https://www.prothomalony.com/
13085
literature
শিল্পচর্চার পথ কখনো সহজ নয়। একজন শিল্পীর জীবন ও অভিজ্ঞতা, তার চারপাশের সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি, প্রকৃতি এবং আত্মিক চেতনা—সব মিলিয়েই গঠিত হয় তার শিল্পভুবন। রঙের মাধ্যম যেমন শিল্পীর কাজকে প্রভাবিত করে, তেমনি তার ভৌগোলিক অবস্থান, আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশও গভীরভাবে তার শিল্পীসত্তাকে গড়ে তোলে। তেল রঙের গভীরতা, টেক্সচার এবং বহুমাত্রিকতা শিল্পীর কল্পনাকে বিস্তৃত করে তুলতে সাহায্য করে, আবার অ্যাক্রিলিক রঙের সীমাবদ্ধতা অনেক শিল্পীকে এই মাধ্যম থেকে দূরে রাখে। তবে রঙের মাধ্যম যাই হোক না কেন, শিল্পীর হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত থাকে তার আত্মপরিচয় এবং শিকড়।
আজ শিল্পঘর-এ দুজন চিত্রশিল্পীর গল্প থাকছে, যাদের শৈল্পিক কাজ ও ভাবনার অনুরণনে আপনারাও মুগ্ধ হবেন। আশাকরি 'শিল্পঘর' এর আজকের মূল্যায়নটি আপনাদের ভালো লাগবে।
ধন্যবাদান্তে_ রোকেয়া দীপা
শিল্প এক অন্তর্জাগতিক যাত্রা-চিত্রশিল্পী তারিক জুলফিকার

জীবনকে যখন কেউ কেবল সময়ের ক্যালেন্ডারে নয়, বরং মায়ার অলিন্দে উপলব্ধি করেন—তখনই একজন শিল্পী হয়ে ওঠেন সময়ের সাক্ষ্য, সমাজের বিবেক। এমনই এক শিল্পী তারিক জুলফিকার, যিনি মনে করেন—জীবন আসলে মায়া ছাড়া আর কিছুই নয়। এই মায়ার ভেতরেই জন্ম নেয় আকাঙ্ক্ষা, লালসা, হতাশা; যা মানুষের মনোজগতকে নিয়ন্ত্রণ করে, গড়ে তোলে তার পরিচয়, আবার ভেঙে দেয় সেই চেনা সত্তা। তারিক এই জীবনচেতনা, মানসিক দ্বন্দ্ব এবং আত্মানুসন্ধানকে নিজের শিল্পকর্মে ফুটিয়ে তুলেন দারুণ দক্ষতায়।
১৯৭৯ সালে খুলনায় জন্ম নেওয়া তারিক বেড়ে উঠেছেন বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়। তার বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে তিনি সমাজের নানা শ্রেণির, বর্ণের, ধর্মের মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, শিখেছেন বিভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার বৈচিত্র্য। এই ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা তার মানসিক জগৎকে করেছে বহুবর্ণিল এবং দার্শনিক চিন্তায় পূর্ণ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৪ সালে বি.এফ.এ এবং ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (UODA) থেকে ২০০৬ সালে এম.এফ.এ সম্পন্ন করেন তিনি।
তারিকের শিল্পচর্চার প্রাথমিক সময় কেটেছে ঢাকায়, ২০০৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত। এ সময়ে তিনি সিরামিক ডিজাইনার থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপন সংস্থা, মিডিয়া, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টসহ নানা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। কিন্তু তার শিল্পীসত্তা সবসময় তার কাজের বাইরেও খুঁজে ফিরেছে মানুষের মনোজগত, সমাজের অসঙ্গতি, দর্শন ও আত্মিক মুক্তির পথ।
তার উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ২০২০ সালের মহামারিকালে করা সিরিজ "বিউটিফুল সোল অফ ডেড সিটি", যেখানে করোনাকালীন সামাজিক সংকট, নিঃসঙ্গতা ও মৃত্যুভয় উঠে এসেছে তীব্রভাবে। এই কাজগুলোর মধ্যে তিনি তুলে ধরেছেন শহরের নিস্তব্ধতা, মানুষের আতঙ্ক, বিচ্ছিন্নতা ও ভেতরের আর্তনাদ। যেন শিল্পই হয়ে উঠেছে সেই সময়ের একটি দর্পণ।
২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে তারিক সপরিবারে পাড়ি জমান নিউ ইয়র্কে, যেখানে তিনি এখন নিয়মিত শিল্পচর্চা করছেন। নিউ ইয়র্কের বিভিন্ন গ্যালারি ও আর্ট ক্যাম্পে অংশ নিয়েছেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জ্যামাইকা সেন্টার ফর আর্টস লার্নিং (JCAL)-এ অংশগ্রহণ, যেখানে তার "Imagination and Realization of Nirvana" সিরিজের তিনটি চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। এই সিরিজে শিল্পী নির্ভানা বা পরম মুক্তির ধারণা—যা ভারতীয় ধর্ম ও দর্শনে গভীরভাবে নিহিত—তার নিজস্ব উপলব্ধিতে রূপ দিয়েছেন। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে গাঢ় রঙ ও মূল বিষয়বস্তুতে সাদার ব্যবহারে প্রতীকী ধাঁচে বোঝানো হয়েছে অস্তিত্ব, জন্ম-মৃত্যুর চক্র, এবং অতীত-বর্তমানের সেতুবন্ধন।
একইভাবে তার "গোস্ট গান" সিরিজ শিল্পীর সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সময়ের কঠিন বাস্তবতার প্রতিফলন। এখানে তিনি বন্দুক ও সহিংসতা কেন্দ্রিক এক মনস্তাত্ত্বিক বোধময়তা প্রকাশ করেছেন, যেখানে সমাজের অন্ধকার দিক এবং তা থেকে উত্তরণের আকাঙ্ক্ষা স্পষ্ট। শিল্পী এই কাজগুলোর মাধ্যমে মানুষের মনোজগত ও সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। প্রতিটি কাজেই তিনি রেখার ব্যবহার, রঙের প্রতীকী প্রয়োগ ও বিমূর্ত চিন্তার মিলনে তৈরি করেছেন এক নতুন শিল্পভাষা।
তারিকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ "Simulacrum", যা ২০০৭ সালে বাংলাদেশ জাতীয় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় প্রদর্শনীতে পুরস্কৃত হয়। এই ধারায় তিনি পোস্ট মডার্ন দর্শনের আলোকে তৈরি করেছেন এমন সব চিত্রকর্ম, যেখানে পুরাতন ঘটনার পুনরাবৃত্তি এক নতুন রূপে হাজির হয়। "Copy without original"—এই ধারণাকে কেন্দ্র করে তারিক বোঝাতে চেয়েছেন কীভাবে বর্তমান রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি আমাদের অতীতেরই প্রতিধ্বনি মাত্র, নতুন মোড়কে। ছবিতে ডানা মেলা এক মানবসত্তাকে সময়ের স্রোতে উড়ে যেতে দেখা যায়—যেন অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ এক অদৃশ্য রেখায় যুক্ত।
বর্তমানে তারিক কেবল চিত্রশিল্পেই সীমাবদ্ধ নেই। তিনি কাজ করছেন ভিডিও আর্ট, ফটোগ্রাফি, গ্রাফিক্স ডিজাইন ও ডকুমেন্টারি নিয়ে। পাশাপাশি 'মিউজিয়াম অফ আর্ট' থেকে আর্ট বিষয়ক বিভিন্ন অনলাইন কোর্স করছেন, যা তাকে সমসাময়িক শিল্পচিন্তা এবং আন্তর্জাতিক শিল্পচর্চার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করেছে।
তারিক জুলফিকারকে বোঝার জন্য তার কাজগুলোর দিকে তাকানো যথেষ্ট নয়; তার চিন্তাধারার গভীরে প্রবেশ করাও জরুরি। তিনি জীবনের মূল্যবোধ, দর্শন, আত্মিক চেতনা, সমাজের অস্থিরতা—সব কিছু একসূত্রে গাঁথেন তার ক্যানভাসে। তিনি মনে করেন, অতীতকে বুঝে ভবিষ্যতের পথ তৈরি হয়। তাই শিল্প তার কাছে কেবল রঙ আর রেখার খেলাই নয়—এ এক অন্তর্জাগতিক যাত্রা, নিজের ও সমাজের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহস।
এই শিল্পী নিজেকে এখনও নির্মাণ করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। এবং সেই নির্মাণের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের আরও অনেক "Simulacrum," আরও অনেক "Nirvana," আর হয়তো আরও অনেক "Beautiful Soul"। শিল্পের এই পথ চলায় তারিক জুলফিকার হয়ে উঠছেন আমাদের সময়ের এক দর্পণধারী শিল্পযোদ্ধা।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই শিল্প-আলমা লিয়া

"কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা, মনে মনে মেলে দিলেম গানের সুরের এই ডানা..."—এই লাইন যেন আলমা লিয়ার জীবনের এক নিখুঁত প্রতিধ্বনি। একজন স্বপ্নচারিণী নারী, যিনি জন্মেছিলেন ঢাকা শহরের এক রক্ষণশীল পরিবারে, কিন্তু সমাজের প্রতিটি রূঢ় বাস্তবতার মাঝেও নিজের ভেতরের আলোর প্রদীপ নিভতে দেননি। ছোটবেলা থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিলেন সমাজের বিভিন্ন অনিয়ম, বৈষম্য ও বাধাগুলো নিয়ে। সেই প্রশ্ন আর স্বপ্নই একদিন তাকে করে তোলে এক সংগ্রামী শিল্পী, যিনি জাগ্রত চোখে স্বপ্ন দেখেন এবং সাহসের সঙ্গে সেগুলো বাস্তবে রূপ দেন।
আলমা লিয়া শিক্ষাজীবন শুরু করেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজে, যেখানে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের কারুশিল্প বিভাগ থেকে অর্জন করেন স্নাতক ডিগ্রি। এই সময়েই তার শিল্পীসত্তা গড়ে ওঠে আরও গভীরভাবে। পড়ালেখা শেষ করে তিনি 'ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ নেটওয়ারর্ক'-এ প্রধান চিত্রশিল্পী হিসেবে কাজ শুরু করেন, যা তার পেশাগত জীবনের প্রথম ধাপ হলেও শিল্পীসত্তার মূল অন্বেষণ তখনও চলমান ছিল।
লিয়া ২০১৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করেন। নতুন একটি দেশে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম, যেখানে শিল্পচর্চা অব্যাহত রাখাটা সহজ ছিল নয়। কিন্তু জীবনের প্রতিটি বাধাকে শক্তিতে পরিণত করে তিনি নিজের শিল্পপথে হেঁটেছেন নিরন্তর। ২০২০ সালের বিশ্বব্যাপী মহামারীর সময়, করোনা থেকে বেঁচে ফিরে তার শিল্পজগতে আসে এক নতুন বাঁক। এই সময়ের অভিজ্ঞতা, জীবনের নশ্বরতা, অস্তিত্বের সংকট তার চিত্রকর্মে পায় নতুন মাত্রা।
এই পুনর্জন্মপর্বেই তিনি পান NYFA City Artist Corps Grants, যা তাঁর জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ পালাবদল। ২০২১ সালে নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা সেন্টার ফর আর্টস এন্ড লার্নিং-এ অনুষ্ঠিত হয় তার প্রথম একক চিত্র প্রদর্শনী। এরপর ২০২২ সালে তিনি জ্যামাইকা ভ্যাক্স (Jamaica Vaxx Scene) অনুদান পান। এর পাশাপাশি তিনি ৩৪ জন বাংলাদেশি-আমেরিকান শিল্পীকে নিয়ে "Memoir" শীর্ষক একটি গোষ্ঠীগত প্রদর্শনীর কিউরেশন করেন, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।
আলমা লিয়া অংশগ্রহণ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের অসংখ্য গ্রুপ এক্সিবিশন, ওয়ার্কশপ এবং পাবলিক আর্ট প্রজেক্টে। তিনি শুধুমাত্র একজন শিল্পী নন, বরং এক সাংস্কৃতিক দূত, যিনি তার শিল্পভাষায় তুলে ধরেন নারীর অভিজ্ঞতা, সমাজের দ্বান্দ্বিকতা এবং মানবিক উপলব্ধির গভীর রূপ।
তার শিল্পচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো 'মিক্সড মিডিয়া'-তে দক্ষতা। সাদা এবং সোনালী রঙের মিশ্রণে তিনি নিজ ক্যানভাসে নির্মাণ করেন এক ত্রিমাত্রিক অনুভব। তার 'দ্য লিজেন্ড', 'জার্নি', 'হোম', 'দ্য কনট্রোভার্সি', 'দ্য সেভিয়র' সিরিজগুলোর চিত্রকর্মে দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী ট্যাপেস্ট্রির অনুপ্রেরণা, ধাতব উপাদানের বিচক্ষণ প্রয়োগ, এবং বিমূর্ত ভাবনাগুলোর এক পরিশীলিত রূপ। এইসব মাধ্যম ও কৌশলের সংমিশ্রণে তার শিল্প হয়ে ওঠে একান্ত নিজস্ব—এক ধরনের আত্মপ্রকাশ যা একাধারে সামাজিক, দর্শনচিন্তামূলক এবং নান্দনিক।
লিয়া বিশ্বাস করেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই শিল্প, আর সেই শিল্পের মাধ্যমেই তিনি কর্ম ও আনন্দের সন্ধান করেন। তার কাছে জীবন মানেই সৃষ্টি, আর সৃষ্টি মানেই দায়বদ্ধতা। তাই তিনি চেষ্টা করেন প্রতিটি কর্মকে অর্থবহ করে তুলতে—হোক সেটা ক্যানভাসে, প্রদর্শনীতে কিংবা জীবনের প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজের মধ্যেও।
একজন নারী শিল্পী হিসেবে প্রবাসে দাঁড়িয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন বহু মানুষের অনুপ্রেরণা। তার সাহস, ধৈর্য, এবং শিল্পপ্রতিভা নতুন প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল পথচিহ্ন।
পরিশেষে বলা যায় যে, আমেরিকার মতো দেশে একজন শিল্পী পায় বহুমুখী সুযোগ, বিস্তৃত প্ল্যাটফর্ম, শিল্পের যথাযথ মূল্যায়ন এবং সার্বিক সহযোগিতা—যা তাদেরকে করে তোলে আরও সাহসী, অনুসন্ধানী এবং বিশ্বদর্শী। ভিন্ন সংস্কৃতি, ভাষা, আবহাওয়া, সৌন্দর্যবোধ এবং দর্শনের সংস্পর্শ একজন শিল্পীকে নতুন নতুন অনুভব দেয়। সে শিখে নিতে পারে অন্যরকম সৌন্দর্য দেখা, অচেনাকে আপন করে নেওয়া এবং বিচিত্র অভিজ্ঞতা থেকে সৃজনশীলতা আহরণ করা।
তবুও, যতদূরেই শিল্পী যাক না কেন—সে কখনো নিজের শিকড়কে ভুলে যায় না। সে বয়ে নিয়ে চলে নিজের মাতৃভূমির গন্ধ, তার সংস্কৃতি ও কৃষ্টির পরিচয়। আর সেখানেই শিল্পী ও শিল্পের আসল স্বার্থকতা—যখন তা শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রদর্শনী নয়, বরং আত্মার প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে। শিল্প তখনই সফল, যখন তা দর্শকের হৃদয়ে নাড়া দেয়, প্রশ্ন তোলে, সাড়া জাগায়। সেই শিল্পই চিরস্থায়ী, কালজয়ী। তাই বলা যায়, শিল্পী, তার রং, ক্যানভাস, সমাজ ও আত্মা—সবকিছু মিলিয়েই এক অন্তহীন যাত্রার নাম শিল্প।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন