https://www.prothomalony.com/

12754

literature

সাহিত্য

উড়ে যাই শঙ্খদেশে: এক নৈঃশব্দ্যের অনুসন্ধান

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৫ ০৪:২৮

বই: উড়ে যাই শঙ্খদেশে

লেখক: আহসান জামান
প্রকাশক: সিঁড়ি প্রকাশন
প্রচ্ছদ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি
সংকলিত কবিতা: ৯৫টি

আহসান জামানের "উড়ে যাই শঙ্খদেশে" কাব্যগ্রন্থটি সংগ্রহ করি গত বছর। ধীরে ধীরে পড়া শেষ করলাম। কাব্যগ্রন্থটি নিয়ে এক কথায় বলতে গেলে, এটি এক ধরনের নৈঃশব্দ্যের অনুসন্ধান, যেখানে কবি শব্দের গভীরে লুকিয়ে থাকা মৌনতা খুঁজে ফিরেছেন। প্রশ্ন জাগতে পারে-নৈঃশব্দ্যের অনুসন্ধান কীভাবে সম্ভব?  নৈঃশব্দ্য তো স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে, নিজেই হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়ে জীবনের পরতে পরতে। তবে, আমি এখানে যে নৈঃশব্দ্যের কথা বলছি, তা নিছক শব্দহীনতা নয়; বরং এটি অভিজ্ঞতার স্তব্ধতা, যেখানে শব্দ থাকলেও অর্থ হারিয়ে যায়, আর ভাবনাগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে নির্জনতার সাথে লীন হয়। 

 

সবগুলো কবিতা পড়ে যতটা বুঝতে সক্ষম হলাম, তাঁর কবিতাগুলো ধীর, সংযত চিন্তার প্রতিচ্ছবি—কখনো গভীর জীবনবোধ, কখনো নস্টালজিয়া, আবার কখনো সময়ের ক্ষয় ও পরিবর্তনের প্রতি সংবেদনশীল মনোভাবের প্রকাশ। তাঁর কাব্যিক সুরে একধরনের নিমগ্ন ভাবনার ছোঁয়া রয়েছে, কবির ভাবনা ও প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে জীবন, সময়, বয়স, এবং পরিবর্তন-গভীর উপলব্ধিতে ধরা পড়েছে। 

 

"ঘুম" কবিতায়, মৃত্যু কিংবা শাশ্বত ঘুমের ইঙ্গিত মেলে। নৈঃশব্দ্য এবং অনন্তের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার যে ভয়, তা কবি নিঃশব্দ ভাষায় প্রকাশ করেছেন:

'যদি এই ঘুম এসে

নৈঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়ে

চিরদিনে, উড়ে যায় অনন্ত

পাতালদেশে; তুমি আর 

ডেকে ডেকে পাবে না ফিরে।' 
এখানে এক অনিবার্য সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের সকলের উপলব্ধি, কবির ভাষায় ফুটে উঠেছে।

 

"এক বয়সে" কবিতায়, বয়সের পরিবর্তনের বাস্তবতা তুলে ধরেছেন কবি। সময়ের সাথে মানুষ, সম্পর্ক ও গতি—সবকিছুই পরিবর্তিত হয়। পরিধির ব্যাস ছোট হয়ে আসে, জীবনের গতি শ্লথ হয়ে যায়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মনেও স্তব্ধতা জমে। বয়োজ্যেষ্ঠদের চোখের ছানি এবং স্যাঁতসেঁতে বাড়ির ছত্রাক-বয়সেরই ভার বহন করছে। 

'এক বয়সে এমনই হয়; পরিধির

ব‍্যস কমে যায়, পথে পথে গতিরোধক

স্তব্ধতা জমে, গন্তব‍্যগুলো মুছে দেয় 

সময়ের কুঁচি। বাড়ির বয়োজ‍্যেষ্ঠের 

চোখের ছানির আনুপাতিকে বাড়ে

বসতের আঙিনায় স‍্যাঁসসেঁতে ছত্রাক।'

 

"বদল" কবিতায়, কবি প্রকৃতিক পরিবর্তনের স্বাভাবিকতাকে স্বীকার করেছেন। 

'এভাবেই ভেবে ভেবে বুড়ো হয়ে যাই

ভাবি বদলে যাবো; যেমন বদলে যায়

বাতাসের দিগ্বিদিক, ঋতু বদলে যায়

আমাদের পোশাকও বদলে মানিয়ে নেয়

প্রকৃতি। শীত-কুয়াশা পুড়ে যায় রোদ্দুর।'

 

'বাতাসের দিগ্বিদিক বদলে যায়, ঋতু বদলে যায়...' এই  পঙ্‌ক্তি আমাদের বোঝায়, জীবন মানে ক্রমাগত মানিয়ে নেওয়া, পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানো, আর সময়ের স্রোতে নিজেকে হারিয়ে ফেলা।

 

গদ‍্য কাঠামোতে রচিত "জীবন" কবিতায়, কবি এক ধরনের অনিশ্চিত যাত্রার চিত্র এঁকেছেন।

'অনেকটা পথ হেঁটে এসে, ভুলে যাই পেছনে ফেরার পথ; গা চমকানো অন্ধকারে কিম্বা রোদ্দুরের উজানে জেগে উঠা দু'চোখ; সম্মুখানুসন্ধানী।' 

 

প্রথম পঙ্‌ক্তিতে 'অনেকটা পথ হেঁটে এসে, ভুলে যাই পেছনে ফেরার পথ...' সময়ের একমুখী প্রবাহ এবং অতীতের প্রতি একধরনের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি দেখতে পেলাম। দ্বিতীয় পঙ্‌ক্তিতে কবি জীবনের দুই বিপরীত বাস্তবতার চিত্র এঁকেছেন— 'গা চমকানো অন্ধকার' এবং 'রোদ্দুরের উজানে'। 'গা চমকানো অন্ধকার' প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, জীবনের ভয়, অনিশ্চয়তা, দুঃখ বা সংগ্রামের ইঙ্গিত হিসাবে। এটি সেই সময়ের কথা বলে, যখন মানুষ হতাশা বা বিপদের মুখোমুখি হয়, যখন চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে যায়, কোনো দিক নির্দেশনা থাকে না। 'রোদ্দুরের উজানে' ঠিক তার বিপরীত—এটি আশা, নতুন সম্ভাবনা, আলোর দিশারী বা জীবনের উজ্জ্বল মুহূর্তগুলোর প্রতীক হতে পারে। এই দুই বাস্তবতার মাঝেই আমরা চলাফেরা করি, তবে 'জেগে উঠা দু'চোখ; সম্মুখানুসন্ধানী' বলে কবি বোঝাতে চেয়েছেন-আমাদেক চোখ বা দৃষ্টিশক্তি শুধুমাত্র দেখার উপকরণ নয়, বরং এটি অনুসন্ধানের মতো কিছু। মানুষ তার অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও সংকল্প দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চায়, ভবিষ্যতের পথ খোঁজে, অন্ধকার বা আলো যাই থাকুক না কেন।

 

'জেগে থাকে অনিদ্রাচোখ', 'উড়ে যাই একাকীত্বের দেশে', 'সে নেই; পথগুলো বসে থাকে', 'নেই', 'দিনক্ষণ', 'এভাবেই মুছে যায় সবই', ' ভাঙাঘুম'-প্রতিটা কবিতা যেন আমাদেরই কথা, আমাদেরই ভাবনা, যেখানে আমরা নিজেদের খুঁজে পাই, হারিয়ে যাই, আবারও ফিরে আসি। এ যেন আমাদের একান্ত অনুভূতিগুলো প্রতিধ্বনি—নিঃসঙ্গতা, বেদনা, হারিয়ে যাওয়া মুহূর্তের স্মৃতি, কিংবা একটুখানি আশার আলো। কবিতাগুলোর ভাষা সরল হলেও তাদের গভীরতা আমার  অন্তরের নিভৃত কোণে স্পর্শ করেছে। মনে হয়েছে, কবি আমার মনের কথাগুলোই শব্দের বাঁধনে গেঁথে দিয়েছেন। 

 

আহসান জামানের কবিতাগুলোতে শব্দের মিতব্যয়িতা লক্ষণীয়। তিনি সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন যেখানে অনুভূতি সরাসরি প্রকাশ না হয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। পাশাপাশি, কয়েকটি কবিতায় বিষয়ের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। 

 

আহসান জামানের "উড়ে যাই শঙ্খদেশে" কাব্যগ্রন্থে গভীর জীবনবোধ এবং চিন্তার অনুরণন থাকলেও কিছু জায়গায় কবিতার অতিরিক্ত বিমূর্ততা সহজ পাঠকের জন্য ব্যাখ্যার জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। 

উদাহরণস্বরূপ, "ঘুম" কবিতায় বলা হয়েছে—
'যদি এই ঘুম এসে নৈঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়ে চিরদিনে, উড়ে যায় অনন্ত পাতালদেশে...' 

আমার মনে হয়েছে, এই পঙ্‌ক্তিগুলোতে কবি ঘুমকে চিরস্থায়ী অনুপস্থিতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন, অর্থাৎ মৃত্যুর ইঙ্গিত। "নৈঃশব্দে ঘুমিয়ে পড়া" বলতে এমন এক নিস্তব্ধতা, যা আর ভাঙবে না—চিরতরে বিলীন হওয়া। "উড়ে যায় অনন্ত পাতালদেশে" বলে কবি মৃত্যু পরবর্তী এক অজানা শূন্যতার দিকে  ইঙ্গিত করেছেন হয়তো, যেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ নেই।

তবে আমার ধারণা যদি ভুল হয়, তা এই বিমূর্ত রচনার কারণেই হবে, কারণ আমি একজন সাধারণ পাঠক; যার  পক্ষে কবিতার সঠিক তাৎপর্য বোঝা কঠিন হতে পারে। কবির ভাষা যতই গভীর হোক না কেন, অনেক সময় অতিরিক্ত প্রতীকায়ন এবং বিমূর্ততা পাঠকের অনুভূতির সঙ্গে সংযোগ স্থাপনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। 

 

শেষ কথা: "উড়ে যাই শঙ্খদেশে" নিছক কবিতার সংকলন নয়, এটি সময়, বয়স, পরিবর্তন, জীবন ও মৃত্যুর এক অনবদ্য সংলাপ। আহসান জামান শব্দের মাধুর্য ও ভাবনার গাম্ভীর্য দিয়ে এক ধরনের শূন্যতার অনুভূতি তৈরি করেন, যা পাঠককে ভাবায়, বিরতি দেয়, এবং প্রশ্ন করতে শেখায়। তাঁর সংযত ও ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষাশৈলী বাংলা কবিতার আধুনিক প্রবণতার সঙ্গে মানানসই বলে মনে হয়েছে। এবং চিন্তাশীল পাঠকদের জন্য নিঃসন্দেহে এ কাব্যগ্রন্থ পড়ার মতো একটি। 

শুভ কামনা কবি আহসান জামান। 

সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন