https://www.prothomalony.com/
12274
opinion
১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর গত ৫৩ বছরেও বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটিতে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা লাভ করেনি, তার মূলে নানাবিধ ফ্যাক্টর জড়িত বলে আমার নিজের ধারণা।
বাংলাদেশের সরকারব্যবস্থায় সঠিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভাব ছাড়াও রাজনীতিবিদসহ এ দেশের মানুষের সুশিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষার অভাবকেও আমি এদেশে ফ্যাসিবাদ জন্ম নেয়ার পেছনে দায়ী বলে মনে করি। এদেশের মানুষের মধ্যে যেভাবে দুর্নীতি ও এনার্কিজম জায়গা করে নিয়েছে, তাতে এদেশকে কেবল সংবিধান বদলের মাধ্যমেই মানুষের মধ্যকার দুর্নীতি ও এনার্কিস্ট মানসিকতার অবসান ঘটবে- তা মনে হয় না।
৫০ বছর ধরে যে বিভক্তির রাজনীতি আমরা করে এসেছি, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মতাদর্শের ভিন্নতাকে পুঁজি করে একদল অপর দলের মধ্যে যে হিংসার বীজ আমরা বুনেছি তা কেবল নতুন একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে রাতারাতি তিরোহিত হবে, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। আমি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নই, সক্রিয়ভাবে কখনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িতও ছিলাম না। তবে, সাদা চোখে এমনটাই মনে হয় আমার।
সাহিত্যের বাইরে ইতিহাসের একজন পাঠক হিসেবে এবং একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এ দেশটিকে আমিও আরো অনেক নাগরিকের মতোই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবেই দেখতে চেয়েছি। কিন্তু গণতন্ত্র আমাদের কাছে আজও অধরাই থেকে গেছে। এদেশের অন্তত ৮০ শতাংশ মানুষ ধর্ম প্র্যাকটিস করলেও সৎ মানুষের সংখ্যা কিছুতেই ৫ শতাংশের বেশি নয়। অর্থাৎ ধর্মও আমাদেরকে নৈতিকভাবে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। সমাজের প্রায় সর্বত্র ঘুষ, দুর্নীতি, কমিশনবাণিজ্য, ভেজাল- এসবে ছেয়ে গেছে।
এসব সত্ত্বেও বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক ও উন্নত একটি দেশ হিসেবে দেখতে চান সকল দেশপ্রেমিক মানুষই। এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন যারা দেখেন এবং এমন একটি দেশ গড়ে তুলতে হলে কী করণীয় সেসব নিয়েও যারা ভাবেন তাদের একজন আমেরিকা-প্রবাসী তৌফিকুল ইসলাম পিয়াস।
বাংলাদেশকে তিনি একটি উন্নত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিশেবে কেবল দেখতে চান তা নয়, বরং তা করতে হলে আমাদের কী করণীয় সে সম্পর্কে তিনি সময়ে সময়ে বেশ কিছু ভাবনাজাগানিয়া নিবন্ধও লিখেছেন। সেসব নিবন্ধ নিয়েই সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে 'বদলে যাবার সুযোগ: ওয়েক আপ বাংলাদেশ'।
এ বইয়ে তার দেয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস সংক্রান্ত বেশকিছু তথ্য ও মতের সঙ্গে আমি একমত নই, কিন্তু তা সত্ত্বেও এটিকে এ সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বই বলে মনে করি। এ বইয়ের বেশকিছু নিবন্ধ আমাদের নীতিনির্ধারক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ ও অর্থনীতিবিদদেরও পড়া দরকার বলেই মনে হয়।
তার অনেক প্রস্তাবনাকেই প্রাথমিকভাবে ইউটোপিয়ান মনে হতে পারে এবং তারপরও তার বিভিন্ন বিশ্লেষণ পাঠকের মনে স্বপ্ন জাগিয়ে তুলতে সক্ষম। কিন্তু এসব সত্ত্বেও তার রচনায় যথেষ্ট সারবত্তা আছে বলেও একইসঙ্গে আমার মনে হয়েছে।
তিনি সম্পূর্ণ নতুন একটি সংবিধান প্রণয়নের পক্ষে এবং একই সঙ্গে আমেরিকার মতো প্রেসিডেন্টশাসিত একটি সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পক্ষে। বর্তমান সংবিধানটিকে তার কাছে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য উপযোগী নয় বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।
যদিও বর্তমান সংবিধানের আওতায় কেন প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকারব্যবস্থায় যাওয়া এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম সম্ভব নয় সে বিষয়ে যৌক্তিক কোনো বিশ্লেষণ তিনি হাজির করেননি। আমার ধারণা, আমেরিকার সরকারব্যবস্থাকে অন্যান্য রাষ্ট্রের তুলনায় তার কাছে বেশি জনবান্ধব মনে হয়েছে এবং সে কারণেই আমেরিকার সংবিধানের মতো একটি সংবিধান প্রণয়ন করাটাই তার কাছে বেশি যৌক্তিক বলে মনে হয়েছে।
তিনি কেমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন সেটা বোঝার জন্য তার লেখা থেকে কিছুটা উদ্ধৃত করা যাক-
'বাংলাদেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী নিজেই আইনপ্রণেতা এবং নিজেই সরকারপ্রধান। অর্থাৎ তিনি চাইলে যা খুশি করতে পারেন। কিন্তু বিষয়টি যদি এমন হতো যে, প্রেসিডেন্ট নিজে কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারবেন না; আইন প্রণয়ন করবে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা এবং ঐ আইন মেনে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন প্রেসিডেন্ট। অর্থাৎ একজন প্রেসিডেন্ট নিজে যা ইচ্ছে করতে পারবেন না; তাকে আইন মেনে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে এবং আইনকে কঠোরভাবে পাহারা দিবে সংসদ। প্রেসিডেন্ট কোনো ভুল করলে সংসদ তার "গলা টিপে" ধরবে। এরকম ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ শাসনব্যবস্থা থাকলে দেশে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা হবার কোনোই সুযোগ থাকে না। এবং আইন যদি থাকে যে, একজন প্রেসিডেন্ট তার জীবদ্দশায় ২ মেয়াদের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারবে না; তাহলে ফ্যাসিবাদ কায়েম হবার সম্ভাবনা শতভাগ কমে যাবে।'
তিনি আরো বলেছেন, 'বাংলাদেশের আইনকানুন সবই একজন রাজা কর্তৃক প্রজা শাসনব্যবস্থা মাত্র; যেখানে গণতন্ত্রের লেশমাত্র অবশিষ্ট নেই। এ ব্যবস্থার পরিবর্তন অত্যাবশ্যক।'
বাংলাদেশের অর্থনীতি, গণমানুষের অধিকার, পুলিশের ক্ষমতা ও ব্যবহার, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান, আইন আদালত, কূটনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চারশোরও বেশি পৃষ্ঠার এ গ্রন্থটিতে রয়েছে ট্রান্সজেন্ডার নিয়েও অসামান্য একটি লেখা।
এমনকি বইটিতে আছে 'মাথা উঁচু করে থাকা একজন শেখ মুজিব' নামের একটি নিবন্ধও। শেখ মুজিবুর রহমানকে এতে স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন উল্লেখযোগ্য নেতা হিসেবে চিত্রায়িত করা হলেও শাসক শেখ মুজিবের ভুল-ত্রুটির বিবরণও তিনি দিয়েছেন।
বইটিতে থাকা তার বিভিন্ন রচনা বিভিন্ন সময়ে লেখার কারণে বেশকিছু বিষয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। আশা করি, পরের সংস্করণে তিনি সেসব ত্রুটি দূর করার চেষ্টা করবেন। তবে, তার গদ্য স্বাদু ও স্বতঃস্ফূর্ত হওয়ায় পড়তে মন্দ লাগেনি। বইটি পড়তে পড়তে এও মনে হয়েছে, বদলে যাওয়ার এ সুযোগ কি আমরা সত্যিই কাজে লাগাতে পারবো? নাকি আমরা আবারও জড়িয়ে যাবো- আগেরই মতো, ফ্যাসিবাদের পুরোনো চক্রব্যূহেই। সময়ই তা বলে দেবে।
তৌফিকুল ইসলাম পিয়াসকে অভিনন্দন, এমন একটি সময়োপযোগী গ্রন্থ উপহার দেয়ার জন্য।
তার বইয়ের শিরোনাম ধার করেই বলি- জাগো বাংলাদেশ! বদলে যাওয়ার, বদলে দেয়ার এটাই মোক্ষম সুযোগ।
অভিমত থেকে আরো পড়ুন