https://www.prothomalony.com/

17657

opinion

অভিমত

একটি যাত্রা, অসংখ্য বাঁক: ফ্লাইট বাতিল থেকে ঘরে ফেরা

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬ ০২:২৯

নিত্যদিনের মতোই স্রেফ একটি সাধারণ যাত্রা। তা যে বিড়ম্বনার এক অভাবনীয়
রোমাঞ্চে রূপ নেবে, কে জানত! মিটিংয়ে যোগ দিতে ইন্ডিয়ানাপোলিস থেকে
ওয়াশিংটন ডিসি গিয়েছিলাম। পরিকল্পনা ছিল আগের রাতে যাব, আর পরের দিন মিটিং
শেষ করেই ফিরতি ফ্লাইট ধরব। এমন পরিকল্পনা ও সে অনুযায়ী যাতায়াত প্রায়ই
করতে হয়। অনেকটাই জীবনের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে এমন ভ্রমণ।

পরদিন মিটিং শেষ করে একদম সোজা চলে গেলাম বিমানবন্দরে। গিয়েই শুনলাম,
ফ্লাইট ৩০ মিনিট বিলম্বিত। নানা কারণে এমন বিলম্ব বিরক্তিকর হলেও নতুন কিছু
নয়। কখনো আবহাওয়ার কারণে, কখনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে। দেখতে দেখতে সেই
৩০ মিনিট গিয়ে ঠেকল দীর্ঘ ছয় ঘণ্টায়। আর মধ্যরাতের ঠিক আগমুহূর্তে ঘোষণা
এলো—ফ্লাইটটি বাতিল করা হয়েছে। এয়ারলাইনস থেকে আমাকে পরের দিন বিকেলের
ফ্লাইটে পুনরায় বুক করে দেওয়া হলো।

ততক্ষণে ক্যালেন্ডারে তারিখ বদলে গেছে। রাত নতুন দিনের দিকে গড়াচ্ছে। এত
রাতে কোনো হোটেল খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না। খাবারের জন্য চারপাশের সব
রেস্তোরাঁও ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত একটি হোটেল পাওয়া গেল।
ভাগ্য ভালো, হোটেলের কর্মীরা এমন একটি খাবারের জায়গার খোঁজ দিলেন, যা ২৪
ঘণ্টাই খোলা থাকে। অনাহার-অর্ধাহারের মানুষের কাছে সব খাবারই অমৃত মনে হয়।
তবে মধ্যরাত পেরোনো সময়ে সেখানকার খাবারটি সত্যিই অসাধারণ ছিল। তৃপ্তির
সঙ্গে খাওয়া শেষ করে দিনের ক্লান্তি আর ফ্লাইট বিলম্বের বিড়ম্বনার পর এক
ধরনের স্বস্তি অনুভব করছিলাম। ঠিক যেমন করে জীবন কখনো কখনো অকারণেই মুচকি
হাসে।

আবাসিক হোটেলগুলোতে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নাশতা দেওয়া হয়। মাত্র কয়েক
মিনিটের জন্য হোটেলের ব্রেকফাস্ট মিস করলাম। খালি পেটে বিমানবন্দরের
লাউঞ্জে বসেই অফিসের একটি টিম কলে যোগ দিলাম। হোটেল থেকে বিমানবন্দর।
অবশেষে একসময় শার্লটগামী ফ্লাইটে চড়ে বসলাম। সেখান থেকে ইন্ডিয়ানাপোলিসের
কানেক্টিং ফ্লাইট ধরার কথা। মনে তখন ঘরে ফেরার স্বস্তি।

কিন্তু স্বাভাবিক গল্প যখন নাটকীয় হয়ে ওঠে, তখন একের পর এক মোড় আসতে থাকে।
বিমানটি যখন শার্লটে অবতরণ করতে যাবে, ঠিক তখনই আবহাওয়া বিপজ্জনক হয়ে উঠল।
আমাদের ফ্লাইটটি ঘুরিয়ে ফেয়েটভিল (Fayetteville) নামের একটি ছোট
বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হলো। রানওয়েতেই বিমানের ভেতরে আমরা এক ঘণ্টারও বেশি
সময় বসে থাকলাম। আর সেই সময়ের মধ্যেই আমাকে ছাড়াই আমার কানেক্টিং ফ্লাইটটি
উড়ে গেল।

আবার অপেক্ষার প্রহর। এই যাত্রা এবার আমাকে কোথায় নিয়ে গিয়ে থামায়! এই
পর্যায়ে এসে কখন বাড়ি পৌঁছাব, সেই হিসাব করা আমি একেবারেই ছেড়ে দিয়েছি।
বাড়ি থেকে স্ত্রী, ছেলে ও মেয়ের উদ্বেগভরা ফোন। আমি শান্ত থাকার চেষ্টা
করি, ঘটনার প্রবাহের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে থাকি। মাথায় দার্শনিক
কথাবার্তা ঘুরতে থাকে। মাঝে মাঝে গন্তব্যের চেয়ে যাত্রাপথই অনেক দীর্ঘ হয়ে
দাঁড়ায়। শুধু এই আশাটুকু ছিল—পরের আপডেটটা অন্তত নিজের বাড়ি থেকেই দিতে
পারব।

বিমানের ভেতর টানা দুই ঘণ্টা বসে থাকার পর অবশেষে আমাদের ফেয়েটভিল
বিমানবন্দরে নামিয়ে দেওয়া হলো। জানতে পারলাম, পুরো বিমানবন্দরে তখন কর্মী
আছেন মাত্র চারজন। বিমানবন্দরটিও খুব ছোট—একটি ছোট কনভিনিয়েন্স স্টোর, একটি
ছোট বার আর কয়েকটি বসার জায়গা—ব্যস, এইটুকুই।

চারটি ফ্লাইটের টেক-অফ সামলানোর মতো পর্যাপ্ত কর্মী না থাকায় আমেরিকান
এয়ারলাইনস জানাল, আমাদের ফ্লাইট পরদিন সকাল ৭টায় পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
আমার সামনে তখন দুটি পথ—হয় রিফান্ড (টাকা ফেরত) নেওয়া, নয়তো ১২ ঘণ্টা
অপেক্ষা করে আবার ফিরে আসা। এর অর্থ, রাতের জন্য বাইরে কোনো হোটেলে থাকতে
হবে, যার খরচ এয়ারলাইনস বহন করবে না।

ফেয়েটভিল থেকে দূরের পথ হলেও শার্লট যাওয়ার জন্য একটি উবার (Uber) ডাকার
চেষ্টা করলাম, যাতে সেখান থেকে অন্য কোনো ফ্লাইট পাওয়া যায়। কিন্তু
দূরত্বের কারণে কোনো উবার চালকই যেতে রাজি হলেন না। নিরুপায় হয়ে আমেরিকান
এয়ারলাইনসের কাছে রিফান্ডের আবেদন করলাম এবং গাড়ি ভাড়া (Rent a Car) করে
শার্লট যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

গ্রাউন্ড ট্রান্সপোর্টেশন এলাকার দিকে যাওয়ার সময় এক সহযাত্রী জানতে
চাইলেন, আমি কী করতে যাচ্ছি। আমি জানালাম, গাড়ি ভাড়া করে শার্লট গিয়ে পরদিন
সকালে ফ্লাইট ধরার পরিকল্পনা করেছি।

কার রেন্টাল এলাকায় গিয়ে দেখি মানুষের দীর্ঘ লাইন। একটু পাশে বসে সম্ভাব্য
ফ্লাইটের খোঁজখবর নিচ্ছিলাম। পরে এজেন্টের কাছে গিয়ে জানতে পারলাম, আজকের
জন্য সব গাড়িই বুকড হয়ে গেছে।

এই জবাবে অবশ্য খুব একটা অবাক হইনি। ফ্লাইট বাতিল হলে তার প্রভাব যে গাড়ি
ভাড়া, কাছাকাছি হোটেল—সবকিছুর ওপর পড়ে, তা আগের অভিজ্ঞতা থেকেই জানা ছিল।
গ্রেহাউন্ড বাসের খোঁজ নিয়ে জানলাম, সবচেয়ে কাছের বাসটি ছাড়বে মধ্যরাতে এবং
শার্লট পৌঁছাতে সময় লাগবে প্রায় সাত ঘণ্টা।

আমি আবার রেন্টাল এজেন্টের কাছে গিয়ে অন্য কোনো উপায়ের কথা জানতে চাইলাম।
তিনি আমাকে বাইরে পার্কিং লটের কাছে লোকাল ট্যাক্সি খুঁজে দেখতে বললেন।

বাইরে এসে কার্বসাইডে একটি ট্যাক্সি দেখতে পেলাম। চালক ভেতরেই বসে ছিলেন।
ট্যাক্সিটি দেখতে বেশ পুরোনো ও জরাজীর্ণ। চালক শার্লট যেতে রাজি হলেন, তবে
হিসাব কষে জানালেন, একা গেলে ভাড়া পড়বে প্রায় ৪০০ ডলার। আমি ভাবছিলাম, এত
টাকা দিয়ে ট্যাক্সি নেওয়া উচিত হবে কি না। আবার এখানেই হোটেলে থেকে পরদিন
সকালের ফ্লাইটের অপেক্ষা করাও ঝুঁকিপূর্ণ মনে হচ্ছিল। তাই বড় বিমানবন্দরের
দিকে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ মনে হলো।

ঠিক তখনই আমাদের ফ্লাইটের আরও চারজন যাত্রী সেখানে এলেন। তাঁরা ভাড়া
ভাগাভাগি করতে চাইলে চালক এক লাফে ভাড়া ৬০০ ডলার চেয়ে বসলেন। শেষ পর্যন্ত
দরকষাকষির পর প্রতিজন ১২০ ডলার করে দেওয়ার চুক্তিতে আমরা পাঁচজন যাত্রী
ট্যাক্সিতে চড়ে বসলাম।

যাত্রা শুরু হতেই বুঝলাম, ট্যাক্সিটির অবস্থা সত্যিই শোচনীয়। হাইওয়েতে এটি
অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছিল। গাড়িতে বসেই ফ্লাইটের টিকিট পরীক্ষা করে দেখলাম,
ইন্ডিয়ানাপোলিসের শেষ ফ্লাইটটি আমি পৌঁছানোর আগেই ছেড়ে যাবে। তাই শার্লট
বিমানবন্দরের কাছে একটি হোটেল বুক করলাম এবং পরদিন সকালের একটি ফ্লাইটের
টিকিট কেটে নিলাম।

প্রায় তিন ঘণ্টা পর ট্যাক্সিটি আমাকে হোটেলে নামিয়ে দিল। তখন রাত প্রায়
বারোটা।

হোটেলের রিসেপশনিস্ট দ্রুতই আমাকে তিনতলার একটি কক্ষের চাবি দিলেন। রুমে
ঢুকে লাইট জ্বালাতেই দরজার পাশে একটি লাল রঙের ক্যারি-অন স্যুটকেস দেখতে
পেলাম। প্রথমে ভাবলাম, হয়তো রুমে অন্য কেউ আছেন। জিজ্ঞেস করলাম, “ভেতরে কেউ
আছেন?” কিন্তু কোনো সাড়া পেলাম না।

চট করে স্যুটকেসটির একটি ছবি তুলে রুমের দরজা বাইরে থেকে লক করে নিচে
রিসেপশনে চলে গেলাম। হোটেলের কর্মী শুনে অবাক। তিনি বললেন, হয়তো আগের অতিথি
ভুল করে স্যুটকেসটি ফেলে গেছেন।

তিনি আমাকে রুমে ফিরে যেতে বললেন এবং জানালেন, তিনি দ্রুতই আসছেন। ফিরে এসে
আবার লাইট জ্বালাতেই বিস্ময়ের সীমা রইল না। টেবিলের ওপর একটি ল্যাপটপ
ব্যাগ, বোর্ডিং পাসসহ একটি পাসপোর্ট এবং একটি সানগ্লাস রাখা।

দ্রুত আরেকটি ছবি তুলে রুম থেকে বেরিয়ে সোজা লবিতে চলে গেলাম। হোটেলের
কর্মী তখন অন্য অতিথিদের নিয়ে ব্যস্ত থাকায় প্রায় দশ মিনিট অপেক্ষা করতে
হলো। তিনি ফাঁকা হতেই দ্বিতীয় ছবিটি দেখালাম। এবার তিনি নিজেই আমার সঙ্গে
রুমে এলেন। সবকিছু দেখে বললেন, এই অতিথি তাঁর ডিউটির সময়ই চেক-আউট
করেছিলেন। কিন্তু কেন তিনি নিজের এত মূল্যবান জিনিসপত্র ফেলে চলে গেলেন,
তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না।

হোটেল কর্মী রুম থেকে সব মালপত্র সরিয়ে নিলেন এবং এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঝামেলার
জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। রুমটি একদম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিল। ক্লান্ত থাকায়
দ্রুতই ঘুমিয়ে পড়লাম। কারণ, পরদিন সকালেই আবার বিমানবন্দরের উদ্দেশে ছুটতে
হবে।

মাত্র তিন ঘণ্টার মতো ঘুমিয়ে সকাল সাড়ে ছয়টায় উঠে ফ্রেশ হলাম। নিচে গিয়ে
নাশতা করলাম—এক স্লাইস মাখন-টোস্ট আর এক কাপ কফি। এরপর তৈরি হয়ে হোটেলের
শাটল বাসে করে বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য লবিতে এলাম।

দেখি, আরও কয়েকজন অতিথি বাসের অপেক্ষায়। সবাই ব্যাগগুলো বাসের পেছনে রেখে
উঠে বসলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম, চালকের কোনো দেখা নেই! সবারই
ফ্লাইট ধরার তাড়া, অথচ চালক উধাও। এক যাত্রী হোটেলের ভেতরে গিয়ে খোঁজ নিয়ে
জানলেন, চালক যথাসময়ে আসেননি। বিকল্প চালকের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে,
তবে কতক্ষণ লাগবে, তা কেউ বলতে পারছেন না।

বিমানবন্দর খুব দূরে ছিল না। তাই আর সময় নষ্ট না করে একটি উবার ডেকে দ্রুত
বিমানবন্দরে চলে গেলাম। গিয়ে দেখি মানুষের বিশাল লাইন। তবে টিএসএ (TSA)-এর
Touchless ID প্রক্রিয়ায় আগে থেকেই নিবন্ধিত থাকায় এক মিনিটেরও কম সময়ে
নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষ করতে পারলাম।

অবশেষে যথাসময়ে ফ্লাইটে উঠে বসলাম। মনে তখন একটাই আশা—এবার নিশ্চয়ই
ইন্ডিয়ানাপোলিসে পৌঁছাতে পারব। আলহামদুলিল্লাহ, শেষ পর্যন্ত যথারীতিই
পৌঁছালাম।

পুরো এই ঝক্কি-ঝামেলার মধ্যে আমি নিজেকে শান্ত ও মনোযোগী রাখার চেষ্টা
করেছি। আগের ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা থেকেই এই শিক্ষা পেয়েছি। জীবনে এমন কিছু
পরিস্থিতি আসে, যখন মেনে নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। তাই অফিসের কাজ
সামলানো, মিটিং পুনর্নির্ধারণ করা এবং পরিবার, সহকর্মী ও বন্ধুদের নিয়মিত
আপডেট দেওয়ার দিকেই মনোযোগ দিয়েছিলাম।

এমন পরিস্থিতি যেকোনো সময়, যেকোনো মানুষের সঙ্গেই ঘটতে পারে। তাই আতঙ্কিত
না হয়ে, ধৈর্য ধরে এবং বুদ্ধি খাটিয়ে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যায়,
সেই মানসিক প্রস্তুতি আমাদের সবসময়ই থাকা উচিত।


# মাসুম মাহবুব , নির্বাহী প্রধান, হিউম্যান কনসার্ন ইউএসএ

অভিমত থেকে আরো পড়ুন