https://www.prothomalony.com/
12691
literature
কবিতা পাঠকের হৃদয়ে ঢেউ তোলে, কখনো স্পর্শ করে মৃদু বাতাসের মতো, কখনো বা জাগিয়ে তোলে এক গভীর বিস্ময়। পলের কাব্যগ্রন্থ "জলভৈরবী" সেই বিস্ময়েরই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ৬২টি কবিতা নিয়ে রচিত এই গ্রন্থটি কবির চিন্তার গভীরতা, অনুভূতির প্রাবল্য ও ভাষার নবীন প্রকাশের এক শক্তিশালী উপস্থাপনা। প্রকাশনী হরিৎপত্র, প্রচ্ছদ করেছেন আল লোমান। ২০২৩-এ প্রকাশ হয় তার কাব্যগ্রন্থটি।
"জলভৈরবী" প্রথাগত ছন্দের বাঁধনে আবদ্ধ নয়। কবি মুক্তছন্দ ও গদ্য কবিতার মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন এক অনন্য ভাষাশৈলী, যা পাঠককে চিন্তার নতুন জগতে নিয়ে যায়। গদ্য কবিতাগুলো এক ধরনের চিন্তার স্রোত রয়েছে, যেখানে ভাষার বাঁধন আলগা করে কবি নিজের অনুভূতিকে মেলে ধরেছেন। গদ্যের কিছু কবিতা বেশ দীর্ঘ।
যেমন-পৃষ্ঠা ১২-তে "তুমি প্রত্যাশা" কবিতাটি।
"সূর্যের আলোর সাথে সাথে তোমারে রূপের পরিবর্তন
সূর্যাস্তের শেষ গোধূলিবেলায় কিশোরী থেকে নারীতে রূপায়ন
আহা! আগুনরূপে ঝলসে যায় মন
মগজ আমার প্রেমের পথে নিয়ে যায়..."
৫৫ লাইনের দীর্ঘ কবিতার শেষে কবি লিখেছেন,
"না পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় পেয়েছি
অনুভবের এক মহাউল্লাসের মন
কবিতা লিখি ভালোবেসে তোমার জন্য
বরফের মত শুষ্ক শীতল হৃদয় নিয়ে..!"
"তুমি প্রত্যাশা" কবিতায় কবি প্রেমের রূপান্তর, না পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, এবং অনুভূতির গভীরতাকে তুলে ধরেছেন। প্রেম শুধু প্রাপ্তি নয়, বরং তা অনুভবেরও বিষয়। না পাওয়া সত্ত্বেও ভালোবাসার অনুভূতি তাকে কবিতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। শেষ পঙক্তিতে "বরফের মত শুষ্ক শীতল হৃদয়" বলেই কবি প্রেমের এক দ্বন্দ্বময় বাস্তবতা তুলে ধরেছেন—যেখানে আবেগ ও নিরাসক্ততা পাশাপাশি অবস্থান করে।
মুক্তছন্দের কবিতাগুলোতে প্রথাগত ছন্দের অনুশাসন না থাকলেও, প্রতিটি শব্দের বুননে এক ধরনের সংগীতধর্মিতা স্পষ্ট। পৃষ্ঠা ২১- এর একটি কবিতা "বোকার স্বর্গ।"
"অতি ক্ষুদ্র সাধারণ আমি
সবাই মহান জ্ঞানী
সত্য চোরের দখলে চেয়ারে বসে
ভালো করা নাটকের ডায়লগ ও ফন্দি
জানিনা আমরা -কে সে বন্দি
কথায় কথায় নিন্দুকের মূল্যবান বাণী
সততা, বিনয় ও ভালোর স্বীকৃতি দেয়া ছাড়া
সুখী মানুষের জীবন হয় কী?"
"বোকার স্বর্গ" কবিতায় ক্ষোভ ও প্রতিবাদের স্পষ্ট প্রকাশ রয়েছে। কবি সমাজের ভণ্ডামি, ক্ষমতার অপব্যবহার, এবং সততার অবমূল্যায়নের বিরুদ্ধে কটাক্ষ করেছেন। ক্ষমতাবানরা নাটকের মতো সাজানো কথা বলে, অথচ সত্যিকারের গুণের স্বীকৃতি মেলে না। কবির বার্তা হলো—এই সমাজে সৎ ও বিনয়ী মানুষের মূল্যায়ন কম, আর ক্ষমতা ও চাতুর্যই বেশি প্রাধান্য পায়।
কবি পল সবসময়ই সৃষ্টির রহস্য নিয়ে ভাবেন, খুঁজে ফেরেন উত্তর। তাঁর কবিতাগুলোতেও এই প্রবণতা প্রকট। জীবন, সময়, প্রকৃতি এবং অস্তিত্বের প্রশ্নগুলো তাঁর কবিতার সার্বক্ষণিক অনুষঙ্গ। কখনো সরল ভাষায়, কখনো বিমূর্ত চিত্রকল্পে তিনি উপস্থাপন করেন অনুভূতির এক নতুন ব্যাখ্যা।
পৃষ্ঠা ৫৩-এর একটি কবিতা "মৃত্যু অবধি চলবে।"
"দর্পণের প্রতিবিম্বে প্রতিক্ষণ
ভিন্ন রূপে মানুষের অস্তিত্ব
পশ্চাতে হাসি আর সম্মুখে ছল
ভুবন এক মহানাটকের মহাস্থান।"
শেষে লিখেছেন,
"ঈশ্বরের প্রতিকূলে পৃথিবীতে এসে
পবিত্র প্রার্থনায় কী সন্তুষ্টি মিলে? "
"মৃত্যু অবধি চলবে" কবিতায় কবি পল মানব অস্তিত্বের দ্বৈততা, সমাজের ভণ্ডামি, এবং আত্মপরিচয়ের রহস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। দর্পণের প্রতিবিম্বের মাধ্যমে তিনি দেখিয়েছেন, মানুষ প্রতিনিয়ত রূপ বদলায়—পেছনে হাসি, সামনে ছলনা, আর এ বিশ্ব যেন এক বিশাল নাট্যমঞ্চ। শেষ পঙক্তিতে তিনি গভীর দার্শনিক প্রশ্ন রেখেছেন—যে পৃথিবী ভোগ-বিলাস, মিথ্যা ও দ্বিচারিতায় পূর্ণ, সেখানে ঈশ্বরের নামে প্রার্থনা করলে কি সত্যিকারের মুক্তি বা সন্তুষ্টি পাওয়া সম্ভব?
তার মূল বার্তা হলো—মানুষের জীবন এক অন্তহীন অভিনয়, যেখানে সত্য ও মিথ্যার লড়াই চলতে থাকে, এবং প্রশ্ন থেকে যায়, এই দ্বৈততার মাঝে প্রকৃত পবিত্রতা বা মুক্তি কি আদৌ সম্ভব?
শরিফুজ্জামান পলের প্রতিটি কবিতাই নতুন এক ভালো লাগার অনুভূতি সৃষ্টি করে। তার ভাষার সাবলীলতা, চিত্রকল্পের গভীরতা, এবং ভাবনার বহুমাত্রিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে।তার প্রকাশ ভঙ্গি কখনো সরল, কখনো বিমূর্ত—তাঁর কবিতাগুলো জীবনের গভীর সত্য, অনুভূতি ও দর্শনের প্রতিচ্ছবি বলেই মনে হয়েছে। 'মাতৃ অনুভব', 'গন্ডগোলের একাত্তর', 'তুমি-প্রত্যাশা', 'মানুষমুখী গতি', 'আশ্রয়হীন', 'হলুদ মেঘের ঢেউ', 'শনির মুক্তি', ' মানবতার মহাকাব্য'... কবিতাগুলো আমাকে একাধিকভার পড়তে বাধ্য করেছে।
আমি বলব, "জলভৈরবী" শুধুমাত্র একটি কাব্যগ্রন্থ নয়, এটি এক উপলব্ধির জার্নি। যে পাঠক প্রচলিত ছন্দের বাইরে চিন্তার নতুন দিগন্তে প্রবেশ করতে চান, তার জন্য এই বই হতে পারে এক অনন্য অভিজ্ঞতা। পলের কবিতায় সময়, যাপিতজীবন, সমাজ, রাষ্ট্র ব্যবস্থা ও সৃষ্টির যে রহস্যময় অনুসন্ধান রয়েছে, তা পাঠকের মনে নতুন ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলে আশা করি।
সাহিত্য থেকে আরো পড়ুন