https://www.prothomalony.com/
12692
literature
সাহিত্যজগতে নতুন লেখকদের আবির্ভাব সবসময়ই এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। তারা নতুন ভাবনা, নতুন শব্দচয়ন ও স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গি নিয়ে আসেন, যা সাহিত্যের ক্ষেত্রকে আরও বিস্তৃত করে তোলে। শামসুন ফৌজিয়া সেই নতুন লেখকদের একজন, যিনি কবিতার মাধ্যমে নিজস্ব স্বর প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন।
২০২৩-এর একুশে বইমেলায় প্রকাশ হয় শামসুন ফৌজিয়ার কাব্যগ্রন্থ 'ঘাসফুল।' বাসাপ বর্ণবিন্যাস প্রকাশনী, প্রচ্ছদ করেছেন রাজিব আহম্মেদ। বইটি ৭২টি কবিতা নিয়ে সজ্জিত। কবিতাগুলো অন্তমিল ছন্দ ও মুক্তছন্দে রচিত।
কিছু কবিতা বেশ দীর্ঘ, গদ্য আকারে। যেমন, 'স্বাধীনতা তুমি এক স্বপ্ন', 'তোমার শহরে পৌঁছে', 'মেয়েরা চাইলেই সব পারে না', 'শোধ আর শোষণ', আমাদের গল্পগুলো', 'ভালোবাসা এমনই', 'অভিনন্দন আনন্দধারা', 'মুক্তিনামা', এবং 'ভালোবাসার চোখে'।
শামসুন ফৌজিয়ার কবিতার অন্যতম আকর্ষণ তাঁর বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য। তিনি জীবন সংগ্রাম, প্রেম, সময়, সমাজ, অস্তিত্ব ও ব্যক্তিগত অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে কবিতা লিখেছেন। তাঁর কবিতাগুলো বেশিরভাগ বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রকাশ, বিমূর্ত ভাবনার শৈল্পিত বিন্যাস কম বলেই মনে হয়েছে আমার কাছে। বিষয়বস্তুর ক্ষেত্রে তিনি সাহসী এবং গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে লেখার চেষ্টা করেছেন। অনেক কবিতায় অনুভূতির গভীরতা ও ভাবনার স্বতন্ত্রতা পাওয়া যায়, যা একজন নতুন কবির জন্য ইতিবাচক দিক।
বইটিতে তাঁর প্রথম কবিতাটি ছিল, 'বাংলা আমার জন্মভূমি', চার নম্বর কবিতাটি ছিল 'স্বপ্ন আমার যাবে বাড়ি।'
"ছবির মতোন গ্রামখানি পাশাপাশি ঘর
মায়া মমতায় ভরা ছিল, কেহ নাহি পর"
শেষের পঙতি,
"স্বপ্ন আমার আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন যাবে বাড়ি
মায়াবতী গ্রামখানি আজো স্বপ্নে নেয় কাড়ি।"
প্রবাসে থেকে কবি যেন তাঁর শৈশবের গ্রাম, সেখানকার ঘরবাড়ি, প্রকৃতি এবং পারস্পরিক ভালোবাসা-স্নেহের পরিবেশকে স্মৃতিচারণ করছেন।
শামসুন ফৌজিয়ার কবিতাগুলো অনিয়মিত ছন্দে রচিত, অর্থাৎ তিনি স্বরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত বা মাত্রাবৃত্ত ছন্দের শৃঙ্খলায় আবদ্ধ নন, বরং নিজের ভাব প্রকাশের জন্য মুক্ত ছন্দের পথ বেছে নিয়েছেন। এটি অনেক আধুনিক কবির ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তবে ছন্দের ক্ষেত্রে কিছু অসঙ্গতি লক্ষ্য করা গেছে। কিছু কবিতায় ছন্দপতন ঘটেছে, যা কখনো কখনো কাব্যের স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত করেছে। যেমন-পৃষ্ঠা ৪০-এ তার 'সোনালী শৈশব' কবিতাটি-
"খেলার সাথীরা কোথা আজ তোরা আছিস কেমন বল
পুতুল বিয়েতে পেরেশানি দুপুর ছিল যে কতই ছল"
কবিতাটিতে তাঁর ফেলে আসে জন্মভূমির স্মৃতিচারণ দেখতে পাই। তবে এখানে ছন্দ ও কাঠামোর দিক থেকে মূল্যায়ন করতে গেলে, দ্বিতীয় পঙতিতে ছন্দপতন ঘটেছে। যদিও এটি কোনো গুরুতর সমস্যা নয়, তবে ছন্দ ও ছন্দহীনতার মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা গেলে কবিতাটি আরও সুগঠিত হয়ে উঠতো।
তাঁর ভাষাশৈলী সহজ ও সাবলীল, যা পাঠকের জন্য বোধগম্য। তিনি কঠিন শব্দের ব্যবহারের চেয়ে অনুভূতি প্রকাশের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন। এই দিক থেকে তাঁর কবিতাগুলো সহজেই পাঠকের কাছে পৌঁছায় এবং হৃদয়ে দাগ কাটে।
শামসুন ফৌজিয়ার এই কাব্যসংকলনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাঁর চিন্তার স্বকীয়তা। তিনি প্রচলিত বিষয়গুলোকেও নতুনভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন, যা তার সম্ভাবনার পরিচায়ক। তাঁর কবিতাগুলোর মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও অনুভূতির গভীরতা স্পষ্ট। নতুন কবিদের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ আত্মপ্রকাশের শক্তি ও মৌলিকতা একজন কবিকে স্বতন্ত্র করে তোলে। যেমন- ৯২-পৃষ্ঠায় 'ব্যস্ততা নয় তুমিই অসহায়' কবিতায় তিনি লিখেছেন,
"কিছু কিছু মানুষের বিবেক মুখের উপর বলতে সাড়া দেয়না
কিছু কিছু দুঃখের উৎস কখনোই কেউ জানতেও পারে না
কিছু কিছু কথা কখনো বলার সুযোগটুকুও আসে না"
ব্যক্তি শামসুন ফৌজিয়ার স্বভাব আচরণ সম্পর্কে যতটা জানি, কবিতাটির সাথে হুবহু মিলে যায়।
শেষের পঙতি,
"কি ভেবেছো অজুহাতের চালাকি দিয়ে চালিয়ে যাবে বেশ?"
এখানেও শান্ত স্বভাবের কবি দৃঢ়তার সাথে একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, তাঁর স্বভাবসিদ্ধ নীরবতা ভেঙে একপ্রকার দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন।
তিনি যদি বিভিন্ন ছন্দরীতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে পরিচিত হন এবং কাব্যভাষাকে আরও নিখুঁতভাবে গড়ে তোলেন, তাহলে তাঁর কবিতা আরও বেশি শক্তিশালী ও শৈল্পিক হয়ে উঠবে। যেহেতু তিনি প্রচুর বই পড়েন, এটি তাঁর লেখার মান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
শামসুন ফৌজিয়ার কাব্যসংকলন নতুন পাঠকদের জন্য একটি স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্বাস রাখি। কিছু পরিশীলন প্রয়োজন থাকলেও তার কাব্যচিন্তা, অনুভূতির প্রকাশ ও নতুন কিছু করার প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবিদার।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন