https://www.prothomalony.com/
13469
literature
অপ্রাপ্তি স্বীকার
মিঠুন দত্ত
সবার কাছে ঠিকঠাক
আমার কাছে কখনো নুন বেশি,
কখনো তেল, কখনো হলুদ মরিচ,
কখনো মসলার ঝাঁঝালো ঝাঁঝ...
কম বেশি; যা ইচ্ছা তাই।
পরিমাপও কেউ বোঝেনা
আমার উদরের।
মরার উদর কতদিন ধরে ভরে না;
অনেকদিন হয়
মা
আমার
রাঁধে না...!
আমাদের মা
রফিকুল নাজিম
আমাদের মা একজন সিরিয়াল কিলার
প্রতিনিয়ত তিনি তাঁর ইচ্ছেকে খুন করছেন
মাঝারি সাইজের স্বপ্নের টুটি চেপে ধরে খুন করছেন
বড় বড় চাওয়াকে তিনি দেদারসে কেটে
কুঁচিকুঁচি করছেন
আমাদের মা একজন নৃশংস খুনি
তিনি হাসিমুখে খুন করছেন তাঁর চারু ইচ্ছেগুলোকে,
তারপরও আমাদের মায়ের মধ্যে কোনো অনুতাপ নেই
কোনো অপরাধবোধ নেই!
মাটির ব্যাংকে সঞ্চয় করা একটা একটা আদুলির মত
আমাদের মা আমাদের জন্য সঞ্চয় করেন স্বপ্ন
আমাদের মা নির্মাণ করেন সমৃদ্ধ এক ইন্দ্রপুরী
যেখানে তরতাজা সুখগুলো লুটোপুটি খায়;
এবং
আমাদের মা- নির্লজ্জের মত ফুলের হাসি হাসেন!
মা : ঈশ্বর পর্ব
হৃদয় পান্ডে
মায়ের গল্প মানে স্রষ্টার স্মৃতিকথা।
২.
শেষমেষ, যত দেবী, যত ঈশ্বর,
সব পেরিয়ে— তোমার দৃষ্টির আলোকেই
আমি পেয়েছি আমার আরাধ্যকে।
৩.
তুমি যখন হাঁটতে,
কানের দুলে টুনটান শব্দ বাজত,
এ শব্দ ছিল আমার শৈশবের প্রার্থনা
৪.
পূজোর সকালে খই আর চিনি,
মায়ের সিঁথি লাল, আমার চোখে দেবী।
৫.
তিন শত ছেঁড়া দিন, রক্তে ভেজা প্রতীক্ষা—
তবেই প্রসব হয় ভবিষ্যৎ।
৬.
তোমার শরীরে আঁকা ছিল
আমার যাবতীয় গন্তব্য।
৭.
"এসো,"
ডেকে নেয় মা, বীজের ভিতর থেকে,
জন্মের গন্ধ ছড়িয়ে—
আকাশ থেকে পাতাল পর্যন্ত।
৮.
তোমার কোলে বসেই আমি চিনেছি—
সব দেবী, সব গীতার, সব পুরাণের মূল।
৯.
তুমি ক্ষয় হতে হতে অক্ষয় হয়ে গেলে,
আমাদের চোখে, চেতনায়, অস্তিত্বে।
১০.
তুমি যখন গান ধরতে,
ঘর ভরে যেত অদৃশ্য দীপ্তিতে।
মা
সারওয়াৎ জাবীন লুবনা
মাকে এখন পাই না ছুঁ'তে যখন তখন আর
চাদর বালিশ শাড়ির আঁচল কাঁথা মুড়ির পাড়।
পানের বাটা, জর্দা চেমন, চশমা খিলাল সব
তেমনি আছে মা-ই শুধু নেই হারিয়ে হলেন শব।
শাষণ, ধমক সবই এখন পেছন অতীত প্রাণ
আলনা জোড়া শাড়ির ভাঁজে শুধুই খুঁজি ঘ্রাণ।
বাগান জুড়ে গাছ লাগানো- দিতেন পানি রোজ
মা নেই তবু গাছের ফলে হচ্ছে রোজই ভোজ।
মাছ ওয়ালা রোজ এসে কয়- 'মা জননী কই?
উনার হাতের খাব্যর খেয়েই শেষ রোজাটা রই।'
আমবাগানে সজনে তলে মা যে আছেন বেঁচে
'জলদি ওঠো ভোর হলো যে'-কেউ বলে না যেচে।
বৃষ্টিছাদে জামের মুকুল জল এড়াতে ছাতা
জাম কুড়াতে থাকত সেথায় মায়ের আঁচল পাতা
পান চিবিয়ে চুনের হাতে স্পর্শ হোতো কত
সবই এখন মিলিয়ে সারা ফ্রেমের ছবি শত।
কেউ সাধে না ওই আমসত্ত্ব, আমের ঝুড়ি আঁচার
মা ছাড়া এই দুনিয়াতে কষ্ট খুবই বাঁচার।
মায়ের আঁচল
মিয়া এম আছকির
মা ছাড়া কি কেউ কখনও, থাকতে পারে ভালো
মা তো সবার আঁধার রাতের, পূর্ণিমার-ই আলো।
স্বপ্নের ভিড়ে কষ্ট ঢাকেন-বুকে পাথর চাপা দিয়ে
সন্তান একদিন সফল হবে জগৎ-খ্যাতি নিয়ে।
সন্তান লাভের সুখাচ্ছন্নে, মা যায় প্রহর গুনে
স্বপ্ন-আকাশ সাজায় মা যে, স্বপ্ন বুনে বুনে।
মাতৃ-গর্ভের মণিকোঠায় মানিক বেড়ে ওঠে
মাতৃত্বের স্বাদ মা'কে দিতে চাঁদ হয়ে সে ফোটে।
পূর্ণিমার চাঁদ দোল দিয়ে যায় মায়ের বুকের ভেতর
চাঁদখানা মুখ ঠাঁই দিতে মা'র জেগে ওঠে জঠর।
ধরা দেয় না কল্পনাতেও, কী অসীম সেই টান,
ভাঙা ঘরে, শূন্য হাঁড়িতেও মা তো রয় মহান।
অস্তিত্ব নিংড়ানো স্বর্গসুধা মায়ের স্তনে জমায়,
নাড়ির ধনকে বুকে টেনে প্রেমে–ভরে খাওয়ায়।
মায়ের মাখা পরশবলে সচল হয় চাঁদের প্রাণ,
জীবনভর জড়িয়ে থাকে তাঁর দোয়ার আঁচল–টান।
মায়ের পরশ
আব্দুস সাত্তার সুমন
মায়ের পরশ মিষ্টি ভীষণ-খুব যে ভালো লাগে,
মায়ের আঁচল বুকের ভেতর-অনুভূতি জাগে।
মায়ের ঘ্রাণ শীতল করে মনের ভিতর ব্যথা,
আদর মাখা হাতটি দিয়ে বুলায় যখন মাথা।
আব্বু আম্মু বলে ডাকে আঁকড়ে ধরে যখন,
মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে রাখে শান্তি পাই তখন।
পরশ দিয়ে আগলে রাখে পূর্ণ করে চাওয়া,
মা হলো স্বর্গ মনি বেহেস্ত থেকে পাওয়া।
মায়ের পরশ সবার সেরা তুলনা যে নাই,
মায়ের মত এই জগতে পরশ কোথায় পাই?
মা, তুমিই পৃথিবীর প্রথম আলোটা
এইচ বি রিতা
মা! ভীষণ অস্থির মনে ডাকছি তোমায়
তুমি ঘুমিয়ে পড়ো না, আজ একটুখানি জেগে থাকো-
বাকি দিনগুলো তো তোমার জেগে থাকারই গল্প-
যেখানে ভোরের আগেই খুলে যেত তোমার হাতের মুঠো,
তাপ ওঠতো চুলোর ধোঁয়ায়,
ছোটবেলার আমার স্কুল ব্যাগের ওজন,
জীবনের এক-একটা দুপুর
যেখানে তোমার নিজের নামটা কোথাও ছিল না।
তোমার শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে থাকত আমার
পেন্সিল কাটার, রঙিন কলম, আমার না বলা
গল্পের খাতা। তুমি বুঝে নিতে,
কোন শব্দটা আমার গলায় আটকে গেছে।
মনে হয়, তোমার হাতটাই ছিল আমার মুখের ভাষা।
তুমি বুঝতে, আমি কখন চুপিচুপি কেঁদে ফেলি,
বুঝতে, হুটহাট কেন হেসে খুন হই।
তুমি এমনই এক বিস্ময়—
যে নিজের নিঃশ্বাসটাকেও নিঃশব্দে ধার দেয়
সন্তানের দিকে, যার ভালোবাসা ছাপিয়ে যায়
দাবি ও হিসেবের বাইরে।
আজ মা দিবস।
সবাই আজ ফেসবুকে, ইনস্টাগ্রামে তোমার মতো
মায়েদের ছবি দেয়, ফুল দেয়, কবিতা লেখে।
আমিও লিখছি—
তোমার মুখটা মনে করে, তোমার পায়ের নিচের
পুরোনো ফাটলগুলোর কথা মনে করে
যেখানে আমি হোঁচট খাইনি কখনো,
কারণ তুমি আগেই দাঁড়িয়ে থাকতে—
আমার যন্ত্রণাগুলোকে আগলে রাখার জন্য।
জানো মা, এখনো যখন খুব ক্লান্ত হয়ে যাই,
খুব একা বোধ করি, তখন তোমার পুরোনো চাদরটা
গায়ে দিই।
তুমি পাশে থাকো না,
কিন্তু গন্ধটা এখনো রয়ে গেছে। এটাই তুমি—
একটা গন্ধ, একটা স্পর্শ, একটা আশ্রয়...
যেটা কোনো দিন পুরনো হয় না।
মা আমার পরশ পাথর
আসাদ সরকার
আমার মা আমার প্রথম স্কুল।আমার মা আমার প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মহা বিদ্যালয়। আমার মা আমার প্রথম শিক্ষক। আমার মা আমার আদর্শ, এক মাত্র অনুপ্রেরণা, আমার ইচ্ছা শক্তি আমার সাহস। মা শব্দটি শুনলে আমার হৃদয়ে একটি অনুভূতি সৃষ্টি হয় যা পৃথিবীর কোন যন্ত্রপাতি দিয়ে পরীক্ষা করলেও সেই অনুভূতি বোঝানো সম্ভব নয়। আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রুতিমধুর শব্দটি হচ্ছে মা। আমার জীবনে প্রথম যে শব্দটি শিখেছি সে শব্দটি আমার মায়ের কাছ থেকে।
পৃথিবীতে আমরা হয়তো অনেকেই পরশ পাথরের কথা শুনেছি কিন্তু কেউ কি কখনো ধরে অনুভব করছেন? বা নিজের চোখে পরশ পাথর দেখেছি? আমি সত্যি পরশ পাথর দেখেছি। আমার পরশ পাথরের নাম শান্তির পরশ। আর সেই পরশ পাথরটি আমার মমতাময়ী মা। আজকে আমি পৃথিবীতে একজন বড় সফল মানুষ, এই সফলতার আড়ালে একটি গল্প লুকিয়ে আছে। আর সফলতার গল্পটি আমার জনম দুঃখী মা।
আমার পরিবার একটি মধ্যেবিত্ত পরিবার। আমাদের পরিবারের আমার দুই চাচা, দাদা, দাদিকে নিয়ে একটি সুখী পরিবার। আমার বয়স যখন তিন বছর তখন আমার বাবা মারা যায়। পরিবারের নেমে আসে দুঃখের ছায়া। আমার ছয় বছর বয়সে দুই চাচা পরিবার নিয়ে শহরে বসবাস করতে থাকেন। আমি প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হই। ৫ম শ্রেণি পযর্ন্ত চাচারা ভালো খোঁজ খবর নিতো। ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে উঠার পরে আমার দাদা মারা জান। কিছুদিন পর মেঝো চাচা বাড়িতে এসে দাদিকে নিয়ে যায় শহরে। তারপর থেকে আমাদের সাথে দুই চাচার পরিবারের আর কোন যোগাযোগ নেই। আমার পড়াশোনার খরচ দিন দিন বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে মা টিউশনি আর সেলাই কাজ করতে থাকেন। কোনো ঈদে মাকে ভালো কাপড় পড়তে দেখিনি। একটি ভালো কাপড় আলমারিতে তুলে রাখতো সেটা আমার স্কুলের কোন প্রয়োজন হলে পড়ে যেতেন।মাঝে মাঝে চোখে পরতো চার পাঁচ তালি যুক্ত কাপড় পড়ে থাকতো। এসব দেখার পরে ইচ্ছে হতো পড়াশোনা ছেড়ে কাজে লেগে যাই। মায়ের কাছে যখন বলতাম মা, আমার পড়াশোনা আর ভালো লাগে না। মা আমাকে আদর করে বুকে নিয়ে অনেক অনুপ্রেরণা দিতেন। তোমাকে অবশ্যই তোমার চাচাদের থেকে অনেক বড় হতে হবে। শহরে বাড়ি করতে হবে, ভালো চাকরি করতে হবে। এভাবে যখন ভেঙে পরতাম তখনি তিনি সাহস দিতেন। আমি কখনো প্রাইভেট পড়িনি মায়ের কাছে শিখতাম।
মা ছেলে কষ্টের জীবনযাপনের মধ্যে শেষ হলো হাইস্কুল এবং আমার এস এস সি পরীক্ষায় ভালো একটি রেজাল্ট হয়। আমার মায়ের ইচ্ছে শহরে ভালো কলেজে পড়াবে। কিন্তু আমি বুঝি মায়ের অনেক কষ্ট হবে। তাই বায়না ধরলাম আমি শহরে যাবো না। অনেক বায়না ধরলাম কিন্তু মাকে রাজি করানো সম্ভব হয়নি। একদিন মা এবং আমি শহরের বড় চাচার বাসায় গেলাম আমার রেজাল্ট জানানোর জন্য কিন্তু চাচার এবং চাচির ব্যবহার দেখে মনে হলো আমরা ওদের বাড়ির চাকর। তারপরও মা বড় চাচাকে বললো ভাইজান শাকিবকে শহরের সরকারি কলেজে পড়াতে চাচ্ছি? যদি থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা হতো তাহলে কষ্ট হতো না।চাচা কিছু বলার আগে চাচি আম্মুকে বললো আমাদের বাসায় তো জায়গা নেই কোন ম্যাচে তুলে দেন। আমার মা কিছু না বলে চুপচাপ দুটি চোখে জল মুছতে মুছতে বাড়ি থেকে বাহির হয়ে এলেন। আমি এই প্রথম আমার আম্মুকে আমার চোখের সামনে কাঁদতে দেখলাম। আমি মায়ের পা ধরে বললাম মা, আমি আর পড়াশোনা করতে চাই না।আম্মু আমাকে বুকে ধরে বাচ্চাদের মত কাঁদতে থাকে।
দুপুরের খাবারের সময় হয়ে গেছে। মেঝো চাচার বাসায় যাওয়ার জন্য হাঁটা শুরু করলেন। আমি আম্মুকে বললাম,
'আম্মু আমার একটি কথা রাখবে?'
'কি কথা বল?'
'আগে বলো রাখবে_'
'আচ্ছা বল আগে রাখার চেষ্টা করবো।'
(আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম আমাকে অনেক বড় হতে হবে)
'মা মেঝো চাচার বাড়িতে যাব না। চলো বাড়িতে চলে যাই।
আমি কলেজে ভর্তি হয়ে টিউশন করে পড়াশোনার খরচ জোগাব। একটি নরমাল মেসে উঠবো। কোনো চাচার বাসায় উঠে পড়াশোনা করবো না।'
আমার কথা শুনে মা কিছু সময় ধরে চুপ করে রইল। তারপর থেকে মায়ের সাথে সাথে আমি সংগ্রাম করা শিখে গেছি। দিনেরাতে দুই বেলা খাওয়ার অভ্যাস করে নিলাম। সেই থেকে আজ পযর্ন্ত আমার দুই বেলা খাওয়ার অভ্যাস। কলেজে ভর্তি হয়ে টিউশন খুঁজতে খুঁজতে কতদিন না খেয়ে রাস্তায় রাস্তায় কাটিয়েছি তার হিসাব নেই। একদিন রাতে না খেয়ে অনেক পেট ব্যথা। মেসের এক বড় ভাই চিকিৎসার টাকা দিয়ে চিকিৎসা করায়। বড় ভাইয়ের কাছে সবকিছু খুলে বলি। পরের দিন তিনি আমাকে দুই বেলা খাওয়ার বিনিময়ে আমাকে একটি টিউশন ব্যবস্থা করে দেন। আপতত পেটের ব্যবস্থা হয়ে গেছে। কিন্ত মেসের ভাড়া কলেজের টিউশন ফি টাকার চিন্তা মাথায় রইয়ে গেল।
কিছুদিন পর যাদের বাসায় পড়ায় এই আন্টি আমার পরিবার সম্পর্কে জানতে চাইলে আমি লোকলজ্জার কথা চিন্তা না করে সব খুলে বলি। তিনি আমার জন্য একটি টিউশন সংগ্রহ করে দেন। এভাবে কলেজ জীবন শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে আজকে এই জায়গায় পৌঁছেছি।
তার পিছনে যে মানুষ তার জীবন যৌবন নষ্ট করেছেন তিনি আমার মা। যিনি চাইলে আমাকে ছেড়ে ভালো একটি ছেলের সাথে সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারতেন তিনি আমার মা। আজকে এই শহরে দুটি পাঁচ তলা বাড়ি বিশাল ব্যবসা সব কিছু আমার মায়ের জন্য। আমার মায়ের নামে যতটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান কোন প্রতিষ্ঠানের কোনো লোকসান নেই। কারণ তিনি আমার পরশ পাথর।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন