https://www.prothomalony.com/

13843

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৫ ০৮:২৯

প্রাণপাখি যেভাবে ছুরি ধরে টানে

মুহাম্মদ রফিক ইসলাম 

 

ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আচানক 

বিস্ময়ে দেখি শোয়ানো পশুটার চোখ

কী অবুঝ বিশ্বাসে সে অপলক তাকিয়ে থাকে 

পৃথিবীর দিকে

অথচ তার টানটান গলায় ছুরি বসিয়ে দিলেই

প্রাণপাখি উড়ে যাবে শূন্যে ফিরে

তবু ভয় নেই 

যেন তৃপ্তির ঢেকুর তোলে ভাষাহীন দৃষ্টিতে সে

বুঝাতে চাইছে, 'মনের পশুটা বধ করো আগে...'

 

ধামাইলের ভিতর বজ্রস্বপ্ন: ওসমানীর প্রতিচিত্র

মুহাম্মদ হাবীবুল্লাহ হেলালী

 

জলপদ্ম-মাটি এখন হাওরের আয়নায় মুখ ঢাকে

শালতরুর শেকড়ে লুকিয়ে পড়ে জাতির নিঃশব্দ বিগ্রহ

পীরের দরগাহ কিংবা ফেসবুক-নোটিফাই—

সেখানে ওসমানী কেবল চিরুনির নিচে গুম এক নাম

 

পোস্টারে লেখা-ভবিষ্যৎ বিক্রয়যোগ্য!

আলপথের শেষে বিলভাসা ধামাইলের ক্লান্ত ধ্বনি

শোলার টোপর প'রে তিনি নেমেছিলেন রক্তের মহাযাত্রায়

এখন হিজলছায়া নিঃসাড়, পলাশ আর ফোটে না

 

গুগলের স্ক্রলে ফেরে উত্তরহীন প্রশ্নচিহ্ন—

আর তাঁর চেতনায় এখনো ভাঙে এক বজ্রপ্রবাহ:

রাষ্ট্র মানে কেবল মানচিত্র নয়—

বরং এক বিদ্যুৎস্নাত দীর্ঘশ্বাস, যা প্রতিটি জনপদে 

বেজে ওঠে ধামাইল হয়ে...।

 

সবুজ চুম্বন

সাজু কবীর

 

দুধেল আকাশের কোলে আমার প্রফুল্ল পৃথিবী

সবুজাভ ঘ্রাণে প্রাণীত হয় স্বচ্ছ স্বপ্নের ঢিবি

সোনালু-পাখি লাফ দেয় প্রেম-পুঁইয়ের মাচায়

ঘাটে ঘাটে চারুপাঠ, লাল ফড়িং সবুজ পাতায়।

 

এখানে গুমসো গন্ধ নেই স্বপ্নপ্রেয়সীর চুলে

রুগ্ননীল বাতাসের দম বন্ধ হয়না মরানদীর কূলে

এখানে নীল কিংবা সিন্ধু সভ্যতা ভাটিয়ালি গায়

হিরন্ময় প্রীতির শুভ হাতছানি বৃক্ষের চাঁদোয়ায়।

 

এখানে ঘাসফুল গর্ভবতী হয় কৃষাণের পদছোঁয়ায়

নির্ভীক তৃণকান্তারে জয়ের স্বপ্নে ঘোড়া চরায়

সারি সারি তৃণদ্রূম বেড়ে ওঠে মানুষের কল্যাণে

জরাগ্রস্তদের মুক্তি হাঁটে, খাদ্য ফলে প্রাণপণে।

 

এ উন্মীলিত দিগন্ত তোমার ভালবাসার লীলা

সময়-সমুদ্রে  ভাসিয়েছি দাসত্বের ভেলা 

দশদিকে তুমি  আলোর মতন বেলা অবেলায়

সবুজ চুম্বনে চিরসবুজ আমি এ প্রীতির মেলায়।

 

তুমি ফিরে এসো বৃষ্টি হয়ে

জহিরুল হক বিদ্যুৎ

 

অতঃপর

এই একাকিত্ব যেন এক নীরব চিৎকার

শব্দহীন অথচ কর্ণভেদী,

সবাই আছে, তবু কোথাও কেউ নেই।

তুমি ফিরে এসো বৃষ্টি হয়ে,

ভিজিয়ে দাও তুমিহীনা এই শুকনো মনটাকে।

তোমার ফোঁটায় জেগে উঠুক পুরোনো গান

ভেসে যাক ভেতরের অস্থিরতা,

চুপচাপ ভিজুক সময়, চোখ, জানালা, সব কিছু।

তুমি ফিরে এসো বৃষ্টি হয়ে

কোনো এক বিকেলে হঠাৎ মেঘ ডেকে,

সুশীতল হাওয়ার স্পর্শ হয়ে।

নতুন করে বাঁচতে শেখাও,

এই ক্লান্ত হৃদয়ে

একটু শান্তির শব্দ হয়ে ঝরে যাও অঝোরে।

 

 

চিরকাল কর্তৃত্ববাদের শিকার নিরীহ প্রাণ

আ ই না ল  হ ক 


বারুদের গন্ধে সম্বিৎ ফিরে পেলে পৃথিবীর দরজায় 

দাঁড়িয়ে লেলিহান শিখায় দেখি প্রতিহিংসার আগুন-
রাজনৈতিক রোষানলের বায়বীয় বিষ বাষ্পে তাকিয়ে 
লোভ আর ক্ষমতার অপব্যবহার ছাড়া কিছুই দেখি না , যুদ্ধ কিসের সমাধান? কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার নীল নকশায় নিরীহ প্রাণ বিসর্জনের দৃশ্য দেখলে বুকের উপর এসে দাঁড়ায় দুঃখবোধের এক অসহায় পাহাড়। 

 

নৈবেদ্য ফিরিস্তি 

শাহজালাল সুজন 

 

আমি হারিয়েছি বহুবার ত্রীরত্ন দেবীর কাছে 

চেদিতে ধূপ জ্বালিয়ে প্রেমাস্পদে,

হৃদয় অঙ্কুরিত ফুলগুলো ছিঁড়েছি রুধির ধারায় 

শুনেনি বেদনার্ত আর্তচিৎকার।

 

খণ্ডিত শিরা উপশিরায় সলিতা পুড়িয়ে করেছি

নিক্ষিপ্ত আঁধারে আলোর মশাল,

শুধু দেবী সরস্বতী,লক্ষ্মীর আশির্বাদ বদন খানি 

কিন্তু পেয়েছি ভস্মিভূত অক্ষীরঞ্জক।

 

আজ উপাসনালয় হয়েছে ঝলসানো কৃষ্ণপাথর

যেখানে হামাগুড়ি খায় অব্যক্ত কথন,

জমিয়ে রাখা ভালোবাসা গুমোট ধূসর মলাটে 

হয়েছে ধূলোয় মলিন নৈবেদ্য ফিরিস্তি।

 

 

আমি আর নৈঃশব্দ্য

 মো. রবিন ইসলাম 

 

আমি আর নৈঃশব্দ্য—

চুপচাপ হই মুখোমুখি।

জাগে না কোন সুর, বাজে না কোন বাঁশি,

শুধু শূন্যতা বয়ে আনে বাতাস—

তাতে নেই শব্দ, নেই ছন্দ, নেই অনুরণন।

 

আমি আর নৈঃশব্দ্য—

এই ধূসর বিকেলে কেউ ফেরে না পিছনে,

কেউ রাখে না হাত, কেউ ডাকে না নামে।

সব শব্দ গেছে পলায়ন করে,

রয়ে গেছে শুধু এক অদৃশ্য স্তব্ধতা।

 

তবু দাঁড়িয়ে থাকি আমি—

নৈঃশব্দ্যের চোখে চোখ রেখে।

আমার ভিতরে তার আশ্রয়,

তার ভিতরে আমার অস্তিত্ব।

 

শুধু আমরা—

আমি আর নৈঃশব্দ্য।

 

খোঁজ 

আহাম্মদ উল্লাহ 

 

মৃত্যু হইল অথচ কেউ জানল না

কেহ আবিষ্কার করতে পারল নাই—মৃতকে।

সকলে ভাবিল জীবিত আছে।

কথা হয়-দেখা হয়- অনেক সময় আমরা পরস্পর পাশাপাশি থাকি। 

গাত্রে পৃথক গন্ধ নাই– পোকায় ধরে নি, আগুনে 

ভস্ম হয় নি-সে কফিনেও ঢুকে নি।

লোকদের কানাকানি -কোলাহল-তর্ক জুড়ল শেষে

সে মৃত হয় কী করিয়া।

মৃত বলিল- হৃদয়ের কাছে হৃদয় না পৌঁছাইলে 

মানুষ জীবিত থাকে কী করিয়া।

তারপর জনতার বিশ্বাস গাঢ় হইল–

জনতার মাঝেই নির্জনতা। মন সঙ্গে দেহের 

নির্জনতাই মৃত্যু। 

 

ছায়ার আত্মহত্যা 
বিচিত্র কুমার 

দুপুরবেলা গাছের নিচে দাঁড়ালে একসময় শরীর জুড়িয়ে যেত। গ্রামের মাঠে, শহরের রাস্তার ধারে, কারো টিনের ঘরের পাশে—ছায়া ছিল একান্ত বন্ধু। মানুষ ছায়াকে চোখে না দেখলেও হৃদয়ে টের পেত। ছায়া ছিল স্বস্তি, ছিল শান্তি।কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের চাওয়া-পাওয়া, বদলেছে শহরের রূপ। এখন ছায়ার জন্য মানুষ তাকিয়ে থাকে কিন্তু পায় না। গাছ নেই, জলাশয় নেই, খোলা জায়গা নেই। কংক্রিট আর গ্লাসের শহরে এখন ছায়া যেন এক বিলুপ্ত প্রাণী।

এই গল্প ছায়ার। তার অভিমানের। তার ক্লান্তির। তার আত্মহত্যার।

 

আমি ছায়া। সূর্যের আলো যতই জ্বলে ওঠে, আমি ততটাই ছড়িয়ে পড়ি—মানুষের পায়ের নিচে, গাছের ছায়ায়, প্রাচীরের গায়ে। আমি জন্মাই আলো থেকে, কিন্তু আমিই তাকে ভারসাম্য দিই। আমি আলোকে সহনীয় করি।

আমি আজ অনেক ক্লান্ত।

পৃথিবীর মানুষ এখন আমাকে আর চায় না। গাছগুলো কেটে ফেলে, পুকুরে মাটি ফেলে ভবন বানায়। ঘাসের মাঠে তুলে দেয় পিচঢালা রাস্তা। গরমে হাঁসফাঁস করলেও কেউ ভাবে না—আমি কোথায় গেলাম? আমি কেন হারিয়ে যাচ্ছি?

ঢাকার এক বস্তির পাশ দিয়ে একদিন আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম—তাপমাত্রা তখন ৪১ ডিগ্রি। একটা ছোট ছেলে রাস্তার পাশে কাঁদছে, তার পা জ্বলে গেছে উত্তপ্ত রাস্তার ছোঁয়ায়। তার মা এক হাত দিয়ে তাকে বুকে চেপে ধরেছে, অন্য হাতে একটা পুরনো ছাতা ধরে ছায়া বানানোর চেষ্টা করছে।

আমি ব্যর্থ বোধ করলাম। আমি তো ছিলাম একসময় এই শহরের প্রতিটি কোণে। আজ আমি নেই। কেউ আমাকে ডাকে না, খোঁজে না।

আমি ছায়া। আজ আমি আত্মহত্যা করতে যাচ্ছি।

সজল একজন সফল প্রকৌশলী। তার বাসা ঢাকার ব্যস্ত এক এলাকায়, যেখানে চারদিকে গ্লাসের সুউচ্চ ভবন। তার কাছে ছায়া মানে তেমন কিছু নয়। বরং গাছের ছায়া তার চোখে রোদ আটকানোর প্রতিবন্ধক।

 

একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে দেখে তাদের বাড়ির সামনে এক পুরনো গাছ কাটা হচ্ছে। সে খুশি হয়। স্ত্রী শম্পা একটু দুঃখ নিয়ে বলে, "গাছটা তো অনেক পুরনো, কত ছেলেমেয়ে ওর ছায়ায় খেলতো!"

সজল হেসে বলে, "গাছ দিয়ে কি হবে? আলো আসবে ঘরে। আধুনিক হতে গেলে জায়গা ছেড়ে দিতে হয়।"

কিন্তু সেই দুপুরে, সজলের ছেলের ঘরে পা রাখা যায় না। ছাদ পুড়ছে, দেয়াল ফুটছে, এসি চললেও ঘাম ঝরছে। ছোট্ট আদিত্য বারবার পানি খাচ্ছে, বারবার কাঁদছে। সজল কিছুটা অস্বস্তি বোধ করে—কিন্তু নিজেকে বোঝায়, "এ তো এখনকার স্বাভাবিক ব্যাপার। গ্লোবাল ওয়ার্মিং তো সবাইকেই ভোগাচ্ছে!"

ঠিক তখনই ছায়া নিজের আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়।

তারপরও কিছু মানুষ আছে, যারা চুপিচুপি ছায়াকে খোঁজে। ঢাকার বাইরে এক গ্রামের স্কুলে এক শিক্ষক প্রতিদিন ক্লাস শুরু করেন গাছের নিচে বসে। তিনি বলেন, "ছাত্ররা যেন প্রকৃতিকে ভালোবাসে। ছায়া যে নিছক ছায়া নয়, সেটা তারা যেন বোঝে।"

 

ছোট্ট আদিত্য একদিন একটি ছবি আঁকে—ছবিতে একটা গাছ, তার নিচে এক ছায়া বসে কাঁদছে। সে মাকে বলে, "মা, ছায়া কেন কাঁদে?"

শম্পা উত্তর দেয়, "কারণ আমরা ওকে হারিয়ে ফেলেছি।"

সেদিন থেকেই আদিত্য গাছ লাগানোর কথা বলতে শুরু করে। সে তার বাবাকে অনুরোধ করে অফিসে গিয়ে একটা প্রজেক্ট তৈরির কথা বলতে—যেখানে ভবনের ছাদে গাছ থাকবে, দেয়ালের পাশে ছায়াবান্ধব কাঠামো হবে।

সজল প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে রাস্তায় কয়েকজন অসুস্থ বৃদ্ধকে দেখে থমকে যায়। পাশে অ্যাম্বুলেন্স নেই, ছায়া নেই, বাতাস নেই।

সে ভেতরে এক ধরনের অপরাধবোধ অনুভব করে। সেই রাতেই ছেলেকে কথা দেয়—"আমরা ছায়াকে ফিরিয়ে আনবো।"

ছায়া তখনও পুরোপুরি মারা যায়নি। সে হালকা হয়ে গেছে, অদৃশ্য প্রায়। কিন্তু কিছু মানুষের ভালোবাসা তাকে আবার বাঁচার ইচ্ছা জাগিয়ে তোলে।

নতুন প্রকল্প শুরু হয়। শহরের স্কুলগুলোতে গাছ লাগানো বাধ্যতামূলক হয়। ছাদের উপরে বাগান বানানো শুরু হয়। অফিসপাড়ায় ছোট ছোট ছায়া ঘর তৈরি হয়।

 

ছায়া আবার হাঁটতে শুরু করে শহরের রাস্তায়। শিশুদের মাথার ওপর দিয়ে, বুড়োদের বেঞ্চের পাশে, তরুণদের ছায়াঘেরা আড্ডার মাঝে।

ছায়া আত্মহত্যা করেনি। কারণ কিছু মানুষ আবার তাকে ভালোবেসেছে। এই পৃথিবী যদি বাঁচাতে হয়, ছায়াকে ফিরিয়ে আনতেই হবে। আর ছায়া ফেরে না একদিনে—তাকে ফেরাতে লাগে সময়, যত্ন, ভালোবাসা।

এবার তুমি কী করবে? ছায়াকে বাঁচাবে তো?

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন