https://www.prothomalony.com/
13631
literature
আকুতি
সুবীর কাস্মীর পেরেরা
ফিরিয়ে নাও তোমাদের স্বাধীনতা!
এখন, স্বাধীনতায় শাখায় শিমুল-পলাশ গেছে ঝরে,
কোকিল নিয়েছে নির্বাসন কৃষকলীর দেশে,
পতাকায় নিয়েছে ঠাঁই ধর্ষকের কামুকতা,
শহীদ মিনারে ভাঙ্গনের উল্লাস
আর, দেশের ভিতরে দেশ!
ফিরিয়ে নাও তোমাদের স্বাধীনতা!
স্বাধীনতার অন্তরালে পরাধীনতার আস্তাবল;
ধর্ষিতার ছবি ভাসে খবরের পাতায়,
এক মুঠু অন্নের আশায় একাত্তর!
শিক্ষকের দিন কাটে ছাত্র আতঙ্কে,
রাজনীতির খোলা মঞ্চে সংস্কারের রক্ত,
ধর্ম উপাসনালয়ে চলে সুদের কারবার!
ফিরিয়ে নাও তোমাদের স্বাধীনতা!
ফিরিয়ে দাও একটি কণ্ঠ,
"এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।"
মানুষ বাদে আর যা কিছু
নাহিদ সরদার
অস্তি, মজ্জা, রক্তের সু-মিশ্রণে
বিন্দুটা এখন বড় হচ্ছে;
মা- নামক গাছটি থেকে
দুধজল শুষে যে অবয়ব পেয়েছে,
তাকে একটা মানুষ বলা যায়।
মনের এই গাঠনিক প্রারম্ভে
পাখির পাখনা পেলে,
বিন্দুটা-
দাঁত ও নখবিহীন
কিছু একটা হতে চাইত-
মানুষ বাদে আর যা কিছু।
হাওয়া
পলাশ দাস
এই এখনই বাজার থেকে ফিরলাম
তারপরই বৃষ্টি নামল
চারপাশ দেখছি ছুটছে নিভছে
যে যার মতো
কেউ কারো মুখ দেখে না
রাস্তাটা যতদূর দেখা যায়
আমাদের শহরে এখন পুরোনো বাড়ি ভাঙা হচ্ছে
আর কেটে ফেলছে পুরোনো গাছ
রাস্তাটা তেমনই আছে
শুধু দৃশ্যত বহরে বেড়েছে আর
হু হু করে ভেসে যাচ্ছে নতুন হাওয়া।
মুহূর্তের গায়ে কান পেতে শোনা
আহসানুল করিম
নিদ্রা আমার
এমন পুকুর
স্বপ্নে মাছেরা
এসে ঘাই মারে
গোল হয়ে ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে
আর বিছানার পাড় থেকে খসে পড়ে
পিরিচে ঢাকা পানির গ্লাস,
চশমা আর ল্যাম্প
শব্দে জেগে ওঠে সচকিত
পোষা বেড়াল আমার
আবদার করে মাছ না খেয়ে
ঘুমোবে না আর
খোদার স্বপ্নে নিজেকেও আমার
মাছ মনে হয়, ভাবি কোথায় সেই
মহাবেড়াল এসে খেয়ে যাক
কেননা আঁধারে নিজেকে হাতড়ালে
হাতে শুধু আঁইশ উইঠা আসে।
চার্বাক
বিশ্বজিৎ মণ্ডল
এইসব অপরুপ দহনের পর
থাকতে পারে না,বৈদেহির অনুষঙ্গ....
কখনো রুমালি রুটির গন্ধে সেজে উঠিনি অভিজাত
সানকি জীবন জুড়ে বেজে গেছি_ঠনঠন...
নিঃসঙ্গ কাকতাড়ুয়া
চারপাশের প্রতিবেশিরা আপেল-আঁকা গন্ধে
গেয়ে উঠে - প্রাক্তন কোরাস
ঠিক তখনই অনর্থক পাড়া তোলপাড় করে
কারা বাজিয়ে চলেছে,অযাচিত মাদল।
কিংবদন্তি বাদুর
দ্বীপ সরকার
এই যে ডালে ঝুলছে কিংবদন্তি বাদুর
এক অনিশ্চিত দোলনায় দুলছে প্রাচীন হাওয়া ধরে-
সোজা উবু হয়ে মাটির দিকে ঝুঁকে
আমি সেই বাদুরকে চিনি না
অথচ তোমরা বললে 'আমার খুব নিকটজন সে'
তোমাদের অভিযোগ-আমি বুঝিনি
আমার পিতামহ এক সময় বাদুর ছিলেন
সরকারি বৃক্ষের পাখি স্বভাবে ছিলেন তিনি
তিনি তো চাকুরি করতেন কর বিভাগে
কর বিভাগের বাদুর কোন রঙের হয়,জানি না
তিনি তো আর নেই-বহুকাল নেই
অথচ তোমরা বলো-আমি কি না বাদুর!
বিভক্ত দুপুর
বশির আহমেদ
আমার মাঝে একটি নির্ণীত সাগর আছে।
মন খারাপের দিনে জোয়ার বয়, মাঘী দুপুরের মতো
হেঁটে যায় মনান্তর ফুল!
আষাঢ়ী বৃষ্টিতে গাছের চুল ভিজে,
জ্যৈষ্ঠের রোদ যেন দুর্ধর্ষ ডাকাত! ধোঁয়াশায় আছি,
নচিকেতা সুরে বিভক্ত দুপুর!
বুনোবন ভরে গেছে অতিথি ফুলে,
এই বুঝি নিষিদ্ধ হলো ইউক্যালিপটাস, আহা কত দুঃখ পোষে বার্লিনে নিভে গেল এক নিষিদ্ধ জীবন!
তুমি
সৈয়দ মইন
তুমি হঠাৎ এসে দাঁড়িয়ে যাও
আমার প্রতিদিনের মাঝখানে
আকাশের মতো বিশাল নও তুমি
তবুও চোখে আটকে যাওয়া।
স্বপনের সেই দীর্ঘ করিডোরে
তোমার পায়ের শব্দ শুনে,
হৃদয়টা কেমন থেমে থেমে যায়
তবুও তা পরম পাওয়া।
সাগর কিনারা ধরে দু'জন হেঁটে চলি,
বাতাসে তোমার চুল আমার ঢাকে মুখ
শুনশান নীরবতাও তখন কথা বলে
না বলা কত কথা বলতে চাওয়া।
অধরা
মধুমিতা দত্ত
সোমনাথ রায় শ্রীরামপুর অঞ্চলের এক পুরনো স্কুলের নবনিযুক্ত শিক্ষক।ছোট শহরের ছিমছাম পরিবেশ-তার খুব পছন্দের জায়গা। চাকরির খবর পাওয়ার পর, মা বলেছিলেন, "নতুন জায়গা, একটা ভালো ঘর দেখে নিও। তাহলে আমরা গিয়েও থাকতে পারবো।"
মায়ের কথামতো সে স্কুলের হেডমাস্টারের সঙ্গে কথা বলে একটি পুরনো বাড়ি কিনে নিলো। এককালের জমিদার বাড়ির ধাঁচে তৈরি, কিন্তু এখন কিছুটা জরাজীর্ণ। সামনের বাগানে শিউলি, জবাফুল, আর একটা আমগাছ; ঘরের ভেতরে দুটো বড়ো ঘর, রান্নাঘর, একটা স্নানঘর আর পেছনের দিকে ছায়াঘেরা বারান্দা। আগের মালিক অনিক সেন কলকাতা চলে যাবেন বলে, কিছু পুরনো আসবাবপত্র সহ বাড়িটা বিক্রি করে দিয়েছেন। তার মধ্যে সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো জিনিস—একটা বিশাল কাঠের আলমারি। সব মিলিয়ে বাড়িটা নিছক ইট-কাঠের গড়া কোনো স্থাপনা নয়, বরং এক জীবন্ত সত্তা—যার প্রতিটি দেয়াল, করিডোর আর জানালার ফাঁকে জড়িয়ে আছে শতাব্দী পেরোনো কিছু না বলা গল্প আর অনুচ্চারিত রহস্য।
স্কুলে যোগ দেওয়ার আগের দিন সোমনাথ এসে পৌঁছালো। স্নান,খাওয়াদাওয়া সেরে নতুন কেনা পুরনো বাড়িটি একটু গোছাতে শুরু করল। বিশ্রাম নেওয়ার ইচ্ছে থাকলেও পুরনো বাড়ির ধুলো মাখা কোণগুলো যেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল।
সোমনাথ বড়সড় কাঠের আলমারিটা যখন টান দিয়ে সরালো, তখন যেন এক বন্ধ দরজার পেছনে লুকিয়ে থাকা সময় নিজেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সেই মুহূর্তেই বাইরে শুরু হলো এক অদ্ভুত হাওয়ার খেলা—যেন জমে থাকা কান্না, নিঃশব্দ অথচ ভারী।ঘরের আলোটা এক মুহূর্তের জন্য ম্লান হয়ে এল, সময় যেন থেমে গিয়ে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছিল।বাতাসটা যেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল—বহুদিন আগের অতৃপ্ত প্রেম, অথবা একটা অসমাপ্ত অপেক্ষা নিয়ে।
সোমনাথ অবাক হয়ে কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে রইলো। কিছুক্ষন পর আবার কাজে মন দিলো|। তাকিয়ে দেখলো দেয়ালের সঙ্গে লুকিয়ে আছে একটা পুরনো ডাকবাক্স। ধুলো-ময়লা জমে যাওয়া বাক্সটার মরচে ধরা তালা কোনোভাবে খুলতেই একটা হলদেটে খাম মাটিতে পড়ে গেল। কৌতূহলী হয়ে সেটি তুলে নিতেই টের পেল-চিঠিটা বেশ পুরনো, পাতাগুলো ভাঁজে ভাঁজে বিবর্ণ হয়ে গেছে।
সাবধানে খামটা খুলে ভেতরের কাগজ বের করতেই ধুলো উড়ে এলো, কিন্তু সোমনাথের চোখ তখন আটকে গেছে অচেনা হাতের লেখায়- খামের ওপরে লেখা – ঐশী......!
তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। এই নাম কার? আর কেনই বা এই চিঠি এমনভাবে এখানে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল? সোমনাথ কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না। খাম খুলতেই বেরিয়ে এল একটা বিবর্ণ, কাঁপা হাতে লেখা চিঠি। পাতার কোণ ছিঁড়ে গেছে, অস্পষ্ট কিছু কথা, তবে লেখা কিছুটা পড়া যায়—
"ঐশী! তোমার অপেক্ষায় আমি প্রতিটি দিন, প্রতিটি প্রহর গুনে যাচ্ছি। জানি না,এই চিঠি আদৌ তোমার হাতে পৌঁছাবে কি না।তবু লিখছি, কারণ কিছু অনুভূতি শব্দের আশ্রয় চায়—না বলা কথাগুলো বুকের ভেতর পাথর হয়ে চেপে বসেছে। বিশ্বাস করো, যদি কখনো এই বাড়ির দেয়াল তোমার মনের কথা শুনতে পারে,তবে আমার ভালোবাসাও ঠিক তোমার কাছে পৌঁছে যাবে... সময়ের স্রোত পেরিয়ে, দূরত্বের সব বাধা ভেঙে..."
সোমনাথ চিঠিটা পড়তে পড়তে থমকে গেল। কে এই লেখক, কে ঐশী? কী হয়েছিল তাদের মধ্যে? যাকে এই চিঠি লেখা হয়েছিল,সে কি কখনো চিঠিটা পেয়েছিল কিংবা ফিরে এসেছিল? তার মনে ভেসে উঠল এক মলিন, একাকী পুরুষের মুখ—যার অপেক্ষা হয়তো কোনোদিনই শেষ হয়নি।
সোমনাথ আবার পড়তে শুরু করলো......
"ঐশী, যে সন্ধ্যেটায় তুমি চলে গেলে, সেদিন আমি তোমাকে থামাতে চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। হয়তো আমার অহংকার, হয়তো ভয় অথবা দুটোই। কিন্তু সত্যিটা হলো, আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম, আজও ভালোবাসি। যদি কোনোদিন ফিরে আসো, সেই আশায় এই চিঠি। আমি তোমার অপেক্ষায় থাকব..."
বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্রিয়মান হয়ে আসছে, আর সোমনাথের মনে অজানা এক রহস্য ক্রমশ দানা বাঁধছে; বাতাসে ভেসে এল অচেনা সুর, যেন শতাব্দীর প্রাচীন প্রতিধ্বনি, দেয়ালের প্রতিটি ইট, ধুলো জমা প্রতিটি কোণ কোনো অজানা কাহিনি বলার অপেক্ষায়! সব কিছু যেন এক'ই ভাষায় কথা বলছে—যে ভাষার মধ্যে শূন্যতা আর পূর্ণতা, আনন্দ আর বেদনার অবিচ্ছেদ্য মিশেল।
ঠিক তখনই দরজার দিকে চোখ যেতেই সে দেখে, এক বৃদ্ধা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন বাড়িটির দিকে। তাঁর চোখের গভীরে লুকিয়ে আছে এক অজানা অতীতের ছায়া, যেন কোনো কিছু খুঁজে ফিরছেন বহু বছর ধরে।
সোমনাথ ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে তাঁর সামনে চিঠিটা তুলে ধরে প্রশ্ন করলো ,"আপনার নাম কি ঐশী?"
বৃদ্ধার চোখে জল চিকচিক করে উঠল। হাতে ধরা চিঠিটার দিকে একবার তাকিয়ে তিনি কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বললেন—"অনিরুদ্ধ।" এত বছর পরও তুমি আমার অপেক্ষায়? আমি ফিরে এসেছিলাম কিন্তু তখন আর কেউ ছিল না।"
সন্ধ্যার ম্রিয়মান আলোয় বাড়ির ছায়া দীর্ঘ হয়ে এলো।বাতাসে এক নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাস মিশে গেল এক হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার, এক অপূর্ণ অপেক্ষার প্রতিধ্বনি।
সোমনাথ দাঁড়িয়ে থাকল নিশ্চল হয়ে, হাতে ধরা চিঠিটা কাঁপছে যেন তার বুকের মাঝখানে। পুরনো দেয়ালের ফাঁক গলে, ধুলোমাখা বাতাসে ভেসে এল এক হারিয়ে যাওয়া অপেক্ষার দীর্ঘশ্বাস, যা এখনো এই বাড়ির দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে - ঐশী..ঐশী...!
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন