https://www.prothomalony.com/
12719
opinion
প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৫ ০৪:১৮
‘আমরা চাইলেই আমাদের চামড়ার রঙ বদলাতে পারবো না। জন্মগত বাঙালি তাই আমার সন্তানদের অরিজিন জানতে চাইলে বাঙালিই বলতে হবে। এই অরিজিন জানানোর সময় আমাদের কিছু গর্বের বিষয় থাকা উচিত। বাংলাদেশ সম্পর্কে বাচ্চাদের কিছু জানাতে হলে প্রথমেই বাংলা ভাষা আসে। ভাষা থেকেই একটা দেশ বাংলাদেশের জন্ম হয়। এই গর্ববোধ বাচ্চাদের শেখাতে হবে। সেই জন্যেই প্রবাসে আমাদের সন্তানদের বাংলা ভাষা শেখানো দরকার।’
প্রবাসে নতুন প্রজন্মকে বাংলা শেখানোর বিষয়ে আশাবাদী হয়ে কথাগুলো বলেছেন সাইফুল আজম সিদ্দিকী।
গত বৃহস্পতিবার (৬ মার্চ) প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সাপ্তাহিক সম্প্রচার ‘টক অব দ্যা উইক’ অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন তিনি। সাইফুল আজম সিদ্দিকী একাধারে সাংবাদিক, কলামিস্ট, প্রবাসী ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠক ও আবৃত্তিকার। ‘ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগান’ থেকে উচ্চ শিক্ষা লাভের পর বর্তমানে বহুজাতিক গাড়ি প্রস্তুতকারী কোম্পানি স্টেলান্টিসে প্রকৌশলী ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন। বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান স্টেটে।
অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনায় ছিলেন ফরিদা ইয়াসমীন। পরিচালনায় এইচ বি রিতা।
ফরিদা ইয়াসমীন প্রথমেই জানতে চান, কবি ও আবৃত্তিকারের মাঝে সংযোগটা কোথায় বা কীভাবে হয়? সাইফুল আজম বলেন, ‘স্কুল জীবন থেকেই লেখালিখির শুরু, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেকে পত্রিকাগুলোর সাথে জড়িত হই। ২০০১ সালে প্রথম আলোতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন আয়োজক হিসাবে ছিলাম আমি। পরবর্তী দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসাবেও লেখালিখি করেছি। কবিতার সাথে সেই সময়েই হৃদ্যতা। ছোটবেলায় স্কুল কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করতাম। তবে কোভিড চলাকালীন কবিতা পাঠের চর্চা গভীরতার সৃষ্টি হয়। দেশের বাইরে থাকলেও শুদ্ধভাবে কথা বলার ও আবৃত্তি করার চেষ্টা করি।’
একজন সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠকের প্রেক্ষাপট থেকে তিনি বলেন, ‘সব সময়ই খেলাধুলার সাথে জড়িত ছিলাম। প্রফেশনালি কখনো বড় মঞ্চে খেলা হয়নি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিনায়ক হিসাবে বিভিন্ন খেলায় খেলেছিলাম। পড়াশোনার চাপে পেশাদারিত্বের কাছাকাছি যাওয়া হয়নি। তবে নেশাটা মনের মধ্যে ছিল। প্রবাসে এসে ব্যস্ততা থাকা সত্ত্বেও শরীর ও মন-মানসিকতা সুস্থ রাখার জন্যে ক্লাব গঠন করি। ক্লাবের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিশেষ দিনগুলো যেমন,একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৬ ডিসেম্বর, ২৬ মার্চ, পহেলা বৈশাখ পালন করি। বিগত দশ বছরে মিশিগান স্টেটে বাঙালির সংখ্যা বেড়েছে। তাই, এসব ঘরোয়া অনুষ্ঠানের জনপ্রিয়তা বহু বেড়ে যায়। এই আয়োজনের আরেকটা উদ্দেশ্য হচ্ছে- আমদের নতুন প্রজন্মকে বাঙালি সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া। প্রবাসে এই আয়োজনে সবাই একসাথে কাজ করার ফলে নিজেদের মধ্যে হৃদ্যতা বাড়ছে। একটা ছোট অনুষ্ঠান করলেও সবার যোগদানের কারণে তা একটা বড় মিলনমেলায় পরিণত হয়।’
প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রচারের উদ্যোগ সম্পর্কে সাইফুল আজম বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা কিছু বাঙালি অভিভাবক বাংলা ভাষা শেখার স্কুল খোলার চিন্তা করছি। এ ব্যাপারে লাইব্রেরির সাথে কথা বলেছি। এক দিনের জন্য কোন লাইব্রেরির রুম ফ্রি পাই তাহলে স্কুল শুরু করতে পারবো। আমাদের বাচ্চারা অল্প-সল্প বাংলা বলতে পারলেও অক্ষর চেনে না, লিখতে বা পড়তে পারে না। আরো কিছু উৎসাহী অভিভাবক এবং লাইব্রেরির সাহায্য পেলে আমি আশা করছি একটা বাংলা স্কুল শুরু করতে পারবো।’
‘আমাদের অনেকেই নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ভাষাকে ধরে রাখার উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু অনেক সময় অভিভাবকদের ইংরেজির দজ্ঞতা কম থাকার কারণে তারা বাচ্চাদের স্কুলজড়িত বিষয়গুলো সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। এক্ষেত্রে সেইসব অভিভাবকদের জন্যে আপনাদের সামাজিকভাবে উন্নয়নমূলক কি কি কর্মকাণ্ড আছে? এইচবি রিতার এম প্রশ্নে তিনি নিশ্চিত করে জানান, মিশিগানে কয়েকটা সংগঠন এই ব্যাপারের সাথে জড়িত। এখানে সিটির মেয়র এবং কাউন্সিলররাও যুক্ত আছেন। ভাষাগত বাধার কারণে অনেকে কমিউনিটির বাইরে কাজ করতে ভয় পান। নাগরিকত্বের পরীক্ষায় এখন আর আগের মতো দোভাষী ব্যবহার করা যায় না। তাই তারা প্রতি বছর নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষকে ইংরেজি শেখাচ্ছেন। সেখানে মূল ব্যাপারগুলোতে কিভাবে ইংরেজিতে কথা বলত হয় সেটা শেখানো হয়।
তিনি বলেন, ‘আমার শহরে দোভাষীর কোর্স আছে। সেখানে বাঙালি কমিউনিটির অনেকেই ইংরেজি শেখানো হচ্ছে।’
প্রবাসে বসবাসরত নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলাদেশি পরিচয় ও মূল্যবোধ বজায় রাখার ব্যাপারে সাইফুল আজম বলেন, ‘আমাদের সংগঠনগুলো যখন বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করে, তখন আমাদের বাচ্চারা সেখান থেকে অনেক কিছুই শেখে। আমাদের দেশীয় বাঙালি সংস্কৃতিগুলো আমেরিকার কোন বইয়ে লেখা নেই। তাই আমাদের সন্তানেরা আমাদেরকেই দেখে শেখে। কোন একটা আয়োজনে আমরা যখন ভালো কোন আচার আচরণ চর্চা করবো তখন আমাদের সন্তানেরাও সেটা শিখবে।’
এ দেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করা সাইফুল আজমের সামনে বাড়ার পথকে কীভাবে সুগম করেছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার পড়াশোনা অন্য সবার চাইতে একটু ভিন্ন। আমি বাংলাদেশে কৃষি প্রকৌশলের উপর ব্যাচেলর ডিগ্রি করেছি। রুরাল ইলেক্ট্রিফিকেশনের উপরে মাস্টার্স করেছি। কিন্তু আমেরিকায় আসার পর সময়টা সহজ ছিল না, তাই আমেরিকায় ২০০৯ সালে মেকানিক্যাল ইঞ্জিয়ারিং পড়ার সিদ্ধান্ত নেই। তখন সারা পৃথিবীর অর্থনৈতিক মন্দা মিশিগানের উপরেও আঘাত হানে। বহু মানুষ ঘর বাড়ি ফেলে রেখে অন্যত্র চলে গিয়েছিল। কিন্তু যখন ২০১০ সালের দিকে গাড়ির কোম্পানীগুলো উন্নতির দিকে যাচ্ছিল, আমি তখন ডিগ্রি শেষ করার আগেই ২০১২ সালে বিখ্যাত ফোর্ড মোটর কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে যাই। তারপর থেকে আমাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে আমি স্টেলান্টিস কোম্পানিতে চাকরি করছি। ইউনিভারসিটি অফ মিশিগানে পড়াশোনার সময়টা খুব একটা সহজ ছিল না। দেশ থেকে নতুন এসেছিলাম, পরিবারের সদস্যদের আমি নিজেই পরিচর্যা করেছি। তবে সেটা একটা সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল। আমার এই প্রবাসী জীবনের সংগ্রামী গল্প এদেশে নতুন আসা অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার হয়ে উঠেছে। এ কারণেই এখানের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশি ছাত্র সংগঠনগুলো আমার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখে।’
অনুষ্ঠানের মাঝখানে সাইফুল আজম দর্শকদের উদ্দেশ্যে দুইটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনান। সৈয়দ শামসুল হকের ‘নূরলদীনের সারাজীবন’ ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘ক্ষমা করো হজরত’ তিনি আবৃত্তি করেন।
শিল্প সাহিত্য অঙ্গনে জড়িত থাকার দরুন ভালো মন্দ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘যে কোন অনুষ্ঠান করতে গেলে যেমন নতুন বন্ধু পাওয়া যায়, তেমনি কাছের কোন বন্ধুও খোয়া যায়। অনেক সময় মনমালিন্য হয়, বিষয়গুলো আমি স্বাভাবিকভাবেই নেই। আমি নিজে নিজেই কবিতা আবৃত্তির চর্চা করি, ইউটিউবে-ফেসবুকে রেকর্ডকৃত কবিতা পোস্ট করি। কবিতাগুলো বাংলাদেশের বাইরেও দূরদূরান্ত থেকে অনেক মানুষ শোনে। মাঝেমাঝে মন খারাপ হয়, তবে আমেরিকায় আসলে মন খারাপ হওয়াটাও কঠিন ব্যাপার। এতো বেশি ব্যস্ততা থাকে যে, অন্যের কারণের জন্য আমার কিছু থেমে থাকে না।’
এভাবেই সাইফুল আজম সিদ্দিকী সেদিনের ‘টক শোতে প্রবাস জীবনের সংগ্রাম, নানা উদ্যোগ ও প্রাপ্তির কথা তুলে ধরেন।
প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার ‘টক অফ দ্য উইক’ অনুষ্ঠানটি প্রতি বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় রাত নয়টায় ফেসবুক লাইভে সম্প্রচারিত হয়ে থাকে।
সিএন/আলী
অভিমত থেকে আরো পড়ুন