https://www.prothomalony.com/

12673

opinion

অভিমত

লেখকের শক্তি কলমকে কোনভাবেই দলীয়করণ করা যাবে না—মুনিয়া মাহমুদ

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৫ ০৫:৩৪

'একজন লেখক হিসাবে আমি সমাজে ঘটে যাওয়া নানা অসঙ্গতি, অন্যায়-অবিচারের ব্যাপারে সবসময়ই সোচ্চার থাকি, আমার লেখার বিষয়বস্তুতেও সেগুলো প্রতিফলিত হয়। আমি কোন রাজনৈতিক দল করি না, তবে ভালোর সাথে আছি। আমি মনে করি, লেখক-শিল্পীদের কোনো সীমাবদ্ধতা থাকা ঠিক না। শিল্পীদের প্রতি আমার অনুরোধ, তারা যেন নিজের সত্তায় দৃঢ়ভাবে অবস্থান করেন। কলম হচ্ছে একজন লেখকের শক্তি, তাকে কোনভাবেই দলীয়করণ করা যাবে না।

বৃহস্পতিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার জনপ্রিয় সাপ্তাহিক সম্প্রচার 'টক অব দ্যা উইক' অনুষ্ঠানে এমনটাই বলেছেন লেখক মুনিয়া মাহমুদ।  অনুষ্ঠানটির  উপস্থাপনায় ছিলেন সোহানা নাজনীন। আর পরিচালনায় ছিলেন এইচ বি রিতা। 

নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় বসবাসরত মুনিয়া মাহমুদ প্রবাসে থেকেও বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। লেখালিখির যাত্রার সূচনা ও আগ্রহের পেছনের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'মূলত ছোটবেলা থেকেই লেখালিখি করি। বেশির ভাগই ছোট কবিতা লিখতাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাকালীন সময়ে আমার আব্বাকে হারাই। তারপর পড়াশোনা এবং লেখালিখি দুটোই বন্ধ হয়ে যায়। মনের খোরাকের জন্য প্রতিদিন ডায়েরি লিখতাম। প্রথম আলো, বিচিত্রা'র ক্যাপশন প্রাইজ পেয়েছি, কিন্তু ব্যস্ততার কারণে বড় পরিসরে লেখালিখি করিনি। ২০০৫ সালে আমেরিকার ফ্লোরিডায় আসার পর আমার লেখালিখি আবারো শুরু হয়। তুষারপাত নিয়ে ছোট একটা কবিতা 'ঠিকানা' পত্রিকায় ছাপানোর পর অনুপ্রেরণা পাই। এরপর থেকে পুরোদমে 'ঠিকানা' এবং 'বাংলা' পত্রিকায় আমার লেখা নিয়মিত যেত। ২০০৮ এ নিউইয়র্কে আসার পর আমার লেখা চলতেই থাকলো। কিন্তু সেই তুলনায় আমার গ্রন্থের সংখ্যা অনেক কম, মাত্র পাঁচটি গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে।' 

মুনিয়া মাহমুদ আর্টিকেল, কবিতা, ছোটগল্প লিখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করেন বলে জানান। তবে করোনার সময় এই ধারা ব্যাহত হয়, অসুস্থ হবার কারণে তিনি লেখালিখি কমিয়ে দেন। তবে এই বছর তার একটা বই প্রকাশ হয়েছে।

প্রবাসে থেকেও বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হওয়া কীভাবে সম্ভব হল, সোহানা নাজনীনের প্রশ্নে তিনি বলেন, 'আমি মনে করি শিল্প-সাহিত্য একটা প্রতিভা। কেউ জোর করে এটা করতে পারে না। যেমন- আমাদের একজন হুমায়ুন আহমেদ আছেন, আরো অনেকে আছেন। আমার এমন মেধা ছিল কিন্তু সেটা সঠিক সময়ে প্রস্ফুটিত হয়নি। লেখার সময় কিছু চিন্তা করে লিখি না। আমি শুরু করলেই লেখা আপনা আপনি শেষ হয়ে যায়। লেখার জন্য আমি সেজেগুজে বসি না, লেখাই আমাকে বসিয়ে দেয়। তাই বলবো, জোর করে কখনো শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক হওয়া যায় না। লেখক হতে চাইলে তাকে চর্চা করতে হবে। লেখা ধারালো করার জন্যে অনেক বেশি বই পড়তে হবে। 

লেখক সেলিনা হোসেন আমাকে বলেছিলেন, তুমি অনবরত লিখে যাও। এখন লক্ষ্য করেছি যে আমার তখনকার লেখার সাথে এখনকার লেখার বেশ পার্থক্য। এজন্যেই আমার প্রথম প্রকাশিত বই আবারও সংশোধনের মাধ্যমে  নতুন করে এবারের বইমেলায় প্রকাশ করেছি।' 

লেখকের লেখনীতে লেখনীতে সমাজের বিভিন্ন বিষয়, সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটে, যা পাঠকদের নতুন ভাবনার খোরাক জোগায়। মুনিয়া মাহমুদও এই বিষয়গুলোকে একত্রিত করেন, প্রধান্য দেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'এটাকে সমষ্টিগত একটা চিন্তা বলা যায়। লেখার সময় পুরো বিষয়টা আমার মাথায় একযোগে কাজ করে। গল্পের চরিত্র, সংলাপ, কাহিনী সবকিছুকেই গুরুত্ব দেই। আমরা যারা লেখালিখি করি, তাদের মাথায় এই চিন্তাগুলো ধারাবাহিক ভাবে আসে।'

সাহিত‍্য চর্চার বিষয় হলেও আজকের নতুন লেখকদের অনেকের মধ্যে সেই চর্চার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। এই সম্পর্কে মুনিয়া মাহমুদ বলেন, 'লেখকদের ভালো লেখার জন্যে অনুপ্রেরণা ভীষণভাবে প্রয়োজন। যেমন আমার বাবা এবং হুমায়ুন আহমেদ থেকে আমি অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম। এটা নির্মম সত্যি যে, লেখক তার পরিবার পরিজনদের থেকে কম অনুপ্রেরণা পায়। তাছাড়া বর্তমানে আমাদের লেখকদের কোন অনুপ্রেরণা দেবার মতো কেউ নেই। লেখকদের একটা নিজস্ব জগত থাকে যেখানে তারা ডুব দিয়ে থাকে, যা সাধারণ মানুষদের নেই। তবে এটাও সত্যি যে, সব লেখকের পক্ষে পাঠক পাওয়া সম্ভব না। নিউইয়র্কে অনেক ভালো লেখক আছে যাদের অনেককেই আমরা চিনি না। কারণ তারা পর্যাপ্ত মার্কেটিং করেনি, যা একজন লেখকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।' 

প্রবাসে বাংলা সাহিত্য চর্চার জন্য বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে, যেখানে লেখক ও সাহিত্যিকরা একত্রিত হয়ে সাহিত্যকর্মে অংশগ্রহণ করেন। মুনিয়া মাহমুদ এমন কোনো সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেন কিনা, কিংবা কোনো অবদান রেখেছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমি কোন অবদান রেখেছি কিনা জানা নেই। তবে সাহিত্য সংগঠনে যেতাম। ২০১০ সাল থেকে নিউইয়র্কের সাহিত্য একাডেমীতে জড়িত থেকে রিপোর্ট করতাম। পরের দিকে যাওয়া আর সম্ভব হল না। কারণ, আমি লক্ষ্য করেছিলাম ওখানে কোন কোয়ালিটি কন্ট্রোল ছিল না। এটা যদি কোন প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠন হয় তাহলে এখানে লেখা বা কবিতার উপর সেমিনার হবে, যেমনটা আমেরিকায় হয়ে থাকে। প্রাতিষ্ঠানিক কোন কাজ ওখানে দেখিনি। আমি লাইব্রেরি গঠনের অফার করেলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।' 

এইচ বি রিতা রাজনৈতিক দলীয়করণ বাদেও লেখকদের মাঝে যে সামাজিক দলীয়করণ আছে, সে সম্পর্কে মুনিয়া মাহমুদের মতামত জানতে চান। তিনি বলেন, "ইতিহাস অনুযায়ী মানুষ একটা দলবদ্ধ জাতি, তারা দলবদ্ধ হয়েই থাকতে পছন্দ করে। সেই কারণেই নিউইয়র্কে প্রায় ২০ বছর ধরে আছি, হয়তো আমারও একটা নিজস্ব দল আছে। তবে আমি দলের জন্য নিজেকে বিকিয়ে দেইনি। আমরা মানুষ হয়ে জন্মেছি মানুষের উপকারের জন্য।' 

তিনি যুক্ত করেন, 'আমার বাড়ির পাশে বইমেলা হল কিন্তু আমার যাওয়ার ইচ্ছা হল না। কারণ আমি ফেসবুকে দেখলাম শুধু ছবি আর ছবি, দেখে মনে হল কোনো ফ‍্যাশন শো, বইমেলা না। একটা বইয়ের ছবি দেখলাম না, স্টলের ছবি দেখলাম না। তখন মনে হল, এমন ফ‍্যাশন করে তো আমি যেতে পারব না, আমি একজন লেখক আমি যাবো বইয়ের টানে। বইমেলা করলে সকল লেখকদের ডাকো, তাদের নাও, বলো-আসো তোমরা সবাই বই নিয়ে আমাদের বইমেলায়। এমন বইমেলা আমি আশা করি না। ' 

নিউইয়র্কের সাহিত্য সংগঠনগুলো সাহিত্যের বিকাশে কতটুকু অবদান রাখছে-দর্শক কুলসুম আক্তার সুমী'র এই প্রশ্নে মুনিরা মাহমুদ বলেন, 'অবদান রাখাটা যার যার নিজস্ব ব্যাপার, সংগঠন কোনো অবদান রাখে না। লেখালিখি কিংবা সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশনা বাড়ালে সেই মানুষকে সবাই চিনবে। অনুষ্ঠানগুলোতে সবাই সাজগোজ করে আসে, কবিতা পড়ে, খুব গুরুগম্ভীর আলোচনা করে যা অনেকে বুঝতেই পারে না। আমার মতে সংগঠনগুলো সাহিত্য বিকাশে তেমন কোন অবদান রাখে না।' 

দর্শক শামসুন ফৌজিয়ার প্রশ্ন ছিল, কীভাবে উদ্যোগ নিলে সাহিত্য সংগঠনগুলোতে সাহিত্যের সঠিক চর্চা সম্ভব হতে পারে? মুনিয়া মাহমুদ বলেন, 'এই ব্যাপারে আমি অনেকটাই হতাশ। আমার নিজেরই ২০১২ সাল থেকে হুমায়ুন আহমেদ মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন আছে। আমি দেখেছি নিউইয়র্কের মানুষ সাহিত্যের চাইতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উপরে বেশি মনোযোগ দেয়। অর্থবান বাঙালিরা নাচ-গানের অনুষ্ঠানে অনেক বড় চাঁদা দেবে, কিন্তু কোন সাহিত্যের অনুষ্ঠান নিয়ে কেউ ভাবে না। আমি একজন আয়োজক, চাইলেই একটা অনুষ্ঠান সহজে সাজাতে পারি। কিন্তু এর জন্যে অন্য কারো থেকে আর্থিক সাহায্য দরকার। আমি আশা করবো প্রবাসী বাঙালিরা যেন এই সাহিত্য এগিয়ে নেবার কর্মশালায় এগিয়ে আসে।'

উত্তর আমেরিকায় বাংলা সাহিত্যের চলমান পরিস্থিতি এবং মানদন্ড নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এখানেই শেষ হয়। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার 'টক অফ দ্য উইক' অনুষ্ঠানটি প্রতি বৃহস্পতিবার নিউইয়র্ক সময় রাত নয়টায় ফেসবুক লাইভে সম্প্রচারিত হয়ে থাকে। 
 

অভিমত থেকে আরো পড়ুন