https://www.prothomalony.com/

13575

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য

প্রকাশ: ২৮ মে ২০২৫ ০৭:০৬

তুমি ঘুমাও নীরবে

কাজী জহিরুল ইসলাম 

 

দু'পায়ের গোড়ালিতে প্রাণপণ চেপে রাখে পাথুরে বার্লিন।

এখানে শরৎ আসে বুঝি? হের্বস্ট পড়ে আছে, পাতার হরিণ,

 

চোখে ইছামতি, কাগেশ্বরী, শরতের শুভ্র কাশ,

মুছে গেল?

চুলের চমক ছুঁয়ে ছুঁয়ে হেঁটে যায় মন্থর আকাশ।

 

তবু প্রতিবাদ, টানে না, না, একদম না বলছি, 

হাতে হাতে ওড়ে রোদের বোতল, দুজনই টলছি।

 

যমুনা তোলেনি ঢেউ হ্যাভেলের বুকে একবারও,

এতোটা তরঙ্গহীন, এতোটা! কী করে পারো?

 

কারো জন্ম কী করে আজন্ম পাপ হতে পারে বলো?

স্থির হিমালয় মেঘের সঙ্গমে হয়নি কী কিছুটা চঞ্চলও?

 

কেন তুমি এতোটা নীরব, স্থির, থেকে গেলে অনাদি-অনড়

বার্লিনের বিছানা আপন, দোহারপাড়ার মাটি রয়ে গেল পর?

 

অক্ষরের কারুশিল্পী তুমি ঘুমাও নীরবে, 

কেউ আর জাগাবে না কোনোদিন এই ঘুম থেকে, 

তুলবে না দূরের স্বদেশ ডেকে ডেকে,

 

শুধু জেনে রাখো জুনের উত্তপ্ত দিনে লাল কৃষ্ণচূড়া এসে

তোমার শিয়রে বসে হাওয়া দেবে স্বার্থহীন ভালোবেসে।

 

 

 

কোন স্বর্গে

কাকন রেজা 

 

কোন সে দেশে জানের চেয়েও মালের বেশি মূল্য

কোন সে দেশ, হীরক রাজার দেশের সাথে তুল্য 

কাটবে জবান বললে কথা, কোন সে দেশ বলো 

কাটার আগে সুশীল ভাষণ আছে এমন খলও

ত্রাসের শহর, লাশের বহর রয়েছে কোথায় ঢাকা 

কোন শহরে সকল কাগজ তোষামুদিতে মাখা

কোন দেশেতে সুশীল মুখ ভাঁড়ের মুখোশ আঁটা 

শহরগুলোর কিশোর তরুণ বুকে বুলেট সাঁটা 

বিদ্যালয়ে পড়তে দিয়ে লাশ খুঁজতে হয় মর্গে

বলুন দেখি কোন সে দেশ, বাস করি কোন স্বর্গে

 

 

 

কাফের

‎সুশান্ত হালদার 

‎যে জানার শুধু সে-ই জানুক 

‎মৃত্যুর পরেও জেগে থাকে মানুষ 

‎আমি ত সেই কাফের

‎রক্ত নয়, ভিক্ষা চেয়েছি প্রেম ; ভালোবেসে

‎যে জানার শুধু সে-ই জানুক 

‎কারবালা শেষ হলেও জেগে থাকে মহররম; 

খণ্ডিত পাঁজরে 

‎মানুষ যদি বলো, খোদার কসম

‎নগ্নতায় দেখি নিজেকে আগে 

‎যে জানার শুধু সে-ই জানুক 

‎বিচ্ছেদে প্রেম কতটা বিষাদ বিধুর!  

 

 

শৃঙ্খলহীন কবি 

শামীম আহমদ 

 

এক পৃথিবী তৃষ্ণা নিয়ে চলে গেলে 

তোমার রাতের কান্না গুলো জমা হয়েছে যপমাল্যে

 

পরিযায়ী পাখির দীর্ঘশ্বাস কেবল বাতাসই জানে 

যদি জমানো যেতো হয়তো তার ঘূর্ণিবলয়ে পৃথিবী 

নুয়ে পড়তো সেজদায় ...

 

মূহুর্মূহু উত্তাল ধমনীপ্রবাহ 

তোমার ক্রান্তিবলয় জুড়ে শুধু একঝাঁক কুয়াশার 

শিশিরের আলপনা ,যেখানে সময়ের বেষ্টনীতে 

শৃঙ্খলহীন এক কবি দাউদ হায়দার ।

 

 

মৃত্য দেহগুলো  

স্বপন শর্মা

 

মৃত‍্য দেহগুলো...

অতৃপ্ত সাধনা নিয়ে উঠে আসে চিতায়

অপ্রত্যাশিত ভাবে প্রবেশ করে কবরে

প্রচণ্ড আঁকুতি ছিল বাঁচবার

প্রবল সংস্কৃতির লাল টিপ পরে 

সেজেছিল দেহগুলো।

 

মৃত্য দেহগুলোর...

সলিল সমাধি ঘটে জলে

আগুন জ্বালানো চিতায়

অথবা বিলীন ঘটে পরিত্যক্ত কবরে।

মৃত্য দেহগুলোর...

সমাজ যদি চায়, হবে শেষকৃত্য

সমাজ যদি চায় হবে দাফন

সমাজ যদি চায়, দেহ জ্বলবে

যদি কপালে থাকে আগুন...

স্পষ্ট ছিল আগুনের ধর্ম, পুড়ে পুড়ে ভষ্ম করা।

 

 

 

অস্থির বার্তা 

ইশতিয়াক রুপু 

 

উত্তর গোলার্ধের বিশ্ব খ্যাত সবুজ বনের সীমানায় স্বচ্ছ 

জলের লেইক।যা জর্জ লেইক নামে পরিচিত।

 

বেষ্টনির শান্ত পরিবেশের ব‍্যাতিক্রমী সৌন্দর্যের মোহনায়,

আগামীর স্বপ্নের পশরা প্রচুর। 

পাকা চার লেইনের বুক চিরে কালো আর 

সাদা রঙের চলমান ডট, 

ঝরা পাতায় বিচ্ছিন্ন লতাগুল্মের আংশিক ঢাকা। 

বাকি পুরো অংশ যেনো কবিতার যুক্তাক্ষরের 

পুরো চারটি লাইন!

শীতের শীতল স্পর্শে চারপাশে নিরন্তর 

নীরবতা আর নিঃশব্দের নির্জনতা।

 

এতো আয়োজন আর আগমনের উষ্ণ 

বার্তা কখনোই আমাকে উড়ে যেতে 

আটকাতে পারেনি। তা হউক সময়কালে 

কিম্বা নিকট অতীতে।

 

বোশেখের দিগন্ত জুড়ে সোনালি ফসলের মনকাড়া 

ফ্রেমে কামিন আর লক্ষীবধুর হাসি হাসি মুখ।

কাঁটা ধানের বুনো ঘ্রানে মাতোয়ারা আমি একজন 

কৃষক প্রজন্ম।

সারি সারি লাল ইটের গাঁথুনির ভিতে

চৌকা ডিজাইনে সাজানো মার্কিন দলিলের গৃহে আবদ্ধ।এক বঙ্গ সন্তানের আকুতি,

ফিরে আসে বার বার।বহু বার। অবিরত।

উত্তর তীর ধরে বয়ে যাওয়া শান্ত সুরমা নদী,

বৈশাখের ফসল তোলার অপরূপ আয়োজনে 

অংশ নেওয়ার অনন্ত বাসনায়।

 

নারী 

রওশন হক 

 

আমরাই অন্বেষণকারী, স্বপ্নদর্শী, শিখা

নক্ষত্রের জন্ম, তবুও নামের ভারে ভারাক্রান্ত।

আমরা যুগ যুগ ধরে আগুন বহন করি,

ধূলিকণা থেকে নির্মাণ করি, আশা এবং বিশ্বাসে।

 

আমরা উঠি এবং আমরা হতাশ হই, 

আমরা ক্ষতবিক্ষত হই এবং আমরা মেরামত করি

নতুন মানচিত্র আঁকি যেখানে শুরু শেষ হবে না।

 

সংগ্রামে, দয়ায়, প্রশ্নে আমরা খুঁজে পাই,

একটি আয়না, একটি মুহূর্ত, আমাদের ধরনের আত্মা।

আমরা আমাদের হাত দিয়ে গঠন করি, আমরা 

আমাদের অশ্রু দিয়ে কথা বলি,

আমরা নীরবতার মধ্য দিয়ে গান করি, আমরা 

আমাদের ভয়ের সাথে লড়াই করি।

 

ছায়া ছাড়া কোন সাধু নেই, 

অনুগ্রহ ছাড়া কোন পাপ নেই,

গতিতে কেবল গল্প, একটি বিশাল মানব জাতি।

 

তাই করুণা, বিস্ময় এবং যত্নের সাথে চলুন -

আমরা যা কিছু তা হল একটি নিঃশ্বাস; যা আমরা 

ভাগ করে নিই।

 

মতপ্রকাশ ও ধর্মীয় আবেগের দ্বন্দ্বে কবি দাউদ হায়দার

এইচ বি রিতা

 

স্বাধীন ভাবনা ও মতপ্রকাশের অধিকার এবং ধর্মীয় অনুভূতি -এই দুটি সামাজিক শক্তি প্রায়ই সংঘর্ষে আসে, বিশেষ করে কোনো মত, লেখালেখি বা শিল্প যখন ধর্মীয় বিশ্বাস-আচার বা ঈশ্বর সম্পর্কে প্রশ্ন তোলে। একজন লেখকের অধিকার আছে নিজের চিন্তা, বিশ্বাস, মত বা অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার—এমনকি তা যদি প্রচলিত সামাজিক বা ধর্মীয় ধ্যানধারণার বিরুদ্ধেও হয়। তবে, স্বীকার করতেই হবে, ধর্ম ব্যক্তিমানুষের গভীর আত্মিক বিশ্বাসের অংশ, যা সমাজে পবিত্র ও অখণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। কেউ তা নিয়ে প্রশ্ন তুললে তা ব্যক্তিগত অপমান বা সামাজিক আক্রমণ হিসেবেই অনুভূত হয়। তাছাড়া, ধর্ম মানুষের বিশ্বাস, আবেগ ও সংস্কারের ওপর গড়ে ওঠে, যা অনেকের কাছে অটল সত্য। অন‍্যদিকে, স্বাধীন মতপ্রকাশ প্রায়ই যুক্তি, বিশ্লেষণ বা বিদ্রোহী দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে গঠিত হয়, যা আবেগপ্রবণ ধর্মীয় মানসিকতাকে আঘাত করে।

কবি দাউদ হায়দারের কবিতায় সরাসরি ভাষা ও ভাব প্রকাশের প্রবণতা ছিল। তিনি বিমূর্ততা বা আড়াল করে কথা বলতেন না। ধর্ম, যৌনতা, রাষ্ট্র ও সামাজিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন সাহসিকতার সঙ্গে। ন্যায়বিচার, ব্যক্তি স্বাধীনতা, ধর্মান্ধতা ও সামাজিক ভণ্ডামি তাঁর কবিতায় ঘুরেফিরে এসেছে। কবিতাকে তিনি কেবল সৌন্দর্য নয়, বরং অস্ত্র হিসেবে দেখেছেন—বৈষম্য, নিপীড়ন, মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে লড়ার মাধ্যম।তবে, তাঁর কবিতায় ঈশ্বরের অস্তিত্ব, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিক্রিয়া ছিল। পাঠক ও ধর্মানুরাগীরা সেটিকে ঈশ্বরনিন্দা হিসেবে দেখেছেন, এবং দেখাটাই স্বাভাবিক। কারণ এতে ধর্মীয় আবেগে আঘাত লেগেছে।  ১৯৭৩ সালে তাঁর প্রকাশিত একটি কবিতায় ধর্ম, নবী ও ঈশ্বর নিয়ে তীব্র ব্যঙ্গ ও প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। এতে অনেক পাঠক ও ধর্মানুরাগী আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং একে "ধর্ম অবমাননা" হিসেবে দেখেন। ফলে, তাঁর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সংঘর্ষিত হয়, যার পরিণতি ছিল নির্বাসন।

তাঁর এই স্বাধীন মত প্রকাশের বিষয়টি যুক্তিযুক্ত ছিল কি না, তা নির্ভর করে দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। যুক্তির পক্ষে বিবেচনা হতে পারে, কবি তাঁর চিন্তা ও বিশ্বাসকে সাহসের সঙ্গে প্রকাশ করেছেন, যা একজন লেখকের মৌলিক অধিকার এবং কোনো ধর্ম বা বিশ্বাস প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়—এমন মুক্তমনাদের মতে, তাঁর মতপ্রকাশকে রক্ষা করা উচিত ছিল। রাষ্ট্র যদি সত্যিই ধর্মনিরপেক্ষ হতো, তবে লেখকের নিরাপত্তা দিত, নির্বাসনে পাঠাত না। 

যুক্তির বিপক্ষে বিবেচনা করলে, এটি ধর্মীয় আবেগে আঘাত হানে। বাংলাদেশ মুসলিম সংখ‍্যাঘরিষ্ট দেশ; এই প্রেক্ষাপটে ধর্ম খুব সংবেদনশীল একটি বিষয়। নবী বা ঈশ্বর সম্পর্কে অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার সহ্যসীমার বাইরে। ধর্মবিশ্বাসকে অবমাননা না করেও সমালোচনা বা প্রশ্ন তোলা সম্ভব, কিন্তু দাউদ হায়দারের ভাষা অনেকের কাছে অসম্মানজনক। 

মতপ্রকাশের অধিকার তখনই পূর্ণতা পায় যখন সমাজে সহনশীলতা এবং আলোচনার পরিবেশ থাকে। ধর্মীয় বিষয় নিয়ে মতপ্রকাশ করলে সেই মত ব্যক্তির অধিকার হিসেবেই থাকবে, না কি তা অন্যের অনুভূতিতে আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে—এই দ্বন্দ্বই সংঘর্ষের মূল। এই ভারসাম্য না থাকলে মতপ্রকাশ কখনও নির্বাসন, হুমকি, বা সহিংস প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়ে, যা ঘটেছে দাউদ হায়দারের ক্ষেত্রে। 

 "কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নায় কালো বন্যায়" ১৯৭৪ সালের ২৪ই ফেব্রুয়ারি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় মুদ্রিত হলে তার বিরূদ্ধে আদালতে জনসাধারণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের জন্য মামলা হয়। এ মামলার সূত্রে তিনি ১১ই মার্চ ১৯৭৪ তারিখে গ্রেফতার হন। এরপর, সরকারের সিদ্ধান্তে ১৯৭৪ সালে তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। প্রথমে কলকাতা তারপর বাকি জীবন তার জার্মানের বার্নিংয়ে কাটে। ৭৩ বছর বয়সে তিনি জার্মানির বার্লিনে অবস্থিত একটি বয়স্ক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত‍্যুবরণ করেন।

"কালো সুর্য্যের কালো জ্যোত্স্নায় কালো বন্যায়" কবিতায় দাউদ হায়দার ঈশ্বর, নবী এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি তীব্র সমালোচনা করেছেন, যা তৎকালীন সমাজে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করার মতই। তিনি ধর্মীয় নেতাদের ভণ্ড, রাজনীতিক এবং মিথ্যুক হিসেবে চিত্রিত করেছেন, যা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে। তিনি যখন কবিতাটি লিখেন, সে সময়কার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আমার ধারণা নেই, তবে কবির উদ্দেশ্য নিশ্চয় ছিল সমাজের কিছু প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করা, যা একটি মুক্তচিন্তার সমাজে স্বাভাবিক। কবি তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতি এবং সমাজের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করেছেন। কিন্তু, তাঁর কবিতায় বেশ কিছু বিতর্কিত পঙতি রয়েছে, যা একজন ধর্মবিশ্বাসী হিসেবে ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করে বলতে পারি যে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অনুভূতির মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা উচিত। মত প্রকাশের স্বাধীনতা কারো মৌলিক অধিকার হলেও, তা ব্যবহার করার সময় সমাজের বিভিন্ন স্তরের অনুভূতির প্রতি একজন কবির যথেষ্ট সংবেদনশীলতা থাকা উচিত। 

বিশ্বের ইতিহাসে বহু কবি ও লেখক তাদের লেখালেখির জন্য নির্বাসিত হয়েছেন। তারা রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক বিষয়ে লেখার কারণে শাসকগোষ্ঠীর রোষানল কিংবা সাধারণ জনগনের সমালোচনায় পড়েছেন। রুশ কবি ও প্রাবন্ধিক জোসেফ ব্রডস্কিকে সোভিয়েত ইউনিয়নে "সামাজিক পরজীবী" হিসেবে অভিযুক্ত হয়ে ১৯৬৪ সালে ব্রডস্কিকে শ্রমশিবিরে পাঠানো হয়। তাঁর কবিতা "অ্যান্টি-সোভিয়েত" হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে নির্বাসিত হন ১৯৭২ সালে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন। 

নাজি জার্মানির সময়ে ইহুদি কবি পল সেলানকেও রোমানিয়া থেকে পালিয়ে ভিয়েনা হয়ে প্যারিসে আশ্রয় নিতে হয়। চীনা লেখক মা জিয়ান তার উপন্যাস 'চাইনা ড্রিম' –এ চীনের দমননীতির সমালোচনা করায় চীন থেকে নির্বাসিত হন এবং যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেন। 

প্রাচীন রোমান কবি ওভিড ৮ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আউগুস্তুস এর আদেশে রোম থেকে নির্বাসিত হন এবং তাকে রোমানিয়ার কনস্টান্টা শহরে (তৎকালীন টোমিস) পাঠানো হয়। নির্বাসনের কারণ সম্পর্কে ওভিড নিজে বলেছেন, এটি ছিল "একটি কবিতা ও একটি ভুল"। "কবিতা" বলতে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন তার রচিত Ars Amatoria (প্রেমের শিল্প), যা সম্রাটের নৈতিক সংস্কার প্রচেষ্টার পরিপন্থী ছিল।

এই দীর্ঘ ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই—কখনো একজন কবির কলম প্রশ্ন তোলে ধর্মীয় কর্তৃত্বের, কখনো একজন ঔপন্যাসিক বা চিন্তাবিদের ভাষা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের হাতিয়ার। একদিকে ব্যক্তি স্বাধীনতা, অন্যদিকে ধর্মীয় বা সমাজের সম্মিলিত আবেগ—এই দুইয়ের মাঝে যে সংকট জন্ম নেয়, তা শুধু দাউদ হায়দার বা ওভিডের জীবনে নয়, বরং বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে বারবার ফিরে এসেছে। তবে একটি সমাজ কতটা প্রগতিশীল বা মানবিক, তা নির্ধারিত হয় সেই সমাজ কীভাবে ভিন্ন মত, আপত্তিকর বক্তব্য কিংবা বিতর্কিত চিন্তাকে গ্রহণ বা মোকাবিলা করে তার মাধ্যমে।

দাউদ হায়দার সাহস করে নিজের বিশ্বাস ও প্রতিবাদকে উচ্চারণ করেছিলেন—যার মূল্য তাঁকে নির্বাসনের মধ্য দিয়ে দিতে হয়েছে। 

এইসব উদাহরণ থেকে আমাদের শেখার আছে অনেক কিছু—বিশেষ করে, সহনশীলতা, সংলাপ, ও মতপার্থক্যকে সম্মান করার চর্চা গড়ে তোলা। মতপ্রকাশ ও বিশ্বাস—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নেওয়া আমাদের সামষ্টিক মানবিক উন্নতির জন্য জরুরি। সাহিত্যের ইতিহাস এই সত্যই প্রমাণ করে—যারা কলম ধরেন, তারা শুধু সৌন্দর্যের জন্য লেখেন না, লেখেন পরিবর্তনের জন্যও।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন