https://www.prothomalony.com/
13384
literature
মা কৈলে - তয় যা, উড়াই যা
হুমায়ুন কবির
১
প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই আমার প্রথম কাজ হলো জানালার ব্লাইন্ড তুলে পাখিগুলো কি করছে দেখা। কখনো ঘরের ছাদে, কখনো সবজির-বাগানের মাচায়, কখনোবা গাছের ঝোপে পায়রা দুটো উড়ে উড়ে বেড়ায়। বুঝতে পারি ওরা বাসা বাঁধার জায়গা খুঁজছে। লক্ষ্য করছিলাম ঝুলন্ত ফুলের টবের দিকেই ওদের নজর বেশি। দেখি, দিনশেষে ফেন্সের উপর বসে সারাদিনের হিসেব মিলায়। দুজনে শলাপরামর্শ করে। মা হবার সময় এসেছে, যেনোতেনো আঁতুরঘর হলে তো চলবে না!
অবশেষে সবদিক যাচাইবাছাই করে একদিন মনের মতো জায়গাটি বেছে নেয় ওরা। ঝুলন্ত ফুলের টবে! কোন মা না চায়, সন্তানদের জন্ম হোক ফুলের বিছানায়! ওরা ও চেয়েছে।
শুরু হয় বাসা বাঁধার কাজ। দুজনে মিলে খড়কুটো জড়ো করতে থাকে। ছোট বড়ো নানান মাপের খড় কুটো দিয়ে একটু একটু করে বুনতে থাকে বাসা। কখনোবা ভেজা ঘাসে একটু কাদা মাখিয়ে নিয়ে আসে। রাজমিস্ত্রীদের মতো নিপুন হাতে ঘর বানায়। ঠিক যেমন রাজমিস্ত্রীরা ছোটবড় ইট মিলিয়ে, কেটেকুটে গাঁথুনি গাঁথে, ওরাও তাই। সারাদিন পরিশ্রম আর রাতে বিশ্রাম। আবার কাকভোরে কাজে লেগে যায়।
কে শিখিয়েছে ওদের এতো কারিগরী বিদ্যা? আমি অবাক বিস্ময়ে স্রষ্টার অপরূপ সৃষ্টি প্রানভরে দেখি।
একসময় বাসাবাঁধা শেষ হয়। মা ডিমপেড়ে তা' দেওয়া শুরু করে। পুরুষ পাখিটা ঘুরে ফিরে তদারকি করে। পালা করে পাহারা দেয়। মা'কে অবসর দেয় মাঝেমাঝে। আমি পালক-পিতা'র মতো ওদের সন্তান আসার অপেক্ষায় দিনগুনি। কখনো দেখি, ফুলের ঝোপের ফাঁক গলিয়ে মায়ের গভীর কালো উদ্বিগ্ন চোখ উঁকিমারে। আমাদের চোখাচোখি হয়। ইশারায় অভয় দেওয়ার চেষ্টা করি। জানিনা ওরা বুঝতে পারে কি না।
কয়েকরাত ধরে তুমুল ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিলো। আবার দিনের বেলা ঠা-ঠা রোদ্দুর আর প্রচণ্ড গরম। প্রকৃতি যেন তার অশুভ খেলায় মেতেছে। মায়ের পরীক্ষা নিচ্ছে বারবার। প্রকৃতি কি বোকা, ও কি জানেনা মায়েদের পরীক্ষা নিতে নাই। মা-রা তো পরীক্ষায় কখনো ফেল করে না! ভিজে একাকার, তবুও মা-পাখি ঘর ছেড়ে পলায় না। অতি যত্নে ডিমগুলো আগলে রাখে।
যদিও আমি উদ্বিগ্ন ছিলাম, যদি ডিমগুলোর কোনো ক্ষতি হয়।
আমার কান্ড দেখে আমার স্ত্রী নিরা হাসে।
-কি এত দ্যাখো? একদিনতো তোমার বাচ্চাদের মত, ওদের বাচ্চারাও মায়ের পাঁজর কেটে উড়াল দেবে। চিন্তা করলেই কষ্ট লাগে। এতো কষ্ট করে ছেলেমেয়ে পাললাম কেন? নিরা এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে একটু হালকা হবার চেষ্টা করে।
আমি মনে মনে বলি
-পাঁজর কি শুধু তোমার কাটবে, আমার না? কিন্তু ওকে জানাতে চাইনা আমার কষ্টের কথা।
-এটাইতো নিয়ম, তুমি আমি সবাইতো উড়াল দিয়েছি। তাও আবার এক-আধ মাইল না, দীর্ঘ বারো হাজার মাইল!
-দেখ, দেখতে থাকো আর কষ্ট পাও। নিরার টিপ্পনিকাটা শেষ হয় না।
বুঝতে পারি, সব মায়েদের মতো নিরাও চায় বাচ্চাদের আগলে রাখতে। বাচ্চাদের বিচ্ছেদে কষ্টে পায়।
সৃষ্টির অপূর্ব এই খেলা আমার ভালো লাগে। আমি প্রাণ ভরে দেখি। উপভোগ করি। তাছাড়া আমিতো বাবা। বাবাদের কষ্ট পেতে নাই।
তিন সপ্তাহ পরে বাচ্চা ফুটলো। ছোট্ট মাথা জুড়ে পুরোটাই গোলগোল চোখ। যদিও চোখ তখন ফোটোনি। আরো কিছুদিন লাগবে। গায়ে খোঁচাখোঁচা ধূসর রঙের পালক। গোলাপি রঙের ঠোঁট। কেমন অদ্ভুত পোকাদের মত দেখতে।
চুড়ি বাচ্চাদের দেখতে চায়। আমি ছবি তুলে দেখাই।
- ইস, এরকম আগলি কেন আব্বু? চুড়ি বলে।
- ইস বলছিস কেন? তুইও জন্মের পরেরদিন এরকম আগলি ছিলি । নিরা মেয়েকে ক্ষেপায়।
- না, আমি এরকম ছিলাম না। আব্বু আমি এরকম ছিলাম? চুড়ি প্রশ্ন করে
- না আম্মু, তুমি টুকটুকে একটা পরী ছিলে। এখনো আছো।
চুড়ি খুশি হয়ে চলে যায়।
২
ছুটির দিন ছাড়া আমাদের কারোই একসাথে লাঞ্চ করা হয়না। কাজের দিনগুলোতে কারো স্কুল, কারো অফিস। তাই যেখানেই থাকি, রাতের খাবার সবাই একসাথে করার চেষ্টা করি। এটা অনেকটা অলিখিত নিয়মের মত আমাদের বাসায়। যে নিয়মটা অনেকদিন ধরে মেনে চলার চেষ্টা করছি সবাই।
ঠিক দু'বছর আগের কথা। সে-দিনটা নিরা আর চুড়ি বাংলাদেশে। ছেলেও বাসায় নেই। শুক্রবার রাত। পরদিন ছুটি। ডিনার টেবিলে আমার বড়মেয়ে নাজ আর আমি। মেয়েটাকে যেনো একটু বিষণ্ণ লাগছিল।
-সব ঠিক আছে? চুপচাপ কেন? জিজ্ঞেস করলাম।
-কই, নাতো, সব ঠিক আছে আব্বু । একটু টায়ার্ড লাগছে।
কথা শেষ না হতেই তাড়াহুড়া করে ডিনার টেবিল ছেড়ে রুমে চলে গেল। আমি আর কথা বাড়ানোর সুযোগ পেলাম না। তাছাড়া কিছু জিজ্ঞেস ও করতাম না হয়তো।
একটা সময় আসে ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেলে কথাবার্তা মেপেঝেপে বলতে হয়। তা নাহলে ওদের কাছে কথা শুনতে হয়। ওরা বলে
-আমরা এখন বড় হয়েছি, এতো বেবি-বেবি করোনা।
মাঝে মাঝে ছেলেমেয়েদের সাথে কথা বলতে গিয়ে মনে হয়, যেন ডিমের খোসার উপর দিয়ে হাঁটছি। একটু এদিক ওদিক হলেই সব ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে। যাইহোক, এসব অনুভুতি শুধু আমার জন্য প্রযোজ্য। সবার জীবন তো এক না।
একটু পরে নাজ রুম থেকে ফিরে এল ।
-আব্বু আইসক্রিম খাবে?
-খেতে পারি।
-মানে কি, খাবে? হা বা না বলো।
-হ্যাঁ, শুধু এক চামচ।
ও এক বাটি আইস্ক্রিম নিয়ে আসে।
-এতো কেন?
-তুমি তো সবসময়ই বলো এক চামচ, কিন্তু দিলো তো সবটুকুই খাও।
আমি হেসে ফেলি।
আমার মনে আবার আশংকা ভীড় করে। ও হয়তো কিছু একটা বলতে চায়?
আইসক্রিম খেতে খেতে টুকটাক কথার মাঝে হঠাৎ কোনো ভনিতা না করেই নাজ বলে ফেললো, যে কথাটি বলতে চেয়েছিলো এতক্ষন।
কিছুদিন আগে শাহাদুজ্জামানের লেখা অনবদ্য একটি বই পড়েছিলাম। "একজন কমলালেবু" পড়তে পড়তে একটা লাইনে এসে চোখ আটকে গিয়েছিলো।
"পাখির-মা দেখলো ছানারা একটু বড়ো হয়েছে। তারা ডানা ঝাপটায়। মা কৈলে ..."বাছারা তোরা কি এখন উড়তি পারবি?" ছানারা কয় .... "হ পারুম।" মা কৈলে - "তয় যা, উড়াই যা - তয় সাবধানে থাকিস! "
কত নির্মম সুন্দর এই বাণী! প্রকৃতির সাথে মানুষের জীবনের কত মিল। মায়ের লুকায়িত গভীর বেদনা, আর উচ্চারিত আশীর্বাদের পিছনে চাপা দীর্ঘশ্বাস সন্তানেরা কি টের পায় ?
৩
বার্নারের অটো সুইচটা কিছুতেই কাজ করছিল না। লাইটারটার ও একই অবস্থা। কিভাবে চুলা জ্বালাবো? চা খেতে ইচ্ছে করছে খুব। রাতে ভালো ঘুম হয়নি। মাথাটা ধরে আছে।
এক সময়ে বারবার চা না খেলে যেন ভাত হজম হতো না। ইদানিং অভ্যাসটা আর নেই। আগের 'ভালো লাগার দিনের' সাথে 'এখন কার দিনের' অনেক বিরোধ। আগের কালের মিষ্টির হাড়ি, এখন যেন পান্তাভাতে ভরা।
শেষমেষ একটা উপায় পাওয়া গেলো বটে। সুগন্ধি মোমবাতিটা তখনও কিচেন টেবিলের উপর জ্বলছিল। একটা কাগজে আগুন ধরিয়ে, চুলা জ্বালিয়ে কেটলিটা চাপিয়ে দিলাম।
ভাজ করা কাগজ সহজে পুড়ে ছাই হতে চায় না। আগুনের শিখা নিভে গেছে ততক্ষণে কিন্তু কাগজের ধার ঘেঁষে সোনালী আগুন, জরির কাজের মতো ঝিলমিল করছে তখনও। আগুন পুড়িয়ে পুড়িয়ে একটু একটু এগুতে থাকে কাগজের ধার ঘেঁষে ঠিক যেন আমার মনের আগুনের মতো। কাগজের আগুন নিভে যাবে এক সময়ে। কিন্তু আমার মনের আগুন? মেয়ের কথাগুলো তখনও কানে ভাসছিলো।
-আব্বু আমি একটা ভালো চাকরির অফার পেয়েছি। এখনকার মতোই বড় কোম্পানি। বেতন আর সুযোগসুবিধা ও বেশি।
-তাই ? খুব ভালো খবর।
-হা, কিন্তু আম্মু হয়তো খুশি হবে না।
-কি বলো, খুশি হবে না কেন?
-চাকরিটা সিয়াটলে।
একটা তীক্ষ্ণ নখরের আঁচড় অনুভব করলাম বুকের বা-দিকে। কিন্তু আমি তো বাবা, তার উপর পুরুষ মানুষ। পুরুষ মানুষরদের প্রকাশ্যে কষ্ট প্রকাশ করতে নাই।
-সিয়াটেল! ওয়াও! ভালোই হবে, তোমার উছিলায় আমাদের বেড়াতে যাওয়া হবে। সিয়াটল তো অসম্ভব সুন্দর শহর, যেখানে সমুদ্রের পাশ ঘেঁষেই পাহাড়। আমাদের ডালাস তো একেবারে খটখটা।
-তুমি তোমার আম্মুকে জানিয়ে দাও তাহলে।
-তুমি বলো। আমার ভয় লাগছে। নাহ ঠিক আছে, আমি কল করে জানাবো। মেয়ে রুমে চলে যায়।
খানিকটা আনমনা হয়ে গিয়ে ছিলাম। ফায়ার অ্যালার্ম এর টু-টু সম্বিধ ফিরে পেলাম। পানি শুকিয়ে কেটলিতা পুড়ে যাচ্ছিলো। আর চা খেতে ইচ্ছে হলোনা।
কেন কষ্ট হলো অথবা হয়, জানি না। এটাই তো জীবনের নিয়ম। আমি নিজে ও সেই ইন্টারমিডিয়েটে থেকে ঘরের বাইরে। জীবনে পরিবার ছেড়েছি অনেকবার। খুলনা থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে সিলেট, আবার ঢাকা থেকে আমেরিকা! তখন মায়ের কষ্টের মলিন মুখের দিকে তাকাবার সময়েই হয়নি একটুও। জীবনের প্রয়োজনে গিয়েছি, যেতে হয়েছে।
দুই বছর হয়ে গেল নাজ সিয়াটলে চাকরি নিয়েছে। এরমধ্যে আমরা দুইবার বেড়াতে গিয়েছি। দুই তিন মাস পর পর ও আসছে। করোনা'র জন্য এখানে কাটিয়েছে ছয় সাত মাস। বাসায় থাকলে যতটা না কথা হতো, তার চেয়ে বেশি কথা হয় এখন। তবু ও মন ভরে না। বার বার মনে হয় ও ডালাসে নাই।
পাখির ছানাগুলো বড় হচ্ছে দিন দিন। বাবা মা পালা করে পাহারা দেয় ওদের। প্রকৃতির নিয়মে ডানা ঝাপটাবে কদিন পরে।
মা বলবে "বাছারা তোরা কি এহন উড়তো পারবি...?
পাখিরা পারে মানুষরা কেন পারে না!
আস্তে আস্তে সয়ে যাচ্ছিলো সবকিছু। ক্ষত শুকানো এখনো বাকি। নিয়তি তার ধারালো নখর নিয়ে আবার হাজির হলো।
ছেলেটা ইউনিভার্সিটি-অফ-মিলওয়াকিতে রিসার্চ এসিস্টেন্সশিপ পেয়েছে। যা নিয়ে ও স্বপ্ন দেখতো। কীভাবে যেন রিসার্চ প্রোগ্রামটা আশ্চর্য ভাবে মিলে গেলো ওর জন্য। স্কলারশীপ, টিউশন ফ্রী , আমাদের না বলার কোনো অবকাশই নেই।
আমি যখন আমেরিকা আসবো, মেজো দুলাভাই বলেছিলো
-তুমি চলে যাচ্ছো, মনে হচ্ছে আমাদের যেন একটা ডানা ভেঙে গেল! তার কষ্টের অনুভূতিটা এতদিন পরে আজ আবার আমার মন উপলব্ধি করতে পারলো।
প্রায় প্রতিদিনই আব্বার লেখা চিঠির লাইন গুলো মনে পড়ে।
' -বড় সাধ ছিল, সবাই মিলে একত্রে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিবো। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের জন্য হলো না।'.....
সময় গড়াবে, একটা সময় আসবে চুড়ি চলে যাবে আমাদের ছেড়ে। যেভাবে আমরাও উপেক্ষা করে ছেড়ে এসেছিলাম মায়ের আঁচল, জন্মভূমি আর সকল পিছুটান।
জীবন চলবে তার আপন গতিতে! আর নিয়তি তার নিজের নিয়মে প্রতিশোধ নেবে বারবার।
নেতা
সোমের কৌমুদী
"বাবা, এগুলো আমার ঔষধ কেনার জন্য। নিস্ না।"
মায়ের কথা কানে তোলে না জয়। টেবিলের কভারের নিচে লুকিয়ে রাখা টাকাগুলো বের করে নিজ পকেটে রাখে। বাবা হারা নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলের চলে যাওয়া পথের দিকে অসহায় তাকিয়ে থাকেন মা।
বাসা থেকে বের হয়ে জয় প্রতিদিনের মতোই সোজা চলে আসে মনির টি স্টলে। সন্ধ্যায় তার এখানে আড্ডা দেওয়া বন্ধুরা সব আগেই এসেছে। অভি সাথে করে নিয়ে এসেছে এলাকার বন্ধু বিপ্লবকে। জয় বেঞ্চে বসতেই কথা শুরু করে অভি-
'জয়, দোস্ত এ হলো আমার বন্ধু বিপ্লব।'
এবার বিপ্লবের দিকে চোখ ঘুরিযে নেয় অভি।
'আর বিপ্লব, এ হলো আমাদের বন্ধু জয়।'
বিপ্লবের সাথে করমর্দন শেষে কথা শুরু করে জয়।
'হুম্। আমি হলাম এদের নেতা বন্ধু (তর্জনীর ইঙ্গিতে বিপ্লবকে উপরে দেখায়)। এখন থেকে অভির সাথে তুমিও নিয়মিত এসো।'
আবার কথা বলতে শুরু করে অভি। বিপ্লবের দিকে তাকিয়ে,
'শোন, যখন খুশি আসবি তবে একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে। এ দোকানে যত বিল হবে সব জয় দিবে। এটা জয়ের অনুরোধ। কেননা, জয়ের মতে এলাকাটা ওর।'
চা, সিগারেট আর গল্পে আড্ডা জমে উঠে। সন্ধ্যার প্রহর মুখরিত হয় জয়ের সাথে তার বন্ধুদের আড্ডায়। রোড লাইটের আলোয় ঝলমল করছে মনির মিয়ার চায়ের দোকানের উপর সাঁটানো ছাত্রনেতা জয়ের ছবি সম্বলিত বড় ব্যানার। ব্যানারের ছায়ায় দোকানের ছাদের কিছুটা অংশ আঁধারের মতো। হয়তো সেই আঁধারে ডুকরে কাঁদছে দলটির প্রতিষ্ঠাতা মহান নেতার দেখানো ছাত্র রাজনীতির আদর্শ নীতি।
বিগত প্রণয়
নাদিয়া নওশাদ
বাইশ বছর বয়সী হাল্কা ছিপছিপে গড়নের রিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী সাহিত্যের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনার পাশাপাশি শখের বশে বই লেখে। প্রায়শই প্রতি বছর 'একুশে বইমেলা' তে ওর একটা না একটা বই প্রকাশিত হয়। তরুণ কথাসাহিত্যিক হিসেবে এরইমধ্যে খানিক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
এরকমই এক বিকেলে বইমেলা প্রাঙ্গণে সাংবাদিক অভি আহমেদের সাথে রিয়ার দেখা। অভি 'নতুন আলো' পত্রিকার সাংবাদিক। বই বিকি-কিনি,বয়োজ্যেষ্ঠ গুণীজনদের সমাগম, পাঠক প্রতিক্রিয়া, নিত্য-নতুন খবরের সন্ধানে অভি পৌঁছে গেলো বইমেলায়। রিয়ার সাথে আলাপচারিতা,এরপর ভালো লাগা,উভয়ের দূরালাপনী নম্বর বিনিময় সব মিলিয়েই চমৎকার সময় কেটে গেলো।
এক ছুটির দিনে রিয়া তার বাড়িতে অভিকে নিমন্ত্রণ করে। অভিনন্দন বাবা আশফাক সাহেব একজন ব্যবসায়ী ও মা সিতারা গৃহিণী।
কথায় কথায় অভি আশফাক সাহেব কে তার আর রিয়ার মন আদান-প্রদানের বিষয় খুলে জানায় আর রিয়া কে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। ভালো ছেলে অভি। আর একমাত্র মেয়ে বলে আশফাক সাহেব ও সিতারা আপত্তি করলেন না। এক শ্রাবণ সন্ধ্যায় বেশ ধুমধাম করে অভি ও রিয়ার বিয়ের সানাই বেজে উঠলো।
সংসারে মা রিহানা ও বোন জয়া ছাড়া আপনজন বলতে আর কেউ নেই অভির। বিয়ের পর রিয়া অভির পরিবারের সদস্যদের সাথে মোহাম্মদপুরের নিজ বাসায় বসবাস শুরু করলো। এতকিছুর মধ্যেও রিয়া পড়াশোনাটা ঠিকঠাক চালিয়ে যাচ্ছে। প্রথম কিছুদিন অভিদের বাড়িতে রিয়ার ভালোই দিন কাটলো। ধীরে ধীরে অভির প্রমোশন হলো আর কাজের ব্যস্ততায় অভি ডুবে গেলো। সারাদিন শাশুড়ীমার সাথে সাংসারিক টুকটাক কাজ, পড়াশোনা, লেখালেখি করে রিয়াও বেশ হাঁপিয়ে উঠেছে।
এরইমধ্যে নিজ শরীরে ছোট্ট একটি প্রাণের অস্তিত্ব অনুভব করলো রিয়া। অভি, রিহানা, জয়া, রিয়ার বাবা-মা সবাই খুব খুশি। তবে এই খুশি খুব বেশিদিন স্থায়ী হলো না। দিন দশেকের মধ্যে বাড়ির দোতলার সিঁড়ি থেকে আকস্মিক পা ফসকে গর্ভপাত হয়ে গেলো রিয়ার। মুহূর্তের মধ্যেই সব আনন্দ ধুলিস্মাত হয়ে গেলো। এর পরিপ্রেক্ষিতে অভি আর রিয়ার মাঝে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হলো।
পাশাপাশি রিয়া চরম মানসিক হতাশাগ্রস্ত হয়ে গেলো। সিদ্ধান্ত নিলো অভির কাছ থেকে চিরতরে সরে আসার। তবে অভি কিছুটা বোঝাতে চেয়েও শেষ পর্যন্ত পারলো না। রিয়া চলে এলো তার নিজ বাড়িতে,বাবা-মায়ের কাছে।
মাঝে কেটে গেলো প্রায় সাত-আট বছর। আজ রিয়া কথাসাহিত্যিক হিসেবে সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্ত এখনও বড্ড একাকিত্বে ভোগে। অতীতে অভির সাথে কাটানো সোনালি মুহূর্তগুলো তাকে যেন মাঝেমধ্যেই অতীতপানে হাতছানি দিয়ে ডাকে। তার জীবনের বিগত প্রণয় কে চাইলেও ভুলে যেতে পারেনা। সেদিন নারায়ণগঞ্জে একটা ক্ষুদ্র আয়োজনের বইমেলায় হঠাৎই রিয়ার সাথে অভির দেখা হয়। তবে অভি জীবনে আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়েছে। রিয়ার তাকে ছেড়ে আসার বছর দুয়েক পর মায়ের পছন্দের পাত্রী তানিয়ার সাথে পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় অভি। এই সংসারে দেড় বছরের এক কন্যাসন্তান আছে তাদের।
অভির নতুন জীবন আজ কেনো যেন একটু হলেও রিয়ার মনের কোণে বিরাট ধাক্কা দিয়েছে। সহজে মন থেকে মেনে নিতে পারে না রিয়া। তবুও এই বিগত প্রণয় নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবে বলেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। বই লেখা নিয়ে এগিয়ে যাবে আগামীর পথে।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন