https://www.prothomalony.com/

13684

literature

সাহিত্য

‘আমাদের মেয়ে’ মালিহা মাহবুবের গল্প

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৫ ১০:৩৮

পলিমাটির দেশ থেকে দূর দেশে জন্ম বা বেড়ে ওঠা প্রজন্মের একজন মালিহা। বুকের ভেতর এক অজানা টান—নিজের শেকড়ের দিকে। দক্ষিণ এশীয় প্রবাসী জীবনে যেটা খুব চেনা অনুভূতি। সে অনুভবটা ধরা দেয় না সহজে। কখনো দূরে থাকে, কখনো বেদনায় জ্বলে ওঠে।
বাংলাদেশের শুশুয়া নামের গ্রামে  “আমাদের মেয়ে”— নামে ডাকা হয় তাকে। পুরো নাম মালিহা মাহবুব। মালিহা, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং আইন ও জননীতিতে দ্বৈত মেজর নিয়ে অধ্যয়ন করছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এ তরুণী।

মালিহার গল্পটা শুরু হয় প্রশ্ন থেকে: “আমি আসলে কোন পরিচয় ধারণ করি? আমার অবস্থানটিই বা কোথায়? আমেরিকায় এক পরিচয়ে বেড়ে উঠা। বাংলাদেশে গেলে বলে, “এই মেয়েটা আমেরিকার।” পরিচয়ের এ অবস্থান তাকে ঠেলে দেয় অন্য এক পথ খুঁজতে।
মালিহা ভাবছিলেন, বাংলাদেশের কোনো গ্রামে যাবেন, কিন্তু খালি হাতে নয়। প্রবাসী পরিবারে বড় হওয়া এক মেয়ের মনে ছিল শেকড়ের কাছে কিছু দিয়ে ফেরার তাগিদ। তার মনের সেই দান ছিল একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক উদ্যোগ—নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য, সচেতনতা এবং প্রাথমিক হাইজিন প্রোডাক্ট সরবরাহ। জায়গার নাম শুশুয়া —বাংলাদেশের এক নিভৃত গ্রাম, যেখানে হয়তো কোনো বিদেশি পা রাখেনি কোনদিন। কিন্তু এই গ্রামই ছিল তার পূর্বপুরুষদের বসবাসস্থল। এখানেই তার প্রপিতামহী (গ্রেট গ্র্যান্ড মাদার) জীবনের শেষ সময় কাটিয়েছেন।

মালিহা একজন বিশেষজ্ঞ বা ত্রাণদাতা হিসেবে শুশুয়া গ্রামে যাননি। গিয়েছেন একজন অস্থিত্বের উত্তরসূরী হিসেবে—যার নাকে তার মায়ের ছাপ, কণ্ঠে দাদীর সুর, আর হাতে খালার আদল।
“সবকিছু একসাথে বুঝে উঠতে পারিনি,” বলেন মালিহা। “কিন্তু একটি মুহূর্ত ছিল, যা সবকিছু থামিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছিল। প্রজেক্ট শেষে এক বৃদ্ধা এসে আমার হাত ধরে চুমু খেয়ে বললেন, ‘আমাদের মেয়ে।”
এই একটি শব্দ—“আমাদের”— মালিহার চিন্তাকে বদলে দেয়ার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠে।
“আমার আত্মীয়তা এই ভূমির সাথে জন্মসূত্রে না হলেও আমি এর দায় নিতে চেয়েছি,” বলেন মালিহা।
“সেবার আসল শক্তি আসে তখনই, যখন আপনি কিছু পাওয়ার আশা না করে শুধু নিজেকে উজাড় করে দেন। আমি চাইনি কেবল এসে ছবি তুলে চলে যেতে। আমি থাকতে চেয়েছি, যুক্ত হতে চেয়েছি, দায়িত্ব নিতে চেয়েছি।”

সুসুয়ার কাজ শেষ করে মালিহা আবারো যুক্ত হন হিউম্যান কনসার্ন ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে। ঈদের সময় রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে খাদ্য বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। তিনি বলেন—“সেবা মানে দান নয়। এটা একটা দায়। আপনি যখন কোনো জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু করেন, তখন আপনি তাদের সাথে এক সূতোয় বাঁধা পড়েন। আপনি তাদের কাছে জবাবদিহি করেন। এখানেই আপনার রূপান্তর ঘটে।”
“আমি বাংলায় কথা বলি, কিন্তু উচ্চারণে আমেরিকান টান,” বলেন মালিহা। “আমার মাতৃভাষা শেখা শুরু হয়েছে টিভি দেখে আর বাড়ির মানুষদের সাথে কথা বলেই। এটা আমার পরিচয়—আমি দুই ভূখণ্ডের। আর আমি সেটা নিয়ে গর্ব করি।”
“আমি যাদের বুকে চেপে বড় হয়েছি—আমার মা, দাদী, খালা—তাদের সবার না বলা গল্প বহন করে চলি।
আমার এই ছোট্ট উদ্যোগ—নারীর দুঃখ-কষ্টকে চিরন্তন করে রাখার বিরুদ্ধে আমার এক শান্ত প্রতিবাদ। আমি চাই খুশির গল্প, শান্তির গল্প লিখতে। এই উদ্যোগ তার সূচনা মাত্র।”

অবশেষে, মালিহার উপলব্ধি এমনটাই—“আমরা প্রবাসীরা অনেক সময় ভাবি, দেশের মাটিতে পা রাখলেই শেকড়ের সাথে সংযোগ মিলবে। কিন্তু সত্যি বলতে, সেই সংযোগ তৈরি হয় কাজের মাধ্যমে, প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে।
দেশে যাওয়ার মানে শুধু ছবি তোলা নয়, নিজেকে দায়িত্বশীল করা। তখনই আপনি নিজে সেই মাটির অংশ হয়ে ওঠেন।”

এই গল্প এখানেই থেমে যায় না। ব্রাউন গার্ল ম্যাগাজিনের তৃষা সাকুজা-ওয়ালিস এবং ইভা কালেক্টিভের মায়েশা এই উদ্যোগে অংশ নিচ্ছেন। তাঁরা এই স্বাস্থ্য ও খাদ্য কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছেন।
“আমরা কেবল খাদ্য দিচ্ছি না,” বলেন মায়েশা। “আমরা টেকসই সমাধানে বিনিয়োগ করছি—সেই সমাধানগুলো গড়ে তুলছে নিজস্ব জনগোষ্ঠী।”
মালিহার মতো মেয়ে আমাদের দেখিয়ে দেন। নিজের জায়গা কোথায় তা খুঁজে না পেয়েও কাজ শুরু করা যায়। বসে না থেকে কাজ শুরু করতে হয়। তখনই, সেই মাটি একদিন উত্তর দেয়। কোনো জাঁকজমক নয়, বরং এক জোড়া হাত, একটুকু দৃষ্টি, একটা ডাক—“আমাদের মেয়ে।” এভাবে কোনো এক দিন, অন্যদের দান করতে গিয়ে আমরা নিজেরাও কিছু ফিরে পাই। তখনই হয়তো—আমরা সত্যি ‘শেকড়ে ফেরত’ যাই। সম্পৃক্ত হই নিজের আত্মা ও অস্থিত্বের সাথে।
( বিখ্যাত 'ব্রাউন গার্ল ম্যাগাজিন' মালিহা মাহবুব'কে নিয়ে করা প্রতিবেদন অবলম্বনে) 
 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন