https://www.prothomalony.com/

13405

literature

সাহিত্য

শিল্পঘর

প্রকাশ: ১৪ মে ২০২৫ ০৭:৩৬

ভূমিকা: সংগীত—শুধু ধ্বনি বা সুর নয়, এটি এক আত্মার ভাষা, যা দেশ, কালের সীমানা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে ছুঁয়ে যায়। প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই সংগীতচর্চা কেবল একটি শখ নয়, বরং নিজের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের এক নিঃশব্দ প্রয়াস। বইয়ের পাঠের বাইরেও তারা খুঁজে নিচ্ছে আত্মার আনন্দ, আত্ম-প্রকাশের এক সৃজনশীল পথ। কিছু কিছু মুহূর্তে সুর হয়ে উঠে গল্প, সংগীত হয়ে উঠে স্মৃতি। আজকের প্রজন্ম সংগীতকে শিখছে কেবল শেখার জন্য নয়, বরং তার ভেতর দিয়ে নিজেকে জানার, নিজের সংস্কৃতিকে ধারণ করার জন্য। তারা শুধু সুরের অনুশীলন করছে না, তারা গড়ে তুলছে এমন এক ভবিষ্যৎ—যেখানে বাংলার সংগীত বিশ্বমঞ্চে শুনবে তার নিজের কণ্ঠে।

আজকের এই পাতা তেমনই এক যাত্রার ছোট্ট ধাপ, যেখানে দুই শিল্পী আমাদের শোনাবে আশা, শিকড়, আর সম্ভাবনার গল্প।

ধন‍্যবাদান্তে -রোকেয়া দীপা

 

সংগীতের বিস্ময়: আলমীর তারাজ রহমান


আলমীর তারাজ রহমান, ১২ বছর বয়সের ছোট্ট এক সংগীত প্রতিভা- বেড়ে উঠছে সংগীতমনা বাবা মায়ের সাথে নিউ জার্সির সাউথ ব্রুন্সউইক শহরে। পড়াশোনার পাশাপাশি সংগীত বিষয়ক সহশিক্ষা কার্যক্রমের জন্য এই শহরের স্কুলগুলো বেশ পরিচিত। বাসায় গিটার, কীবোর্ড এর সাথে তার পরিচয় ছোটবেলা থেকেই। 

সাত বছর বয়সে বাবার সাথে গিটার সেন্টারে ঘুরতে গিয়ে পরিচিতি হয় সংগীত তত্বের আর স্টাফ নোটেশনের উপর বই এর উপর। বাসায় বই নিয়ে দুই-তিন সপ্তাহের মাঝে নিজে নিজেই স্টাফ নোটেশন পড়া আয়ত্ব করে ফেলে ছোট্ট আলমীর, নোটেশন পড়ে কিবোর্ডে বাজানো শুরু করে বিভিন্ন গান। 

অবাক হয়ে ছেলের অসীম ধৈর্য, উৎসাহ দেখে কয়েক মাস পরে গিটার সেন্টারেই লেসন নেয়ার ব্যবস্থা করে আলমীরের বাবা মা। গ্রেগ ওয়েলচার নামের এক শিক্ষকের কাছে তালিম নেয়া শুরু করে আলমীর। 

"ওকে গ্রামার কিংবা স্টাফ নোট পড়া শিখানোর দরকার নেই, থিওরি ও ভালোই জানে, ও যেন তৈরি হয়েই এসেছে। আমি ওকে আরো শানিত করতে সাহায্য করবো, ও ব্যতিক্রমী এক ছেলে, সবাইকে যেভাবে শেখাই তা ওর ক্ষেত্রে কাজে দেবে না" - বলেছিলেন গ্রেগ। 

গুরু তার ছোট্ট শিষ্যকে অনেক স্নেহে আর আনন্দে শিখিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু করোনার লকডাউন ও পরবর্তী সময়ে গ্রেগ অন্য শহরে চলে যাওয়ায় ছেদ পড়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার, কিন্তু আলমীর থেমে থাকে না। নোটেশনের বই পড়ে আর ইউটউব দেখে শিখতে থাকে নতুন নতুন গান আর টেকনিক। ইতোমধ্যে স্কুলের শিক্ষকেরাও জেনে যায় তার সংগীতের প্রতি ভালোবাসা আর প্রতিভার কথা। আলমীর জায়গা করে নেয় জ্যাজ ব্যান্ড, অর্কেস্ট্রা, উইন্ড সিম্ফনি আর কয়্যার দল এ । পিয়ানো বাজানোর পাশাপাশি শেখা  শুরু করে বাঁশি আর পিকোলো। নিজে নিজে মৌলিক সুর তৈরি করা শুরু করে। নিজের পোষা পাখিদের জন্য তৈরি করে পিয়ানো সংগীত "ফ্রি বার্ড"। 

পঞ্চম শ্রেণীতে স্কুলের শিক্ষক ড. ব্রায়ান হান্টার এর উৎসাহে এর পর প্রায় তিন চার মাস ধরে আস্তে আস্তে লিখে ফেলে নিজের মৌলিক স্কোর "Rebirth of Phoenix"। ১০ ইন্সট্রুমেন্টের অর্কেস্ট্রা নিয়ে সৃষ্টি করা সংগীত লিপিবদ্ধ করার জন্য আলমীর "ফিনালে" সফ্টওয়ার শিখে নিয়েছে নিজে থেকেই। 

"অদ্ভুত ব্যাপার - রচনা লেখার মতো করে মনে মনে চিন্তা করে সেটা স্টাফ নোটেশন করে ফেলছে, ভিন্ন লেন এ ভিন্ন ইনস্ট্রুমেন্ট বিভিন্ন মেলোডি লাইন - আমরা তো ইনস্ট্রুমেন্ট বাজিয়ে বাজিয়ে গান লিখি, আর ও মনে মনে চিন্তা করেই জটিল কম্পোসিশন লিখে ফেলছে" - আলমীরের বাবা শোভন রহমান (এক্স-অর্থহীন ব্যান্ড মেম্বার) বলছিলেন ছোট্ট আলমীরের কম্পোসিশন অভিজ্ঞতার কথা।  

স্কুলের ব্যান্ড অর্কেস্ট্রা শিক্ষক চেয়েছিলেন এই স্কোর বছর শেষের কন্সার্টে স্কুল টিম বাজাবে - কিন্তু আলমীরের শারীরিক অসুস্থতার জন্য তা আর হয়ে উঠেনি । ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে আলমীর আবার তালিম নেয়া শুরু করে প্রিন্সটন এ নামকরা ওয়েস্টমিনিস্টার কনজার্ভেটরী অফ মিউজিক অফ রাইডার ইউনিভার্সিটি তে, এবার শিক্ষিকা এলেনা বেনেডিক্ট। তার তত্বাবধানে আলমীর আরো পরিশীলিত হয়ে বাজানো শুরু করে বিথোভেন, মোজার্ট, শপিন, কূহ্লাউ, ডেবুশি, চাইকোওস্কি সহ আরো নামকরা সব কম্পোজার দের সৃষ্টি।  বছর শেষে কনসার্ভেটরির ইভালুয়েশন পরীক্ষায় অর্জন করে "হাই অনার্স" সর্বোচ্চ নম্বর। রাইডার ইউনিভার্সিটির কনজার্ভেটরির কিছু অনুষ্ঠানে ক্লাসিকাল সংগীত  আর নিজের কম্পোসিশন বাজানোর পাশাপাশি বিখ্যাত প্রিন্সটন আর্ট কাউন্সিলেও  বাজিয়েছে আলমীর। 

বিগত তিন  বছর ধরে নিউ জার্সিতে আর্টল্যাব মিডিয়া এর বাৎসরিক স্প্রিং কনসার্ট গুলোতে পিয়ানো সোলো বাজিয়েছে, আর সম্প্রতি রাটগার্স উনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত NJMTA (নিউ জার্সি মিউজিক টিচার্স এসোসিয়েশন ) এর কম্পেটিশনে অংশ নিয়ে চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নিয়েছে আলমীর । আগামীতে নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত কার্নেগি হলে পারফর্ম করবে আলমীর, এই আশা রাখছেন তার শিক্ষক বেনেডিক্ট।

পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় এলিস আইল্যান্ডে বেড়াতে গিয়ে রেঞ্জার এর অনুমতি নিয়ে ঐতিহাসিক গ্রেট হল এ রাখা শতবছরের  পুরোনো পিয়ানোতে বিথোফেনের ষষ্ঠ সিম্ফনি বাজানোকে ছোট্ট জীবনের এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি মনে করে আলমীর।

সংগীতের পাশাপাশি পড়াশুনাতেও তুখোড় আলমীর প্রথম গ্রেড থেকেই গিফটেড এন্ড ট্যালেন্টেড আর একসেলারেটেড ম্যাথ প্রোগ্রামের  আওতায় আছে। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময়ই উনিভার্সিটি প্রি-ক্যালকুলাস শেষ করে এই গ্রীষ্মে ক্যালকুলাস-১ ক্লাসের জন্য তৈরি আলমীর।

সংগীতের সাথে জড়িত বাবা আর চাচাকে অনেক বাংলা গান গাইতে আর বাজাতে দেখে বড়ো হয়ে ওঠা আলমীর খুঁজেছে বাংলা গানের স্টাফ স্কোর, যেন সে দেখে বাজাতে পারে। অনেক অসাধারণ বাংলা গান কোনো স্টাফ স্কোরের মাধ্যমে সংরক্ষিত নয় জানতে পেরে আলমীর এই সংরক্ষণ আর অনুলিখনের (preservation through arranging and writing staff notation ) স্বপ্ন দেখছে আলমীর, যাতে ওর মতো দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রবাসী বাংলাদেশীরা তাদের শিকড়ের সংগীতকে সহজেই আত্মস্থ করার পাশাপাশি বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে পারে। 

সুযোগ আর উৎসাহের সহায়তার জন্য আলমীর নিজের পরিবার আর শিক্ষকদের পাশাপাশি কমুনিটির সবাইকে কৃতজ্ঞতা জানায় আলমীর ।
 

প্রিয়াশা: বিমুগ্ধ প্রতিভার এক সংগীতযাত্রা


 

প্রিয়াশার জন্মদিনটা ভারী মজার - ১২/১২/১২. ওর জন্ম ইন্ডিয়াতেই, কিন্তু প্রবাসে- গুজরাট এর আহমেদাবাদে। সঙ্গীতের হাতেখড়ি হয়েছিল দেড় বছর বয়সে - নাচ শেখার মাধ্যমে। ওরা আহমেদাবাদে যেখানে থাকতো তার কাছেই একটা নাচের স্কুল ছিল । ওর মা ওকে ভর্তি করে দিয়েছিলো সেই নাচের স্কুলে। দিব্বি নাচতো বাংলা , হিন্দি সব গানের সাথে। ২ বছর বয়সে ও প্রথমবার মঞ্চে নৃত্য প্রদর্শন করে একক ভাবে। গান শোনাটা স্বাভাবিকভাবে তখন থেকেই শুরু। 

প্রিয়াশা চার বছর বয়সে চলে এলো যুক্তরাষ্ট্রে, তারপর টুকটাক এদিকে বর্ষবরণ, ওদিকে দুর্গাপুজোতে গাইতো যেমন পারতো। ওর যখন ৬ বছর বয়েস, তখন ও ভর্তি হলো গায়েত্রী শর্মা ম্যাম এর কাছে তালিম নিতে। শাস্ত্রীয় সংগীতের সঙ্গে পরিচয় তখন থেকেই। বাড়িতে মা বাবার উৎসাহে আর গুরুর কাছে যোগ্য তালিম পেয়ে এর পর ও আস্তে আস্তে মঞ্চে গাইতে শুরু করলো। মা এর সৌজন্যে বাড়িতে বাংলায় কথা বলে ওর বাংলা উচ্চারণ এ তন্ আসেনি। আর একসময় গুজরাটি ভাষাটা ভালো রকম রপ্ত ছিল বলে হিন্দিটাও ভালোই আসে ওর, তাই বাঙলা আর হিন্দি দুটো গানই সাবলীল ভাবে গাইতে পারে। 

যুক্তরাষ্ট্রের বাচ্চাদের মধ্যে ওর এই বিনা টান-এ গান গাওয়াটা অনেকের কাছেই বেশ চমকপ্রদ লাগে। এদেশে থেকে ইন্ডিয়ান ক্লাসিকাল গান শেখা আর গাওয়াতা চাট্টিখানী ব্যাপার না।  নিউ জার্সিতে তে তাও এসবের কিছুটা সুযোগ সুবিধা আছে, তার সাথে গায়েত্রী ম্যাম এর মতো গুরু পাওয়াটাও একটা ভাগ্যের ব্যাপার। 

প্রিয়াশার ৮ বছর বয়সে "দ‍্য আর্টিস্ট" বলে একটা গ্লোবাল ট্যালেন্ট হান্ট কম্পেটিশনএ গান গাওয়ার সুযোগ আসে। ইন্ডিয়ান ক্লাসিকাল, বলিউড এন্ড ওয়েস্টার্ন ভোকাল - ৩ তে ক্যাটাগরিতে অংশগ্রহণ করে সর্বকনিষ্ঠ প্রতিযোগী হিসেবে ও সেমিফাইনাল এ যায়। ১০ বছর বয়সে নিউ জার্সির এডিসন এ ও 'সা রে গা মা পা তে' অংশ নেয়। ওর থেকে অনেক বেশি বয়েসের দাদা -দিদিদেড় সঙ্গে যোগ্যভাবে লড়ে ও তৃতীয় স্থান পায়। 

ছোট্ট মেয়েটির মুখে "রোজ রোজ আঁখো তোলে' র "আজকি রাত" শুনে দর্শক থেকে জজ সবাই একইরকম চমৎকৃত হয়েছিলেন। বাড়িতে ফ্রাইডে ইভনিংয়ে বাবা, মা আর বোনের সাথে নিয়মিত কারাওকে করা প্রিয়াশার কাছে গান গোটা যেমন একটা রিলাক্সিং ব্যাপার তেমনি ওর একটা খুব পছন্দের জিনিস হলো কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে নানা রকম কুকিং এর এক্সপেরিমেন্ট করা।

২০২৫ এ আর্ট ল্যাব এর পরিচালনায় ট্যালেন্ট হান্ট এর খবরটাও প্রথম পায় ওর গায়েত্রী ম্যাম এর কাছে থেকে। প্রথম রাউন্ড এ গাওয়া "বাজে গো বিনা" ওকে প্রথম পুরস্কার এনে দেয়। ওদেরই দেওয়া প্লাটফর্ম এ ও সুযোগ পায় স্প্রিং কনসার্ট এ গান গাওয়ার। 

এই ব্যাপারে প্রিয়াশা আর্ট ল্যাব এর কাছে খুবই কৃতজ্ঞ এই সুযোগ পাওযার জন্যে। প্রিয়াশা আশা রাখে, ও মিডল স্কুল এর হোমওয়ার্ক আর কম্পিটিটিভ জিমন্যাস্টিক্স এর কড়া সময়সূচির মধ্যে গান এর চর্চাটা চালিয়ে যেতে পারবে।  

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন