস্ফোরিত বোমাগুলো, পুরো রাত জুড়ে প্রমাণ দিয়েছিল-আমাদের পতাকাটি তখনো অক্ষত আছে।"-
রাতের অন্ধকারে, কেবল বোমার আলোতেই মাঝে মাঝে পতাকা দেখা যেত। এবং সেই দৃষ্টিই ছিল -যুদ্ধের মধ্যে আশার একমাত্র চিহ্ন।
(৪)
"অহ! বলো তো,
আজও কি সেই তারামণ্ডিত পতাকাটি উড়ছে
এই স্বাধীন ভূমির আকাশে-বীরদের ঘরে?"-
এই চরণে ফ্রান্সিস স্কট কি আবারও প্রশ্ন করছেন—আমরা কি এখনও স্বাধীন? আমাদের সাহস কি এখনও অটুট? পতাকা সেই জবাবের প্রতীক।
এই স্তবকটির সারমর্ম সংক্ষেপে বলতে গেলে-একটি জাতির অস্তিত্ব, স্বাধীনতা এবং সাহসিকতার চূড়ান্ত নিদর্শন হলো পতাকা। যুদ্ধ চলাকালীন যখন সবকিছু অনিশ্চিত, তখন একটি পতাকা অন্ধকারে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে -যা হয়ে ওঠে আস্থা, চেতনা ও বিজয়ের আলো।
"দ্য স্টার-স্প্যাঙ্গল্ড ব্যানার" শুধু একটি গান নয়-এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় চেতনার প্রতীক। প্রতিটি আমেরিকান এটি অসংখ্যবার শুনেছে, প্রায়ই মুখস্থ বলতে পারে। কিন্তু এর পেছনের ইতিহাস, কাব্যিক গভীরতা, সুরের উৎস এবং রাজনৈতিক পথচলার গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একটি পতাকারও আছে রক্ত, আগুন, আত্মত্যাগ আর জয়ের স্মৃতি।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন