https://www.prothomalony.com/

13035

literature

সাহিত্য

কবিতার জগতে মাসুম আহমদের 'একজন সার্টিফাইড কবি হওয়ার প্রস্তুতি'

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৫ ০১:১৪

"একজন সার্টিফাইড কবি হওয়ার প্রস্তুতি" মাসুম আহমদের প্রকাশিত প্রথম কাব‍্যগ্রন্থ। যার মধ্যে ৭৪টি কবিতা একত্রিত হয়েছে। প্রচ্ছদে আমায়া আহমদের আভা ছড়িয়ে থাকা এই বইটি, পঞ্চায়েত ও বুনন যৌথ প্রকাশনায় ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়। বইটি সংগ্রহ করার পরই মনে প্রশ্ন জেগেছিল, বইটির শিরোনাম এমন কেন? যাহোক, সম্পূর্ণ বইটি পাঠের পর সে প্রশ্নের উত্তর জেনে গেলাম। 

এক কথায় বলতে গেলে, "একজন সার্টিফাইট কবি হওয়ার প্রস্তুতি"-একদিকে যেমন সাহিত্যের নানান রূপ এবং ধারার মেলবন্ধন, তেমনি অন্যদিকে সমাজ ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের বিদ্রোহমূলক ছোঁয়া বহন করে। একটা নীরব প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরও রয়েছে কবিতাগুলোতে, সাথে রুপক উপমার যথাযথ ব‍্যবহার। 

শোষিত ও পরিশ্রমী শ্রেণির অবদান সমাজ খুব সহজেই ভুলে যায়। অথচ, সমাজের প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবানরা যখন প্রয়োজন পড়ে, তখন তাদের অবস্থান জাহির করে, ক্ষমতায় চোখ রাঙায়। তাই হয়তো কবি গদ্যের ঢেউয়ে আওয়াজ তুলেছেন, 'এই তো তোমরা সহজেই ভুলে যাও আমাদের ঘামে রচিত বেহুলা নদের শৈশব আর ঢেউয়ের কথা। আমরাও যে তোমাদের বাবুগিরি আর রাঙা চোখের ইশারা মনে রাখি সেরকম কিছু না।(কবিতা: বেহুলা নদ গুটিয়ে থাকে রাঙা শামুকের খোলসে) 

'হরিণশিশুরা আনমনে খেলেছে সাপেদের ছায়ার সাথে', 
যেখানে প্রগতিশীল চিন্তার সূক্ষ্ম দাগগুলো ফুটে উঠেছে। 

এরপর আসে "আমি তুমি এবং নিখিলেশ"-মুক্তছন্দে ৫৭ লাইনে রচিত দীর্ঘ প্রেম দ্রোহ, বিরহের কবিতা, যা ব্যক্তিগত আত্মঅন্বেষণ ও দায়বদ্ধতার সমন্বয়কে স্পষ্ট করে তুলে ধরে। চতুর্থ কবিতাটি, "অ্যাবস্ট্রাক্ট দৃশ্যাবলি", সংখ্যায়িত কবিতা। বইটির শুরুতেই আমি একটা বৈচিত্রময় গোছানোর অনুভূতি পেয়েছি, যেখানে কবিতারা নিজস্ব ছন্দ, ভাব এবং রঙে মিলিত হয়ে এক নতুন স্পন্দন সৃষ্টি করেছে। 

বইয়ের মধ্যে রয়েছে অসংখ্য বৈচিত্র্যময় কবিতা, যেমন "মোনাজাত"। 

'ঈশ্বর আগামীর খবর সম্পাদনা নিয়ে যখন খুব ব‍্যস্ত, 
আমি তখন বাজার থেকে ডায়েকি কিনে নিয়ে এসে
সেখানে স্পষ্ট অক্ষরে লেখার চেষ্টা করি-
মানুষ তার দুইহাত কেমন করে 
ইগল পাখির মতো প্রশস্ত করবে।' 

এই অংশে লেখক একটি রূপক ব্যবহার করে সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতার মর্ম স্পষ্ট করতে চেয়েছেন। এখানে 'ইগল পাখির মতো প্রশস্ত', কবি হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন, মানবজীবন যেন নিজের সর্বোচ্চ ক্ষমতা, উন্মুক্ততা ও স্বাধীনতা প্রকাশে সক্ষম হয়। হয়তো বলতে চেয়েছেন, ব্যক্তি তার নিজের পথ খুঁজে বের করতে এবং সমাজের নির্ধারিত নিয়ম-নীতি ও বাধাকে ছাড়িয়ে নিজস্ব সৃজনশীল ও স্বাধীন অভিব্যক্তিকে বিকশিত করতে পারে। 

"ঘরে ফেরার সময় হলো" কবিতায় তিনি লিখেছেন, 

'অবশেষে ব‍্যস্ত শহরগুলো পায় অফুরন্ত অবসর
সমুদ্রের ঢেউ মাথা তুলে তাকায়
উড়ন্ত এরোপ্লেনের দিকে।
রাতজাগা পাখিদের চোখ টলমল করে 
নিশাচর প্রাণীরা গোল হয়ে বসে আগুন পোহায়।' 

পরের অংশে,

'রাতের বেসুরা কান্না, আজীবন কয়েদি স্বপ্ন
প্রতারিত যুবতীর বেহিসাবী প্রেম
বকুল ফুলের পতিতা হয়ে উঠার গল্প...' 

কবিতায় কবি একধরনের স্থিরতা ও পরিণতির অনুভূতি ফুটিয়ে তুলেছেন। প্রথম অংশে 'শহরের অফুরন্ত অবসর, সমুদ্রের ঢেউয়ের উঁকি, এবং উড়ন্ত এরোপ্লেনের প্রতি তাকানো'-এইসব চিত্রকল্প এক বিষণ্ণ প্রশান্তি ও প্রতীক্ষার অনুভূতি। এখানে ব্যস্ততার শেষে এক নিস্তব্ধ মুহূর্তের ইঙ্গিত রয়েছে, যেখানে রাতজাগা পাখি ও নিশাচর প্রাণীরা একত্র হয়ে প্রকৃতিকেও যেন ক্লান্ত ও অপেক্ষারত রাখে। দ্বিতীয় অংশে 'রাতের বেসুরা কান্না, আজীবন কয়েদি স্বপ্ন, প্রতারিত যুবতীর বেহিসাবী প্রেম, এবং বকুল ফুলের পতিতা হয়ে ওঠার গল্প'-এইসব উপমা সমাজের দুঃখ, অবহেলা, ও নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে তুলে ধরে। প্রেম, স্বপ্ন, ও নিষ্পাপ সৌন্দর্য (যেমন বকুল ফুল) সময়ের সঙ্গে কীভাবে পরিবর্তিত হয় বা নষ্ট হয়ে যায়, তার ব্যথাতুর চিত্র এঁকেছেন কবি। এব কবিতাটি সমাজের ক্লান্তি, জীবনসংগ্রামের ব্যর্থতা, প্রতারণা এবং স্বপ্নভঙ্গের করুণ এক আলেখ্য, যা রাতের শান্ত নৈঃশব্দ্যের আড়ালে চাপা পড়ে থাকে। 

"আফসোস" কবিতায়, 

'এখানে সুন্দরী রমণীরা বিলবোর্ডে ঝুলে থাকে 
ঝাড়বাতিরা পাহারা দেয় তাদের সোনা গহনা 
রিফিউজি পুরুষ‌গুলো ড‍্যাবড‍্যাব অপলক তাকিয়ে
বিলবোর্ডের রমণীদের গলে পড়া সুন্দর উপভোগ করে।
আমি রিফিউজি পুরুষদের মাঝেমাঝে দূর থেকে 
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি, তারপর নিজেকে দেখি 
গুচির কালো চশমা আমাদের মাঝে 
কিছুটা তফাৎ সৃষ্টি করলেও, আমাদের মিছিল
আমাদের স্লোগানের ভাষা 
আমাদের ঘরে ফেরার ট্রেন সবই এক।"

'আফসোস' কবিতায় 'রিফিউজি পুরুষ' বলতে হয়তো কবি সমাজে বসবাসকারী এমন মানুষদের বোঝাতে চেয়েছেন যারা অনৈতিক, অমানবিক ও কামুক প্রবৃত্তির অধিকারী।

তারা বিলবোর্ডে প্রদর্শিত সুন্দরী নারীদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাদের সৌন্দর্য উপভোগ করেন, যা তাদের অন্তর্নিহিত কামনা ও লালসার চিত্র। কবিতায় 'বিলবোর্ডে ঝুলন্ত সুন্দরী রমণী'দের চিত্র এবং তাদের সোনার গহনার পাহারায় ঝাড়বাতির উল্লেখ ভোগবাদী সমাজের প্রতিফলন হতে পারে।  

'গুচির কালো চশমা' এই বাহ্যিক নৈতিকতার প্রতীক হতে পারে, যা তাদের আসল চরিত্রকে আড়াল করে রাখে। কবি নিজেকে এই রিফিউজি পুরুষদের মধ্যে খুঁজে পান, তারমানে 

কবি হয়তো বলতে চেয়েছেন যে, গুচির কালো চশমা তাদের মধ্যে সামান্য পার্থক্য সৃষ্টি করলেও অর্থাৎ এই বাহ্যিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, তাদের মিছিল, স্লোগানের ভাষা এবং ঘরে ফেরার ট্রেন সবই এক, যা ইঙ্গিত করে যে এই নৈতিকতার মুখোশের আড়ালে তারা সবাই একই ধরনের কামুক প্রবৃত্তির অধিকারী। 

সবশেষের দীর্ঘ কবিতাটি ছিল, "একজন সার্টিফাইড কবি হওয়ার প্রস্তুতি", যা আট পর্বে রচিত স‍্যাটায়ারমূলক একটি গদ‍্য কবিতা। চমৎকার একটা বিদ্রোপমূলক কাহিনি রয়েছে কবিতায়। লেখক এখানে কবি হওয়ার জন‍্য যারপরনাই চেষ্টা করছেন। প্রথমে একজন কবি হিসাবে লেখক নিজেকে ঘোষণা দেন। এ কথা শুনে শহরের কবি সর্দার ক্ষেপে যান, তাকে দরবারে ডেকে বলেন, সার্টিফিকেট ছাড়া কবি হওয়া যাবে না এবং আমার কাছ থেকেই তোমাকে কবি হওয়ার সার্টিফিকেট নিতে হবে। তারপর সর্দার তাকে এক মাস সময় দেন। এই এক মাসে লেখক আকাশ পাতাল থেকে বহু কিছু জোড়া দিয়ে একটা কবিতা তৈরি করেন, সেটাকে আবার রোদে শুকিয়ে ইস্ত্রি দিয়ে পরিপাটি করে সর্দারের কাছে নিয়ে যান। সর্দার কবিতার ঘ্রাণে ঘ্রাণে ওজন মেপে অবশেষে 'কবি সার্টিফিকেট' দেন। কিন্তু এখানেই শেষ হয়, লেখকের দেখা হয় আরেক সার্টিফাইড পাগলের সাথে। তিনি জানান, কবি হওয়ার আসল সার্টিফিকেট তিনিই দিয়ে থাকেন। লেখকের তো আক্কেল-গুড়ুম, এখন কি হবে!  আবারো সেই পাগলের কাছ থেকে কবি হওয়ার সার্টিফিকেট নিতে তাকে প্রস্তুতি নিতে হল, আর সেটা ছিল শরীরের কাপড় খুলে ছুড়ে ফেলার মাধ‍্যমে। অবশেষে লেখক, জনগনের কাছে দোয়া চান যেন তিনি সার্টিফাইড কবি হওয়ার পরই মরতে পারেন। 

এই দীর্ঘ স্যাটায়ারমূলক গদ‍্য কবিতায় লেখক মূলত বিদ্রোপমূলকভাবে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষপাতিত্ব, রীতিনির্দিষ্টতা এবং প্রথাগত কাঠামোর প্রতি সমালোচনা জানিয়েছেন। লেখক দেখাতে চান যে, 'কবির সার্টিফিকেট' পাওয়ার এই প্রক্রিয়া কতটা অযৌক্তিক ও নির্মম। একদিকে, একজন কবি হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে নিয়ম-কানুন ও বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, তা এক ধরনের নকল স্বীকৃতি ও বাহ্যিক স্বীকৃতির চর্চা; অপরদিকে, এই প্রক্রিয়া আসলে শিল্পকলার প্রকৃত সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করে।

লেখকের বিদ্রোহমূলক বার্তা হলো—প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি বা সার্টিফিকেটের পিছনে লুকিয়ে থাকা সত্যিকারের সৃজনশীলতা, স্বাধীনতা ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন যে, যদি কবি হওয়ার জন্য বাহ্যিক অনুমোদন বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে, তাহলে তা শিল্পের প্রকৃত মর্যাদা ও স্বাধীনতার অবসান ঘটাবে।

এবং আমি বলব, এই কবিতাটাই সম্পূর্ণ বইয়ের মূল‍্যবান এবং আকর্ষণীয় এক কবিতা যা আমাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছে। 

তবে, লেখকের অনেক কবিতায় ইংরেজি শব্দের ব্যবহার রয়েছে। বিদেশি শব্দের ব্যবহার উপযুক্ততা মূলত লেখকের উদ্দেশ্য, লেখার প্রেক্ষাপট এবং পাঠকের গ্রহণযোগ্যতার উপর নির্ভর করে। আমরা জানি, ভাষা ক্রমাগত পরিবর্তনশীল ও উন্নয়নশীল, যেখানে বিদেশি শব্দ প্রায়শই নতুন ধারণা বা ভাব প্রকাশে সহায়ক হয়। যদি বিদেশি শব্দগুলি লেখায় নতুন মাত্রা যোগ করে এবং পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করে, তবে তা উপযুক্ত। তবে, বিদেশি শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে লেখকের উচিত এই শব্দগুলির অর্থ বা প্রাসঙ্গিকতা পাঠকের জন্য স্পষ্ট করা। অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি বা বিদেশি শব্দ ব্যবহার করলে অনেক সময় তা ভাষার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস করতে পারে। এদিকে কবির খেয়াল রাখা দরকার। 

সবশেষে বলব, মাসুম আহমদের 'একজন সার্টিফাইড কবি হওয়ার প্রস্তুতি' কাব্যগ্রন্থটি আধুনিক বাংলা কবিতার এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন। বইটির প্রতিটি কবিতা সমাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন দিককে গভীরভাবে উপস্থাপন করে, যা পাঠকদের চিন্তা ও অনুভূতিকে প্রভাবিত করবে বলে বিশ্বাস রাখি। লেখকের সৃজনশীলতা, রূপক ব্যবহার এবং সমাজের প্রতি সমালোচনামূলক দৃষ্টিকোণ এই গ্রন্থকে বিশেষ করে তুলেছে। কবির জন‍্য শুভ কামনা। 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন