https://www.prothomalony.com/

12954

opinion

অভিমত

যাত্রা নিরাপদ হোক

প্রকাশ: ৩১ মার্চ ২০২৫ ১১:২৫


ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এই সময়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিজেদের গ্রামের বাড়ি, স্বজন আর প্রিয়জনের সাথে সময় কাটাতে ছুটে যান। কিন্তু এই আনন্দযাত্রা প্রায়ই ম্লান হয়ে যায় সড়ক, নৌ ও রেলপথের দুর্ঘটনায়। প্রতি বছর ঈদের সময় সংবাদ মাধ্যমে ভেসে উঠে হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলো-ভাঙা বাস, উল্টে যাওয়া লঞ্চ, রক্তাক্ত শরীর, আর্তনাদ। ঈদের এই পবিত্র সময়ে যাত্রা যেন মৃত্যুযাত্রায় পরিণত না হয়, সে জন্য পরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার ও সচেতনতা জরুরি।

বাংলাদেশের পরিবহন খাতের মূল সমস্যা হলো নিম্নমানের পরিষেবা ও নিরাপত্তাহীনতা। ঈদের সময় এই সমস্যা চরমে উঠে। প্রথমত, বেশিরভাগ বাস, লঞ্চ ও জাহাজের ফিটনেস সার্টিফিকেট থাকে কাগজে-কলমে। যানবাহনের ব্রেক, ইঞ্জিন, টায়ার বা নৌযানের ইঞ্জিন, লাইফ জ্যাকেটের বাস্তব অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক গাড়ি মেরামতের বদলে সাময়িক প্যাচ দিয়ে চালানো হয়, যা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। ২০২২ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে একটি বাসের ব্রেক ফেইল হওয়ায় ১৫ জন নিহত হন। দুর্ঘটনার পর তদন্তে দেখা গিয়েছিল, গাড়িটির ফিটনেস সার্টিফিকেট ছিল অবৈধ।

দ্বিতীয়ত, 'অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন' একটি নৈমিত্তিক ব্যাধি। ঈদের সময় লঞ্চ বা বাসে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী উঠানো হয়। যাত্রীরা দাঁড়িয়ে, রডের উপর ঝুলে, এমনকি গাড়ির ছাদে ভ্রমণ করেন। ২০১৯ সালে মেঘনায় একটি লঞ্চ ডুবে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যার প্রধান কারণ ছিল ওভারলোডিং। তৃতীয়ত, ‘বেপরোয়া গাড়ি চালানো’। ট্রাফিক পুলিসের রিপোর্ট অনুযায়ী, ঈদের সময় ৬০ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ গতি নিয়ন্ত্রণহীনতা ও সড়কে প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি চালানো। ড্রাইভাররা অতিরিক্ত ভাড়ার লোভে একটানা ১৮-২০ ঘণ্টা গাড়ি চালান, যা ক্লান্তিজনিত দুর্ঘটনা ডেকে আনে।
‘দায়িত্বহীনতা ও দুর্নীতি’ এসবের পেছনে প্রধান কারণ। পরিবহন মালিকরা অতিরিক্ত মুনাফা করতে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণে বিনিয়োগ করেন না। অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা টাকার বিনিময়ে ফিটনেস সার্টিফিকেট দেন।
 
ঈদের সময় প্রতিটি বাস বা লঞ্চ যত বেশি ট্রিপ করবে, মালিকের আয় তত বাড়বে। তাই, গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটি উপেক্ষা করে দৌড়ানো হয়। প্রতিযোগিতা ও লাভের মোহ বহু মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক যাত্রী সময় বাঁচানোর জন্য ওভারলোডেড গাড়িতেও উঠে যান। নিরাপত্তার চেয়ে সস্তা ভাড়া বা দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। যাত্রী সচেতনতা এখানে বিরাট ভূমিকা পালন করে। সময়ের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমে অনেক জীবন ঝরে যায় প্রতি বছর।    
এসব অব্যবস্থা প্রতিরোধে সরকারি ব্যর্থতা চরমে। বিআরটিএ বা নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের তদারকি দুর্বল। ট্রাফিক পুলিস ঈদের সময় চাঁদাবাজি বা ফর্মালিটিতে ব্যস্ত থাকে, বেপরোয়া ড্রাইভিং বন্ধে নয়।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার প্রভাব শুধু সংখ্যায় নয়, এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। পরিসংখ্যানে প্রতি বছর ঈদে ২০০-৩০০ প্রাণহানির কথা বলা হলেও এর পিছনে লুকিয়ে থাকে হাজারো পরিবারের অবর্ণনীয় কষ্ট। বাবা-মা হারানো শিশু, একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারানো পরিবার, পঙ্গুত্ব বরণ করা যাত্রী- এদের জীবন চিরতরেই  বদলে যায়। ২০২৩ সালে সিরাজগঞ্জে একটি বাসের সাথে ট্রাকের ধাক্কায় ২২ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যার মধ্যে ৮ জন ছিলেন একই পরিবারের সদস্য। ঈদের নতুন জামা কিনতে যাওয়া সেই শিশুদের লাশ তুলে দেওয়া হয়েছিল মায়ের হাতে।

যন্ত্রযানের ফিটনেস নিশ্চিতকরণ ব্যাপক প্রাণহানি প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ন পদক্ষেপ। প্রতিটি বাস, ট্রাক ও লঞ্চের বাধ্যতামূলক প্রি-ঈদ চেকআপ করুন। ফিটনেসবিহীন যানবাহন জরিমানা বা বাতিল করুন। তদারকিতে তৃতীয় পক্ষ (প্রাইভেট মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার) যুক্ত করুন, যাতে দুর্নীতি কমে। ডিজিটাল টিকেটিং সিস্টেম চালু করুন, যাতে সিটের বেশি টিকেট বিক্রি না হয়। লঞ্চ ও ফেরিতে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে যাত্রী সংখ্যা মনিটর করুন। ড্রাইভারদের জন্য বাধ্যতামূলক মেডিকেল চেকআপ ও রেস্ট ইন্টারভাল (প্রতি ৫ ঘণ্টায় ৩০ মিনিট বিশ্রাম) নিশ্চিত করুন। গাড়িতে ব্ল্যাক বক্স ও স্পিড গভর্নর লাগান।
 
মিডিয়া, সামাজিক সংগঠক মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিতদের মাধ্যমে নিরাপদ যাত্রার বার্তা ছড়িয়ে দিন। স্কুল-কলেজে ট্রাফিক সেফটি ক্লাস চালু করুন। ফিটনেস জালিয়াতি বা ওভারলোডিংয়ের দায়ে পরিবহন মালিকের লাইসেন্স বাতিল করুন। রেসিং বা ড্রিঙ্কেন ড্রাইভিংয়ের শাস্তি হিসেবে জেল ও হেফাজত মামলা করুন।
 
২০২১ সালে মানিকগঞ্জে একটি ওভারলোডেড নৌকাডুবিতে ২৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছিল। তাদের অনেকেই ঈদের শপিং করতে গিয়েছিল। এই মৃত্যু নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক পরাজয়। সরকার, পরিবহন মালিক, ড্রাইভার ও যাত্রী- সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়ই কেবল এই সংকট কাটানো সম্ভব। আসুন, ঈদের যাত্রাকে নিরাপদ করতে আমরা শপথ নেই: কোনো ত্রুটিপূর্ণ গাড়িতে উঠব না, ড্রাইভারকে বেপরোয়া চালানো থেকে বিরত রাখব, কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতায় মৃত্যুকে ডেকে আনব না। ঈদে বাড়ি যাওয়া মানুষ উৎসবের আমেজ নিয়ে যেন নিরাপদে কর্মস্থলে ফিরে আসন- এ প্রত্যাশা।

অভিমত থেকে আরো পড়ুন