https://www.prothomalony.com/
13383
literature
শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে শিকাগোর হে মার্কেটে প্রাণ দানের প্রায় ১৪০বছর হয়ে গেলেও কৃষক, শ্রমিক, মজদুর, মেহনতী মানুষের খেয়ে পরে বেঁচে থাকার ন্যূনতম ব্যবস্থা কি হয়েছে? হয়নি। আজো তাঁরা নিরন্ন। অপুষ্টির শিকার। নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা নেই। অর্থাভাবে বিনা চিকিৎসায় অকালে প্রাণহানি ঘটে চলেছে অসংখ্য মানুষের।
তবু আসে ‘মে দিবস’( আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস )। মিছিল, মিটিং হয়, সেমিনারে ভারী ভারী কথা বলেন স্বীকৃত বিজ্ঞ পণ্ডিতবর্গ। অভাব বিদায় নেয় কি? দারিদ্র, অপুষ্টি অশিক্ষা, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বন্ধ হয়েছে কি? উত্তর একটিই। হয়নি।
মে দিবসের মানুষের সংগ্রামকে সম্মান জানিয়ে সাতজন কবির সাতটি কবিতা। পড়ার বিনীত আমন্ত্রণ।
ফারুক ফয়সল
নুনচিত্র
ঝর্না রহমান
সারাজীবনই আমাগো নুন আনতে পান্তা ফুরায়
তয় নুন ফুরায় না। ঐটা ভুল কথা।
বিদ্যুৎ থাকে না দিনমান, রাইতে
একটা কম পাওয়ারের বাল্ব, ভূতের চৌখ্যের মত জ্বলে।
কারখানাও বন্ধ হয়া গেল
মেশিনের হ্যান্ডেল গেল। অখন রিশকার প্যাডেলই ভরসা।
পকেট ভারি হইলে একটা ব্যাটারি লইতে পারতাম,
ঠ্যাং তুইলা বইসা থাকলেও পোঁ পোঁ চলত গাড়ি।
পাও দুইখান তো একটু জিরান পাইতো।
প্যডেল মারতে গিয়া টের পাই দুই রান বায়া ঘাম
নামতাছে। য্যান সুতানলি সাপ
চুলের জঙ্গল থেইকা, গর্দানের ফাটল থেইকা,বগলের
গাতা থাইকা বাইরাইতেই থাকে।
আইজ হালার এক পাসিঞ্জার মাঝপথে নাইমা গেল।
কয়, গা থেকে দুর্গন্ধ আসে। পিঠ ভরা শুকনা নুন।ওয়াক।
গোসল করতে পারিস না? বেটা ধাঙড়!
কই পামু গোছলের পানি? বস্তিতে মউতের গোছল
দেওয়ার পানি লইয়াও কাইজ্জা।
বউ আমার জামাডা হাতে লইয়া কয়, সাদা সাদা
এক্রাবেক্রা এই দাগগুলান কী গো?
তোমার ঘাম শুকাইয়া এই অবস্থা? মাইয়া কয়
এইটা তো মানচিত্র হইয়া গেছে বাবা! তোমার জামা কি মানচিত্র?
না রে মা, এইডা হইল নুনচিত্র।
মেয়ে সোহাগে বাপের বাহুতে চাটা দেয়।
এহ হে, এক্কেরে নুন-কডা! বাবা এই নুন কি খাওন যায়?
এই নুনই তো খাস রে মা!
গেণ্ডুয়া গেমের মাঠ ও গ্যালারি
মাসুদ খান
পশ্চিমের ‘সভ্য’ খেলোয়াড়েরা প্রায়-প্রায়ই নেমে পড়ে গেণ্ডুয়া খেলায়—
শিশু ও মানুষদের গোল গোল নরমুণ্ডের গেণ্ডুয়া।
যতবারই এয়ার স্ট্রাইক, যতবারই বিস্ফোরণ,
ততবারই কুটি-কুটি হয়ে ছিঁড়ে যায় শতশত শিশু ও তাদের বাবা-মা।
সঙ্গে সঙ্গে উল্লসিত হয়ে ওঠে গেণ্ডুয়া গেমের স্ট্রাইকার
আর মাঠে-নেমে-আসা তাদের উন্মত্ত, অন্ধ, সমর্থকেরা।
গ্যালারিতে বসে উপভোগ করে মানবতার ফেরিঅলা সম্প্রদায়।
মাঝে মাঝে তারা চোখ ঢেকে নেয় দু-হাতে, আবার
চোখ ফিরিয়েও নেয় কখনো কখনো।
মরতে ভয় পায় না আর সে-দেশে শিশুরা
স্রেফ মরে যেতেই তো চায় তারা।
শুধু মরতে চায় আস্ত, টুকরো টুকরো হয়ে নয়।
তাদের একমাত্র ভয়
কুটি-কুটি হয়ে ছিঁড়ে যাওয়ার।
সেই দেশে এক ঝটকায় খসিয়ে দেওয়া হয় মানুষের গড় পরমায়ু—
পঁচাত্তর থেকে পঁয়ত্রিশে।
মে দিবসের মিছে আশ্বাস
ফারুক ফয়সল
শক্ত খসখসে আবরণের ভিতরে দুধ বরণ তরল ধান
জীবন-চক্রের অভিযানে পরিপক্ক সোনালি খাদ্য দান
প্রতি ছড়ায় কৃষকের শ্রমের কত ফোঁটা আছে স্বেদ, জানা নেই।
আমাদের প্রধান খাদ্য ভাত, অথচ কৃষকের পাতে সংবৎসর পড়ে না!
কত তাপমাত্রায় ফার্নেসে লোহা গলে হয় তরল ইস্পাত দৃঢ় শক্তি
কোদাল, কড়াই, বেলচার ছাঁচে ঢালতে চামড়া-মাংস ঝলসে যাওয়ার ঝুঁকি
কারখানার মালিক মুনাফা জানে, শ্রমিকের পেশী ক্ষয়
নয়।
ধনীর তনয়া বহুমূল্য ড্রেসারে ঘুরে ঘুরে নিজেকে সাজায়,
দেখতে পায় না মূলোৎপাটন থেকে গাছ কাটা হয়ে সিজনড্ হওয়ার বেদনা,
তক্তার গা বেয়ে কাঠের গুড়া নয়, স’মেশিনে বৃক্ষের বুক চিরে রক্ত হয়ে নামে!
শিকাগো শহরে হে মার্কেটে শ্রমিকদের আত্মত্যাগের বয়ান
আজো আমরা দেশে দেশে গলা তুলে বলি, স্মরণ করি সে বলিদান
মুনাফার বাজারে শ্রমিকের শরীর পাতন নজর এড়িয়ে যায়
শিক্ষা-চিকিৎসা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান সব হবে একদিন,
এই আশায় থেকে বছর বছর চতুর নেতার বাণী শোনে অভুক্ত শ্রমিক!
প্রয়াত ক্রীতদাসদের মেহনত
মঈনুস সুলতান
চকমিলান এ অট্টলিকার সামনে এসে দাঁড়াই প্রায়
প্রতিদিন, মাঝেমধ্যে ঢুকেও পড়ি, হয়তো আজ দেখবো নতুন
কোন শৈলীর কারিকুরি—মনে প্রত্যাশাও জাগে ক্ষীণ।
শিল্পকলার রকমারি সম্পদে সমৃদ্ধ এ জাদুঘর, প্রতিটি কামরা
অলিন্দ ও দেয়ালগিরি হরেক বর্ণের মেঘজোৎস্নায় হয়ে আছে
পসর। আর্কাইভ ঘেঁটে জানাতে পারি, আঠারো শতকের শেষ
দিকে শতাধিক ক্রীতদাস, উদয়াস্ত খেটে নির্মাণ করেছিল
রিজেন্সি কেতার শ্বেতাঙ্গ অধ্যুসিত এ নিবাস। ভাবি—তাঁদের
পরিশ্রমের কথা কী লিপিবদ্ধ করা যেত না কোন ফলকে,
ফোটানো যেত না ভাস্কর্য—সংরক্ষিত মহার্ঘ কোন রকে?
বিষয়বস্তু-রিক্ত কিছু চিত্রের কম্পোজিশন ক্রিমসনের
বর্ণচ্ছটায় হয়ে আছে রজস্বলা আস্ত এক দেয়াল জুড়ে ঝুলছে
ন্যুড চিত্রকলা, চিত্রকরেরা মনে হয় নিয়েছিল নারীদেহ
ব্যবচ্ছেদের শপথ, সময় আসেনি কী দৃষ্টিভঙ্গি বদলের,
কেবলমাত্র শিল্পের জন্য শিল্প তো হলো ঢের, একটি
ক্যানভাসও কী প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না প্রয়াত
ক্রীতদাসদের মেহনত?
সূচকন্যা
নাহার মনিকা
গণিত শিখেছি আমি ঘাস বুনে বুনে
মাছের কাঁটার ধার দাঁতের আগুনে-
রসায়ন শিখে গেছি কড়াই, সালুনে
সন্ধ্যার সরলাংক, সোয়েটারে উল
সূচ গেঁথে এঁকে যাই আসল আর ভুল।
আমার দুঃখ থাকে না জমানো হাট
মুখ গুঁজে বেঁচে দেই বুকের তলাট।
আমারও আকাশ আছে দোষের বাতাসে
ফ্যাকাশে অন্ধকার ভেসে থাকা শ্বাস
আমিও আয়না দেখি, ম্লান ভুরু হাসে
বাসচাপা ঠেকা দেই, ছিঁড়ে যায় শাড়ি,
আমিই তো সূচকন্যা, আমিও বাহারি!
সেলাই মেশিনে তুলি সুরের দ্যোতনা!
আমার আঙ্গুলে আছে অজগর ফণা
আমিও মাথায় করে দশমনি ধান
থেঁতো, উড়ে- পুড়ে যাই তুষের সমান।
মানচিত্র
রুদ্রশংকর
যারা তৈরি করেছে আকাশ ছোঁয়া শহর
যারা মাটির বুক চিরে এনেছে নদী
আঘাত সহ্য করে বুনেছে ফসলের মায়া
তাদের হাতে থাকুক পৃথিবীর মানচিত্র
এই মুহূর্তে পোড়া রোদের নিচে
মেহনতি স্বপ্নগুলো ফুল হয়ে বেরিয়ে আসছে
শুধু ফুলের মালা কেন?
শুধু স্লোগানের কোলাহল কেন?
এই শহর, এই গ্রাম, এই আকাশে
শ্রমিকের ঘামে, কৃষকের ঘামে বৃষ্টি হোক
জেগে উঠুক নরম শান্তি
হাওয়ায় ভেসে আসুক নতুন দিনের গান
অথবা গানের মতো এক সাম্যের পৃথিবী।
সহস্রাব্দের রক্তঘাম
উদয় শংকর দুর্জয়
চোখের কর্ণিয়ায় রক্তঘাম, জটলাগা চুলে কবে জুটেছিল এক চিমটি সোডা
আর ঘামে ভেজা ছিন্ন কাপড়ের কথা না হয় থাক। চলো শুধু একটি দিনের জন্য
শ্রমজীবী হই। যেবুড়ো লোকটা প্রকান্ড ঠেলাগাড়ি টেনে নিতে পেশীর সাথে যুদ্ধ করছে
যে বৃদ্ধা তার বিকলাঙ্গ সন্তানের জন্য অন্যের বাড়িতে এঁটো বাসন মাজতে মাজতে
আংগুলের ফাঁকে ঘা বাঁধিয়ে বসেছে; মহাজনের রক্তচক্ষুতে নিষ্পেষিত যে বিধবার
কোনো গন্তব্য নেই শুধু শোষনের আড়ালে আরও বেশি শোষিত শুধু তাদের জন্য
একটা দিনের জন্য চলো শ্রমজীবী হয়ে উঠি।
এই আয়েশি যাপনের আড়ালে যাদের কব্জিতে পেশিতে জীবন্ত হয়ে আছে অনাচার,
কপালের ভাঁজে , কোঁচকানো চামড়ার গহ্বরে বিগত শ্রমজীবনের ইতিহাস আছে জমা
তারা আমার প্রপিতামহ। আমার পূর্বপুরুষের ক্লান্তি জড়ানো কোষ ঢেকে আছে অস্টিও আর্থ্রাইটিস ছোবলে, ঝুলে আছে স্পাইনাল কার্ডের সীমাপরিসীমায় হাজার বছরের
দাসত্বের নির্মমতা। চলো গাঁইতি চালিয়ে হাতের তেলোয় ঠোলা পড়া মানচিত্রে আবার শ্রমজীবী হয়ে উঠি। অন্তত একটা দিনের জন্য রক্তঘাম ঝরিয়ে পূর্বপুরুষকে স্মরণ করি।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন