https://www.prothomalony.com/

13170

literature

সাহিত্য

উত্তরের সাহিত‍্য-অটিজম সচেতনতা দিবস সংখ‍্যা

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৫ ০১:৩১

ভূমিকাঃ এপ্রিল মাস—অটিজম সচেতনতা মাস। এই মাস যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি মানুষ যেমন একক, তেমনি অটিজম স্পেকট্রামে থাকা প্রতিটি জীবনও এক একটি স্বতন্ত্র পৃথিবী। এই সাহিত্যপাতাটি শুধু কবিতা ও জীবনের টুকরো টুকরো অভিজ্ঞতার সংগ্রহ নয়! এটি এক ধরনের শ্রদ্ধার্ঘ্য, এক নীরব প্রতিবাদের ভাষা, এবং এক অন্তরাত্মার ডাক—যা শুনতে চায় না কেবল শব্দ, বরং হৃদয়ের স্পন্দন।

এখানে আমরা তুলে ধরেছি সেইসব মা-বাবার অশ্রু ও আশার গল্প, যারা নিঃশব্দ চাহনির মধ্যেও সন্তানের চোখে ভাষা খোঁজেন। তুলে ধরেছি সেই সন্তানদের কথন, যারা শব্দহীন থেকেও একান্ত নিজস্ব এক ভাষায় জগতকে অনুভব করেন। এবং তুলে ধরেছি কবিদের কণ্ঠ, যারা শব্দের কারুকাজে ছুঁয়ে দেন অটিজমের আলো ও ছায়ার অনুভূতির ক্যানভাস।

এই পাতা আমাদের আহ্বান জানায়-চোখ মেলে দেখতে, মন খুলে বুঝতে এবং হৃদয় প্রসারিত করে গ্রহণ করতে। অটিজম কোনো দুঃখের নাম নয়। এটি ভিন্নতায় সৌন্দর্যের আর্তি, বৈচিত্র্যের নিরব কবিতা।

ধন‍্যবাদান্তে-এইচ বি রিতা। 

 

 

 

 

না রোদ না বৃষ্টি 

রিজোয়ান মাহমুদ 

 

তোমাকে ব্যাকুল একখানা ছাতা ধরে 

বৃষ্টি ও রৌদ্রের খরতাপ থেকে সরিয়ে এনেছি ; 

তুমি না সইতে পার রোদ না বৃষ্টি 

তবু ছাতার নিরাপত্তার নিচে তুমি শান্ত - 

স্থিতধী অনেক ক্ষুব্ধ নও একেবারে 

তোমার দীর্ঘ উদাসীনতা আমার ভয়ের 

চিৎকারের স্নায়ুবিক রোগ 

অথচ কী গভীর চোখের পলক তীক্ষ্ণতা 

প্রতিদিন রাত দ্বিপ্রহরে দেখি; আকাশটা আত্মলীন 

সংকটে গোমড়া মুখো রাষ্ট্র - যেন মাতৃহীন দেশ, 

প্রান্তের ঠিকানা 

যেন প্রতিটি পাহাড় ছুঁয়ে নামে উন্মত্ত হাওয়া 

আমাদের পূর্বপুরুষের শাপে 

ভাবি, জাতির মস্তিষ্ক আজও কতটা ঢিলা 

প্রতিবন্ধকতা ঠোঁটে সংক্রমিত হলে ভাষা 

তীর্যক হারিয়ে যায় 

রোগটি ক্রমশ ব্যক্তি মানস চরিত্র হয়ে সমাজ রাষ্ট্রের 

অদ্বিতীয় অভিঘাতিনী। 

 

 

বয়ঃসন্ধি
রাবাত রেজা নূর

 

নাকের নিচে গোঁফের রেখা আমার শুধু করে ভয়
কোনো কিছুই ভাল্লাগে না হঠাৎ করে কি যে হয়!
নিজের কথায় চমকে উঠি গলার ভেতর অন‍্য স্বর
দমকা হাওয়া হঠাৎ করে আমার উপর করে ভর।

নাকের নিচে গোঁফের রেখা গালে বাড়ে ব্রণের দাগ
হঠাৎ করে সবাই যেন আমার কাজে বসায় ভাগ
পড়তে আমার ভাল্লাগে না ছুড়ে ফেলি পড়ার বই
ইচ্ছে করে দূরে কোথাও―একা একা বসে রই।

এমন যেন পাখির মতো কোথাও কোনো বাধা নাই
কেউ না জানুক ইচ্ছে করে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাই
দূরের আকাশ দূরের পাহাড় শুনি যেন পাখির গান
বন্ধ ঘরে ভাল্লাগে না― আঁতকে উঠে আমার প্রাণ।

কোথায় নদী শহর ছেড়ে পাখিরা সব যায় চলে?
আমি নাকি অন‍্য রকম– প্রায়ই আমার মা বলে
তুই আমার লক্ষ্মী আকাশ, তুই তো আমার পাখি
তুই আমার খোকন সোনা তোর আকাশেই থাকি। 

 

 

 

জন্ম বিচ‍্যূতিতে 

জেবুন্নেছা জোৎস্না 

 

যেন কিছু আলো সময়ের আগে 

অন্ধকার পৃথিবীতে ঝুপ নেমে আসে 

ভালো- মন্দের হিসাব না বুঝে নিস্পাপ হাসে! 

তুমি সেই আলোর সুগন্ধি ফুল গন্ধরাজ, 

হাসনাহেনা—

সফেদ সাদায় আলোকিত আমার বাগানে। 

তোমার অতল চোখে নীল নক্ষত্র বিস্ময় 

অবোধ মানুষ পায়না সেই রহস‍্যের খোঁজ, 

বোঝেনা তোমার অভয়ারণ্যের ভাষা— 

জন্ম বিচ‍্যূতিতে ভাবে ভয়ানক রোগ 

 

তুমি চির প্রস্থানের পোষাকের পবিত্র শুভ্রতা

এতোটুকু দোষ- দাগ নেই তাতে

আগরবাতি ধূপে যেন মানুষের আদলে দেবতা  

শ্বেত বিন্দুজলে কাঁপা রূর্যকিরণ, বিসর্জনের আগে

 

জগৎ -সংসারে কেউ তোমায় দেবদূত বলে 

আমি বলি, আমাদের বিশেষ সন্তান! 

তুমি অবহেলা বোঝ, ভালোবাসা বোঝ

বোঝাতে পারোনি শুধু কষ্টের যাতনা, 

আর নিজ স্বার্থটাকে বুঝে নিতে...!

 

 

 

 

অচীন অনুভবে

আহসান জামান

 

তোমার ভিতরে তোমাকে

তাড়িয়ে নিচ্ছ কোথায়!

তুমি কি জান তোমাকে?

 

শুধু অচল মুদ্রণের মত

পড়ে আছো যুবুথুবু

পৃথিবীর বুকে।

 

কাকে চিনে কাকে ডাক কাছে;

কাকেই বা দূরে ঠেলে, নিজকে

কর একেলা। একই পৃথিবীর

ভিতর তোমার নিঃসঙ্গ জীবন

কি খুঁজে কি বা হারিয়ে তুমি

কাঁদ একা; দূরপাল্লা ট্রেন

তোমার মস্তিষ্কে চলছে

অবিরাম; অচীন পৃথিবী

পথ; তোমার শ্রম

স্তব্দতা কুঁড়িয়ে আনে।

 

 

 

নিঃশব্দতারও থাকে সুর—সেটাই আমার সন্তানের গান

শামছুন ফৌজিয়া 

 

প্রত্যেক মানুষের জীবনের গল্প ভিন্ন এবং উত্থান পতন,সুখ দুঃখ,সাফল্য ব‍্যর্থতা তথা জীবনবোধ ভিন্ন জানি।ছোট্ট এই জীবনে প্রতিটি দিনই ভিন্ন কোন গল্প দিয়ে শুরু হয় যা কখনো কল্পনা ও করতে পারি না, কখনো মোকাবেলা করি, কখনো উপভোগ করি।

আমার দুই ছেলে ওয়ালী ওসমানী ও আবীর ওসমানী।দু'জনেই বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন এবং তারা বর্তমানে এডাল্ট হলেও ভেতরে একদম শিশু।আমার বড় ছেলের জন্ম স্বাভাবিক ভাবে হলেও এক বছর বয়সে তার ঘাড় সোজা হয়নি। আই কন্ট্রাক্ট একদম কম ছিল, নয় মাস বয়সে জ্বর থেকে খিঁচুনির শুরু হয়েছিল যা এখনও আছে।তিন বছরে হাঁটতে শিখেছে, প্রায় চার বছর পর্যন্ত শুধু মাত্র লিকুইড খাবার খেয়েছে সেই সাথে জন্মের পর প্রতি রাতে প্রচুর কান্না করত এবং ভোরের দিকে ঘুমালেও ঘুম খুব হাল্কা ছিল।

 

আমি তখন দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নতুন চাকরি পেয়েছি সেই সাথে মাস্টার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। কর্মস্থল গ্রামে থাকায় বাবার বাড়িতে থেকে কাজ করতাম।আমার ছেলে ওয়ালীকে আমার মা বাবা, ভাই বোন দেখাশোনা করতেন।ছেলের খিঁচুনি শুরু হলে প্রথমে স্থানীয় ডাক্তারের কাছে ও পরে সিলেট শহরের বিখ্যাত শিশু নিউরোলজিস্ট ডাঃ মনজ্বির আলীর কাছে চিকিৎসা সেবা নেই। ঘন ঘন খিঁচুনির কারণে ছেলের অবস্থা খুবই খারাপ থাকত।ছেলে সব খাবার খেতে পারত না বলে অপুষ্টির ও জ্বরের কারণে ব্লাডে হোয়াইট সেল বেড়ে হিমোগ্লোবিন কমে যায়। ছেলের ঘন ঘন ডায়রিয়া হয়,একমাস ডায়রিয়ার চিকিৎসা করেও উন্নতি না হওয়ায় ডাক্তার ক্লিনিক থেকে ঘরে নিয়ে আসার পরামর্শ দেন। প্রতি মাসেই ক্লিনিকে ভর্তি হতে হত এবং ছেলের হিমোগ্লোবিন কমে গেলে ব্লাড দিতে হতো।ডাঃ মনজ্বির আলীর কাছে আমি ঋণী, তিনি রেফার করেছিলেন ছেলেকে ঢাকায় শেরেবাংলা নগরের শিশু হাসপাতালের শিশু বিকাশ কেন্দ্রে চিকিৎসা করাতে। শিশু বিকাশ কেন্দ্রের  ডাক্তার নায়লা হক তাঁর সহপাঠী ছিলেন এবং মনজ্বির সাহেবের ব‍্যক্তিগত অনুরোধে আমাকে অটিজম কি তা জানতে সাহায্য করেছিলেন। শুরু হয় চিকিৎসা এবং এই প্রথম আমি জানতে পারলাম অটিজম বলে কিছু আছে। এবং সেইদিন থেকে আমি একটু একটু করে মানসিক ভাবে তৈরি হই পরবর্তীর জন্য। 

 

আমি টুকটাক লেখালেখি করতাম, তা ছেড়ে দিলাম। স্বামীর বাড়ি থেকে বলা হল চাকরি ছেড়ে দিয়ে ছেলের যত্ন নিতে, আমি বহু চেষ্টা করেও চাকরি ছাড়তে পারিনি। কেন জানি মনে হয়েছে আমার নিজের জন্য চাকরি করাটা খুব জরুরি।এই সময়ে অনেকেই ছেলের অসুস্থতার জন্য আমাকে দায়ী করেছে, আমাকে কল্পিত কুকর্মের ফলভোগে দণ্ডিত করেছে যা ভেতরে ভেতরে ক্ষতবিক্ষত করলেও মুখে কুলুপ দিয়ে রাখতাম। ছেলের চিকিৎসার জন্য শহরে হাজবেন্ডের বাসায় থাকাকালীন সিইনএড কোর্সে ভর্তি হই। আমার মা তাঁর  কাজের সহযোগীকে আমার ছেলের জন্য দেওয়ায় টিচার্স ট্রেনিং করতে সুবিধা হয়। বড় ছেলের জন্মের পাঁচ বছর পর ছোট ছেলের জন্ম হয়, জন্মের আগেই শহরের বিশিষ্ট গাইনি ডাক্তারকে বলেছিলাম এমন কোন টেস্ট থাকলে করিয়ে নিতে যাতে জানা যায়, পরের সন্তান সেইম অটিস্টিক হবে কি না? তিনি চিকিৎসা ও ল‍্যাব টেস্টে জানালেন কোন সমস্যা নেই।  এরপর দ্বিতীয় সন্তানের জন‍্য আগ্রহী হই। নির্দিষ্ট সময়ে আবীরের শিশু সুলভ বিকাশের ঘাটতি দেখে আবারো নিউরোলজিস্টের কাছে গেলে তিনি ঢাকায় পাঠান। আবারো জানতে পারলাম, আমার দ্বিতীয় সন্তান অটিস্টিক, এই সময়ে আমি শুধু চাকরিটা বাঁচিয়ে রেখে জীবন থেকে বাকি অনেক কিছুই মাইনাস করলাম। 

বোনের এপ্লাইয়ে ২০১১ সালে আমেরিকায় এলে শুরু হয় ছেলেদের চিকিৎসা। এখানে আমার বড় ভাই আমার হয়ে ছেলেদের জন্য যা যা দরকার সবই করেছেন। ডাক্তারের ডায়াগনোসিসে জানতে পারলাম, এটি জেনেটিক ও স্নায়ুবিক রোগ-অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার, যাতে থাকে তীব্র বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা, অকথনক্ষমতা, যোগাযোগে অক্ষমতা, এবং নিজের নিরাপত্তা বা যত্ন বোঝার অক্ষমতা। এখানে আমি প্রথম ছেলেদের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারি এবং তাদের জন্য স্পেশাল স্কুল পাই, যেখানে তাদের জন‍্য 'সিক্স ওয়ান ওয়ান' ক্লাস ছিল। দেশে যে সুবিধা কখনো পাইনি সেই সুবিধাগুলো এখানে পেতে শুরু করলাম। যেমন, হোম কেয়ার, মেডিকেইড, স্কুল, চিকিৎসা ইত্যাদি। 

 

আমার ছেলেরা ডায়াপার পরে, তারা কমপ্লিটলি ডিপেন্ডেন্ট।তাদেরকে খাইয়ে পরিয়ে দিতে হয়, ছোট বাচ্চার মতো গোসল থেকে শুরু করে সবকিছু করিয়ে দিতে হয়। এর মধ্যে অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে, তাদের হাইস্কুল গ্র‍্যাজুয়েশন শেষ। বড় ছেলের জন্য 'ডে প্রোগ্রাম' পেলেও ছোট ছেলের জন্য এখনো অপেক্ষায় আছি।আমরা এদেশের নাগরিকত্ব পেয়েছি অনেক আগেই এবং সেই হিসেবে ছেলেরা 'ডিসএবিলিটি' সুবিধা পেয়েছে। 

এখানে আমি কাজের চেষ্টা করেও কন্টিনিউ করতে পারিনি, ছেড়ে দিতে হয়েছে। আমাকে সুপ্রিম কোর্ট ছেলেদের জন্য এক্সামাইন করে দিয়েছে যাতে ছেলেদের দেখাশোনা করতে পারি কোন বিনিময় ছাড়া। আমি কৃতজ্ঞ আল্লাহর কাছে, কৃতজ্ঞ আমেরিকার কাছে। 

 

যারা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুর মা বাবা একমাত্র তারাই বুঝতে পারবেন আমাদের জার্নি কেমন। আমি কোনদিন মন খারাপ করিনি ছেলেদের জন্য, আমি সব সময় তাদের জন্য হ‍্যাপি।আল্লাহ আমাদেরকে এই নিষ্পাপ শিশুদের জন্য সিলেক্ট করেছেন বলেই আমরা এদের মা বাবা হতে পেরেছি।আমার ছেলেদের ঘুমের ঠিক নেই, খাবারের ঠিক নেই, মেজাজের ঠিক নেই-তাতে কি? আমার একটাই কাজ ছেলেদের হাসিখুশি রাখা, আর এজন্যই তাদের জন্য কখনো বাইরে বেরোই, কখনো ঘরের ভেতর নিজের জগতে আনন্দ করি, হাসি, কাঁদি, গাই এমনকি নাচি ও অভিনয় করি! 

গল্পের এখানেই শেষ নয়। এ নিয়েও কথা শুনতে হয়, বয়স বেড়েছে আদিখ‍্যেতা যায়না! পরিচিত এবং নিজের কিছু মানুষের ধারণা আমেরিকায় এসে ছেলেদের জন‍্য তাদের ভাষায় ডলার পেয়ে লাল হয়ে গিয়েছি সেই জন‍্য এত হাসিখুশি থাকি। ওহে মানুষেরা, সন্তানের বিনিময়ে বাবা মা হয়ে কিছু পাওয়ার লোভে লোভী মা বাবা হওয়ার চাইতে নিঃসন্তান থাকা অনেক শ্রেয়। 

 

বিশ্ব অটিজম মাসে পৃথিবীর সকল অটিস্টিক মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দোয়া রইল, তাদের মা বাবার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা রইল। 

 

 

 

(দ্বিতীয় পাতার লেখা) 

 

 

অটিজমঃ ব্যক্তিগত যুদ্ধ বনাম স্বতন্ত্র কল্পনা 

ফারজানা নাজ শম্পা 

 

এপ্রিল মাস সারা বিশ্বে 'অটিজম' সচেতনতার মাস। অটিজম-মানুষের বিশেষ ও জটিল স্নায়ুবিক বিকাশজনিত একটি অবস্থা। আজ বিশ্বজুড়ে অটিজম যুক্ত মানুষদের প্রতি ধীর ধীরে গ্রহণযোগ্যতার একটি চোখ সৃষ্টি হচ্ছে; যদিও এখনো সেই প্রক্রিয়া খুব সন্তোষজনক হয়নিl 

আমার যমজ দুই সন্তানর মধ্যে বড় বাচ্চা আবরার হাসনাত এহসান বিশেষ চাহিদার কিশোর। আবরারকে ঘিরে আমাদের গত প্রায় পনেরো বছরের চ্যালেঞ্জিং পথ পাড়ি দিতে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছেl আড়াই বছর বয়সে ওর স্বাভাবিক হতে ব্যতিক্রম ধর্মী আচরণের ফলে আমরা ওকে নিয়ে হ্যালিফ্যাক্স কানাডার চিকিৎসকের শরণাপন্ন হই এবং কয়েক পর্যায়ের বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁরা অটিজমের সিদ্ধান্তে উপনীত হনl 

ছোটবেলায় আবরার প্রাকৃতিক বা পারিপার্শ্বিক সাধারণ পরিবর্তন সহজভাবে মানতে পারতো না। রাতের অন্ধকার হলেই ভয়ে চিৎকার করতোl তার আড়াই বছরে লক্ষ্য করেছি কোন সাধারণ শব্দ বা পরিবর্তনে তার তাৎক্ষণিক কোন প্রতিক্রিয়া ছিল না। একস্থানে নিজেকে গুটিয়ে রাখতো, শারীরিক ক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটাতো, একটি আঙ্গুল বা পা ক্রমাগত নাড়ানো এবং সরাসরি আমাদের দিকে না তাকিয়ে কোন কথপোকথনে বিরত থাকতো। আবরারকে স্পিচ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি ইত্যাদির সাথে আমরা সম্পৃক্ত করি, চিকিৎসকের নির্দেশ অনুসারে তার আচরণ নোট করে রাখতাম।কথোপকথনের বিকাশের জন্য তার স্পিচ থেরাপিস্ট ছোট ছোট বিষয়ে 'ডব্লিউ এইচ' প্রশ্ন করতো, যেমন-হুয়াট, হোয়ার, হুয়েন ইত‍্যাদি। তার সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার দিকটিও বিশেষ প্রাধান্য পায়l 

 

জীবন সঙ্গী এহসান খন্ডকালীন চাকরি আর গবেষণা ফলস্বরূপ আবরারের অতিরিক্ত প্রাইভেট থেরাপির অর্থ ব্যয়ভার বহন করা সেই সময়ে কানাডায় কঠিন হয়ে পরে। তাই একপর্যায়ে আমি আমার মা হতে প্রাপ্ত সম্পত্তি আর বিয়ের উপহারস্বরূপ গয়নার বড় অংশ বিক্রির সিদ্ধান্ত নেইl  আমরা অনেকটা দিশেহারা অবস্থায় সর্বশক্তিমানের উপর আস্থা রেখে শুধুমাত্র মনোবল এবং ইচ্ছেশক্তির উপর নির্ভর করে পুঞ্জীভূত কষ্টে বুকে পাথর চাঁপা দিয়ে পথ চলেছিl নিকট পরিজনদের ক্রমাগত আমার মাতৃপ্রদত্ত সম্পত্তি আর গয়না বিক্রির প্রেক্ষাপটে দেশ হতে নির্মম সমালোচনা বিস্মিত করেছিল, নিত্যসংগ্রামের কোন প্রকারের তেমন সহযোগিতা না করে আমাদের শান্তির স্থানটি বিঘ্নিত করার আপ্রাণ চেষ্টায় মত্ত ছিলেন অনেকেইl অপরের দুঃখ, সংগ্রাম চ্যালেঞ্জ কিছুটা হলেও হৃদয়ঙ্গম করে সমব্যথী না হয়ে অনেকেই তাকে দূরে সরিয়ে দেন, যা অমানবিক এবং লজ্জাজনক। 

আবরারকে ঘিরে ব্যক্তিগত জীবনযুদ্ধের পথে চলছি আমরা তিন যোদ্ধা, আমি এহসান আর আবরারের দশ মিনিটের ছোট ভাই রাফি। আর সেই সংগ্রামে আবরারের হাসি ভরা সরল সুন্দর অভিব্যাক্তি আমাদের একমাত্র প্রেরণা উৎসl রাফি স্কুল শুরু করেছে ভাইয়ের সাথেই এক বছর পরে, যাতে সেই সময় আবরারের প্রাথমিক দীর্ঘমেয়াদি থেরাপির কিছুটা অংশ সমাপ্ত করতে পারে। 

 

আবরার, রাফির সাথেই বর্তমানে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার  মূলধারার স্কুলেই যাচ্ছে। তবে সপ্তাহে এক বা দুই দিন স্কুলের বিশেষ সহায়তা পাচ্ছে। আমরা এর বাইরে নিজেরা আচরণ নির্ভর থেরাপির সাহায্য নিচ্ছি। বার বার  হাত নাড়ানো বা কোন আঙুলের ক্রমাগত মুভমেন্ট করলে আমি প্রশ্ন করি 'এটা কি আব্বু?' উত্তরে সে জানায় 'আমার সাথে একজন জিমন্যাস্ট' আর একজন বার্গারে পেটি ভাজছে আমি সেটি দেখছিl অনুভব করি আবরারের নিজস্ব মজাদার  এবং একান্ত বৈচিত্রমণ্ডিত সৃষ্টিশীল ভুবন আছেl সেন্সরি কয়েকটি ইস্যু থাকার জন্য সে প্রায় নয় বছর পর্যন্ত স্বাভাবিক প্রোটিন ও আঁশসমৃদ্ধ ফলমূল জাতীয় কোন খাবার খায়নি। আমরা খুব নরম ফল,নরম ডিম আর এহসানের হাতে বানানো রুটি বা নরম পরোটা সামান্য খাইয়েছিl 

তবে বর্তমানে সে স্বাভাবিক খাবার এবং বিভিন্ন দেশের খাবার বেশ আগ্রহভরে খাচ্ছে আর বৈশ্বিক ভূগোল, পতাকা ও খাদ্য সংষ্কৃতিভিত্তিক তার আগ্রহের গন্ডিকে ক্রমাগত বিকশিত করছে। এভাবেই অটিজম এখন একটি বিস্ময়কর ক্ষেত্রবিশেষে জটিল এবং আনন্দময় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আমাদের জীবনের অত্যাবশ্যকীয় অনুসঙ্গে পরিণত হয়েছে। 

 

 

 

আমার ছেলেঃ তার সাথে অভিজ্ঞতা                             

রুপা খানম                                              

 

আমার ছেলে নাফি অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে আছে।এটি একটি জটিল স্নায়ুবিক বিকাশসংক্রান্ত রোগ। অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার মূলত একটি বিস্তৃত পরিসরের কথা বলে, যেখানে প্রতিটি ব্যক্তির অভিজ্ঞতা আলাদা এবং এককভাবে নির্ধারিত হয়। একাধিক ব্যক্তি অটিজমে আক্রান্ত হলেও তাদের চ্যালেঞ্জ ও উপসর্গ একে অপরের সঙ্গে মেলে না। বরং প্রত্যেকে এই স্পেকট্রামের একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে অবস্থান করে। অটিজম কয়েক ধরনের হয়ে থাকে, যেমন-অ্যাসপারগার সিনড্রোম, অটিস্টিক ডিজঅর্ডার, পারভেসিভ ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার, চাইল্ডহুড ডিজইন্টিগ্রেটিভ ডিজঅর্ডার, রেট সিনড্রোম। তবে আধুনিক গবেষণায় এই প্রকারভেদ নিয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে, যা এক কথায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। 

 

দুই বছর আট মাস বয়সে আমার ছেলের এই সমস‍্যা ধরা পরে এবং তখন থেকেই আমি নানান ভাবে চেষ্টা করে গেছি তাকে অন‍্য বাচ্চাদের সাথে সংযুক্ত করে শেয়ারিং কেয়ারিং-এ আগ্রহ বাড়াতে। সব কিছু খেলার ছলে শেখানোর চেষ্টাই ছিল আমার ধ‍্যান। খাওয়ার ব‍্যাপারে নিউট্রিশন যুক্ত খাবার বেশি দেওয়ার চেষ্টা করেছি। অটিজম সনাক্ত বাচ্চারা সামাজিক বিকলতা, কথা বলার প্রতিবন্ধকতা এবং সীমাবদ্ধতা সহ পুনরাবৃত্তিমূলক এবং একই ধরনের আচরণ দ্বারা পরিচালিত হয়। তাদের ব্রেনে সীমাবদ্ধতা থাকে সব কিছু প্রকাশ করার। একা একা নিজের থেকে শিখতে পারে না অনেক কিছুই। সবার কাছ থেকে সরে গিয়ে সে তখন তার একটি নিজের বলয় তৈরি করে। কেউ অল্প কথা বলে, আবার কেউ কথা বলতে পছন্দই করে না। কেউ কেউ কথা বলে কিন্তু অর্থহীন। 

আমার ছেলে যেহেতু অটিজম, এডিএইচডি তার চঞ্চলতা ছিল প্রচুর। বসতে বা মনোযোগ দিতে চাইত না, ছুটাছুটিতে অস্থির থাকত। যখন ওর বয়স সাত বছর, স্কুল থেকে চাপ আসে নিউরো ডাক্তার দেখানোর জন‍্য। যেহেতু তার অস্থিরতা লেখাপড়ার মনোযোগ দিতে পারত না।এক সময় শিক্ষকদের সেই অভিযোগ মাথায় নিয়ে ছুটে চললাম নিউরো ডাক্তারের কাছে। এ ধরনের শিশুর জন‍্য নিউরো ডাক্তার পাওয়া কঠিন।অবশেষে পেলাম একজন। তিনি নাফিকে ঔষধ দেয়ার পরামর্শ দিলেন। কয়েকজনের সাথে পরামর্শ করলাম কি করলে ভাল হয়, যাদের সন্তানদের কেউ কেউ এমন সমস্যায় ছিল। তারা কেউ ঔষধের পক্ষে, কেউ বিপক্ষে। তবে আমার ক্ষেত্রে একা বাচ্চাটাকে পালন করা খুবই কঠিন ছিল, যার কারণে আমি নাফিকে ঔষধ দেওয়া শুরু করলাম। ঔষধ দিয়ে ভুল করেছি কি ঠিক করেছি তা আমি আজও বুঝতে পারিনি। তবে সেই মুহূর্তে ঔষধের দরকার ছিল। ঔষধের পর কয়েক বছর সে অনেক শান্ত ছিল, অনেক কিছু শিখতে পেরেছে।হাই স্কুলে পর্যন্ত একদিনও স্কুল বাদ দেইনি। শেষের দিকে হাই স্কুল গ্র‍্যাজুয়েশনের সময় সে আবার আগের মত অস্থির আর রাগী হয়ে উঠতে থাকল। তাকে সামলাতে থেরাপি, শিক্ষক এবং আমি হিমশিম খেয়ে গেলাম। সে অবস্থায় তাকে এডাল্ট নিউরো বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে গেলাম। সে ডাক্তার তার উচ্চতা আর ওজনের কারণে এক সাথে অনেক হাই ডোজ ঔষধ দিলেন। এতে করে আমার ছেলের মারাত্নক সমস‍্যা শুরু হয়।ঔষধের ওভার ডোজে তার শরীরে অ‍্যাকাথেজিয়া দেখা দেয়। সে এখন হসপিটালে এডমিট, প্রায় দেড় বছর যাবত সেখানেই চিকিৎসা নিচ্ছে। 

 

আমার পরামর্শ, ঔষধ ছাড়া অটিষ্টিক শিশুদের সাহায্য করা গেলে ভাল। আর ঔষধ প্রয়োগ করতে হলেও ডোজ বাড়ানোর আগে রক্ত পরীক্ষা করা দরকার। যদিও অটিজম পুরাপুরি নিরাময় কখনো সম্ভব না, তবে সঠিক টেস্ট, চিকিৎসা, থেরাপি এবং কাউন্সেলিংএর মাধ্যমে শিশুদের উন্নতি করা যায়। শেখানো গেলে অটিস্টিক হওয়া সত্তেও স্বাভাবিক জীবনের সাথে মানিয়ে চলতে সক্ষম হয় তারা। এইক্ষেত্রে বাচ্চাদের সবচেয়ে বেশি সাহায্য করতে পারে নিউরোজেন,থেরাপিস্ট, জেনেটিক এক্সপার্ট এবং কাউন্সিলর। তারা আপনার শিশুর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে বদ্ধ পরিপকর। তাদের অধিকার ও মর্যাদা সুরক্ষায় বিশেষ চাহিদাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা অপরিহার্য। যত তাড়াতাড়ি আরলি ইন্টারভেশন করতে পারবে তত শিশুটি উপকৃত হবে।

 

 

'অটিজম সচেতনতা' মাসের প্রত‍্যাশা 

কুলসুম আক্তার সুমী

 

একবিংশ শতাব্দিতে এসে আধুনিক বিজ্ঞান পৃথিবীর অনেক রহস্যের কারণ উন্মোচন করেছে। মাত্র তিন সপ্তাহ আগে মহাকাশ স্টেশনে আটকা পড়ার নয় মাস পর ফিরে এসেছেন নাসার বিজ্ঞানীরা। কত কত নব নব আবিষ্কারে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন তারা নানা অজানাকে যা অতীতে রহস‍্য বলেই বিবেচিত হতো। তবে কিছু কিছু খুব চেনা পরিচিত রহস্য রয়েছে এখনো অনাবিষ্কৃত। তেমনই এক রহস্যের নাম 'অটিজম।' কেন এটি হয় কিংবা কিভাবে এর চিকিৎসা করা যায়, আধুনিক বিজ্ঞান এ প্রশ্নের এখনো কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। 

১৯৪৩ সালে মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরে অবস্থিত জন হপকিন্স হাসাপাতালের মনঃচিকিৎসক ডঃ লিও ক্যানার ১১ টি মানসিক সমস্যাগ্রস্ত শিশুর আক্রমণাত্মক ব্যবহারের সামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন এবং এ ধরনের সমস্যার নাম দেন "আর্লি ইনফেনটাইল অটিজম'। সেই থেকে 'অটিজম' নামে এই সমস্যাটি চিহ্নিত হলেও এর বিষয়ে সাধারণের আজও কোনো স্বাভাবিক বা যৌক্তিক ধারণা নেই। পৃথিবীর উন্নততর দেশে অবস্থান করা অনেকেও এটাকে মানসিক বিকৃতি বলে মনে করে অথচ অটিজম মোটেই সে রকম কিছু নয়। 

 

অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার একটি স্নায়ুবিকাশজনিত সমস্যা, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ স্থাপনে ব‍্যর্থতা, আশপাশের মানুষজনের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদানে সমস্যা এবং একই ধরনের আচরণের পুনরাবৃত্তি করা। এই শিশুদের ভাষা শিখতে সমস্যা হয়, শব্দ বা স্পর্শের প্রতি অতিসংবেদনশীলতা কিংবা সংবেদনহীনতা থাকতে পারে। আবার কখনো আচরণের সমস্যাও থাকে। অনেকে নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না, চোখে চোখ রেখে তাকায় না; কারও কারও অটিজমের সঙ্গে এডিএইচডি (অতিচঞ্চলতা ও  অমনোযোগিতা) বা খিঁচুনি থাকতে পারে। 

কারো কারো ক্ষেত্রে দু' একটি বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে কারো ক্ষেত্রে একই সাথে অনেকগুলো বিষয়ও পরিলক্ষিত হতে পারে। তবে, স্বতঃসিদ্ধভাবে কোন কোন বৈশিষ্ট থাকবে তা বলা সম্ভব নয় কারণ অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রতিটি শিশুই ভিন্ন। ফলে তাদের পরিচালনা, শিক্ষা কিংবা দেখভাল করার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়। 

 

অটিস্টিক শিশুদের যত্ন/ পরিচর্যা সহজ বিষয় নয়। এক্ষেত্রে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি সেই শিশুর পরিবারটিকে আরো বেশি ক্ষতবিক্ষত করে। আমি নিজে একজন অটিস্টিক সন্তানের মা। প্রাথমিক অনেক ধাক্কা কাটিয়ে এবং এ বিষয়ে পড়াশুনা করে একটা বিষয় নিশ্চিত জেনেছি, অটিজম কারো কারণে হয় না। তার মানে হলো আপনার যদি একজন অটিস্টিক শিশু থাকে তার জন্য মা বাবা হিসেবে আপনি কোনভাবেই দায়ী নন। এটা যে কারোই হতে পারে। আমেরিকার হাসপাতালের ডাক্তার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ঘরে অটিস্টিক শিশু ব্যক্তিগতভাবে নিজে দেখেছি। সন্তান জন্মানোর আগে পরে কোন রকমের অসচেতনতা, অবহেলা এদের মধ্যে ছিলো না বা আদৌ নেই। 

যা হোক, এ ধরনের শিশুদের সামাজিক অবস্থা খুবই নাজুক। এখনো এদেরকে পাগল, মানসিক রোগী কিংবা অস্পৃশ্য ভেবে দূরে রাখতেই অভ্যস্ত আমাদের সমাজ। অনেক সময় বাবা মা ও সেই সামাজিক চাপ সহ্য করতে না পেরে এদের সাথে অমানবিক আচরণ করে ফেলে। কিন্তু পারিবারিক বা সামাজিক ভাবে এদেরকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে বাবা-মাকেই সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। এক্ষেত্রে সন্তানের এ অবস্থার জন্য নিজেকে দায়ী ভাবা থেকে বেরিয়ে এসে বরং সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত আমানত ভাবতে পারলে তবেই তা সম্ভব। অনেক বাবা-মা হীনমন্যতা বোধ থেকে পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠান বর্জন করেন। এসব বঞ্চনার জন্য আবার সেই সন্তানটিকেই দায়ী করেন। নিজেদেরকেই এই হীনমন্যতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। 

 

আপনার যদি একজন বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুসন্তান থাকে তবে আপনাকেই বলছি, মনে করুন, সৃষ্টিকর্তা আপনার কাছে এই বিশেষ সন্তান আমানত রেখেছেন। ভাবুন, এর মাধ্যমে আপনার ধৈর্যের পরীক্ষা হচ্ছে, আপনাকে চরম ধৈর্যশীল হবার সুযোগ দিয়েছেন। চিন্তা করুন, আপনার শক্তি সম্পর্কে; সারা দুনিয়া ফেলে দিলেও এই সন্তানকে নিয়ে আপনি একাই লড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন-

এই ভাবনাই আপনাকে বলবান করবে, সামনে বাড়ার প্রেরণা যোগাবে। আপনার সন্তানকে কারো করুণা বা অবহেলার পাত্র না করে একটা সহজ মানবিক জীবন দিবে। প্রতিটি অটিস্টিক বাবা-মায়ের মনে এমন অমিত শক্তির স্ফুরণ ঘটুক। এপ্রিল 'অটিজম সচেতনতা' মাস। এই মাসে এটাই হোক সচেতন মানুষের প্রত‍্যাশা। 

 

 

শ্রদ্ধা সেই মা-বাবাদের, যাদের প্রতিটি দিন একটি জয়

এইচ বি রিতা

 

প্রত্যেকটি শিশু এক একটি মহাবিশ্ব। আর অটিজম স্পেকট্রাম যুক্ত শিশুরা-যেন সেই নক্ষত্র, যাদের আলো একটু আলাদা, একটু নিঃশব্দ, একটু গভীর। তাদের বোঝা, তাদের ছুঁয়ে যাওয়া, তাদের সঙ্গে জীবনযাপন করা-এ এক অন্যরকম ভালোবাসার অভিজ্ঞতা। আর এই জগতে সবচেয়ে সাহসী, সবচেয়ে সহনশীল যোদ্ধারা হচ্ছেন সেই মা-বাবা, যাঁরা প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে নিজেদের সন্তানকে বোঝার জন‍্য, গড়ে তোলার জন‍্য, রক্ষা করার জন‍্য নিরন্তর সংগ্রামে নিয়োজিত।

বিকাশজনিত নিউরোডাইভার্সিটির এই শিশুদের পাশে থাকতে হলে, তাকে বেড়ে উঠতে সহায়তা করতে হলে, প্রতিদিন লড়তে হয় তার মা-বাবাকে। অটিজম যুক্ত শিশুর মা-বাবারা শুধুমাত্র অভিভাবক নন, তাঁরা গবেষক, থেরাপিস্ট, শিক্ষক, বন্ধু, নিরাপত্তার ছায়া, আবার সমাজের মানসিকতা পরিবর্তনের এক এক মানবিক বিপ্লবী। তাঁদের জীবন প্রতিনিয়ত সময়ের বিরুদ্ধে এক সংগ্রাম। সন্তানকে একটি শব্দ শেখানো, একটি চোখের দৃষ্টি বুঝে নেওয়া, একটি আচরণ বদলানো—এই ছোট ছোট কাজগুলোতেই থাকে বিজয়ের আনন্দ। 

 

তারা কথা বলে নীরবে, অনুভবে। একটি শব্দ না বললেও সেই শিশু জানিয়ে দেয় তার ভালোবাসা-হয়তো এক চাহনি দিয়ে, এক ঝলক হাসিতে, কিংবা হঠাৎ হাত ধরে টেনে নেওয়ায়। কিন্তু এই নিঃশব্দ পৃথিবীর মানে বোঝার জন্য যে ধৈর্য, যে সহনশীলতা, এবং যে মানসিক শক্তি প্রয়োজন, তা আমাদের কল্পনারও বাইরে। 

আবার ঠিক একইভাবে, প্রতিদিনের চ্যালেঞ্জের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও একরকম যন্ত্রণা। রাত জেগে সন্তানের অস্থিরতা সামলানো, সমাজের বঞ্চনা বা অবজ্ঞা সহ্য করা, আত্মীয়দের কটাক্ষের সামনে চুপ থাকা—এসব কিছু মিলে বিশেষ চাহিদার সন্তানদের মা-বাবারা প্রতিদিন এক নীরব যুদ্ধের সৈনিক হয়ে ওঠেন।

সমাজ যখন প্রশ্ন তোলে—"আপনার সন্তান তো স্বাভাবিক না?", তখন মা-বাবা কষ্ট পান। কিন্তু তবুও সন্তানকে ভালোবেসে, আগলে রেখে, বারবার সমাজকে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যান—"আমার সন্তানেরও অনুভূতি আছে, তার ভাষা ভিন্ন, কিন্তু সে অনুভব করে, ভালোবাসে, এবং সে যোগ্য সম্মানের।" 

এভাবেই তাঁরা দাঁড়িয়ে থাকেন সন্তানকে আগলে। তাদের হাসি, কান্না, ক্লান্তি-সবকিছুই চলে অন্তরালে, কারণ সামনে শুধু একটাই লক্ষ্য-সন্তানের ভালো থাকা।

 

এই অটিজম সচেতনতা মাসে, আমরা স্মরণ করতে চাই সেইসব রাতগুলো, যখন সন্তান কথা বলেনি, কিন্তু মা বুঝেছেন ক্ষুধা পেয়েছে। সেইদিনগুলো, যখন কেউ বুঝতে পারেনি কেন শিশুটি হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, কিন্তু বাবা ধৈর্য ধরে তাকে বুকে নিয়েছেন। আমরা শ্রদ্ধা জানাতে চাই সেই সব পরিবারকে, যারা অন্য সবার মতো "স্বাভাবিক" জীবন না পেয়েও, প্রতিটি মুহূর্ত ভালোবাসা আর বিশ্বাসে পূর্ণ করে তোলেন।

তারা কখনো ক্লান্ত হন না, এমন না। কখনো ভেঙে পড়েন না, এমন না। কিন্তু তারা উঠে দাঁড়ান-আবার, আবার, এবং আবার। কারণ, তারা জানেন, তাদের ভালোবাসাই সন্তানের সবচেয়ে বড় থেরাপি।

অটিজম কোনো দোষ নয়। এটি জীবনের এক ভিন্ন মাত্রা। চাঁদের গায়ে যেমন কিছু দাগ থাকলেও সে রাতের আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল থাকে, তেমনি এই শিশুরাও এক একটি দীপ্তিময় জ্যোতিষ্ক-যাদের আলো দেখতে হলে আমাদের চাই সহানুভূতি, হৃদয়ের চোখ, আর মানবিক মানসিকতা।

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন